ওলীদের কাশফ ও কারামত (মাজালিসে গাযযালী- ১)



📚মাজালিসে গাযযালী ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
১ - প্রথম মজলিস

ওলীদের কাশফ ও কারামত– ১
ছাব্বিশে সফর, বৃহস্পতিবার। পবিত্র দরবারে বহু আলেম-ওলামা এবং আল্লাহর বিশিষ্ট বান্দাদের উপস্থিতিতে ওলীদের কাশফ ও কারামত সম্বন্ধে আলাপ-আলোচনা হইতেছিল । হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গায্যালী (রঃ) বলিলেন-
ভাইসব ! শায়খের কলবের শক্তি এবং পবিত্রতা এই পরিমাণ হইতে হইবে যে, যখন কোন লোক তাহার নিকট আল্লাহর ওয়াস্তে বায়আত গ্রহণ করিতে আসে তখন প্রথমেই শায়খ তাহার বাতেনী দৃষ্টি দ্বারা বায়আত গ্রহণে আগত ব্যক্তির বক্ষদেশে পৃথিবীর প্রতি যেই মায়া-মোহ রহিয়াছে উহা দূর করিয়া দিবেন, যেন তাহার মাঝে হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ-লালসা, দুনিয়ার প্রতি আসক্তি এবং মায়া-মোহ কোন কিছুই অবশিষ্ট না থাকে। এই প্রাথমিক কাজ সমাধা করার পর তাহাকে বায়আত করিবেন এবং আল্লাহপ্রাপ্তির পথে আনিয়া দাঁড় করাইবেন।
এই শক্তি যখন শায়খের মধ্যে থাকিবে না তখন অবশ্যই মনে করিবে, এই পীর ও মুরীদ উভয়েই গোমরাহীর জঙ্গলে উদ্দেশ্যহীনভাবে দিশাহারা হইয়া ঘুরাফেরা করিবে। কোন মতেই তাহারা মনযিলে মকসুদে পৌছিতে সক্ষম হইবে না।

তিনি বলিলেন, একবার এক বুযুর্গ দেশ পর্যটনে বাহির হইলেন। বহু দেশ ঘুরাফেরা করার পর তিনি বদখশান আসিয়া পৌঁছেন। এই বুযুর্গ বলেন, এখানে 'আসিয়া আমি এক বুযুর্গের খানকায় উপস্থিত হই। এই বুযুর্গ এমনই আল্লাহ ওয়ালা এবং খোদাভীরু ছিলেন যে, তা বর্ণনাতীত। আমি তাঁহাকে সালাম করিলাম। তিনি হাসিমুখে সালামের উত্তর দিয়া তাঁহার পাশেই আমাকে বসাইলেন । আমি তাঁহার খেদমতে কিছু দিন থাকার মনস্থ করিলাম ।
তিনি প্রতিদিন রোযা রাখিতেন। ইফতারের সময় হইলে গায়েব হইতে তাঁহার নিকট দুইখানি রুটি আসিত। তিনি একখানি দ্বারা ইফতার করিতেন এবং অন্য রুটিখানি আমাকে দিতেন। একদিন এই বুযুর্গ শহরের শাসনকর্তাকে দরবারে ডাকিয়া আনিয়া বলিলেন, আমার জন্য দুইটি খানকা তৈয়ার কর । শাসনকর্তা খানকা তৈয়ার করিয়া দরবেশকে সংবাদ দিলেন। দরবেশ শাসনকর্তাকে প্রত্যহ একটি গোলাম কিনিয়া দিতে বলিলেন। শাসনকর্তা প্রতিদিন বাজার হইতে একজন করিয়া গোলাম ক্রয় করিয়া আনিয়া তাঁহাকে দিতেন। বুযুর্গ ক্রীতদাসের হাত ধরিয়া খানকায় লইয়া যাইতেন এবং সাজ্জাদায় বসাইয়া বলিতেন, আমি তোমাকে আল্লাহর নিকট সোপর্দ করিলাম। এইভাবে খানকাদ্বয় আবাদ হইয়া গেল।
তাহাদের মর্যাদা এমনই উন্নত মানের হইল যে, তাহারা অনায়াসে পানির উপর দিয়া চলিয়া যাইতে পারিতেন। যাহাকে যেই কথা বলিয়া দিতেন তাহা কার্যে পরিণত হইত। এই অবস্থা দেখিয়া আমার বিস্ময়ের আর অবধি রহিল না। আমার অবস্থা দেখিয়া উক্ত বুযুর্গ বলিলেন, ভাই ! ইহাতে বিস্ময়ের কি আছে? সাজ্জাদার অধিকারী তো ঐ ব্যক্তি, যে কোন ব্যক্তির হাত ধরিয়া তাহাকে সাজ্জাদার অধিকারী বানাইয়া দিতে পারে। যাহার মধ্যে এই শক্তি নাই সে আবার কিসের পীর? বরং সে তো সুলুকধারীদের মধ্যে মিথ্যাবাদী।

অতঃপর হুজ্জাতুল ইসলাম এরশাদ করিলেন, পুরুষের পৌরুষ বা পূর্ণতা চারিটি বস্তু দ্বারা সাধিত হয়। যথা- কম নিদ্রা যাওয়া, কম আহার করা, কম কথা বলা এবং লোকের সাথে অপারগতায় মেলামেশা করা।

তিনি (ইমাম গাজ্জালী) বলিলেন, গজনীতে একজন অবিবাহিত দরবেশ ছিলেন। সমস্ত দিন তিনি যাহা কিছু পাইতেন রাত পর্যন্ত তাহা দান করিয়া দিতেন। একটি কপর্দকও নিজের জন্য রাখিতেন না। আবার রাতে কিছু পাইলে দিনে তাহা দান করিয়া দিতেন। ছোট হউক বা বড়, দরবেশ হউক বা ধনী, যেকোন লোকই তাঁহার নিকট আসিত, কেহই খালি হাতে যাইত না। যদি কোন ব্যক্তি বস্ত্রহীন অবস্থায় আসিত তিনি তাঁহার পরিধেয় ভাল কাপড় খুলিয়া তাহাকে দান করিতেন। এই দরবেশ খুবই দানশীল এবং মুক্তহস্ত ছিলেন। আমি বহু দিন তাঁহার সাথে অবস্থান করি।

একদিন এই দরবেশ আমাকে বলিলেন, আমি একাদিক্রমে চল্লিশ বৎসর কৃচ্ছ্র সাধনা করিয়া আল্লাহর এবাদত-বন্দেগীতে ডুবিয়া রহিয়াছি। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে আমি আমার মধ্যে এমন কোন নূর এবং উন্নতি দেখিতে পাই নাই যাহা চারিটি বিষয় অবলম্বন করার পর দেখিতে পাইয়াছি। অর্থাৎ, (১) কম খাওয়া, (২) কম কথা বলা, (৩) কম নিদ্রা যাওয়া, এবং (৪) লোকের সাথে কম মেলামেশা করা। 

এই নিয়ম মুখ্য ব্রত হিসাবে গ্রহণ করার পর আমি আকাশের দিকে তাকাইলে আল্লাহর আরশ পর্যন্ত দেখিতে পাই। ইহাতে কোন কিছুই আমার দৃষ্টিপথে অন্তরায় হইয়া দাঁড়ায় না। আবার যখন মাটির দিকে দৃষ্টিপাত করি, তখন সপ্ততল যমীনে যাহা কিছু আছে উহার সব কিছুই আমি দেখিতে পাই। 

অতঃপর বলিলেন, হে দরবেশগণ ! যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা কম না খাইবে, কম কথা না বলিবে, কম নিদ্রা না যাইবে এবং লোকের সাথে কম মেলামেশা না করিবে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের কেহই দরবেশীর রত্নভাণ্ডার আয়ত্ত করিতে পারিবে না।

প্রকৃত দরবেশ তো তাহারাই যাহারা নিদ্রা হারাম করিয়া দিয়াছেন ; কথা বলা পরিত্যাগ করিয়া বোবায় পরিণত হইয়াছেন, লতাপাতা চিবাইয়া জীবন রক্ষা করেন এবং লোকসঙ্গকে হলাহলতুল্য মনে করেন। এই গুণাবলী অর্জন করার পরই আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের মর্তবায় উপনীত হওয়া যায় ।

স্মরণ রাখিও, ভাল পেশাক পরিধান করিলে লোকে তাহার দিকে ফিরিয়া চাহিবে, জনসমাজ তাহাকে সম্মান করিবে, এই আশায় যে উৎকৃষ্ট পোশাক পরিধান করে সে সুলুকের পথের মিথ্যাবাদী। 

যে দরবেশ প্রবৃত্তির তাড়নায় পেট ভরিয়া খায়, আলস্য নিদ্রায় গা ভাসাইয়া দেয় এবং অযথা লোকের সাথে মেলামেশা পছন্দ করে, সে তো দরবেশ নামের কলঙ্ক ।

তিনি (ইমাম গাজ্জালী রহঃ) এরশাদ করিলেন, একবার আমি নদী পথে ভ্রমণ করিতেছিলাম। এই সময় এমন একজন দরবেশের সাথে আমার সাক্ষাত হইল, অত্যধিক বিয়াযত-মুজাহাদা করার দরুন তাঁহার দেহের চামড়া হাড়ের সাথে মিলিয়া গিয়াছিল। কিন্তু নিয়ম ছিল, চাশতের নামায আদায় করার পর তাঁহার সম্মুখে দস্তরখানা বিছানো হইত এবং প্রায় হাজার মণ পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য তাহাতে রাখা হইত। যে কেহ তাঁহার নিকট আসিত সে-ই খাইত। অথচ তিনি রোযা রাখিতেন। চাশত হইতে যোহর পর্যন্ত এইভাবে পানাহার চলিত এবং বস্ত্রহীনকে বস্ত্রদান করিতেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি কিছুই তাঁহার নিকট রাখিতেন না।
ইহার পরও বলিতেন, যাহার যাহা কিছুর প্রয়োজন আমার নিকট আস। অতঃপর কেহ তাঁহার নিকট আসিলে জায়নামাযের নিচে হাত দিতেন, যাহা কিছু হাতে আসিত তাহাই দান করিতেন। ইফতারের সময় আলমে গায়েব হইতে চারিটি খুরমা আসিত। আমাকে দুইটি দিতেন এবং নিজে দুইটি দ্বারা ইফতার করিতেন। তিনি আমাকে বলিতেন, কম কথা বলা, কম খাওয়া, কম নিদ্রা যাওয়া এবং নির্জনতা অবলম্বন করা ব্যতীত কেহই দরবেশের মর্যাদা লাভ করিতে পারে না।

হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধেও তিনি এই জাতীয় একটি কাহিনীতে এরশাদ করিলেন যে, যালেমদের হাত হইতে উদ্ধার করিয়া যখন হযরত ঈসা (আ.)-কে চতুর্থ আসমানে নেওয়া হইল, তখন মহান আল্লাহ তা'আলা  নির্দেশ দিলেন, তাহাকে ঐখানেই রাখ। এখনও তাহার নিকট পার্থিব সুখ-সম্পদের বস্তু রহিয়াছে।
হযরত ঈসা (আ.) এই বাণী শুনিয়া বিস্মিত হইলেন এবং লক্ষ্য করিতে লাগিলেন, পার্থিব সুখ-সম্পদের কোন বস্তু তাঁহার নিকট এখনও অবশিষ্ট রহিয়াছে। দেখিলেন, একটি সুই এবং এক পেয়ালা চর্বি রহিয়াছে। তিনি আরয করিলেন, হে পরওয়ারদেগারে আলম ! এখন আমি ইহা কি করিব?
এরশাদ হইল, তুমিই তোমার পায়ে কুঠারাঘাত হানিয়াছ। তুমি কি উহা পৃথিবীতেই ফেলিয়া আসিতে পার নাই? সুতরাং আর সম্মুখে অগ্রসর হইতে পারিবে না, ঐখানেই অবস্থান কর।

অথচ এই হযরত ঈসা (আ.) জীবনে বিবাহ করেন নাই, রৌদ্র-বৃষ্টি হইতে আত্মরক্ষা করার জন্য ঘর-বাড়ী তৈয়ার করেন নাই। বিশ্রাম করার প্রয়োজন হইলে একখণ্ড পাথর, ইট বা অন্য কিছু মাথার নিচে দিয়া ক্ষণিকের জন্য বিশ্রাম করিয়া লইতেন।

বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা (আ.) মাথার চুল ও দাড়ি আঁচড়ানোর জন্য একখানা চিরুনি এবং একটি পানপাত্র সর্বক্ষণ সাথে রাখিতেন। একদিন নদীর তীর দিয়া যাওয়ার সময় দেখিতে পাইলেন, এক ব্যক্তি অঞ্জলি ভরিয়া পানি পান করিতেছে। তিনি ভাবিলেন, তাই তো ! অঞ্জলি ভরিয়াই যখন পানি পান করা যায় তখন আর পানপাত্র কেন? সাথে সাথেই তিনি পানপাত্র দূরে ফেলিয়া দিলেন। 
আর একদিন দেখিলেন, এক ব্যক্তি হাতের আঙ্গুল দ্বারা মাতার চুল ও দাড়ি বিন্যাস করিতেছে। সেই দিন হইতে তিনি চিরুনিও আর সাথে রাখিলেন না।

হে দরবেশগণ ! এখানে চিন্তা করিয়া দেখার বিষয় যে, হযরত ঈসা (আ."") ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তু সাথে রাখার জন্য সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার অনুমতি পাইলেন না ; বরং চতুর্থ আসমানেই থাকিতে হইল। সেই ক্ষেত্রে যাহারা পার্থিব বিষয়বস্তুর সহিত ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাহারা কিভাবে বন্ধুর দরবারে পৌঁছার আশা পোষণ করিতে পারে।
দরবেশের কর্তব্য সর্বক্ষণ বিস্ময়াপন্ন থাকা। কেননা, তিনি প্রতিদিন এক স্থান হইতে অন্য স্থানে এবং এক দেশ হইতে অন্য দেশে গমন করেন। এইভাবে তিনি একটির পর একটি উন্নতির সোপান অতিক্রম করিয়া যান।

এক দরবেশ সম্বন্ধে বর্ণিত আছে, তিনি সব সময় চিন্তা-ভাবনা করিতেন এবং বিস্ময়াপন্ন হইয়া থাকিতেন। লোকে তাঁহাকে ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিতেন, আমার প্রতিটি পলক এমন এক দেশের উপর পড়ে যাহা প্রথমটি হইতে শত গুণে বড়। প্রতিটি দেশই প্রথমটি হইতে অধিক রহস্যময়। সুতরাং এই রহস্য স্বচক্ষে দেখিয়াই আমি বিস্ময়াভিভূত হইয়া 
পড়ি।
এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার চক্ষুদ্বয় অশ্রুসিক্ত হইয়া পড়িল। কিছুক্ষণ নিচের দিকে মাথা রাখিয়া আবার বলিলেন, বিস্ময়াভিভূত আহলে সুলুক বলেন, দরবেশ তাহাকে বলা হয় যিনি প্রতিদিন হাজার হাজার দেশ অতিক্রম করিয়া যান এবং তাহাতেই নিমগ্ন থাকেন। যেই দরবেশ আলমে গায়েব হইতে কোন সংবাদ পায় না সে দরবেশ নহে।

অতঃপর বলিলেন, আল্লাহর কোন কোন ওলী প্রেমাধিক্য এবং মত্ততার (সুকর) অবস্থায় কিছু কিছু রহস্য প্রকাশ করিয়া দেন। আবার এমন ওলীও আছেন যাঁহারা কোন অবস্থায়ই রহস্য প্রকাশ পাইতে দেন না। অতএব এই পথে সুলুকধারীদের শক্তি-সাহস আরও প্রশস্ত হওয়া উচিত, যেন রহস্য তাঁহার মধ্যেই সীমিত থাকে। কারণ, মাহবুবের রহস্যে যে পূর্ণতাপ্রাপ্ত, সে তাহা কখনও নষ্ট হইতে দেয় না। 

বহু দিন পর্যন্ত আমি আমার মুরশিদের খেদমতে অবস্থান করিয়াছি। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে আমি কোন দিন শুনি নাই যে, তিনি রহস্যময় কোন কথা বলিয়াছেন। আর আমি ইহাও দেখি নাই যে, তাঁহার মধ্যে যে নূরের আবির্ভাব হইয়াছে তাহা প্রকাশ করিয়াছেন। 

কামেল দরবেশের অবস্থা তো এমন যে, তিনি কোন মতেই রহস্য প্রকাশ হইতে দেন না। ফলে অন্য রহস্য সম্বন্ধে তিনি অবগত হইতে পারেন। তাই মানসূর হাল্লাজ যদি পূর্ণতা প্রাপ্ত হইতেন তবে কখনও তিনি তাঁহার বন্ধুর রহস্য লোক সমাজে প্রকাশ করিতেন না। বন্ধুর রহস্যের সামান্য কিছুটা প্রকাশ করার ফলেই তিনি প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হইয়াছিলেন।

হযরত মানসূর হাল্লাজের এক বোন ছিলেন উঁচু স্তরের একজন ওলী। অর্ধ রাত অতিবাহিত হওয়ার পর তিনি ঘর ছাড়িয়া বাগদাদের উন্মুক্ত মরুভূমিতে চলিয়া যাইতেন এবং একাগ্র চিত্তে বহুক্ষণ আল্লাহর এবাদত-বন্দেগীতের লিপ্ত থাকিতেন। বাড়ী ফিরার সময় হইলে আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদিগকে বলিতেন, আমার প্রেম মদিরার এক পেয়ালা বেহেশতী সুরা তাহাকে পান করিতে দাও। ফেরেশতাগণ পানপাত্র তাঁহার হাতে তুলিয়া দিতেন। তিনি উহা পান করিয়া গৃহে প্রত্যাবর্তন করিতেন। 
হযরত মানসূর বোনের গৃহ হইতে বাহির হইয়া যাওয়ার বিষয় অবগত হইতে পারিলেন। বোন কোথায় যায় জানার জন্য এক রাতে তাঁহার পিছনে পিছনে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেলেন। নিয়মিতভাবেই বাড়ী ফিরার পূর্বে ফেরেশতাগণ তাঁহার সম্মুখে পানপাত্র ধরিলেন। তিনি প্রেম সুধার সামান্য পরিমাণ পান করিতেই মানসূর পিছন হইতে ডাকিয়া বলিলেন, বোন! তুমি একা পান করিও না, আমাকে একটু দাও । পিছনে ফিরিয়া ভাইকে দেখিয়া তো তিনি অবাক! তিনি বলিলেন, হায় অদৃষ্ট ! আমার এতদিনের রহস্য আজ প্রকাশ পাইয়া গেল ! তারপর ভাইকে বলিলেন, তুমি ইহা পান করিও না। আমার বিশ্বাস, তুমি ইহার প্রভাব সহ্য করিতে পারিবে না। ভাই তাঁহার কথায় কর্ণপাত করিলেন না। সেই সুধা পান করিলেন। আর যায় কোথায় ! সঙ্গে সঙ্গেই তাঁহার মুখ হইতে বাহির হইয়া পড়িল, আনাল হক। আমিই সত্য। ভাইয়ের অবস্থা দর্শনে বোন দুঃখে কাঁদিয়া ফেলিলেন। বলিলেন, ওহে অপদার্থ! আমার কথা না শুনিয়া নিজেও দুর্নামগ্রস্ত হইলে আর সাথে সাথে আমাকেও হেয় করিয়া ছাড়িলে। 

