ইসলামের আলোকে শ্রম ও শ্রমিকের মর্যাদা



গত শতাব্দীতে আমেরিকায় শিকাগো শহরে অধিকার আদায়ের একটি মিছিলে গুলি করে হত্য করা হয় কয়েকজন নিরীহ শ্রমিককে । পরবর্তীতে এই ঘঠনাকে কেন্দ্র করে দিনটিকে শ্রমিক দিবস হিসাবে পালন করা হয়। বর্তমানে বিশ্ব যখন একটি ছোট্ট গ্রামে (গ্লোবাল ভিলেজ) পরিণত হয়েছে। একটির সঙ্গে আরেকটির সীমান্ত লাগানো। এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের স্বার্থ জড়িত। তখন শ্রম দিবস পালিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। ইংরেজি বর্ষের পঞ্চম মাস মে'র প্রথম দিনটি পালিত হয় আন্তর্জাতিক অ্রমিক দিবশ হিসাবে। এমতাবস্থায় আমাদের কর্তব্য আন্তর্জাতিক সন্মান, শ্রমিক ও মানবাধিকার প্রভৃতি দিবশ উপলক্ষে ইসলামের শ্রমিকের অধিকার কিভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে তা সবার সামনে উপস্থাপন করা। কারণ ইসলামই সেই ধর্ম প্রথম যে মানবাধিকারের বিধান প্রবর্তন করেছে। যেমন ইসলামই শ্রম ইতিহাসে সর্বপ্রথম শ্রমিকের প্রতি যথার্থ দৃষ্টি দিয়েছে। তাকে দিয়েছে সন্মান ও মর্যাদা আর শ্রমের স্বীকৃতি। পক্ষান্তরে কোন কোন সনাতন ধর্মে শ্রমের অর্থ ছিল দাসত্ব বশ্যতা । আবার কোন ধর্মে এর অর্থ ছিল লাঞ্চনা ও অবমাননা ।ইসলাম সমাজে আর দশজন সদস্যের মত নাগরিক হিসাবে তাদের প্রকৃতিক অধিকারগুলোর স্বীকৃতি দিয়েছে। তেমনি শ্রমিক হিসাবে তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে অনেক মূলনীতি ও বিধিও প্রবর্তন করেছে। যাতে সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা হয়। তাসের ইহ ও পরকালীন জীবনে তাদের ও তাদের পরিবারের সন্মানিত জীবন লাভ হয়। এভাবে ইসলাম শ্রমগ্রহীতার প্রতি আহবান জানিয়েছে শ্রমিকের সঙ্গে মানবিক ও সন্মান জনক আচরণ করতে। তার প্রতি মমতা দেখাতে । তার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে। তাকে বারণ করেছে তার সাধ্যাতীত কাজের নির্দেশ প্রদান থেকে। এমনকি নানা অধিকার সুযোগ নিশ্চিত করেছে ইসলাম শ্রমিকের জন্য। শ্রমগ্রহীতার কাধে যা সব বাধ্যবাদকতা আরোপ করা হয়েছে তার মধ্যে সবচে গুরুত্বপূর্ভ হল শ্রমের মুল্য বা মজুরী । সেহেতু ইসলাম এর প্রতি অত্যদিক গুরুত্ব আরোপ করেছে।আমরা দেখেছি ইসলাম কিভাবে কাজ বা শ্রমকে ইবাদত হিসাবে গন্য করে। কীভাবে একে সকল ইবাদতের ওপর স্থান দেয়।আর শ্রমের এই পবিত্র দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে ইসলাম শ্রমিকের মজুরী বা পারিশ্রমিককেও পবিত্র ঘোষনা করে।উদ্বুদ্ধ করে যাতে সকল শ্রমিককে তার শ্রমের মুল্য পরিশোধ করা হয়। পবিত্র কুরআনে অনেক যায়গায় 'আযর' বা বিনিময় শব্দটি উল্লেখিত হয়েছে। আবার অসংখ্য হাদিসেও শ্রমের বিনিময়ের প্রতি বিশেষ নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
শ্রমিকের অধিকার আদায়ে রসুল সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম এর ঘোষণা
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, শ্রমিকের গায়ের গাম শুকিয়ে যাওয়ার আগে তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও 
(ইবনে মাজাহ)
রাসূল (সা.) বলেছেন, “তোমাদের অধীন ব্যক্তিরা তোমাদের ভাই আল্লাহ তায়ালা যে ভাইকে তোমার অধীন করে দিয়েছেন তাকে তা- খেতে দাও, যা তুমি নিজে খাও, তাকে তা- পরিধান করতে দাও, যা তুমি নিজে পরিধান কর।” (বুখারী)
কিয়ামতের দিন শ্রমিকের পক্ষে মহান আল্লাহ দাঁড়াবেন 
'হযরত আবু হুরাইরা রা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল সা বলেছেন যে, মহান আল্লাহ ফরমান জারি করেছেন যে কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যাক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেব
. যে ব্যক্তি আমার নামে শপথ করে, প্রতিশ্রুতি দেয় অতঃপর ওয়াদা ভঙ্গ করে 
. যে ব্যক্তি কোন স্বাধীন লোক কে বিক্রি করে মূল্য খেয়ে ফেলল (তাকে কৃতদাস বাণিয়ে দিল) এবং 
. যে ব্যক্তি শ্রমিক নিয়োগ করে কাজ আদায় করে নিল কিন্তু শ্রমের পারিশ্রমিক প্রদান করল না 
(বুখারী-মুসলিম)
ইসলামের ইতিহাস পড়লে আমরা দেখি শ্রমের দাতা ও গ্রহিতার মধ্যে বৈষম্য ইসলামে ছিলনা এবং নেই যেমন নিচের কিছু ঘঠনা পড়ে অনুমান করতে পারেন। নবী-রাসূলগণ শ্রমিকদের কত মর্যাদা দিয়েছেন ইসলামের সব নবী ছাগল চরিয়ে নিজে শ্রমিক হয়ে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন
হযরত আবু হুরাইরা (রঃ) থেকে বর্ণিত তিনি নবী (সঃ)  থেকে বর্ণনা করেছেন যে রাসূল (সঃ) বলেছেন আল্লাহ তায়ালা যথ নবী পাঠিয়েছেন সকলে ছাগল চরায়েছেন সাহাবীগণ বললেন হে আল্লাহর রাসূল আপনিও কি চরায়েছেন ? তখন রাসূল সা বললেন হ্যাঁ! আমি কয়েক কেরাতের বিনিময়ে মক্কাবাসীদের ছাগল চরায়েছি (শ্রম খেটেছি) 
তাহলে বুঝা যায় মুসলিম কোন প্রকারেই শ্রমিককে হেয় করতে পারেনা।
মালিক হযরত শোয়াইব (আঃ) তাঁর মেয়ের বিয়ে দিয়ে শ্রমিক নবী মূসাকে (আঃ) জামাই বানিয়েছেন
রসুল (সঃ) শ্রমিক যায়েদ (রাঃ)-এর কাছে আপন ফুফাতো বোন জয়নবের বিয়ে দিয়েছিলেন তিনি (সঃ) যায়েদকে (রাঃ) মুতারের যুদ্ধে প্রধান সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন
ইসলামের প্রথম মোয়াজ্জিন বানানো হয়েছিল শ্রমিক হযরত বিলালকে (রাঃ)
মক্কা বিজয় করে কাবা ঘরে প্রথম প্রবেশের সময় মহানবী (সা.) শ্রমিক বেলাল (রাঃ) শ্রমিক খাব্বাবকে (রাঃ ) সাথে রেখে ছিলেন নবীজী কখনো নিজ খাদেম আনাসকে (রাঃ) ধমক দেননি এবং কখনো কোনো প্রকার কটুবাক্য কৈফিয়ত তলব করেননি
আরো অসংখ্য হাদিসে আমরা দেখতে পাই শ্রমিকের মর্যাদা কত উর্ধে । তাই পহেলা মে তথাকথিত শ্রমিক দিবস পালন নয় । ইসলাম ও শ্রমিকের অধিকার পর্যালোচনার দিবস বলেই আখ্যেয়িত করা যুক্তিযুক্ত।

