হযরত আবুল লায়িছ মাদানী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কাশফ ও কারামত

হযরত আবুল লায়িছ মাদানী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কাশফ ও কারামত 
হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) বলেন,–রোববার ১৩ই শাবান ৬৫৫ হিজরী। কদমবুসির সৌভাগ্য লাভ করলাম। হযরত আবুল লায়িছ মাদানী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কাশফ ও কারামত নিয়ে আলোচনা হচ্ছিলো। হযরত শায়খুল  ইসলাম (শেখ ফরিদ) রহমতুল্লাহি আলাইহি এরশাদ করলেন, হযরত আবুল লায়িছ কুদ্দিছা ছিররুহুল আজীজ একজন প্রখ্যাত ও শ্রেষ্ঠ বুজুর্গদের অন্যতম ছিলেন। তিনি শায়খ ইউসুফ চিন্তী, শায়খ শিহাবুদ্দিন ওমর সোহরাওয়ার্দী, রহমতুল্লাহি আলাইহি শায়খ ফরিদউদ্দিন আত্তার এবং খাজা আবিন্নুর ওসমান হারুনী কুদ্দেছা ছিররুহুল আজিজ এদের সমসাময়িক ছিলেন। 
যখন মোগলদের অত্যাচার শুরু হলো এবং মোগলগণ ইয়ামন অবরোধ শুরু করলো তখন ইয়ামনের বাদশাহ বিদিশা হয়ে তাঁর খেদমতে উপস্থিত হলো এবং বহু অনুনয় বিনয় করতে লাগলো। বাদশাহের কান্নাকাটিতে তিনি তাঁর হাতের চিকন ছড়িটা হিলাতে হিলাতে বললেন, যখন সূর্য ডুবে যেয়ে রাত হবে তখন মোঘল সৈন্যদের উপর এ ছড়িটা নিক্ষেপ করবে, ইন্‌শাআল্লাহ তোমার কাজ সফল হবে। 
খলিফা আদব কার্য সম্পাদন করে বিদায় নিলো। নির্দেশিত সময়ে নির্দেশিত পন্থায় মোগল সৈন্যদের উপর ঐ ছড়িটা নিক্ষেপ করলো। এটা তাদের প্রতি নিক্ষেপ করার সাথে সাথে একটা হুলুস্থুল পড়ে গেলো এবং একে অন্যের উপর হুমরী খেয়ে পড়তে লাগলো। এ দিকে ইয়ামনের সৈন্য তাদেরকে ধাওয়া করে বধ করতে লাগলো পরিশেষে একজন মোঘল সৈন্যও ফিরে যেতে পারলো না। 

পরবর্তী পর্ব —
হযরত শায়খ বাহাউদ্দিন যাকারিয়ার কারামত

আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্তদের রিজিকের জন‍্য চিন্তা করতে হয়না

আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্তদের রিজিকের জন‍্য চিন্তা করতে হয়না—