ইহার পর মানসূর প্রকাশ্য জনসমাজে আনাল হক, আনাল হক বলিয়া বেড়াইতে থাকেন। শরীয়তমতে তাঁহাকে শূল দণ্ডে দণ্ডিত করা হইল। শূলে চড়ানোর পূর্বে বোন তাঁহার নিকট গিয়া বলিলেন, মানসূর ! আমি না তোমাকে বলিয়াছিলাম, উহা পান করার শক্তি তোমার নাই। আমার কথায় কর্ণপাত না করিয়া আজ সর্বসাধারণ্যে বন্ধুর রহস্য প্রকাশ করিয়া দিয়া মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হইলে।
লোকে বলাবলি করিতে লাগিল, মানসূর এমন পৌরুষের অধিকারী ছিলেন যে, বন্ধুর প্রেমে স্বীয় জীবন উৎসর্গ করিলেন। কিন্তু বোন লোকের কথা শুনিয়া বলিলেন, মানসূর ছিল একজন কাপুরুষ। সে পৌরুষের অধিকারী হইলে সামান্য পরিমাণ প্রেম মদিরা পান করিয়া এমনভাবে বিপথগামী হইত না। আমি আজ বিশ বৎসর যাবত এই মদিরা পান করিয়া আসিতেছি, অথচ আমি তো কোন দিন বিপথে চলি নাই। বরং বলিয়াছি, আরও দাও।

হযরত জোনায়েদ (রহ.) যখন প্রেমবিহ্বল অবস্থায় থাকিতেন, তখন শুধু এই কথাই বলিতেন যে, প্রেমিক সম্প্রদায়ের জন্য হাজার আফসোস, তাহারা প্রেম ও বন্ধুত্বের দাবী করে, তারপর আলমে গায়েব হইতে তাহাদের উপর যে রহস্য অবতীর্ণ হয় তাহা লোক সমাজে প্রকাশ করিয়া বেড়ায়।

আমি আমার পীর ও মুরশিদের নিকট শুনিয়াছি, একজন বুযুর্গ কয়েকশত বৎসর পর্যন্ত আল্লাহর এবাদত ও মুজাহাদায় নিয়োজিত থাকেন। একদিন তাঁহার উপর প্রেম রহস্য প্রকাশ লাভ করিল। তিনি কিছুটা দুর্বল প্রকৃতির থাকায় তাহা সহ্য করিতে পারিলেন না। সাথে সাথে প্রকাশ করিয়া দিলেন। দ্বিতীয় দিন তাঁহার নিকট হইতে সেই রহস্য ছিনাইয়া লওয়া হইল। দরবেশ সেই দুঃখে ম্রিয়মাণ হইয়া পড়িলেন।গায়েবী আওয়ায হইল, ওহে দরবেশ ! তুমি যদি এই রহস্য  প্রকাশ না করিতে, তবে তোমাকে আরও অনেক কিছু দান করা হইত। সুতরাং তুমি উহার উপযুক্ত না হওয়ায় তোমার নিকট হইতে ছিনাইয়া লইয়া অন্যকে দান করা হইয়াছে।

একবার এক বুযুর্গ আর এক বুযুর্গের নিকট লিখিলেন, ঐ ব্যক্তি সম্বন্ধে আপনার কি অভিমত যে এক পেয়ালা প্রেম সুধা পান করিয়াই বলিয়া উঠে, আমি অনেক কিছু পাইয়াছি। দরবেশ উত্তরে লিখিলেন, এমন ব্যক্তি তো অত্যন্ত- দুর্বলচেতা। যেব্যক্তি সমুদ্রের পর সমুদ্র প্রেম সুধা পান করিয়াও হজম করিয়া ফেলে এবং বলে, আরও দাও, সে-ই বাহাদুর ! কিন্তু আমি তোমাদিগকে বলিতেছি তোমরা কখনও এইরূপ করিও না। কারণ, যাহারা গোপন রহস্য প্রকাশ করে তাহারা কিছুই অর্জন করিতে পারে না।

দরবেশ যতক্ষণ পর্যন্ত নির্জনতা অবলম্বন করিয়া যাবতীয় সম্পর্ক পরিত্যাগ না করে, সে কোন দিনও আল্লাহর নৈকট্য লাভ করিতে সক্ষম হয় না। সত্তর বৎসর পর হযরত বায়েজীদ (রহ.) যখন আল্লাহ নৈকট্য লাভে সমর্থ হন, তখন নির্দেশ দেওয়া হইল, তাহাকে ফিরাইয়া লইয়া যাও। কেননা, এখনও তাহার নিকট পার্থিব উপকরণ রহিয়াছে। তিনি চিন্তা করিলেন, আমার নিকট কি আছে? লক্ষ্য করিয়া দেখিলেন, একটি চামড়ার ছেঁড়া জামা এবং একটি ভাঙ্গা পানপাত্র। তিনি তখনই উহা ফেলিয়া দিয়া প্রতিবন্ধকতা দূর করিলেন।

ভাইসব ! এমন একজন বুযুর্গ যখন এই সামান্য বস্তুর জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভে সমর্থ হন নাই, তখন তোমার-আমার ঠিকানা কোথায় ? 
আমরা তো পার্থিব আসবাব-উপকরণ দ্বারা পরিবেষ্টিত হইয়া রহিয়াছি। পৃথিবীর মায়াজালে আবদ্ধ। হে দরবেশ ! দরবেশী এক বস্তু. সঞ্চয় করা অন্য বস্তু। প্রকৃত দরবেশ তো ঐ ব্যক্তি, তিনি যাহা মুখে বলেন তাহা কার্যে পরিণত হয়, একটুও এদিক সেদিক হয় না।

একবার আমি এবং আমার একজন অন্তরঙ্গ সাথী নদী পথে ভ্রমণ করার জন্য রওয়ানা হই। হঠাৎ আমরা আল্লাহর কুদরতের এমন একটি নিদর্শন দেখিতে পাই যাহা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। নদীর তীরে আমরা বসা। ক্ষুধার তাড়নায় অস্থির। একদিকে জঙ্গল অন্য দিকে নদী। কোথায় পাই খাবার বস্তু। এমন সময় একজন কাফ্রী আসিয়া আমাদের সম্মুখে দুইখানি যবের রুটি রাখিয়া চলিয়া গেল। আমরা আল্লাহর এই নেয়ামত খাওয়া আরম্ভ করিলাম। হঠাৎ আমাদের চোখে পড়িল, উটের সমান একটি বিচ্ছু দ্রুতবেগে নদীতে ঝাঁপাইয়া পড়িয়া ততোধিক দ্রুত গতিতে নদীর অপর তীরের দিকে ধাবিত হইয়াছে। আমরা মনে করিলাম, নিশ্চয়ই কোন প্রয়োজনে উহা যাইতেছে। কি প্রয়োজন দেখার জনা আমরাও উঠিয়া দাঁড়াইলাম। কিন্তু কিভাবে নদী অতিক্রম করিব? আমরা আল্লাহর নিকট দোআ করিলাম। নদীর পানি দুই ভাগ হইয়া আমাদের পথ করিয়া দিল। নদী পার হইয়া দেখিলাম, একটি গাছের তলায় এক ব্যাক্তি গভীর নিদ্রায় নিদ্রিত। আরও দেখিলাম, বিরাট এক অজগর তাহাকে দংশন করার জন্য গাছ হইতে নামিয়া আসিতেছে। ইত্যবসরে উট সদৃশ সেই বিছু অজগরটিকে দংশন করিল। অজগরটি সাথে সাথে মরিয়া গেল। বিচ্ছুটিও আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে চলিয়া গেল। আমরা মনে করিলাম, এই ব্যক্তি নিশ্চয়ই আল্লাহর ওলী, যাঁহাকে অজগরের দংশন হইতে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ তাআলা এই বিচ্ছুটিকে পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। আমরা উক্ত ব্যক্তির নিকট গিয়া যাহা দেখিলাম তাহাতে আমাদের বিবেক-বুদ্ধি লোপ পাইয়া গেল। দেখিলাম, তাহার পাশে মদের বোতল। অতিরিক্ত মদ পান করার দরুণ সে বমি করিয়া নিস্তেজ হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। দুর্গন্ধে তাহার নিকট যাওয়া মুশকিল। আমরা চিন্তা করিতেছিলাম, আল্লাহর এই নিকৃষ্টতম জীবের অবস্থা দেখার জন্য আমরা কেন এখানে আসিলাম ! এমন সময় গায়েব হইতে আওয়ায হইল, ওহে আমার প্রিয়তম বন্ধুদ্বয় ! আমি যদি আমার নেকবখত এবং পুণ্যবানদিগকেই রক্ষণাবেক্ষণ করি তবে আমার গুনাহগার বান্দাদিগকে কে রক্ষা করিবে?
ইত্যবসরে সেই ব্যক্তি জাগ্রত হইয়া পাশে মৃত অজগর এবং আমাদিগকে দেখিয়া অবাক হইয়া তওবা করিল । পরবর্তী সময়ে এই ব্যক্তি খালি পায়ে হাঁটিয়া পনেরবার হজ্জ করিয়াছিল।