শবে বরাতের আমল

পবিত্র শবে বরাতের আমল

#পবিত্র_শবে_বরাতের_আমল
শবে বরাত হচ্ছে মুক্তি বা ভাগ্য অথবা নাজাতের রাত। অর্থাৎ বরাতের রাত্রিতে ইবাদত-বন্দেগী করে ও পরবর্তী দিনে রোযা রেখে আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনাদের সন্তুষ্টি অর্জন করাই মূল উদ্দেশ্য। শবে বরাতে কোন্ কোন্ ইবাদত-বন্দেগী করতে হবে তা কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ শরীফে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। তবে ইবাদত-বন্দেগী করার জন্য নির্দেশ করা হয়েছে। যেমন হাদীছ শরীফে বর্ণিত রয়েছে- “হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ পাক-উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, যখন শা’বানের ১৫ তারিখ রাত্রি অর্থাৎ বরাতের রাত্রি (চৌদ্দ তারিখ দিনগত) উপস্থিত হবে তখন তোমরা উক্ত রাত্রিতে নামায আদায় করবে এবং দিনে রোযা রাখবে। কেননা নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক তিনি উক্ত রাত্রিতে সূর্যাস্তের সময় পৃথিবীর আকাশে আসেন অর্থাৎ রহমতে খাছ নাযিল করেন। অতঃপর ঘোষণা করেন, “কোন ক্ষমা প্র্রার্থনাকারী আছো কি? আমি তাকে ক্ষমা করে দিবো।” “কোন রিযিক প্রার্থনাকারী আছো কি? আমি তাকে রিযিক দান করবো।” “কোন মুছিবতগ্রস্ত ব্যক্তি আছো কি? আমি তার মুছিবত দূর করে দিবো।” এভাবে ফজর পর্যন্ত ঘোষণা করতে থাকেন।” (ইবনে মাজাহ, মিশকাত)
হাদীছ শরীফে আরো বর্ণিত আছে - “হযরত আবু মূসা আশআরী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি আল্লাহর হাবীব হুযূর পাক সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- থেকে বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক তিনি শা’বানের ১৫ তারিখ রাত্রিতে ঘোষণা করেন যে, উনার সমস্ত মাখলূকাতকে তিনি ক্ষমা করে দিবেন। শুধু মুশরিক ও হিংসা-বিদ্বেষকারী ব্যতীত। (ইবনে মাজাহ, আহমদ, মিশকাত)
উপরোক্ত হাদীছ শরীফসমূহের সংক্ষিপ্ত বিষয়বস্তু হলো, রাত্রিতে ইবাদত-বন্দেগী করতে হবে এবং দিনে রোযা রাখতে হবে। যার মাধ্যমে আল্লাহ পাক বান্দাহকে ক্ষমা করে স্বীয় সন্তুষ্টি দান করবেন।
বরাতের রাত্রিতে যেসব ইবাদত করতে হবে তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হলো-
বরাতের নামায: শবে বরাতে ৪, ৬, ৮, ১০, ১২ রাকায়াত নফল নামায পড়া যেতে পারে।
ছলাতুত তাসবীহ নামায: অতঃপর ছলাতুত তাসবীহ-এর নামায পড়বে, যার দ্বারা মানুষের সমস্ত গুণাহখতা ক্ষমা হয়। (নিচে লিংক দেয়া হল)
তাহাজ্জুদ নামায:
অতঃপর তাহাজ্জুদের নামায পড়বে, যা দ্বারা আল্লাহ পাক-উনার নৈকট্য হাছিল হয়।
(নিচে লিংক দেয়া হল)
কুরআন শরীফ তিলাওয়াত: কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করবে, যার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা-উনার সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। কেননা নফল ইবাদতের মধ্যে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত হচ্ছে সর্বোত্তম আমল।
মীলাদ শরীফ ও দুরূদ শরীফ পাঠ: মীলাদ শরীফ ও দুরূদ শরীফ পাঠ করবে, যার দ্বারা আল্লাহ পাক-উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিইয়ীন হুযূর পাক সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার সন্তুষ্টি অর্জিত হয়।
যিকির-আযকার: যিকির-আযকার করবে, যার দ্বারা দিল ইছলাহ হয়।
কবর যিয়ারত: কবরস্থান যিয়ারত করবে, যার দ্বারা সুন্নত আদায় হয়। তবে কবর বা মাযার শরীফ যিয়ারত করতে গিয়ে সারারাত্র ব্যয় করে দেয়া জায়িয হবেনা। সুন্নত আদায়ের লক্ষ্যে নিকটবর্তী কোন কবরস্থান যিয়ারত করে চলে আসবে।
দান-ছদকা: গরীব-মিসকীনকে দান-ছদকা করবে ও লোকজনদের খাদ্য খাওয়াবে, যার দ্বারা হাবীবুল্লাহ হওয়া যায়।
দোয়া-ইস্তিগফার: আল্লাহ পাক-উনার নিকট দোয়া করবে, যার কারণে আল্লাহ পাক খুশি হবেন ও উনার নিয়ামত লাভ হবে। আর সর্বশেষ খালিছ ইস্তিগফার ও তওবা করবে, যার মাধ্যমে বান্দাহর সমস্ত গুণাহ-খতা মাফ হয়ে আল্লাহ পাক-উনার খালিছ সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। অর্থাৎ শ’বে বরাতের বারাকাত, ফুয়ূজাত, নিয়ামত, রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত ইত্যাদি হাছিল করা যায়।
স্মরণীয় যে, অনেক স্থানে দেখা যায় যে, লোকজন ছুবহে ছাদিকের পর আখিরী মুনাজাত করে থাকে। মূলতঃ মুনাজাত যে কোন সময়েই করা যায়। তবে বরাতের রাতে দোয়া কবুল করার যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা ছুবহেছাদিকের পূর্ব পর্যন্ত। এরপর বরাতের রাত অবশিষ্ট থাকেনা। কেননা, হাদীছ শরীফে স্পষ্টই বলা হয়েছে যে- “ফজর বা ছুবহে ছাদিক পর্যন্ত আল্লাহ পাক তিনি দোয়া কবুল করেন।” অতএব, সকলের উচিৎ হবে মূল বা আখিরী মুনাজাত ছুবহে ছাদিকের পূর্বেই করা।
[দলীলসমূহ – (১) তাফসীরে কুরতুবী, (২) মাযহারী, (৩) রুহুল বয়ান, (৪) রুহুল মায়ানী, (৫) খাযিন, (৬) বাগবী, (৭) তিরমিযী, (৮) ইবনে মাজাহ, (৯) আহমদ, (১০) রযীন, (১১) মিশকাত, (১২) মিরকাত, (১৩) আশয়াতুল লুময়াত, (১৪) লুময়াত, (১৫) ত্বীবী, (১৬) ত্বালীক, (১৭) মুযাহিরে হক্ব ইত্যাদি।]
শবে বরাতে ইবাদতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে সারারাত্র ওয়াজ মাহফিল করা
শবে বরাত হচ্ছে ইসলামের বিশেষ রাত্রিসমূহের মধ্যে একটি রাত্রি। যা শা’বানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত্রিতে হয়ে থাকে। শবে বরাত-এর অর্থ হচ্ছে মুক্তির রাত্র বা নাজাতের রাত্র। এ রাতে ওয়াজ-নছীহত করার আদেশও নেই। আবার নিষেধও করা হয়নি। তবে এ রাতে দোয়া কবুল করার ও ইবাদত বন্দেগী করার কথাই হাদীছ শরীফে ব্যক্ত হয়েছে। যেমন আখিরী রসূল, রহমতুল্লিল আলামীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন - “নিশ্চয়ই পাঁচ রাত্রিতে দোয়া নিশ্চিতভাবে কবুল হয়ে থাকে। (১) রজব মাসের প্রথম রাতে, (২) শবে বরাতের রাতে, (৩) ক্বদরের রাতে, (৪) ঈদুল ফিতরের রাতে, (৫) ঈদুল আযহার রাতে।” (মা ছাবাতা বিসসুন্নাহ, আমালুল ইয়াত্তমি ওয়াল লাইলাতি)