হুজুর শেখ ফরিদ (রহ.) আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, মাওলানা নিজামুদ্দিন, যে ব্যক্তি খোদার ইবাদত করে এবং তাঁর খেদমতের প্রাপ্যের মধ্যে কসূর না করে আল্লাহ তায়ালাও তারসন্তুষ্টিতে কাজ করেন।
 বদখশান দেশে শায়খ ওয়াহেদুন্নবীয়ায়ে জুনুন মিসরী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। তিনি শহরের বাইরে এক নির্জন গোহায় বাস করতেন। তিনি শ্রেষ্ঠতর সোপানে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর এক পাও গোহার ভিতরে ছিলো অন্য পা কেটে গোহার বাইরেফেলে রেখে ছিলেন। এক পায়ের উপর ভর করেই তিনি ঐশী-অচৈতন্য-লোকে নিমজ্জিত ছিলেন। আমি তাঁর নিকট যেয়ে সালাম পেশ করলাম। তিনি সালামের জবাব দিয়ে বসতে বলে পুনরায় ধ্যান-মগ্ন হলেন। আমি তাঁর নির্দেশানুযায়ী বসে রইলাম। তিনি তিন দিবারাত্র ঐ হালে থাকার পর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলেন। তারপর আমাকে বললেন, হে ফরীদ, আমার কাছে এসো না, এলে চলে যাবে এবং দূরেও থেকো না, তাহলে বিযুক্ত থাকবে। কিছু কথা শুনেযাও। ৭০ বছর হলো আমি এ গুহায় বাস করছি। অদৃশ্য জগত হতে আমার আহার আসে।একবার এই রাস্তা দিয়ে এক মহিলা যাচ্ছিলো, তার প্রতি আমার দৃষ্টি পতিত হওয়ায় আমার অন্তরে কিছু বদখেয়ালের সৃষ্টি হলো আমি গুহা হতে বাইরে বেরুবার ইচ্ছা করলাম। হঠাৎ গায়েবী আওয়াজ হলো, ওহে প্রার্থনাকারী, তোর কি এই ইচ্ছা ছিল যে আমাকে ছাড়া অন্যকেও কামনা' করবি? এ আওয়াজ শুনার পর আমার মনে ধিক্কার এলো। চাকু আমারকোমরে ছিলো বের করে যে পাটা বাইরে বের করেছিলাম সেটা কেটে তৎক্ষণাৎ ফেলে দিলাম। এ ঘটনা ঘটেছে আজ হতে ৩০ বছর আগে। আমি চিন্তিত আছি এ জন্য যে, কিয়ামতের দিন যখন ঐ সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হবে তখন কি জবাব দিব? 
এরপর শায়খুল ইসলাম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বললেন, সে রাত আমি সেখানেই ছিলাম ইফতারের সময় কিছু দুধ ও দশটি খোরমা উর্ধ্বলোক হতে নেমে এলো। আমি দুধের বাটী আর খোরমা তার সম্মুখে রাখলাম। তিনি বললেন হে ফরীদ, প্রতি দিন পাঁচটা খোরমা আসে, আজঅধিক যা এসেছে তা তোমার জন্য। এসো আহার করি। আমি আদাব রক্ষার জন্য তাঁর আদেশ পালন করলাম। অল্পক্ষণের মধ্যেই তিনি পুনরায় ধ্যানমগ্ন হয়ে ঐশী-অচৈতন্যলোকে গমন করলেন। 

আল্লাহর ওলিদের জন‍্য সবই সহজ 

কারামত দরবেশদের মনের ইচ্ছা

কারামত দরবেশদের মনের ইচ্ছা —
এরপর বললেন, আমি এক সময় সিস্তানে ভ্রমণরত ছিলাম, যখন শায়খ আহাদউদ্দিন কিরমানীর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিলো। তিনি আমাকে বললেন, কল্যাণের পথে রয়েছো। তিনি আরো বললেন যে, মাশায়েখদের খেদমত করে তুমি সৌভাগ্যবান হয়েছো এবং আমার নিকট আসাও তোমার জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। আমি তাঁর নিকট কিছুদিন থেকে গেলাম।আরও দশজন দরবেশ তাঁর মজলিশে উপস্থিত ছিলো; যাঁদের প্রত্যেকেই সাহেবে নে'য়ামত (আল্লাহতায়ালার নিয়ামত প্রাপ্ত ব্যক্তি) ছিলেন। 

কারামত সম্বন্ধে আলোচনা হচ্ছিলো। তাদেরমধ্য হতে একজন বলে উঠলেন, কিছু কারামত প্রদর্শন করা দরকার। 
শায়খ আহাদউদ্দিন কিরমানী রহমতুল্লাহি আলাইহি মজলিসের প্রধান ছিলেন, প্রত্যেকে বললেন, প্রথম কারামত আপনাকে প্রদর্শন করতে হবে। তিনি বললেন, এ শহরের শাসনকর্তা আমার প্রতি বিশ্বাসরাখেনা এবং অনেক সময় আমাকে কষ্ট দেয়, তাই আজ ময়দান হতে তার আর ফেরা হবে না। তিনি এ কথা বলার একটু পরেই একজন লোক এসে সংবাদ দিলো, এ শহরের শাসনকর্তা একটু আগে পলো খেলার সময় ঘোড়ার উপর থেকে পড়ে প্রাণ ত্যাগ করেছে। 
এক দরবেশ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এবার আপনার পালা, কিছু প্রদর্শন করুন। আমি তাদেরকে চোখ বন্ধ করতে বলে মুরাকাবায় বসলাম একটু পরে মাথা উত্তোলন করে তাদেরকে চোখ খুলতে বললাম, দরবেশগণ চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে তারা স্বশরীরে কাবাশরীফে উপস্থিত। কিছুক্ষণ সেখানে থাকার পর একই নিয়মে মজলিসে প্রত্যাবর্তন করলাম। তারা এ কারামত দেখে বললেন যে, হ্যাঁ, দরবেশ হতে হলে এমনই হওয়া দরকার। আমার কারামত দেখানো শেষ হলে আমরা তাদেরকে বললাম, আমাদেরটা তো শেষ করেছি এবার আপনারা দেখান। তারা বললেন, দেখুন। এই বলে তারা নিজেদের মাথা খিরকার ভিতরে প্রবেশ করালোএবং গায়েব হয়ে গেলো। অবশ্য খিরকা ওখানেই পড়ে রইলো। 