বন্ধুগণ! যখন মেহেরবানীর বাতাস প্রবাহিত হইতে থাকে, তখন শত পাপী অপরাধীজনকেও সাজ্জাদার অধিকারী করিয়া দেয়। খোদা না করুন, আবার কখনও যদি ক্রোধের হাওয়া প্রবাহিত হয়, তখন যত বড় সাজ্জাদার অধিকারীই হউক না কেন তাহাকে সাজ্জাদা হইতে বঞ্চিত করেন। সুতরাং এই পথের পথিক কখনও নির্ভয় এবং নিশ্চিন্ত থাকিতে পারে না। কারণ, সে তাহার পরিণতি ভাল হইবে কিনা কিছুই বুঝিতে পারে না। অভিশপ্ত শয়তান যদি তাহার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে জ্ঞাত থাকিত, তবে সে অবশ্যই হযরত আদম (আ.)-কে সেজদা করিত। সে তাহার পরিণতি সম্বন্ধে অজ্ঞ ছিল। বলিয়াই স্বীয় এবাদত-বন্দেগী, রিয়াযত-মুজাহাদার অহংকার করত নিজেকে সকলের চেয়ে গুণী-জ্ঞানী মনে করিয়াই বলিয়া ফেলিল, আমি মাটির তৈয়ারী মানুষকে সেজদা করিব না। ফলে সে নাফরমান হইল। আল্লাহর নির্দেশ পালন না করিয়া বিতাড়িত হইল। তাহার সকল এবাদত-বন্দেগী ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইল। এতদিনের এবাদত-বন্দেগী তাহার মুখের উপর নিক্ষেপ করা হইল।
এই কথা বলিয়া তিনি অঝোর নয়নে কাঁদিতে থাকেন। উপস্থিত সকলেও তাঁহার সাথে ক্রন্দন করিতে থাকেন। কিছুক্ষণ পর তিনি মোনাজাত করিয়া সকলকে  সেই দিনের মত বিদায় দিলেন।
-------------------

উলামায়ে ছূ বা অসৎ আলেম– ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

 উলামায়ে ছূ বা অসৎ আলেম–



📚 মুকাশাফাতুল কুলুব ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


দুনিয়াদার ও অসৎ আলেম যারা, তারাই উলামায়ে ছূ। ইল্ম হাসিলের দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য থাকে, কেবল দুনিয়াবী নেয়ামত ও জাগতিক যাবতীয় দ্রব্য-সত্তার জমা করা এবং উচ্চপদস্থ বড় বড় লোকদের কাছে মান-সম্মান ও মর্যাদা হাসিল করা। নবী করীম (সাল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেনঃ 

“কেয়ামতের দিন সর্বাপেক্ষা কঠিন আযাব হবে সেই আলেমের যে নিজের ইল্ম দ্বারা উপকৃত হয় নাই।” 

তিনি (সাল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আরও ইরশাদ করেছেন : 

“যে কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত আলেম হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে নিজের ইল্ম অনুযায়ী আমল না করবে।” 

হুযূর আকরাম (সাল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আরও ইরশাদ করেনঃ ইলম দুই প্রকার

এক প্রকার ইল্ম যা শুধু মুখের কথা ও ভাষায় ব্যক্ত করা পর্যন্ত সীমিত থাকে; বস্তুতঃ এ ইল্ম অর্জনকারীর বিরুদ্ধে আল্লাহ্ তা'আলার কাছে সাক্ষ্য ও প্রমাণস্বরূপ। 

দ্বিতীয় প্রকার ইল্ম হচ্ছে, অস্তর ও অভ্যন্তরের ইল্ম। বস্তুতঃ এটাই প্রকৃত ইলম; এবং অর্জনকারীর জন্য এ ইলমই নাফে  ও উপকারী।”

হুযূর আকরাম (সাল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন: 

“তোমরা এ উদ্দেশ্যে ইল্ম অর্জন করো না যে, সমকালীন আলেমদের সাথে গর্ব করবে; তাদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করবে, নির্বোধ লোকদের সাথে বাক-বিতণ্ডা ও ঝগড়া করবে এবং মানুষকে নিজের প্রতি আকর্ষণ করবে। কেননা, যে ব্যক্তি এহেন উদ্দেশ্যে ইল্ল্ম হৗসিল করবে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে দোযখে নিক্ষেপ করবেন।”


হুযূর আকরাম (সাল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আরও ইরশাদ করেছেন  : 

“কোন ব্যক্তিকে তার জানা বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে যদি সে তা গোপন করে তবে কেয়ামতের দিন তাকে আগুনের লাগাম পরিয়ে দেওয়া হবে।” 

তিনি (সাল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আরও ইরশাদ করেছেন 

“আমি তোমাদের ব্যাপারে কতিপয় ব্যক্তিকে দাজ্জালের চেয়েও বেশী ভয়ঙ্কর মনে করি”। 

কেউ জিজ্ঞাসা করলো : ইয়া রাসূলাল্লাহ্ ! তারা কারা? তিনি বললেন  : 

“ভ্রষ্ট পথে পরিচালনাকারী সমাজ ও জাতির নেতারা”। 

অপর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)  ইরশাদ করেন 

“যে ব্যক্তি কেবল অধিক বিদ্যাই অর্জন করে গেল; অথচ হেদায়াতের পথে আসলো না - এরূপ বিদ্যার্জন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ থেকে ক্রমবর্ধমান দূরত্বেরই কারণ হয়।” 

হযরত ঈসা (আলাইহিস্সালাম) বলেনঃ “ওহে ! আর কতদিন অন্ধকার রাতের পথচারীদের জন্য পথ পরিষ্কার করবে আর দিশাহারা লক্ষ্যচ্যুত লোকদের সহবাস গ্রহণ করে থাকবে !”  উপরোল্লিখিত রেওয়ায়াতসমূহ এবং আরও অন্যান্য রেওয়ায়াতে ইলমের অপরিসীম গুরুত্ব বুঝা যায় এবং সেই সঙ্গে এ কথাও প্রতীয়মান হয় যে, ইলম হাসিল করার পর সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালন না করা খুবই ক্ষতিকর ও মারাত্মক অপরাধ। তাই আলেম ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে তার সার্বিক দায়িত্ব পালন করে যেমন চির সৌভাগ্যের অধিকারী হতে পারে, অপরদিকে এর বিপরীত করে সে চির ধ্বংসও হতে পারে। সুতরাং সে যদি অত্যস্ত সতর্কতার সহিত ইলমের হক ও দায়িত্ব আদায় না করে, তাহলে অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে বঞ্চনার সম্মুখীন হতে হবে। 

হযরত উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন– “এই উম্মতের মধ্যে আমি ‘ইল্মধারী মুনাফিকের’ বিষয়টিকে বড় ভয়ঙ্কর ও আশংকাজনক বোধ করি”। 

লোকেরা জিজ্ঞাসা করলো  হে আমীরুল মুমেনীন ! 

আলেম মুনাফেক হয় কি করে ? তিনি বললেন  :  মুখের ভাষায় ও কথনে সে বড় বিদ্বান ও আলেম, কিন্তু অন্তর এবং আমল এ উভয় দিক থেকেই সে জাহেল-মূর্খ।


হযরত হাসান (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন : “খবরদার ! তুমি ঐসব লোকের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা বড় বড় বিদ্বান লোকের বিদ্যা এবং বড় বড় তত্ত্বজ্ঞানীদের প্রজ্ঞা একত্রিত করে নিয়েছে কিন্তু আমলের প্রশ্নে একেবারে শূন্য; নির্বোধ ও অজ্ঞ লোকদের পথ ধরেছে।” 

এক ব্যক্তি হযরত আবূ হুরাইরাহ্ (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট আরজ করলো : আমার ইলম হাসিল করতে ইচ্ছা হয়; কিন্তু আশংকা বোধ করি যে, হয়তঃ আমি ইলমের হক আদায় করতে পারবো না; বরং আরো বরবাদ করবো। হযরত আবূ হুরাইরাহ্ (রদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন  : “ইল্ম হাসিল না করাও মূলতঃ ইল্ল্মকে বরবাদ করার অন্তর্ভুক্ত। 

হযরত ইব্রাহীম ইব্‌নে উয়াইনাহ্ (রদিয়াল্লাহু আনহু)– কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলঃ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী লজ্জিত হয় কে? 

তিনি বলেছেন “দুনিয়াতে ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে বেশী লজ্জিত হয়, যে অকৃতজ্ঞ লোকের প্রতি এহ্সান ও অনুগ্রহ করে। 

আর আখেরাতে সবচেয়ে বেশী লজ্জিত হবে অসৎ আলেম।” 

হযরত খলীল ইব্‌নে আহমদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন  “লোকেরা সাধারণতঃ চার প্রকারের হয়ে থাকে  : 

(১) যে জানে (অর্থাৎ ইল্ল্ম শিক্ষা করেছে এবং এ কথাও জানে অর্থাৎ অনুভূতি রাখে  যে, সে জানে (অর্থাৎ নিজের ইলমের দায়িত্বজ্ঞান আছে), এরূপ ব্যক্তি সত্যিকার আলেম; তোমরা তার অনুসরণ কর। 

(২) যে জানে এবং একথা জানে না যে, সে জানে - এরূপ লোক ঘুমন্ত অবস্থায় রয়েছে; তাকে তোমরা জাগ্রত কর। 

(৩) যে জানে না (অর্থাৎ অজ্ঞ) এবং এ কথা জানে (অর্থাৎ অনুভূতি আছে) যে, সে জানে না - এরূপ ব্যক্তি সত্যপথের অনুসন্ধানী; তাকে তোমরা সত্য ও হেদায়াতের পথ দেখিয়ে দাও। 

(৪) যে জানে না (অর্থাৎ অজ্ঞ-মূর্খ) এবং এ কথাও জানে না যে, সে জানে না- এ ব্যক্তি জাহেল, দাম্ভিক; তাকে তোমরা পরিহার কর এবং এ থেকে বেঁচে চল। 


”হযরত সুফিয়ান সওরী (রহঃ) বলেন  : “ইলম চিৎকার করে আমলের দাবী জানায়, যদি তার দাবী ও আহ্বানে সাড়া দেওয়া হয় অর্থাৎ আলেম ব্যক্তি তার ইলম অনুযায়ী আমল করে, তবে সেই ইলম তার কাছে থাকে, অন্যথায় সে বিদায় নিয়ে নেয়।” 


হযরত ইব্‌নে মুবারক (রহঃ) বলেন : 

“একজন লোক সত্যিকার আলেম বা জ্ঞানী হতে হলে সর্বদা (নিজকে মুখাপেক্ষী জ্ঞান করে) জ্ঞান অন্বেষায় মগ্ন থাকতে হবে। আর যদি সে নিজকে আলেম বা জ্ঞানী ভেবে নেয়, তাহলে সে প্রকৃত আলেম বা জ্ঞানী নয়; জাহেল মূর্খ।” 