হাদীছ শরীফে আরো ইরশাদ হয়েছে - “হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ পাক-উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন শা’বানের ১৫ তারিখ রাত্রি অর্থাৎ বরাতের রাত্রি উপস্থিত হবে তখন তোমরা উক্ত রাত্রিতে নামায আদায় করবে এবং দিনে রোযা রাখবে। কেননা নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক তিনি উক্ত রাত্রিতে সূর্যাস্তের সময় পৃথিবীর আকাশে আসেন অর্থাৎ রহমতে খাছ নাযিল করেন। অতঃপর ঘোষণা করেন, “কোন ক্ষমা প্র্রার্থনাকারী আছো কি? আমি তাকে ক্ষমা করে দিবো।” “কোন রিযিক প্রার্থনাকারী আছো কি? আমি তাকে রিযিক দান করবো।” “কোন মুছিবতগ্রস্ত ব্যক্তি আছো কি? আমি তার মুছিবত দূর করে দিবো।” এভাবে ফজর পর্যন্ত ঘোষণা করতে থাকেন।” (ইবনে মাজাহ, মিশকাত)
উক্ত হাদীছ শরীফ-এর ব্যাখ্যায় ইমাম-মুজতাহিদগণ বলেন যে - “বরাতের রাত্র হলো ক্ষমা ও দয়ার রাত্র, তওবা ও লজ্জিত হওয়ার রাত্র,
যিকির ও নামাযের রাত্র, ছদক্বা ও খয়রাতের রাত্র, দোয়া ও যিয়ারতের রাত্র, দুরূদ শরীফ তথা ছলাত-সালাম পাঠ করার রাত্র এবং কুরআন শরীফ তিলাওয়াতের রাত্র।”
কাজেই, বরাতের রাতে যেহেতু ওয়াজ নছীহতের আদেশও করা হয়নি এবং নিষেধও করা হয়নি, তাই মুছল্লীদেরকে বরাতের রাতের ফযীলত ও ইবাদত-বন্দেগীর নিয়ম-কানুন, তর্জ-তরীক্বা বাতিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত ওয়াজ-নছীহত করা অবশ্যই জায়িয ও প্রয়োজন। তাই বলে, সারা রাত্র ওয়াজ করে মুছল্লীদেরকে নামায, তিলাওয়াত, যিকির-আযকার, দোয়া মুনাজাত ইত্যাদি ইবাদত বন্দেগী হতে মাহরূম করা কখনোই শরীয়ত সম্মত নয়। বরং হাদীছ শরীফের খিলাফ। শুধু তাই নয় এতে হক্কুল ইবাদ নষ্ট করা হয়। আর হক্কুল ইবাদ নষ্ট করা কবীরা গুণাহর অন্তর্ভুক্ত। কারণ ওয়াজ বৎসরের যে কোন দিনেই করা যায়। কিন্তু বরাতের রাত্র বৎসরে মাত্র একবারই পাওয়া যায়। যদি কেউ পরবর্তী বৎসর হায়াতে থাকে তবেই সে বরাতের রাত্র পাবে। কাজেই এই মহামূল্যবান রাত্রকে শুধুমাত্র ওয়াজ করে ও শুনে অতিবাহিত করে দেয়া সুন্নতের খিলাফ।
আর সুন্নতের খিলাফ কাজ করে আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনাদের রেজামন্দী বা সন্তুষ্টি কস্মিনকালেও হাছিল করা সম্ভব নয়। মূলকথা হলো, বরাতের রাত্র মূলতঃ ইবাদত-বন্দেগীর রাত্র, সারা রাত্র ওয়াজ করে ইবাদত বন্দেগীতে বিঘ্ন ঘটানো এবং মানুষদেরকে ইবাদত থেকে মাহরূম করা সম্পূর্ণরূপেই শরীয়তের খিলাফ। এ ধরণের কাজ থেকে বেঁচে থাকা সকলের জন্যেই দায়িত্ব ও কর্তব্য।
[দলীলসমূহ] (১) আহকামুল কুরআন জাস্সাস, (২) কুরতুবী, (৩) রুহুল মাআনী, (৪) রুহুল বয়ান, (৫) ইহ্ইয়াউ উলূমিদ্দীন, (৬) কিমিয়ায়ে সা’য়াদাত, (৭) ইবনে মাজাহ, (৮) মিশকাত, (৯) মাছাবাতা বিসসুন্নাহ, (১০) মিরকাত, (১১) আশয়াতুল লুময়াত, (১২) লুময়াত, (১৩) শরহুত্ ত্বীবী, (১৪) তালিকুছ ছবীহ, (১৫) মুযাহিরে হক্ব, (১৬) আমালুল ইয়াউমি ওয়াল লাইলাতি ইত্যাদি]
শবে বরাতে হালুয়া-রুটি বা গোশত রুটি পাকানো
উল্লেখ্য, শবে বরাতে হালুয়া-রুটি অথবা অন্য কোন বিশেষ খাবার তৈরী করা শরীয়তে নাজায়িয নয়। শবে বরাত উপলক্ষে বিশেষ করে আমাদের দেশ ও তার আশ-পাশের দেশসমূহে যে রুটি-হালুয়ার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে তার পিছনে ইতিহাস রয়েছে। ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে, পূর্ববর্তী যামানায় যখন বর্তমানের মতো বাজার, বন্দর, হোটেল-রেঁস্তরা ইত্যাদি সর্বত্র ছিলোনা তখন মানুষ সাধারণতঃ সরাইখানা, লঙ্গরখানা, মুসাফিরখানা ইত্যাদিতে ছফর অবস্থায় প্রয়োজনে রাত্রিযাপন করতেন। অর্থাৎ মুসাফিরগণ তাদের সফর অবস্থায় চলার পথে আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিত জনের ঘর-বাড়ি না পেলে সাধারণতঃ সরাইখানা, মুসাফিরখানা ও লঙ্গরখানায় রাত্রিযাপন করতেন। আর এ সমস্ত মুসাফিরখানা, লঙ্গরখানা ও সরাইখানার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত থাকতেন তারাই মুসাফিরদের খাবারের ব্যবস্থা করতেন।
বিশেষ করে মুসাফিরগণ শবে বরাতে যখন উল্লিখিত স্থানসমূহে রাত্রি যাপন করতেন তখন তাদের মধ্যে অনেকেই রাত্রিতে ইবাদত-বন্দেগী করতেন ও দিনে রোযা রাখতেন। যার কারণে উল্লিখিত স্থানসমূহের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিগণ খাবারের ব্যাবস্থা করতেন যাতে মুসাফিরদের রাত্রে ইবাদত-বন্দেগী করতে ও দিনে রোযা রাখতে অসুবিধা না হয়। আর যেহেতু হালুয়া-রুটি ও গোশ্ত-রুটি খাওয়া সুন্নত সেহেতু তারা হালুয়া-রুটি বা গোশ্ত-রুটির ব্যবস্থা করতেন। এছাড়াও আরবীয় এলাকার লোকদের প্রধান খাদ্য রুটি-হালুয়া বা রুটি-গোশ্ত। তারা ভাত, মাছ, ইত্যাদি খেতে অভ্যস্ত নয়। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে শবে বরাত উপলক্ষে হালুয়া-রুটির প্রচলন আমাদের দেশে ছড়িয়ে পড়ে। উল্লেখ্য, কোন আমলের ক্ষেত্রেই বদ রছম বা বদ প্রথার অনুসরণ করা জায়িয নেই।
এখন মাসয়ালা হচ্ছে- কেউ যদি শবে বরাত উপলক্ষে রছম-রেওয়াজ না করে বা নিজের ইবাদত-বন্দেগীর ব্যাঘাত না ঘটিয়ে উক্ত হালুয়া-রুটির ব্যবস্থা করে তাহলে তা অবশ্যই জায়িয। শুধু জায়িয নয় বরং কেউ যদি তার নিজের ইবাদত-বন্দেগী ঠিক রেখে অন্যান্যদের জন্য যারা রাত্রিতে ইবাদত-বন্দেগী করবে ও দিনে রোযা রাখবে তাদের ইবাদত-বন্দেগী ও রোযা পালনের সুবিধার্থে হালুয়া-রুটি বা গোশ্ত-রুটি অথবা আমাদের দেশে প্রচলিত খাদ্যসমূহের কোন প্রকারের খাদ্যের ব্যবস্থা করে তা অবশ্যই অশেষ ফযীলত ও নেকীর কারণ হবে।
হাদীছ শরীফে ইরশাদ হয়েছে - “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ পাক-উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, হে লোক সকল! তোমরা সালামের প্রচলন করো, মানুষকে খাদ্য খাওয়াও, আত্মীয়তার সর্ম্পক রক্ষা করো এবং মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন নামায পড়ো তাহলে শান্তির সাথে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।” (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, দারিমী)
*****************
সংকলন - কিতাবুল ইলম
-----------------
ছলাতুত তাসবীহ নামায:-
https://www.facebook.com/groups/173687513131278/permalink/218762705290425/
-------------
ইস্তিগফার ও তওবা লিংক :-
https://www.facebook.com/groups/173687513131278/permalink/218824218617607/
------------------------
তাহাজ্জুদ নামায: লিংক
https://www.facebook.com/groups/173687513131278/permalink/218858321947530/