পরবর্তী পর্ব —
আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্তদের রিজিকের জন‍্য চিন্তা করতে হয়না—

প্রকৃত দরবেশদের অবহেলা করা ক্ষতির কারণ

প্রকৃত দরবেশদের অবহেলা করা ক্ষতির কারণ 

পরবর্তী আলোচনা শুরু হলো 'দরবেশ' সম্বন্ধে। হুজুর এরশাদ করলেন, সব সময় দরবেশদের সম্বন্ধে ভালো ধারণা রাখা উচিত। যাঁর বরকতে সেও আল্লাহ্ সাহায্য-প্রাপ্তদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হতে পারে। এরপর বললেন, মুলতান ও আউচের শাসনকর্তাদ্বয় আমার প্রতি ভালো ধারণা পোষণ করতো না; যার জন্য আমি এ পংক্তি দুটো পাঠ করতাম :
"দুঃখ এই যে আমার অবস্থার খবর তোমার জানা নেই 
অতি শীঘ্র তুমি জানবে, তখন তুমি দুঃখ করবে।"

পরিশেষে অবস্থা এমন হলো যে কাফেরগণ তাদের রাজ্য আক্রমণ করলো এবং ছিন্ন ভিন্ন করেদিলো।

পরবর্তী পর্ব —
কারামত দরবেশদের মনের ইচ্ছা 


দুনিয়ার দুঃখই পরকালের সুখ বয়ে আনে

দুনিয়ার দুঃখই পরকালের সুখ বয়ে আনে 
এরপর বললেন, কিয়ামতের দিন ফকির দরবেশগণ যখন অত্যধিক মর্যাদার অধিকারী হবেন তখন ধনীগণ আক্ষেপ করে বলবে, হায়, আমি দুনিয়ায় দুঃখ ভোগ করলাম না কেন? 

তারপর বললেন, মানুষের উচিত স্বীয় প্রভুর কাজে লেগে থাকা এবং যখন কোন দুঃখ-কষ্ট আসে তখন চিন্তা করা উচিত এটা কোথা হতে এবং কেন এলো? চিন্তা করলে সে কারণ খুঁজে পাবে। কেননা মানুষই নফসের চিকিৎসক। এ পর্যন্ত বলার পর তাঁর চোখ অশ্রুভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। তিনি নিম্নোক্ত বয়াতটি আবৃত্তি করলেন।
"হে প্রেমিক দুঃখের খনির মাঝে তোমার চিকিৎসা 
হে প্রেমিক বাঘের গুহায় রয়েছে তোমার হরিণ।"

পরবর্তী পর্ব —
প্রকৃত দরবেশদের অবহেলা করা ক্ষতির কারণ

অন্তরে পাপ ব‍্যাবসার জন‍্য ক্ষতিকর

অন্তরে পাপ ব‍্যাবসার জন‍্য ক্ষতিকর—
শেখ ফরিদ (রহ.) বললেন, যখন আমি বোখারায় শায়খ সাইফুদ্দিন বাখিরজী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মসজিদে উপস্থিত ছিলাম তখন এক লোক তাঁর নিকট এসে নিবেদন করলো, হযরত আমি মওজুদ মালের ব্যবসা করি কিন্তু গত কয়েক বছর যাবৎ শুধু লোকসান হয় এবং অনেক সময আমি নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়ি, তাতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। তিনি ঐ ব্যবসায়ীকে বললেন, দেখো, যখন কোন মুসলমানের অনবরত লোকসান দেখা দেয় তখন বুঝতে হবে তাঁর অন্তরে কোন পাপ জমা হয়েছে যার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে তার ঈমান শুদ্ধ হয় এবং সেও সংশোধন হয়। 