হযরত ফুযাইল ইব্‌নে ইয়ায (রহঃ) বলেন : তিন শ্রেণীর লোকের উপর আমার বড় করুণা আসে : (১) সমাজের শীর্ষস্থানীয় মান্য-গণ্য ব্যক্তি যদি অপমানিত হয়। 

(২) সমাজের বিত্তশালী ও ধনাঢ্য ব্যক্তি যদি দরিদ্র ও অভাবী হয়ে যায়। 

(৩) যে আলেম মানুষের শ্রদ্ধা-সম্মান হারিয়ে ফেলেছে; লোকেরা যাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সাথে হেয় দৃষ্টিতে দেখে।” 


হযরত হাসান (রহঃ) বলেন : “আলেমের শাস্তি হচ্ছে, তার অন্তর মরে যাওয়া, আর অন্তর মরে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে, দ্বীন ও আখেরাতের কাজ করে দুনিয়া তলব করা।” এ প্রসঙ্গে জনৈক আরবী কবি কতই না চমৎকার বলেছেন  : “আমি বিস্মিত হই সে ব্যক্তির উপর যে হিদায়াতের বিনিময়ে গোমরাহী খরিদ করে, আর যে ব্যক্তি দ্বীন বিক্রি করে দুনিয়া খরিদ করে তার অবস্থা আরও অধিক বিস্ময়কর।” 

“এ দুয়ের মধ্যে অধিকতর বিস্ময়কর হলো তার অবস্থা যে সমান দামে দ্বীন বিক্রি করে দুনিয়া নিয়ে নেয় ।” 


হুযূর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন

“(অসৎ) আলেমকে এমন কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে যে, দোযখবাসীরা তার আশে-পাশে জমা হয়ে যাবে ।” হযরত উসামাহ্ ইব্‌নে যায়েদ (রঃ) বলেন, হুযূর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম)-কে আমি বলতে শুনেছি যে, “কিয়ামতের দিন (অসৎ) আলেমকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে; তার নাড়ি-ভুঁড়ি বের হয়ে আসবে এবং এমনভাবে ঘুরতে থাকবে যেমন গাধা চাকীর চতুর্পার্শ্বে ঘুরতে থাকে। দোযখীরা তার আশে পাশে জমা হয়ে জিজ্ঞাসা করবে - তোমার এ শাস্তি কি জন্যে হচ্ছে ? সে বলবে, আমি মানুষকে সৎকাজের উপদেশ দিয়েছি কিন্তু নিজে সে অনুযায়ী আমল করি নাই, লোকদেরকে আমি মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য নসীহত করেছি; কিন্তু নিজে মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকি নাই ।” 

আলেমের শাস্তি এতো অধিক হওয়ার কারণ হচ্ছে, সে জেনেশুনে আল্লাহর না ফরমানী করেছে। এ জন্যেই আল্লাহ্ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন  :  “নিশ্চয় মুনাফিকরা দোযখের সর্বনিম্ন স্তরে হবে।” (নিসা : ১৪৫ ) মুনাফিকদের শাস্তির কঠোরতার কারণ তারা সত্য বিষয় জানার পরেও অস্বীকার করেছে। এমনিভাবে, নাসরাদের তুলনায় ইহুদীদেরকে অধিকতর অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়েছে; অথচ এরা নাসারাদের মত আল্লাহর জন্য পুত্রের কথা এবং ত্রিত্ববাদের কথা বলে নাই; এর কারণ হচ্ছে, এই ইহুদীরা জেনে-বুঝে এবং ভালভাবে পরিচয়লাভের পরও অস্বীকার করেছে। যেমন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “তারা তাঁকে এরূপ চিনে, যেরূপ তারা আপন পুত্রকে চিনে থাকে” (বাকারাহ্ : ১৪৬ )  “অতঃপর যখন তাদের নিকট আসলো সেই পরিচিত কিতাব, তখন তারা একে অস্বীকার করে বসলো; সুতরাং আল্লাহর লা'নত হোক এরূপ কাফেরদের উপর ।” (বাকারাহ্ ৮৯) 

অনুরূপ, বাল্আম বাউরের ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে কুরআনে ইরশাদ হয়েছে  : 

“আর তাদেরকে সেই ব্যক্তির অবস্থা পাঠ করে শুনিয়ে দিন যাকে আমি আমার আয়াতগুলো প্রদান করেছিলাম, অতঃপর সে তা হতে সম্পূর্ণরূপে বের হয়ে পড়লো, অতএব শয়তান তার পিছনে লেগে গেল, ফলে সে বিপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।” (আ'রাফ  : ১৭৫ ) 

উক্ত প্রসঙ্গের শেষ পর্যায়ে ইরশাদ হয়েছে; “ ফলতঃ তার অবস্থা কুকুরের মত হয়ে গেল— তুমি যদি এটাকে আক্রমণ কর তবুও হাঁপাতে থাকে, অথবা যদি এটাকে নিজ অবস্থায় ছেড়ে দাও তবুও হাঁপাতে থাকে।” 

অনুরূপ, অসৎ আলেমেরও ঠিক একই পরিণাম। কেননা, বাল্আম বাউরকেও আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় কিতাবের ইলম দান করেছিলেন; কিন্তু সে কাম-প্রবৃত্তির অনুসরণে নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিল। এ জন্যেই আল্লাহ্ তা'আলা তাকে কুকুরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ, সে জ্ঞান-বিদ্যার কোনই পরোয়া করে নাই; ইল্ল্ম আছে বা নাই - এ প্রশ্নই তার থাকে নাই; খাহেশাত ও কুপ্রবৃত্তির বাসনা চরিতার্থকরণে সে নিমজ্জিত হয়ে গেছে।

হযরত ঈসা (আঃ) বলেছেনঃ 

“অসৎ আলেমের উদাহরণ সেই পাথরের ন্যায়, যেটি প্রবাহিত ঝর্ণার বহির্মুখে পতিত হয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেয় ; সে নিজেও পানি পান করে না এবং শস্যক্ষেত্রেও পানি যেতে দেয় না।”

**********

#অসত_আলেম

#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিয়াহ

#মুকাশাফাতুল_কুলুব

ক্বিয়ামতের বিভীষিকা ইমাম গাজ্জালী রহঃ

 ক্বিয়ামতের বিভীষিকা



✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) 📚মুকাশাফাতুল_কুলুব

হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রঃ) বর্ণনা করেন যে, একদা আমি রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) উনাকে জিজ্ঞাসা করেছি- ইয়া রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) ক্বিয়ামতের দিন কি বন্ধু বন্ধুকে স্মরণ করবে? তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন “কিয়ামতের দিন তিন জায়গায় কেউ কাউকে স্মরণ করবে না। 

(১) মীযান-পাল্লার নিকট যে পর্যন্ত না সে জানতে পারবে যে, তার পাল্লা হালকা রয়েছে কি ভারী হয়েছে। 
(২) আমলনামা বিতরণের সময়; যে পর্যন্ত না সে জানতে পারবে যে, আমলনামা সে ডান হাতে প্রাপ্ত হবে কি বাম হাতে। 
(৩) যখন দোযখের মধ্য থেকে বিরাট-বিশাল একটি গর্দান বের হয়ে তাদেরকে অগ্নির লেলিহান শিখায় আবদ্ধ করে নিবে এবং বলতে থাকবে যে, আল্লাহ্ আমাকে তিন ধরনের লোকের উপর ন্যস্ত করে দিয়েছেন, দুনিয়াতে যারা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকে মাবূদ বানিয়েছে, আর অবাধ্যতা ও হঠকারিতা করেছে, আর যারা ক্বিয়ামতের দিনকে অবিশ্বাস করেছে। এই তিন শ্রেণীর লোকদেরকে সে পেঁচিয়ে জাহান্নামের কঠিন শাস্তির মধ্যে নিক্ষেপ করবে। 

জাহান্নামের একটি পুল রয়েছে চুলের চেয়েও সূক্ষ্ম তরবারীর চেয়েও ধারালো– এতে রয়েছে অগ্রভাগ বাঁকানো আঁকড়া বা লৌহ-শলাকা; উপরন্তু কাঁটাদার ছোট ছোট চারা গাছ।” হযরত আবূ হুরাইরাহ্ (রঃ) রেওয়ায়াত করেছেন, রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা আসমান-যমীন সৃষ্টি করার সময়ই (ক্বিয়ামতের) সিঙ্গা সৃষ্টি করেছেন এবং তা হযরত ইস্রাফিল (আঃ) এর হাতে দিয়ে রেখেছেন । তিনি আরশের দিকে তাকিয়ে অপলক নেত্রে প্রতীক্ষা করছেন যে, কখন ফুৎকারের আদেশ করা হয়। অত্র হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত আবূ হুরাইরাহ (রঃ) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম)-উনাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া

রাসূলাল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম), সিঙ্গা কি ? তিনি বললেনঃ নুরের শিং। আবার জিজ্ঞাসা করলাম, তা কেমন? তিনি বললেনঃ “ঐ সত্তার কসম, যিনি আমাকে সত্য নবীরূপে পাঠিয়েছেন, আসমান-যমীনের প্রশস্ততা জুড়ে এর পরিধি; তিনবার এতে ফুৎকার দেওয়া হবে - ‘নফ্‌খায়ে ফাযা’ (ভয়–বিভীষিকা ও ত্রাসের ফুৎকার ), নফ্‌খায়ে সাক্কু (বেহুঁশকরণের ফুৎকার) এবং নফ্‌খায়ে বাছ (পুনরুত্থানের ফুৎকার)। 