দুটি ভারী জিনিষ


হাদিসে সাকালাইন

#রসুল_সঃ_এর_সুন্নত_ই_আদর্শ

#হাদিসে_সাকালাইন  বা
#দুটি_ভারী_জিনিষ

আল্লাহ্ রব্বুলআলামিন বলেন,
"এবং সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিও না অথবা সত্যকে গোপন কর না যখন তোমরা জান – “ ।
সুরা – বাকারা / ৪২ ।
আল্লাহ্ তাদেরকে সংশোদনের রাস্তা খুলে দিয়ে বলেন ,
তবে যারা তওবা করে এবং বর্ণিত তথ্যাদির সংশোধন করে মানুষের কাছে তা বর্ণনা করে দেয়, সে সমস্ত লোকের তওবা আমি কবুল করি এবং আমি তওবা কবুলকারী পরম দয়ালু।
সুরা – বাকারা / ১৬০ ।

এ প্রসঙ্গে একটি হাদিসের কথা উল্লেখ করতে চাই,যা হাদিসে ( দুটি ভারী জিনিষ ) সাকালাইন নামে পরিচিত।
অতীব দুঃখের বিষয় হল যে , অনেক গুলো সনদে উল্লেখ থাকা সত্বেও বিশুদ্ব সহীহ এই হাদিসটি নিয়ে আলোচনা খুবই কম হয় ! যারা জানা থাকা সত্বেও রসুল সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের এই বিশেষ হাদীসটি গোপন করে অথবা প্রচার করতে কৃপনতা করে তারা কিভাবে কাল হাসরের ময়দানে রসুল সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের সাফায়াত আশা করতে পারে ? অথচ রসুল সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের সাফায়াত ও আল্লাহর করুণা ছারা কেহই জান্নাতে যেতে পারবেনা। বিশুদ্ব হাদিসের জন্য অনেক সনদ জরুরী নয়, একটি নির্ভরযোগ্য সনদই যতেষ্ট। তাই আমি একটি মাত্র উল্লেখ করলাম।যদিও এই হাদীসের বিভিন্ন সনদ আছে।
হাদীসটি হচ্ছে এই, রসুলআল্লাহ্ সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
" হে মানবসকল , নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মধ্যে অতীব গুরুত্বপূর্ন দুটি ভারী জিনিষ (সাকালাইন) রেখে যাচ্ছি , যদি এই দুইটি আঁকড়ে ধরে থাক তাহলে কখনই পথভ্রষ্ট হবে না ।
প্রথমটি হচ্ছে , পবিত্র কোরআন এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে , আমার ইতরাত , আহলে বাইত (রক্তজ বংশধর) । নিশ্চয়ই এই দুইটি জিনিষ হাউজে কাওসারে আমার সাথে মিলিত না হওয়া পর্যন্ত কখনই পরস্পর থেকে বিছিন্ন হবে না । তোমরা লক্ষ্য রাখিও এদুয়ের ব্যাপারে তোমরা কি রকম ব্যাবহার করছ"।
( তিরমিজি ৩৭৮৬, ৩৭৮৭) (বিদায়া ওয়া নিহায়া) আরো অনেক সহীহ্ সনদে আছে।
পথভ্রষ্টতা থেকে মুক্তি পাওয়ার সনদ হচ্ছে , মহানবী (সাঃ) এর রক্তজ বংশধর তথা পুতঃপবিত্র আহলে বাইতের অনুসরন ও অনুগত্য করা ।
আল্লাহ বলেন,
যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলে বিশ্বাস করে না, আমি সেসব কাফেরের জন্যে জ্বলন্ত অগ্নি প্রস্তুত রেখেছি।
[Al-Fath, Ayah 13]
-------------------
ভিডিও লিংক
https://www.facebook.com/mohammed.kaisar.50/videos/2197100710363226/

৬ই রজব হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ মঈনুদ্দিন চিশতী আজমীরী (রহঃ)-এর ওফাত দিবশ

৬ই রজব হযরত খাজা গরীব নেওয়াজ মঈনুদ্দিন চিশতী আজমীরী (রহঃ)-এর ওফাত দিবশ
--------------------------
#রসুল_সঃ_এর_সুন্নত_ই_আদর্শ
==================
(#_হযরত_খাজা_গরীব_নেওয়াজ_মঈনুদ্দিন_চিশতী_আজমীরী_রহঃ)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরবর্তী সময়ে তাঁর প্রচারিত ইসলামকে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব পালন করেন সূফী সাধকরা। তারা নিজেদের জীবনকে সংকটাপন্ন করে সুদূরে পাড়ি জমিয়েছেন এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করেছেন যথাযথভাবে। আল্লাহর ইচ্ছাই তাদের ইচ্ছায় পরিণত হয়েছে। তেমনি এক মহান সাধক হলেন হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রঃ)।
তিনি ধর্মাকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি তার সাধনার মাধ্যমে এই ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত করেছেন আল্লাহ ও রাসুলের ধর্মকে। হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রঃ )-এর প্রতিষ্ঠিত তরিকাকে বলা হয় চিশতীয়া তরিকা। চিশতীয়া তরিকার আদি মুর্শিদ হলেন হযরত মুহম্মদ (দঃ)।
রাসুল (দঃ)-এর আধ্যাত্মিক শিক্ষা হযরত আলী (কঃ) হয়ে হাসান-আল-বসরীর মাধ্যমে অধীনস্ত সিলসিলায় বয়ে এনেছে। চিশতীয়া তরিকার চিশতী উপাধি প্রথম শুরু হয় হযরত খাজা আবু ইসহাক শামী চিশতী থেকে। তিনি সিরিয়ার অধিবাসী ছিলেন।
তিনি তাঁর মুর্শিদের আদেশে আফগানিস্তানের চিশতী নামক স্থানে বসতি স্থাপন করেন। এখান থেকেই তিনি তাসাউফ ও সিলসিলার প্রচার-প্রসার শুরু করেন। চিশতীয়া উপাধি এখান থেকেই শুরু হয়। খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রহঃ) এই তরিকায় সূত্রবদ্ধ হয়ে তরিকার দায়িত্ব পালনের ভার নেন। তাই তিনি এই তরিকার ইমাম ও কুতুব। তিনি ১১৮৫ খ্রিঃ/৫৮১ হিঃ সালে ভারতবর্ষে আগমন করে ইসলামের তওহিদ, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রচার করেন। চিশতিয়া তরিকার ইমাম ও কুতুব
হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রঃ) ১১৪২ খ্রিঃ /৫৩৬ হিঃ সালে ইরান ও আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী জেলার সানজারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ গিয়াস উদ্দীন সঞ্জরি (রহঃ) এবং মাতার নাম সৈয়্যেদা উম্মেওয়ারা বিবি (রহঃ)।
তিনি পিতৃকুল ও মাতৃকুল উভয়দিক থেকেই ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইনের বংশধর। খাজাবাবা খাজা উসমান হারুনীর খেদমতে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘসময় তিনি তার মুর্শিদের সেবায় নিয়োজিত থাকেন।
 মুর্শিদের সান্নিধ্যে তিনি অনেক স্থান ভ্রমণ করেন এবং অনেক গুণী সাধক কামেলদের সান্নিধ্য লাভ করে মারেফতের তত্ত্ব সম্পর্কে প্রভূত জ্ঞানলাভ করেন।
খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী  (রহঃ) তাঁর মুর্শিদ কেবলার সঙ্গে হজব্রত পালন শেষে মদিনায় গমন করেন। মদিনায় স্বীয় মুর্শিদ হযরত খাজা ওসমান হারুনী তাঁকে রাসুলের হাতে সঁপে দেন। নবীজী (সঃ)খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রঃ)-কে হিন্দুস্থানে গিয়ে ইসলাম প্রচারের জন্য নির্দেশ দেন। খাজা উসমান হারুনী (রহঃ) তাঁর প্রিয় শিষ্যকে সঙ্গে নিয়ে মদিনা থেকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশে মক্কায় ফিরে আসেন। মক্কায় তরিকতপন্থীদের ইমাম, হাকিকত বিশারদ, আউলিয়াকুল করা হয়। পরে ওহাবি আন্দোলনে তাঁর মাজারসহ সকল মাজার নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। মুর্শিদের ওফাতের পর খাজাবাবা দারুণ ব্যথিত হৃদয় নিয়ে হিন্দুস্থানের পথে রওনা হন। খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী  (রহঃ) হুজুর বেরীর (রহঃ) দরজায় দুছত্র ফারসি কবিতা লিখেছিলেন যা আজো শ্রদ্ধার সঙ্গে সকলে পড়ে থাকেন। কবিতাটি হলো ‘গঞ্জে বখশ জগতের প্রেরণা ও খোদার নূরে। (তিনি অসামর্থ্যদের পীরে কামেল আর কামেলদের পথপ্রর্দশক।’) লাহোর ত্যাগ করে তিনি দিল্লি ও পরে রাজপুত শক্তির কেন্দ্রবিন্দু আজমিরে আস্তানা করেন। খাজা বাবার অপার মহিমায়, মানব প্রেম ও চারিত্রিক মাধুর্যে মোহিত হয়ে হিন্দু প্রভাবশালীদের প্রবল বাধা বিপত্তির মধ্যেও দলে দলে লোক ইসলাম গ্রহণ করে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে থাকে। এতে হিন্দু রাজা ক্ষিপ্ত হয়ে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রহঃ) কে আজমির ত্যাগের নির্দেশ দেন। মঈনুদ্দিন চিশতী (রহঃ ঐ সময় বলেছিলেন ‘আমি পৃর্থিরাজকে জীবিত বন্দী করে শিহাবুদ্দীন ঘোরীর হাতে তুলে দিলাম।’ তাঁর এই ভবিষদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়েছিল।