পরবর্তী পর্ব —
 দুনিয়ার দুঃখই পরকালের সুখ বয়ে আনে—

দরবেশগণ নফল নামাজও গুরুত্ব সহকারে পালন করেন

দরবেশগণ নফল নামাজও গুরুত্ব সহকারে পালন করেন—
শুক্রবার ১১ই শাবান ৬৫৫ হিজরী। কদমবুসি করে ধন্য হলাম। বেনামাজীদের সম্বন্ধেআলোচনা চলছিলো। তিনি (শেখ ফরিদ) এরশাদ করলেন, বেনামাজী অবশ্যই নিজের কর্তব্যপালন করেনা।

 এরপর বললেন, গজনীর এক মসজিদে একবার আমার রাত্রি যাপনের সুযোগ হয়েছিলো। সেখানে কয়েকজন দরবেশ বাস করতেন। তাদের প্রত্যেকেই এমন ভাবে ধ্যানমগ্ন ছিলেন যা বর্ণনা করে বুঝানো সম্ভব নয়। ভোর হওয়ার পর সেখানে থেকে একটা জলাসয়ের নিকট পৌঁছলাম। পূর্ব হতেই সেখানে একজন মহিমান্বিত বুজুর্গ উপস্থিত ছিলেন। আমি তাঁকে সালাম জানালাম। তিনি সালামের উত্তর দিয়ে আমাকে বসতে বললেন। আমি তাঁর নির্দেশ পালন করলাম। তিনি অত্যন্ত বৃদ্ধ ছিলেন এবং তাঁর শরীর ছিলো জীর্ণ-শীর্ণ-ক্লিষ্ট। আমি তাঁর দেহের এ করুণ অবস্থার কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, আমার পেটের অসুখ। আমি সারাদিন তাঁর খেদমতে কাটালাম। যখন রাত হলো তখন তাঁর অসুখ বেরে গেলো। তাঁর অভ্যাস ছিলো প্রত্যেক রাতে ১২০ রাকাত নফল নামাজ পাঠ করা। অভ্যাস মতো তিনি নামাজে দাঁড়ালেন কিন্তু দু'রাকাত পড়ার পর তাঁর পায়খানার বেগ হলো। তিনি পায়খানা করে গোসল করে এসে পুনরায় নামাজে দাঁড়ালেন। কিন্তু দু'রাকাত পড়ার পর আবারও তাঁর পায়খানার বেগ হলো। তিনি পায়খানা করে আবার গোসল করে এসে নামাজে দাঁড়ালেন। কিন্তু এবারও তিনি দু'রাকাতের অধিক পড়তে পারলেন না; পুনরায় তাঁর পায়খানার বেগ হলো এবং তিনিবের হয়ে গেলেন। পায়খানা করে ফিরার পথে তিনি গোসল করে এসে নামাজে দাঁড়ালেন।কিন্তু এবারও সেই একই অবস্থা দু'রাকাতের বেশী পড়তে পারলেন না। এভাবে তিনি তাঁর প্রত্যেক দিনের অভ্যাসকে জীবিত রাখতে যেয়ে ১২০ রাকাত নামাজ পড়ার জন্য ৬০ বার গোসল করলেন এবং শেষ বার গোসল করার পর নামাজের শেষ রাকাতে শেষ সেজদার মধ্যে ইন্তেকাল করলেন। সোবহানাল্লাহ! কেমন মজবুত আকিদার লোক ছিলেন তিনি! নিজের অজিফা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্ব মুহূর্তেও পরিপূর্ণ করে তারপর দুনিয়া ত্যাগ করলেন।

এরপর এরশাদ করলেন যখন কারও কোন অসুখ হয় তখন তার বুঝা উচিত তার অর্জিত গোনাহ্ হতে সে পবিত্র হচ্ছে। 

পরবর্তী পর্ব —
অন্তরে পাপ ব‍্যাবসার জন‍্য ক্ষতিকর—

__