আর এই শেষোক্ত ফুৎকারে আত্মাসমূহ (রূহ্) বের হবে। তখন এমন দেখা যাবে, যেন অসংখ্য-অগণিত মক্ষিকায় আসমান-যমীন ভরে গেছে। অতঃপর এসব রূহ্ (আত্মা) নাকের ছিদ্র পথ দিয়ে দেহসমূহে প্রবেশ করবে। এরপর হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) বললেন  : আমি সে ব্যক্তি যার কবর সর্বপ্রথম বিদীর্ণ (উন্মুক্ত) হবে।” 

অন্য এক রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত জিব্রাঈল, মিকাঈল ও ইস্রাফিল (আঃ)-কে যখন যিন্দা করা হবে, তখন তাঁরা হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম)  এর কবরের পার্শ্বে গিয়ে উপস্থিত হবেন। তাঁদের নিকট থাকবে (হুযূরের আরোহণের জন্য) বুরাক্ক, আরও থাকবে জান্নাতের পোষাক। কবর মুবারক বিদীর্ণ হওয়ার পর নবী করিম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) জিব্রাঈল (আঃ)-কে জিজ্ঞাসা করবেন, হে জিবরাঈল। আজকে এ কোনদিন? তিনি বলবেন, আজকে ক্বিয়ামত দিবস। 

[এখানে একটি কথা উল্লেখ করা জরুরী যে আল্লাহর রসুল (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) তা জানেননা এমন নয়; যেমন বিদায় হজ্জের খুতবায় তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন ‘আজকের এই দিন কোন্ দিন?’।কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম উনাকেই উঠানো হবে তা তিনি এখনো জানেন তখনো জানবেন ]

হক–নাহাকের ফয়সালার দিবস। ক্বারিয়াহ্ তথা করাঘাতকারীর দিবস। তিনি জিজ্ঞাসা করবেন, হে জিব্রাঈল আল্লাহ্ তা'আলা আমার উম্মতের সাথে কিরূপ আচরণ করেছেন? তিনি বলবেন, আপনি সুসংবাদ নিন; সর্বপ্রথম আপনার কবরই বিদীর্ণ হয়েছে। 

হযরত আবূ হুরাইরাহ্ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) বলেছেনঃ আল্লাহ্ তা'আলা বল্‌বেন  : “হে জ্বিন ও মানবকুল ! আমি তোমাদের মঙ্গল চেয়েছি, এই নাও তোমাদের কর্মফল তোমাদের আমলনামায় রয়েছে। যদি ভাল হয়ে থাকে, তবে আল্লাহ্র প্রশংসা কর। আর যদি বিপরীত কিছু পাও, তবে অন্য কাউকে নয় নিজকেই ভর্ৎসনা কর।” 

হযরত ইয়াহইয়া ইব্‌নে রাযী (রহঃ) এর মজলিসে এক ব্যক্তি এ আয়াতখানি তিলাওয়াত করেছিল
“যেদিন আমি মুক্তাকীদেরকে করুণাময়ের নিকট মেহমানরূপে একত্রিত করবো, আর পাপীদের তৃষ্ণার্ত অবস্থায় দোযখের দিকে তাড়িয়ে নিবো।” (মরইয়াম : ৮৬ ) 
অর্থাৎ পাপীদেরকে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পায়ে হাঁটিয়ে নেওয়া হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন “হে লোকসকল ! কোথায় দৌড়ােচ্ছ— থাম, থাম; এইতো আগামীকল্যই তোমাদেরকে হাশরের ময়দানে একত্রিত করা হবে। চতুর্দিক থেকে তোমরা দলে দলে উপস্থিত হতে থাকবে এবং আল্লাহ্র সম্মুখে একা একা দন্ডায়মান হবে। জীবনের প্রতিটি কথা ও কাজ সম্পর্কে তোমাদেরকে অক্ষরে অক্ষরে জিজ্ঞাসা করা হবে। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদেরকে সম্মান ও মর্যাদা সহকারে জামাআত বন্দী অবস্থায় পরম করুণাময়ের মহান দরবারে পৌঁছিয়ে দেওয়া হবে। আর পাপীদেরকে পায়ে হাঁটিয়ে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় কঠিন আযাবের সোপর্দ করা হবে ; দলে দলে তারা দোযখে প্রবেশ করবে। ওহে ভাইয়েরা আমার ! তোমাদের সামনে এমন একদিন রয়েছে, যে দিনটির পরিমাণ তোমাদের গণনা অনুযায়ী পঞ্চাশ হাজার বছর দীর্ঘ হবে। সে দিনটি হবে প্রকম্পনকারী সিঙ্গা - ফুঁকের দিন। মহা বিভীষিকাময় ক্বিয়ামতের দিন। বিশ্বজগতের রব্বের সন্মুখে দণ্ডায়মান হওয়ার দিন। লজ্জা, অনুতাপ, অনুশোচনা ও হায় আপসুস করার দিন । চুলচেরা ও পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে হিসাব-নিকাশের দিন। দুঃখ-দৈন্য অভাব-অনটন ও ঘাট্‌তি-কমৃতির দিন। চিৎকার, আহাজারি ও আর্তনাদের দিন। হক ও সত্য প্রকাশিত হওয়ার দিন। উত্থান ও পুনর্জীবিত হওয়ার দিন। আপন কৃতকর্ম স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করার দিন। লাভ-লোকসান চূড়ান্ত হওয়ার দিন। চেহারা কালো কিংবা সাদা হওয়ার দিন। ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন কাজে না আসার দিন তবে হাঁ, যারা পবিত্র আত্মা নিয়ে উপস্থিত হবে। অনাচারীদের উযর-আপত্তি কোন কাজে না আসার উপর তাদের উপর অভিশাপ ও খারাবী বর্ষিত হওয়ার দিন।”

হযরত মুক্বাতিল ইব্‌নে সুলাইমান (রহঃ) বলেন, ক্বিয়ামতের দিন সমগ্র মখ্লূক একশত বছর নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকবে ; কোনই কথা বলবে না। একশত বছর গভীর অন্ধকারে বিপন্ন ও দিশাহারা হয়ে থাকবে। আর একশত বছর উত্তাল তরঙ্গের ন্যায় পরস্পর উলট-পালট খেতে থাকবে আর স্বীয় রব্বের নিকট কাতর মোকদ্দমা নিবেদন করতে থাকবে। পক্ষান্তরে, পঞ্চাশ হাজার বছর বিলম্বিত দিনটি নিষ্ঠাবান মুমিনের উপর একটি হালকা ফরয নামাযের ন্যায় স্বল্প সময়ে অতিবাহিত হয়ে যাবে। হুযূর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন

“(হাশরের দিন) বান্দাকে চারটি প্রশ্ন না করা পর্যন্ত তার পদদ্বয় আপন জায়গা থেকে নড়বে না
(১) তার জীবন কি কাজে ব্যয় করেছে ? 
(২) তার শরীরকে কি বিষয়ে সে জীর্ণ করেছে ? 
(৩) যে বিদ্যা সে অর্জন করেছে, সেই অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছে ? 
(৪) ধন-দৌলত কোথা হতে উপার্জন করেছে এবং তা কিভাবে ব্যয় করেছে?” 

হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) ইরশাদ করেছেনঃ “প্রত্যেক নবীকে একটি মকবূল দো'আর অধিকার দেওয়া হয়েছে। সকল নবী তা দুনিয়াতেই গ্রহণ করে নিয়েছেন। কিন্তু আমি তা আখেরাতে আমার উম্মতের শাফা'আতের জন্য সংরক্ষিত রেখেছি।” 

আয় আল্লাহ ! আমাদেরকেও তোমার প্রিয় হাবীবের শাফা'আত নসীব করুন। আমীন ॥

——————-

#মুকাশাফাতুল_কুলুব

#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

হযরত সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব (রঃ) এর উদব

 


হযরত সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব (রঃ) এর বয়স যখন চৌরাশি বছরে পৌঁছে, তখন তাঁর একটি চক্ষু নষ্ট হয়ে যায় এবং অপর চক্ষু থেকেও পানি ঝরতে থাকে । তখনও তিনি বলতেন : আমি নারীদের চেয়ে অধিক অন্য কিছুকে ভয় করি না। 