এভাবে ভারতবর্ষে মুসলমান রাজত্ব কায়েম হয়। ভারতবষের্র দিল্লি ও আজমির মুসলিম শাসনে আসার পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে সূফী সাধক, দরবেশ ফকিররা ভারতবর্ষে এসে ইসলাম প্রচার করেন। এঁদের মধ্যে প্রায় সবাই মঈনুদ্দিন চিশতী (রহঃ) এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁর দোয়া ও অনুমতি নিয়ে দূর-দূরান্তের বিশেষ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন এবং বসতি স্থাপন করে ইসলাম প্রচার করে জীবনপাত করেছেন। হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রঃ) এক মহান মুবান্নিগ। যাঁর প্রচেষ্টার ফসল হলো ভারতবর্ষে ইসলামের সূর্যের উদয়। এবং উদয়ের ফলান্তে এদেশের মানুষ ইসলামের শান্তি লাভ করে। শরিয়ত-মারেফতের আলোতে উদ্ভাসিত হয়ে সত্যিকারের পথ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ প্রাপ্তি হয়। চিশতীয়া তরিকার উত্থান বহুপূর্বে হলেও ভারতবর্ষে মঈনুদ্দিন চিশতী (রহঃ) এই তরিকায় দিয়েছেন এক নতুন পরিচিতি। তিনি তরিকতের সাধনায় মানুষকে দিয়েছেন প্রকৃত মুসলমান হওয়ার শিক্ষা। খোদার পথের সাধনায় প্রথমে মানুষের ৩টি বিষয় রপ্ত করতে হবে ‘মানব প্রেম, সত্যিকারের মানবতা, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা, অন্তর্ধ্যানে স্মরণে রাখা।’ এই বিষয়ে সর্বদাই নিজেকে নিয়োজিত রেখে তরিকার সাধনা করতে হবে। হযরত মুহম্মদ (দঃ) থেকে হযরত আলী এবং হযরত আলী থেকে হাসান বসরী এই তালিম লাভ করেন। সিনা -ব-সিনায় চলে আসা এই তালিম হযরত ওসমান হারুনীও লাভ করেন। এই তালিমগুলো লিপিবদ্ধ ছিল না। হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রহঃ) সুশৃঙ্খলভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে লিপিবদ্ধ করেন।
হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহঃ) ৬৩৩ হিজরীর ৫ রজব দিবাগত রাত অর্থাৎ ৬ রজব সুবহে সাদেকের সময় ইন্তেকাল করেন। তখন তার বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর। গরীবে নেওয়াজের বড় সাহেবজাদা হযরত খাজা ফখরুদ্দীন চিশতী (রহঃ) তার নামাজে জানাজায় ইমামতি করেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি হযরত খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার খাকী (রহঃ) কে খিলাফতের দায়িত্ব অর্পন করে সিলসিলার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন।
***********************
মহান আল্লাহ হেদায়াতপ্রাপ্ত বুযুর্গদের সাহচর্যে থাকার জন্য দোয়া করতে নির্দেশ দিয়েছেন। :-

অনুবাদ- আমাদের সরল সঠিক পথ [সীরাতে মুস্তাকিম] দেখাও। তোমার নিয়ামতপ্রাপ্ত বান্দাদের পথ।{সূরা ফাতিহা-৬,৭}

আর তার নিয়ামত প্রাপ্ত বান্দা হলেন –

অনুবাদ-যাদের উপর আল্লাহ তাআলা নিয়ামত দিয়েছেন, তারা হল নবীগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ, ও নেককার বান্দাগণ।{সূরা নিসা-৬৯}

আর যারা ওলি (বন্ধু) মানে আল্লাহকে এবং আল্লাহর রসুলকে আর ঈমানদার লোকদেরকে, তারাই আল্লাহর দল এবং আল্লাহর দলই থাকবে বিজয়ী ''
( সূরা আল মায়িদা,আয়াত-৫৫-৫৬)

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন,

মনে রেখো যারা আল্লাহর (ওলি) বন্ধু, তাদের না কোন ভয় ভীতি আছে, না তারা চিন্তান্বিত হবে।
সুরা ইউনুস - ৬২

আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: যে ব্যক্তি আমার অলীর সাথে শত্রুতা করে, আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করছি।
(বুখারী - ৬৫০২)
====================
আল্লাহ আমাদের কুরআন ও হাদীসের অনুসরণ করার জন্য হেদায়েত দান করুন।
আমিন।

পবিত্র ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম


পবিত্র ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম 

----------------------
#রসুল_সঃ_এর_সুন্নত_ই_আদর্শ
----------------------
#ফাতিহা_ইয়াজদহম 
১১ই রবিউস সানী অর্থাত রবিউস সানী মাসের এগার তারিখ ( ১০ তারিখ দিবাগত রাত্র ) 'ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম' । হয়ত অনেকেই জানেন না ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম কী। তাই আজকের এই পোষ্ট লিখার ইচ্ছা করলাম। পাঠকের বিপুলতাই আমার লিখনীর সার্থকতা মনে করব ।
ফাতেহা এর অর্থ দোয়া করা, সাওয়াব রেসানী করা, মোনাজাত করা ইত্যাদি। আর ইয়াজদাহম’ ফারসি শব্দ, যার অর্থ - 'এগার তারিখের ফাতেহা'। মোটকথা ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম বলতে এগারো তম দিনের সাওয়াব রেসানীর উদ্দেশ্যে কর্মসূচীকেই বুঝায়। ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহাম হলো ইমামুল আউলিয়া পীরানে পীর গাউসুল আযম দস্তগীর হজরত আবদুল কাদের জিলানি রহমতুল্লা আলাইহি-এর ওফাত দিবস স্মরণে কর্মসূচী ।
যদিও উনার জীবনী এই পোষ্টের মুখ্য উদ্দেশ্য নয় তার পরও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি উনার পিতা মাতাকে। হজরত আবদুল কাদের জিলানী রহ.-এর বাবার নাম সৈয়দ আবু সালেহ (রহঃ) এবং মায়ের নাম বিবি ফাতেমা (রহঃ)।
হজরত আবদুল কাদের জিলানি (রহঃ) ৪৭০ হিজরিতে ইরানের জিলান শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাগদাদের মহান পীর হজরত আবু সাঈদ ইবনে আলী ইবনে হুসাইন মাখরুমির (রহঃ) কাছে মারেফাতের জ্ঞানে পূর্ণতা লাভ করেন এবং খেলাফত প্রাপ্ত হন। পবিত্র কুরআন ও আল্লাহর রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ ভুলে মানুষ যখন বিপথে পা বাড়িয়েছিল, ঠিক এমনি সময় হজরত বড়পীর (রহঃ) ইসলামের পথে মানুষকে ডাক দিয়েছিলেন। বিপথগ্রস্ত মুমিনদের সঠিক পথের সন্ধান দিয়ে ইসলামকে পূনরুজ্জীবিত করেছিলেন। হিজরি ৫৬১ সনের ১১ রবিউস সানি তিনি ইন্তিকাল করেন।মুমিন মাত্রই প্রতি বছর ১১ রবিউস সানি ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম পালন করার মাধ্যমে হজরত বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী (রহঃ).-কে পরম ভক্তি, শ্রদ্ধার সঙ্গে চিরকাল স্মরণ করবে।

হযরত বড়পীরের শানে চিশতীয়া তরিকার ইমাম হযরত খাজা গরীবে নেওয়াজ মঈনুদ্দিন চিশতী (রাহঃ) এর ১টি বাণী
'ইয়া গাউসে মো আযম নুরে হোদা
মোখতারে নবী মোখতারে খোদা' ।
অর্থ:
ইয়া গাউসে আযম! হেদায়েতের নুর,
নবীজীর মনোনীত ও আল্লাহর মনোনীত।
---------------------
ইয়া আল্লাহ্ আমাকে গাউছে পাকের বেলায়তী কদম তলে স্থান দান করুন । আমিন ।

হাদিসে সাকালাইন বা অতীব গুরুত্বপূর্ন দুটি ভারী জিনিষ



হাদিসে সাকালাইন বা অতীব গুরুত্বপূর্ন দুটি ভারী জিনিষ

#হাদিসে_সাকালাইন বা
#দুটি_ভারী_জিনিষ

আল্লাহ্ রব্বুল আলামিন বলেন,
"এবং সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিও না অথবা সত্যকে গোপন কর না যখন তোমরা জান“ ।
(সুরা – বাকারা / ৪২) 
আল্লাহ্ তা'আলা বান্দাকে সংশোদনের রাস্তা খুলে দিয়ে বলেন ,
"তবে যারা তওবা করে এবং বর্ণিত তথ্যাদির সংশোধন করে মানুষের কাছে তা বর্ণনা করে দেয়, সে সমস্ত লোকের তওবা আমি কবুল করি এবং আমি তওবা কবুলকারী পরম দয়ালু।
(সুরা – বাকারা / ১৬০) ।
এ প্রসঙ্গে একটি হাদিসের কথা উল্লেখ করতে চাই,যা হাদিসে  সাকালাইন 
(দুটি ভারী জিনিষ) নামে পরিচিত।

অতীব দুঃখের বিষয় হল যে, অনেক গুলো সনদে উল্লেখ থাকা সত্বেও বিশুদ্ব সহীহ এই হাদিসটি নিয়ে আলোচনা খুবই কম হয় ! যারা জানা থাকা সত্বেও রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার এই বিশেষ হাদিসটি গোপন করে অথবা প্রচার করতে কৃপনতা করে তারা কিভাবে কাল হাসরের ময়দানে রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার সাফায়াত আশা করতে পারে ? অধচ রসূলুল্লাহ্ সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লামের সাফায়াত ও আল্লাহর করুণা ছারা কেহই জান্নাতে যেতে পারবেনা। বিশুদ্ব হাদিসের জন্য অনেক সনদ জরুরী নয়, একটি নির্ভরযোগ্য সনদই যতেষ্ট। তাই আমি একটি মাত্র উল্লেখ করলাম। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন–

” হে মানবসকল, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মধ্যে অতীব গুরুত্বপূর্ন দুটি ভারী জিনিষ (সাকালাইন) রেখে যাচ্ছি , যদি এই দুইটি আঁকড়ে ধরে থাক তাহলে কখনই পথভ্রষ্ট হবে না।
প্রথমটি হচ্ছে, পবিত্র কোরআন এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে, আমার ইতরাত, আহলে বাইত (রক্তজ বংশধর)। নিশ্চয়ই এই দুইটি জিনিষ হাউজে কাওসারে আমার সাথে মিলিত না হওয়া পর্যন্ত কখনই পরস্পর থেকে বিছিন্ন হবে না। তোমরা লক্ষ্য রাখিও এদুয়ের ব্যাপারে তোমরা কি রকম ব্যাবহার করছ।
( তিরমিজি ৩৭৮৬, ৩৭৮৭)
পথভ্রষ্টতা থেকে মুক্তি পাওয়ার সনদ হচ্ছে, মহানবী (
সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর রক্তজ বংশধর তথা পুতঃপবিত্র আহলে বাইতের অনুসরন ও অনুগত্য করা।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
"যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলে বিশ্বাস করে না, আমি সেসব কাফেরের জন্যে জ্বলন্ত অগ্নি প্রস্তুত রেখেছি"। (সুরা আল ফাতাহ্ : ১৩)
-------------------
ভিডিও লিংক
https://www.facebook.com/mohammed.kaisar.50/videos/2197100710363226/

ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর সংক্ষিপ্ত জীবনী – [পর্ব - ১]