আবদুল্লাহ ইবনে আবী ওদায়া বলেন : আমি তাঁর কাছে গিয়ে বসতাম। কয়েক দিন যাইনি। এরপর একদিন গেলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ কয়দিন কোথায় ছিলে? আমি বললাম : আমার স্ত্রী মারা গিয়েছিল। তাই হাযির হতে পারিনি। তিনি বললেন : তুমি আমাকে খবর দিলে না কেন? এরপর আমি প্রস্থানোদ্যত হলে তিনি বললেন : খুব তো চলে যাচ্ছ; কিন্তু জিজ্ঞেস করি, পরে বিয়ে শাদী করলে কি না? আমি আরজ করলাম : হুযুর, আমি গরীব মানুষ। আমাকে কে কন্যা দান করবে। তিনি বললেন : আমি দিচ্ছি। আমি সবিস্ময়ে বললাম : আপনি ! তিনি বললেন : হাঁ। অতঃপর খোতবা পাঠ করে সামান্য মোহরানার বিনিময়ে আপন কন্যার বিবাহ আমার সাথে সম্পন্ন করে দিলেন। আমি আহ্লাদে আটখানা হয়ে সেখান থেকে চলে এলাম এবং কারও কাছ থেকে কিছু কর্জ নেয়ার কথা ভাবছিলাম। ইতিমধ্যে মাগরিবের সময় হয়ে গেল। আমি নামায পড়ে গৃহে ফিরে এলাম। বাতি জ্বালিয়ে রুটি ও তেল নিয়ে ইফতার করতে বসলাম। এমন সময় দরজা থেকে করাঘাতের শব্দ কানে ভেসে এল। আমি জিজ্ঞেস করলাম : কে? জওয়াব এল : সায়ীদ। আমি ভাবনায় পড়ে গেলাম, কোন্ সায়ীদ হতে পারে! সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব হবেন, তা কল্পনায়ও ছিল না। কারণ, তিনি চল্লিশ বছর ধরে মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়া সম্পূর্ণ মওকুফ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু দরজা খুলেই দেখি, সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব দণ্ডায়মান। আমি ধারণা করলাম, বোধ হয় কোন সাংঘাতিক প্রয়োজনে আমার কাছে এসেছেন । আমি আরজ করলাম : আমাকে ডেকে নিলেন না কেন? তিনি বললেন : তোমার কাছে আসাই সমীচীন মনে হল। আমি বললাম : আদেশ করুন। তিনি বললেন : তুমি বিবাহ করেছ। এখন একাকী শয়ন করবে- এটা আমার কাছে ভাল মনে হয়নি। তাই তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছে পৌঁছে দিতে এসেছি। আমি ভাল করে দেখতেই দেখি, বাস্তবে সেই ভাগ্যবতী কন্যা সলজ্জ ভঙ্গিতে তাঁর পেছনেই দণ্ডায়মান রয়েছে। তিনি তার হাত ধরে ভিতরে ঠেলে দিয়ে দরজা বন্ধ করে চলে গেলেন । এদিকে কন্যাটি লজ্জা শরমের আতিশয্যে মাটিতে পড়ে গেল। আমি দরজা খুব ভাল করে বন্ধ করে দিলাম। অতঃপর যে পেয়ালায় রুটি ও তেল রাখা ছিল, তা বাতির কাছ থেকে সরিয়ে দিলাম, যাতে স্ত্রীর দৃষ্টিগোচর না হয়। এরপর গৃহের ছাদে উঠে প্রতিবেশীদেরকে ডাক দিলাম। সকলেই একত্রিত হয়ে জিজ্ঞেস করল : ব্যাপার কি? আমি বললাম : সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব আজ দিনের বেলায় তাঁর কন্যার বিবাহ আমার সাথে সম্পন্ন করেছেন। এখন রাতের বেলায় অপ্রত্যাশিতভাবে তিনি তাঁর কন্যাকে এখানে রেখে গেছেন। লোকেরা সবিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল : সায়ীদ তোমাকে বিবাহ করিয়েছেন? আমি বললাম : হাঁ। তারা বলল : তাঁর কন্যা এখন তোমার গৃহে? আমি বললাম : হাঁ। অতঃপর তারা সকলেই তার কাছে গেল। আমার মা সংবাদ পেয়ে এলেন এবং বললেন : তিন দিন পর্যন্ত তুই বউ মাকে স্পর্শ করতে পারবি না। যদি করিস কখনও তোর মুখ দেখব না। এই তিন দিনে আমরা তাকে ঠিক করে নেব। মায়ের আদেশমত আমি তিন দিন আলাদা রইলাম। এরপর যখন তাকে দেখলাম, তখন পরমাসুন্দরী, কালামুল্লাহর হাফেয, সুন্নতের আলেম এবং স্বামীর হক সম্পর্কে বেশ ওয়াকিফহাল পেলাম। একমাস পর্যন্ত সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব আমার গৃহে এলেন না এবং আমিও তাঁর কাছে গেলাম না। একমাস পর যখন গেলাম, তখন তিনি ভক্তদের বৃত্তের মধ্যে উপবিষ্ট ছিলেন। আমি সালাম করলে তিনি শুধু জওয়াব দিলেন এবং কিছু বললেন না। ভক্তদের প্রস্থানের পর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন : তোমার স্ত্রীর অবস্থা কি? আমি বললাম : খুব ভাল। তিনি বললেন : মর্জির খেলাফ কোন কিছু পেলে লাঠি দিয়ে খবর নেবে। আমি গৃহে চলে এলাম। এরপর তিনি বিশ হাজার দেরহাম আমার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। এ ছিল সেই কন্যা, যাকে খলীফা আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান তার খেলাফত কালে আপন পুত্রবধূরূপে গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব অস্বীকৃত হন। এরপর খলীফা মিথ্যা অভিযোগে তাঁকে একশ' বেত্রদণ্ডে দণ্ডিত করেন এবং কনকনে শীতের মধ্যে এক কলসী ঠাণ্ডা পানি তাঁর গায়ে ঢেলে দেন। এছাড়া কম্বলের কোর্তাও পরিধান করান। এসব কারণে কন্যাকে রাতেই স্বামী গৃহে বিদায় দেয়া পূর্ণ ধার্মিকতা ও সাবধানতার পরিচায়ক ছিল। (আল্লাহ তাঁকে উত্তম প্রতিদান দিন।)