-----------------------------
#রসুল_সঃ_এর_সুন্নত_ই_আদর্শ
-----------------------------
#_ইমাম_গাজ্জালী_রহমাতুল্লাহি_আলাইহি এর আসল নাম আবু হামিদ মুহম্মদ।তাঁর পিতা ও পিতামহর উভয়ের নামই মুহম্মদ। তিনি খোরাসানের অন্তর্গত তুস নগর এর গাজালা নামক স্থানে জন্ম গ্রহন করেন। তাই সবাই উনাকে ঐ স্থানের নাম অনুযায়ী গাজ্জালী নামেই চিনে।
ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর যুগে পারস্যের সম্রাট ছিলেন সলজুক বংশীয় সুলতান রুকনুদ্দীন তোগরল বেগ। সলজুগ বংশীয় সুলতানের রাজত্বকাল মুসলমানদের চরম উন্নতির যুগ ছিল। তাঁদের পুর্বে ইরান শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত বুইয়া বংশীয় রাজাদের শাসনাধীন ছিল।এই সময় মুসলিম শক্তি সমূহ পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ,আক্রমন-প্রতিআক্রমনের ফলে দুর্বল হয়ে পরেছিল। কিন্তু সলজুক বংশীয় তুর্কীগন ইসলাম গ্রহন করলে তাদের প্রাক ইসলামী স্বভাব চরিত্র ও মুল্যবোধে বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয় এবং তাদের মাধ্যমে এক অনুপম সভ্যতা গড়ে উঠে। ফলে তারা মুসলিম বিশ্বের লুপ্ত প্রায় শক্তি ও প্রতিভাকে পুনর্জীবিত করতে সক্ষম হয়। এই শক্তির অভ্যুদয়ের ফলে খ্রীষ্টান শক্তির অগ্রগতি রহিত হয় এবং সমগ্র এশিয়ার এক বিরাট অংশ এই সুলতানগণের অধীনে এসে পড়ে। ঐ যুগে মুসলমানদের বিদ্যার্জন স্পৃহা অত্যন্ত বৃদ্ধি পায় । তৎকালে প্রচলিত ইহুদী ,খৃষ্টান ও পারসিকদের জ্ঞানার্জন সমাপ্ত করে প্রাচীন গ্রীক,মিশরীয় ও ভারতীয় জ্ঞানারহনে তারা প্রবৃত্ত হন।এ জন্যই জ্যোতিসশাস্ত্র, জড়বাদ, নাস্তিকতা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকারের মতবাদের সংমিশ্রনে মুসলমান সমাজে বহু মতানৈক্যের এবং ইসলামী বিশ্বাস ও জ্ঞানের সাথে নানারকম মারাত্বক অনৈসলামিক ধর্ম-বিশ্বাস ও জ্ঞান এমন ভাবে মিশে পড়ে যে,খাটি ইসলামী বিশ্বাস ও অনৈসলামী বিশ্বাসের মধ্যে পার্থক্য করাই দুরহ হয়ে পড়ে। অত্যধিক পরিমাণে পার্থিব জড়বাদের প্রভাবে ধর্ম জ্ঞানের শ্বাস প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় এবং মুসলমান সমাজে ইসলামী বিশ্বাস ও ধর্মকার্যের ক্ষেত্রে এক চরম বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। তা হতে সমাজকে মুক্ত ও রক্ষা করার দায়িত্বই ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর উপর অর্পিত হয়। এই ক্ষনজন্মা মহাপুরুষের অতুলনীয় প্রতিভা যে নিপুণতার সাথে এই দায়িত্ব পালন করেন, তা সমগ্র বিশ্ব বিস্ময় ও ভক্তিভরে আজীবন স্বরন করবে।
তৎকালীন শিক্ষা ব্যবস্হা-
তৎকালে মুসলিম রাষ্ট্রের সর্বত্র প্রথমিক স্তর হতে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত অবৈতনিক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠত ছিল। ছাত্রগণের খাওয়া-পড়ার খরচ সহ মাদ্রাসার সমস্ত খরচ সরকার বহন করত। তদুপরি সকল মসজিদ ও বহু সঙ্গতিসম্পন্ন লোকদের গৃহেও মাদ্রাসা ব্যবস্থা চালু ছিল। সুতরাং সেইকালে ধনী দরীদ্র সকলের নিকটই শিক্ষার পথ সুগম ছিল। প্রবীণ ও উচ্চশিক্ষিত সুধীজন যে সকল স্থানে শিক্ষাদান করতেন ,সেসব স্হানই উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে পরিণত হত।
শৈশবকাল ও ছাত্র জীবন-
ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর পিতা ছিলেন দরিদ্র।তথাপি তিনি পুত্রের শিক্ষার জন্য চেষ্টার কোন ত্রুটি করেননি।ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি শৈশব কালেই পিতৃহীন হন।অন্তিম কালে তাঁর পিতা তাঁর জনৈক বন্ধুর কাছে দুই পুত্র আহমদ ও মুহম্মদ এর প্রতিপালনের ও শিক্ষার ভার অর্পন করেন এবং এ জন্য সামান্য অর্থ প্রদান করেন। শিশুদ্বয় অসাধারণ মেধার অধিকারী ছিলেন।অতি অল্পকালের মধ্যেই পবিত্রকোরআন হিফ্‌জ সমাপ্ত করে তারা শহরের একটি মাদ্রাসায় ভর্তি হন।আল্লামা আবু হামিদ আসকারায়েনি, আল্লামা আবু মুহম্মদ যোবায়নি প্রমুখ মহাজ্ঞানী উস্তাদের নিকট তিনি শিক্ষা লাভ করেন।খ্যাতনামা ফিকাহ শাস্ত্রবিদ আল্লামা আহমদ বিন মুহম্মদ রাযকানীর নিকট তিনি ফিকাহশাস্ত্রের প্রাথমিক কিতাবসমুহ অধ্যয়ন করেন।
উচ্চ শিক্ষার জন্য জুরজানে গমন গমন-
তাহেরানে শিক্ষা সমাপ্তির পর ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উচ্চ শিক্ষার জন্য জুরজান শহরে গমন করেন।এখানে তিনি হযরত ইমাম আবু নসর ইসমাইল রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর তত্বাবধানে শিক্ষাগ্রহন আরম্ভ করেন।তাঁর তীক্ষ্ণমেধা ও অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় পেয়ে তিনি পুত্রবৎ স্নেহে সর্বশক্তি নিয়োগ করে তাকে শিক্ষাদানে প্রবৃত্ত হন।তৎকালে শিক্ষকগণ পাঠ্যবিষয়ে যে বিষয়ে শিক্ষাদান করতেন তা শিক্ষার্থীদেরকে হুবহু লিপিবদ্ধ করতে বাধ্য করা হতো।এ লিখিত নোটগুলিকে ”তালিকাত” বলা হত। এরুপে ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর কাছে তালিকাতের এক বিড়াট ভান্ডার সংগৃহিত হল।
তাহেরানা অভিমুখে যাত্রার পথে সর্বস্ব লুন্ঠন-
জুরজানে অধ্যয়ন সমাপনান্তে ইমাম গাজ্জালী র: জন্মভুমি তাহেরান যাত্রা করেন। পথিমধ্যে দস্যুদল তালীকাত সহ তাঁর সমস্ত কিছু লুন্ঠন করে নেয়।টাকা পয়সা ও অন্যান্য সম্পদ লুন্ঠন হওয়াতে তিনি কোন কষ্ট অনুভব করলেন না । কিন্তু তালিকাত অপহরণে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে পড়েলেন। তাই দস্যুসরদারের নিকট অন্তত তাঁর সমস্ত অর্জিত বিদ্যার সন্চ্ঞয় সম্ভার তালিকাত গুলি ফেরত দেয়ার জন্য অনুরোধ করলেন।দস্যু সরদার তাকে উপহাসের স্বরে বলল। “তুমিতো বেশ বিদ্যার্জন করেছ! সবই কাগজে রয়েছে, মনে কিছু নেই। এই কথা বলে সে তার সমস্ত তালিকাত ফিরিয়ে দিল। সরদারের ব্যঙ্গোক্তি ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর মনে দাগ কাটল। পরে অল্পদিনের মধ্যেই তিনি সমস্ত তালিকাত মুখস্ত করে নেন।
নিজামিয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়ন-
খোরাশানের অন্তর্গত নিশাপুরে অবস্থিত নিজামিয়া মাদ্রাসা তৎকালে বিশ্বের সর্বোচ্চ শিক্ষাকেন্দ্র ছিল। জুরজানের অধ্যয়ন শেষে ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর জ্ঞান পিপাসা নিবৃত হল না। তাই তিনি নিযামিয়া মাদ্রাসায় গমন করলেন। সেখানে তিনি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ আলিমরুপে স্বীকৃত ইমামুল হারামাইন রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন এই মাদ্রসার অধ্যক্ষ।দুনিয়ার বহু দেশ হতে বহু লোক উচ্চশিক্ষার জন্য উনার নিকট উপস্হিত হতেন। তিনি এত গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন যে, দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ হতে সুলতানগণও বিভিন্ন জটিল বিষয়ের মীমাংসার জন্য তাঁর নিকট উপস্থিত হতেন। ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উপযুক্ত শিক্ষক পেয়ে তাঁর তীব্র জ্ঞান পিপাসা মিটাতে লাগলেন। ইমামুল হারামাইনও ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি কে দর্শন ও জ্ঞানের বিভিন্ন স্তরে খুব আগ্রহের সহিত শিক্ষা দিতে লাগলেন।
৪৭৮ হিজরিতে ইমামুল হারামাইন রহমাতুল্লাহি আলাইহি ইন্তিকাল করেন। তিনি ছাত্রগণের নিকট এত প্রিয় ছিলেন যে,তাঁরা তাঁর ইন্তিকালে প্রায় উন্মাদ হয়ে পড়ে। ছাত্রগন প্রায় এক বৎসর কাল উস্তাদের শোকে মুহ্যমান হয়ে থাকে। ইমামা গজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর নিকটও উস্তাদের তিরোধান যাতনা অসহনীয় হয়ে উঠে এবং নিশাপুর তাঁর নিকট অন্দ্ধকার পুরীর ন্যয় মনে হতে লাগলো। তাই তিনি নিশাপুর পরিত্যগ করে বাগদাদ চলে আসেন ও ওখানেই পড়া লেখা শেষ করেন।
দিব্যজ্ঞান বা তাজকিয়ায়ে নফস অর্জনে বাইয়াত গ্রহন-
এই সময় ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর বয়স ছিল মাত্র ২৮ বৎসর। তিনি জানতেন যে কেবল কিতাব পাঠ আল্লাহর জ্ঞান লাভের জন্য যথেষ্ঠ নয়। ইহার জন্য দিব্যজ্ঞানসম্পন্ন জীবন্ত উস্তাদের নিতান্ত প্রয়োজন। হাদিস শরীফে আছে জ্ঞান দুই প্রকার । এক প্রকার জ্ঞান হচ্ছে জবানী জ্ঞান, অন্য একটি ক্বলবী এলেম বা আত্বিক জ্ঞান। রাসুল পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা বলেন, ক্বলবী এলেম বা আত্বিক জ্ঞানই হচ্ছে উপকারী জ্ঞান(মেশকাত শরীফ)।
হযরত আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “আমি রসুল পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা এর কাছ থেকে জ্ঞানের দুটি পাত্র অর্জন করেছি। একটি তোমাদের মধ্যে বিতরণ করেছি অন্যটি করিনি।যদি করতাম তবে আমার কন্ঠদেশ কর্তিত হতো” (বোখারী শরীফ)।
পবিএ কালাম পাকে ইহাকে তাজকিয়া এবং হাদিস শরীফে ইহাকে এহসান নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লমা এর বহুমুখি শিক্ষার মধ্যে এই তাজাকিয়াও ছিল একটি অন্যতম বিষয় ।কালামে পাকে এরশাদ হচ্ছে “তিনিই উম্মিদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন , যিনি তাদেরকে তাজকিয়া করেন এবং কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেন। যদিও ইতিপূর্বে তারা গোমরাহীতে নিমজ্জিত ছিল” (সুরা জুময়া, ২)
হজরত ইমাম মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, ”যিনি তাসাউফ গ্রহন করলেন কিন্তু ফিক্‌হ গ্রহণ করলেন না তিনি নিশ্চই কাফের । আর যিনি ফিকহ গ্রহন করলেন কিন্তু তাসাউফ গ্রহন করলেন না, তিনি নিশ্চয়ই ফাসেক। আর যিনি উভয় জ্ঞান গ্রহন করলেন এবং সেই অনুযায়ী আমল করলেন তিনিই মুহাক্কেক বা প্রকৃত দ্বীন গ্রহণ করলেন।”
তাই তিনি তৎকালীন প্রখ্যাত দিব্যজ্ঞান বা এলমে তাসাউফ ধারী বুযুর্গ কামেল হযরত শায়েখ আবু আলী ফারমেদী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর পবিত্র হস্তে বাইয়াত হয়ে দিব্য জ্ঞান আহরন করতে থাকেন।
মাদ্রাসার নিযামিয়ার অধ্যক্ষ পদে ইমাম সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি-
বাগদাদে তখন তুর্কিরাজ মালেক শাহের আধিপত্য ছিল । তাঁর প্রধানমন্ত্রী হাসান বিন আলী নিযামুল একজন অসাধারন পন্ডিত ও বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তি ছিলেন । তার নিয়মানুসারেই বাগদাদের বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় ‘মাদরাসায়ে নিযামিয়া’ এবং উহার পাঠ্যতালিকা ‘দরসে নিযামী’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সাথে হযরত ইমাম সাহেবকে মাদরাসার অধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত করেন। তখন তাহার বয়স মাত্র ৩৪ বছর, এত অল্প বয়সেও তিনি অধ্যাপনা ও পরিচালনা কার্যে নিতান্ত দক্ষতা ও নিপুনতার পরিচয় প্রদান করেন। স্বয়ং বাদশাহ ও রাজপুরুষগণও রাজকার্যের জটিল সমস্যাসমূহে তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করতেন। এ সময় তার নাম দুনিয়ার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন দেশ হতে শত শত ছাত্র তার শিষ্যত্ব গ্রহণের জন্য ছুটে আসেন। মাদ্রাসা নিযামিয়ার খ্যাতিও অত্যন্ত বৃদ্ধি পায়। অধ্যাপনার সাথে সাথে তিনি নানা জটিল বিষয়ে গবেষণাও করতে থাকেন। এরুপে তিনি অপরিসীম জ্ঞানের অধিকারী হন।
মাদ্রাসা নিযামিয়া পরিত্যাগ-
প্রভূত যশ ও যোগ্যতার সহিত ইমাম গাযযালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি চার বৎসরকাল মাদ্রাসা নিযামিয়াতে কাজ করেন। নানা জটিল বিষয়াদির চমৎকার ব্যাখ্যা শ্রবণ এবং তাঁর জ্ঞাণের গভীরতা উপলব্ধি করে তার ছাত্রগণ একেবারে বিস্মিত হয়ে পড়ত। এখানে অবস্থানকালে তিনি দর্শন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের গ্রন্হরাজি অধ্যয়ন সমাপ্ত করেন। তথাপি তাঁর মন পরিতৃপ্ত হল না। কিসের অভাবে যেন তাঁর মন আনচান করতে লাগলো। অজানাকে জানার এবং অদেখাকে দেখার জন্য তাঁর মন ব্যাকুল হয়ে উঠলো। যাবতীয় কর্মের প্রতি তাঁর মন বিতৃষ্ণ হয়ে উঠলো। তিনি ব্যাকুল বুঝলেন যে, কেবল পুথিগত জ্ঞান দ্বারা বিশেষ কোন কাজ হয় না। বিশুদ্ধ জ্ঞানের সাথে সাথে একাগ্র সাধণা ও রিয়াযত আবশ্যক। এ সম্পর্কে তিনি নিজে বলেন : ”মানুষের সদ্‌গুনরাজির বিকাশের জন্য অক্লান্ত সাধনা ও একনিষ্ঠ সংযমের একান্ত আবশ্যক।” এই উপলব্ধির পর স্বীয় স্বভাব ও কর্মের প্রতি মনোনিবেশপূর্বক দেখলাম, আমার কোন কাজই এই নীতির অনুরুপ নয়, যার দ্বারা আমার স্বভাব,আত্না ও মানবতার উন্নতি সাধন হতে পারে। আমি আরও বুঝতে পারলাম যে,আমি প্রবৃত্তির বশবর্তি হয়ে কাজ করছি এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য আমার কোন কাজ হচ্ছে না। তবে আল্লাহর সন্তোষ লাভের নিমিত্ত লোকালয়ে অবস্থান করেই দুনিয়ার সকল মোহ বর্জন করতে হবে। এইরুপ চিন্তা করতে করতে যাবতীয় কর্মের প্রতি আমার বিতৃষ্ণা ও বইরাগ্যভাব জন্ম নিতে লাগলো। মাদ্রাসার অধ্যাপনা ও পরিচালনার কাজেও শৈইথিল্য দেখা দিল ,মৌনাবলম্বনের স্পৃহা বৃদ্ধি পেল; হযম শক্তি কমতে লাগলো এবং ঔষধেও অশ্রদ্ধা জন্ম নিল। চিকিৎসকগণ বললেন,” এমতাবস্থায় কোন ওষুধই ফলপ্রদ হবে না।” অন্তর দেশ ভ্রমণে বাহির হওয়ার মনস্থ করলাম। দেশের আমীর-উমরাহ,আলিম-উলামা, সুধীমন্ডলী এবং রাজপুরুষগণ এই সংকল্প পরিত্যাগের জন্য আমাকে অনুরোধ করতে লগলেন। কিন্তু আমি মনকে বশে আনতে পারলাম না। পরিশেষে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে হিজরী ৪৮৮ সনের যিলক্বাদা মাসে আমি গোপনে সিরিয়া অভিমুখে রওয়ানা হলাম।
হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এক অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে জন্ম গ্রহন করেছিলেন। জাগতিক জ্ঞান তাঁর মনের তীব্র পিপাসা মিটাতে পারেনি। তাই তিনি এবার আধ্যাত্বিক জ্ঞানের অন্নেষনে বেড়িয়ে পড়লেন। শৈশব থেকেই তাঁর ধর্মের প্রতি অনুরাগ ও জ্ঞান পিপাসা ছিল অত্যন্ত প্রবল। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সকল দার্শনিকদের মতবাদও তিনি অত্যন্ত মনোযোগের সাথে অধ্যয়ন করেন। কিন্তু তাতেও তাঁর মনের কোন খোরাক মিটলো না। তাই এক অজ্ঞাত রহস্যের সন্ধানে সংসারবিরাগী সুফী-দরবেশের বেশে জীবনের দশটি বৎসর নানা দেশ পর্যটনে তিনি অতিবাহিত করেন। এই পথেই তিনি তাঁর জীবনের চির আকাঙ্খিত রহস্যের সন্ধান খুজে পান। তাঁর মন চির রহস্যময় আল্লাহর স্বরূপ উদঘাটনে সমর্থ হয় এবং তাঁর অন্তরের পিপাসা নিবারিত হয়।
সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মুসলিম দার্শনিক ও আলেমে দ্বীন ইমাম আবু হামেদ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আল-গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি জীবনের প্রথম দিকে ছিলেন শাসন কর্তৃপক্ষের নৈকট্যপ্রাপ্ত একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। অন্যান্য আমীর ওমরাহগনের মতই তারও জীবনযাত্রা ছিল বর্নাঢ্য। কিন্তু ভোগ বিলাসপূর্ণ জীবনযাত্রার মধ্যেও তাঁর ভেতরে লুকিয়ে ছিল মুমিন সুলভ একটি সংবেদনশীল মন,যা সমকালীন মুসলিম জনগনের ব্যাপক স্খলন-পতন লক্ষ্য করে নীরবে অশ্রুবর্ষন করতো। ইহুদী-নাসারাদের ভোগ সর্বস্ব জীবনযাত্রার প্রভাবে মারাত্নকভাবে আক্রান্ত মুসলিম জনগনকে ইসলামের সহজ সরল জীবন ধারায় কি করে ফিরিয়ে আনা যায়, এ সম্পর্কে তিনি গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতেন। কোন কোন সময় এ চিন্তাভাবনা তাকে আত্নহারা করে ফেলতো। ভাবনা চিন্তার এক প্রর্যায়ে এ সত্য তাঁর দৃষ্টিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো যে ,বর্তমানে মৃতকল্প মুসলিম জাতিকে নবজীবনে উজ্জীবিত করে তোলা একমাত্র দ্বীনের স্বচ্ছ আবে হায়াত পরিবেশনের মাধ্যমেই সম্ভব।আর তা বিলাসপূর্ণ জীবনের অর্গলে নিজেকে আবদ্ধ করে রেখে হাতে পাওয়া সম্ভব নয়।এ উপলব্ধি তাড়িত হয়েই ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি একদিন পরিবার পরিজন এবং ঘর-সংসার ত্যাগ করে নিরুদ্দেশের পথে বের হয়ে পড়লেন। একদা বহুমুল্যবান পোশাক পরিচ্ছদ পরিধান করা ছিল যার সর্বক্ষনের অভ্যাস, সেই ব্যক্তিই মোটা চট-বস্রে আভ্রু ঢেকে দিনের পর দিন নানা স্হানে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।
ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর এ কৃচ্ছতাপূর্ণ তাপস জীবনেরই সর্বাপেক্ষা মুল্যবান ফসল ‘এহইয়াও উলুমুদ্দীন” বা দ্বীনী এলেমের সন্জিবনী সুধা। এই মহা গ্রন্হের প্রভাবেই হিজরী ৬ষ্ঠ শতকের সুচনাকালে ইসলামের ইতিহাসে একটা উল্লেখযোগ্য পটপরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। নুরুদ্দীন জঙ্গী,সালাহউদ্দীন আইয়ুবী প্রমুখ ইসলামের বহু বীর সন্তান -যাদের নিয়ে মুসলিম উম্মাহ গর্ব করে থাকে। এরা সবাই ছিলেন ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর ভাবশিষ্য,’এহইয়াও উলুমুদ্দীন” এর ভক্ত পাঠক।
মাদ্রাসা নিযামিয়াতে অবস্হান কালে হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি মুল্যবান পোশাক পরিচ্ছদ পরিধান করতেন। কিন্তু দেশ পর্যটনের সময় তিনি নিতান্ত সাধারণ পোশাকে ও একটি মোটা কম্বল সম্বল করে বের হন। কিন্তু ইহাতেও তাকে খুব উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল। সিরিয়ার পথে তিনি কিছুকাল দামেশক নগরস্হিত উমায়্যা জামে মসজিদে অবস্হান করেন। তৎকলে এই মসজিদের পার্শ্বে একটি বিরাট মাদ্রাসা ছিল। হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এই মসজিদের পশ্চিম পার্শ্বস্হ মিনারের এক প্রকোষ্ঠে স্বীয় বাসস্হান নির্ধারণ করেন এবং অধিকাংশ সময়ই তাতে মুরাকাবা -মোশাহাদায় নিমগ্ন থাকতেন।অবসর সময়ে তিনি কিছুসংখ্যক অতি আগ্রহী শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদান করতেন এবং সময় সময় আলিমগনের সাথে জটিল বিষয়াদি সম্পর্কে আলোচনা করতেন।



পরবর্তী পর্বের লিংক
https://www.facebook.com/groups/326664087744317/permalink/357904647953594/

__