#এহইয়া_উলুমিদ্দিন

#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

মকতুবাত আলফেসানী (রহঃ) নং - 276

 মকতুবাত আলফেসানী (রহঃ) নং - 276

--------------------
মিয়া শায়েখ বদিউদ্দিনের নিকট লিখিতেছেন । কোরআন শরীফের 'মোহ্কাম' ও 'মোতাশাবেহ্' আয়াতসমূহের এবং ওলামায়ে রাছেখীনগণের বিষয়ে ইহাতে বর্ণনা হইবে ।
যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহতায়ালার জন্য এবং ছাইয়্যেদুল মোরছালিন (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি ও তাহার পবিত্র আল ও আছহাবগণের প্রতি দরূদ ও ছালাম বর্ষিত হউক । আল্লাহপাক আমাদিগকে ও আপনাদিগকে 'রাছেখ' বা সুদৃঢ় এলমধারীগণের অন্তর্ভুক্ত করুন । (আমীন)
হে ভ্রাতঃ- আল্লাহপাক স্বীয় কালাম মজিদকে দুই ভাগে বিভক্ত করিয়াছেন । প্রথম ভাগ- 'মোহকামাত' বা সুদৃঢ় । দ্বিতীয় ভাগ— ‘মোতাশাবেহাত' বা সংশয়াবিষ্ট । প্রথম প্রকার- শরীয়তের হুকুম আহকাম সমূহের উৎপত্তি স্থল । দ্বিতীয় প্রকার- প্রকৃত তথ্য ও গূঢ় রহস্য সমূহের এলমের আকর । আল্লাহতায়ালার হস্ত, বদন, পদ, জঙ্, অঙ্গুলী, নখ ইত্যাদির কথা - যাহা কোরআন ও হাদীছ শরীফে আসিয়াছে, তাহা সমুদয় মোতাশাবেহাতের (সংশয়াবিষ্ট বাক্যের) অন্তর্ভুক্ত, এবং কোরআন শরীফে ছুরার প্রারম্ভের পৃথক ‘বর্ণ' সমূহ যাহা নাজেল হইয়াছে, তাহাও মোতাশাবেহাতের অন্তর্গত । ইহাদের তাবিল বা অর্থের প্রতি ওলামায়ে রাছেখীন ব্যতীত কাহাকেও অবগতি প্রদান করেন নাই । আপনি ইহা ধারণা করিবেন না যে, কুদরৎ বা ক্ষমতাকে 'হস্ত' বলা, কিংবা আল্লাহতায়ালার জাত অর্থাৎ স্বয়ং তাহার ব্যক্তিত্বকে 'বদন' বলা ইত্যাদিকে তাবিল করা বলা হয় । ইহার ‘তাবিল' অতি গূঢ় রহস্যময়, যাহা বিশেষ বিশিষ্ট ব্যক্তিগণের প্রতি প্রকাশ করা হইয়া থাকে । কোরআন শরীফের ‘হরুফে মোকাত্ত্বয়াআৎ'- খণ্ডিত বর্ণ সমূহের বিষয় কি আর লিখিব প্রত্যেকটি অক্ষর যে, প্রেমিক ও প্রিয়ার গুপ্ত রহস্যের তরঙ্গময় এক একটি মহাসাগর, এবং উভয়ের সূক্ষ্ম বিষয়সমূহের অতীব গোপনীয় ইঙ্গিত । 'মুহকামাত' বা দৃঢ় আন্নাতসমূহ কোরআন শরীফের মাতৃতুল্য বটে; কিন্তু উহার উদ্দেশ্য বা ফল মোতাশাবেহাত আয়াতসমূহ । বস্তুতঃ কেতাবের বা কোরআন পাকের ইহাই মকছুদ । 'মাতা' - 'ফল' লাভের অবলম্বন ব্যতীত অধিক কিছু নহে । অতএব ‘মোতাশাবেহাত আয়াতসমূহ কেতাবের সারাংশ এবং ‘মোহকামাত' উহার খোলস তুল্য । 'মোতাশাবেহাতই'– ইশারা ইঙ্গিত দ্বারা মূল বস্তুর বর্ণনা করে; এবং উহার প্রকৃত তথ্যের নিদর্শন প্রদান করে । মোহকামাত আয়াতসমূহ ইহার বিপরীত । মোতাশাবেহাতসমূহ হকীকত বা প্রকৃত তথ্য স্বরুপ এবং 'মোকামাত' উহার তুলনায় উক্ত হকীকতের আকৃতি তুল্য । “আলেমে রাছেখ” বা সুদৃঢ় এলমধারী ঐ ব্যক্তি, যিনি সারাংশ ও খোলস উভয় একত্রিত করিতে সক্ষম হন এবং আকৃতির মধ্যে হকীকত বা তথ্য আনয়ন করিতে পারেন । খোলসধারী আলেমবর্গ খোলস লইয়াই সন্তুষ্ট, এবং 'মোহকামাত' - কে-ই তাহারা যথেষ্ট জানেন, ওলামায়ে রাছেখীন মোকামাত সমূহের এলম অর্জন করতঃ মোতাশাবেহাতের তাবিল বা মূল অর্থের পূর্ণ অংশ লাভ করেন এবং ছুরত (আকৃতি) ও হকীকত (তত্ত্ব) অর্থাৎ মোহকামাত ও মোতাশাবেহকে একত্রিত করিয়া থাকেন । কিন্তু যে ব্যক্তি মোহ্কামাতের এলম অর্জন ও উক্ত রূপ আমল না করিয়া মোতাশাবেহাত সমূহের তাবিল করিতে চেষ্টা করে বা আকৃতি পরিত্যাগ করতঃ তত্ত্বের প্রতি ধাবিত হয়, সে ব্যক্তি এতই মূর্খ যে স্বীয় মূঢ়তার জ্ঞান তাহার তিরোহিত এবং সে পথভ্রষ্ট; এমনই পথভ্রষ্ট যে- স্বীয় ভ্রষ্টতা অনুভূতি রহিত; সে অবগত নহে যে, ইহজগত ছুরত ও হকীকত বা আকৃতি ও তত্ত্ব সম্মিলিত জগত । যতদিন ইহজগতের অস্তিত্ব বর্তমান আছে, ততদিন কোন হকীকত- ছুরত হইতে পৃথক হইবে না । আল্লাহপাক ফরমাইয়াছেন, “এবং যে পর্যন্ত একীন বা দৃঢ় বিশ্বাস না আসে, সে পর্যন্ত এবাদত করিতে থাক” । তদ্বীরকারীগণ একীনের অর্থ 'মৃত্যু' বলিয়া নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন এবং মৃত্যু পর্যন্তই এবাদতের শেষ । যেহেতু উহাই ইহজগতের অন্ত । কেননা যাহার মৃত্যু হইল তাহার কেয়ামত সংঘটিত হইল । পরকালে প্রকৃত তত্ত্ব সমূহের বিকাশ হইবে, অতএব তথায় ছুরত- হকীকত হইতে পৃথক হইবে । প্রত্যেক জগতের প্রকৃতি ও নিয়ম পৃথক । গণ্ড মুর্খ কিংবা ধৰ্ম্ম ভ্রষ্ট- যাহার উদ্দেশ্য ধৰ্ম্ম বিনষ্ট করা, সে ব্যতীত অন্য কেহই ইহাদের পরস্পরের বিপর্যয় ঘটাইবে না । কেননা শরীয়তের আদেশ প্রারম্ভকারীর প্রতি যাহা-- শেষ পৰ্য্যায় উপনীত ব্যক্তির প্রতিও তাহাই; এ বিষয় সাধারণ মোমেনগণ এবং আরেফগণের বিশিষ্টের বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ সমতুল্য । অপক্ক সূফীগণ ও বে-দীন- ভ্রষ্ট দিগের উদ্দেশ্য যে, কোন প্রকারে তাহারা শরীয়তের সীমারেখা হইতে মস্তক বহিষ্কার করে এবং শরীয়তের হুকুম সমূহ সাধারণের প্রতি বর্তায় ! তাহারা ধারণা করে যে, শুধুমাত্র বিশিষ্ট ব্যক্তিগণই আল্লাহর মারেফত লাভের দায়িত্ব সম্পন্ন; যেরূপ অজ্ঞতা বশতঃ তাহারা আমীর ও বাদশাহগণকে শুধু এনছাফ ও বিচারের দায়িত্ব প্রাপ্ত বলিয়া জানেন । তাহারা বলেন যে, শরীয়ত প্রতিপালনের উদ্দেশ্য মারেফত বা আল্লাহর পরিচয় লাভ করা । অতএব যখন আল্লাহর পরিচয় লাভ সঙ্ঘটিত হয়, তখন শরীয়তের হুকুম তাহার উপর হইতে চলিয়া যায় । তাহারা এই আয়াত শরীফকে ইহার প্রমাণ স্বরূপ পেশ করেন, যে "এবং তোমার প্রতিপালকের এবাদত কর, যে পর্যন্ত 'একীন' লাভ না হয়” । একীনের অর্থ- 'আল্লাহ' । যেরূপ ছাহা তোস্তারী বলিয়াছেন, অর্থাৎ 'আল্লাহতায়ালার মারেফত লাভ হওয়া পর্যন্তই এবাদতের শেষ ।' বাহ্যতঃ যাহারা একীনকে, আল্লাহ বলিয়াছেন, তাহার অর্থ এবাদতের মধ্যে কষ্টের শেষ; আল্লাহতায়ালার মারেফত লাভ হওয়া পর্যন্ত, এবাদতের শেষ অর্থ নহে, যেহেতু ইহা বে-দীনী ও ভ্রষ্টতায় উপনীত করে । তাহারা আরও ধারণা করে যে, আরেফ বা কামেল ব্যক্তিগণ রেয়াকারী বা লোক দেখানোর জন্য এবাদত করিয়া থাকেন । যাহাতে প্রারম্ভকারী ও অনুগামীগণ তাহাদের অনুসরণ করেন; ইহা নহে যে— তাহারা এবাদতের মুখাপেক্ষী । ইহার প্রমাণ স্বরূপ মাশায়েখগণের উক্তি বর্ণনা করেন যে, তাহারা বলিয়া থাকেন যে “যে পর্যন্ত পীর মোনাফেক ও রেয়াকার হইবে না, সে পর্যন্ত মুরীদ তাহা হইতে উপকৃত হইবে না” । আল্লাহপাক ইহাদিগকে অপদস্থ করুক, ইহারা কি বিস্ময়কর জাহেল ও অদ্ভুত অজ্ঞ । আরেফ ব্যক্তিগণ এবাদতের যেরূপ মুখাপেক্ষী, প্রারম্ভকারীগণ তাহার এক-দশমাংশও মুখাপেক্ষী নহে । যেহেতু তাহাদের উন্নতি এবাদত ও শরীয়তের হুকুম প্রতিপালনের প্রতি নির্ভরশীল । সৰ্ব্ব সাধারণ এবাদতের ফল যাহা ভবিষ্যতে অর্থাৎ রোজকেয়ামতে আশা করেন, আরেফগণের তাহা এখনই লব্ধ । সুতরাং তাহারা এবাদত করার অধিক হকদার ও শরীয়ত প্রতিপালনের অধিক মুখাপেক্ষী ।
জানা আবশ্যক যে, শরীয়ত- ‘ছুরত-হকীকতের সমষ্টি । জাহেরী শরীয়তকে 'ছুরত’ বা আকৃতি বলা হয় এবং বাতেনী শরীয়তকে ‘হকীকত' বা প্রকৃত তত্ত্ব বলা হইয়া থাকে । সুতরাং খোলস ও সারবস্তু উভয়ই শরীয়তের অংশ এবং মোহকাম ও মোতাশাবেহ উভয় উহারই ভাগ বা খণ্ড । জাহেরী আলেমগণ উহার খোলস লইয়াই যথেষ্ট হইয়াছেন এবং ওলামায়ে রাছেখীনগণ উক্ত খোলসের সহিত সারবস্তুকে একত্রিত করতঃ আকৃতি ও সারবস্তু উভয়ের পূর্ণ অংশ লাভ করিয়াছেন । শরীয়তকে আকৃতি ও সারবস্তু সম্মিলিত একটি মানব রূপে ধারণা করিতে হইবে ।
একদল লোক উহার আকৃতির প্রতি আকৃষ্ট এবং হকীকত বা প্রকৃত তত্ত্বকে অস্বীকার করে । তাহারা হেদায়া, বজী ইত্যাদি কেতাবকেই স্বীয় অগ্রগামী পীর স্বরূপ ধারণ করে, ইহারাই খোলসধারী আলেম । দ্বিতীয় দল উহার হকীকতের সহিত আকৃষ্ট । কিন্তু উক্ত হকীকতকে শরীয়তের প্রকৃত তত্ত্ব বলিয়া মনে করেন না; বরঞ্চ শরীয়তকে 'ছুরত' বা আকৃতির প্রতিই সীমাবদ্ধ ও শুধু খোলস বলিয়া জানেন । সারবস্তু অন্যত্র ধারণা করেন । কিন্তু ইহা সত্ত্বেও শরীয়ত প্রতিপালনের চুলমাত্র ব্যতিক্রম করেন না অর্থাৎ আকৃতিকেও পরিত্যাগ করেন না । বরং শরীয়তের কোন হুকুম পরিত্যাগকারীকে পথভ্রষ্ট বলিয়া ধারণা করেন । ইহারাও আল্লাহতায়ালার ‘অলী' এবং তাঁহারা মহব্বতের জন্য আল্লাহ ব্যতীত অন্য বস্তুর মহব্বত হইতে কর্তিত ।
অপর আর একদল শরীয়তকে ছুরত এবং হকীকতের সমষ্টি বলিয়া জানেন ও খোলস এবং সারবস্তু সম্মিলিত বলিয়া দৃঢ় বিশ্বাস রাখেন । ইহাদের নিকট শরীয়তের হকীকত বা তত্ত্ব লাভ ব্যতীত ছুরতে শরীয়ত বা শরীয়তের আকৃতি লাভ করা কোনই ধর্তব্য নহে, এবং ছুরত ব্যতীত হকীকত লাভ করা অপূর্ণ । অবশ্য হকীকত ব্যতীত যে ছুরত লাভ হয়, তাহা এছলামের গণ্ডিভুক্ত এবং নাজাত প্রদানকারী মনে করেন । জাহেরী আলেম ও সাধারণ মোমেনগণের উক্তরূপ অবস্থা হইয়া থাকে । পক্ষান্তরে ছুরত ব্যতীত হকীকত লাভ করা অসম্ভব বস্তুসমূহের অন্তর্ভুক্ত বলিয়া জানেন, এবং যে ব্যক্তি এরূপ বলে তাহাকে পথভ্রষ্ট, জিন্দীক আখ্যা প্রদান করেন ।
ফলকথা, ইহাদের (তৃতীয় দলের) নিকট জাহেরী, বাতেনী, পূর্ণতা সমূহ শরীয়তের পূর্ণতা সমূহের মধ্যেই সন্নিবিষ্ট, এবং আল্লাহ্ সম্বন্ধীয় মারেফত সমূহ আহলে ছুন্নত জামাতের মতানুযায়ী যেরূপ আকিদা-বিশ্বাস রাখা প্রমাণিত হইয়াছে, তদ্রুপ বিশ্বাস রাখার প্রতি নির্ভরশীল ।
এলমে কালাম বা বিশ্বাস শাস্ত্রের একটি মাছআলা (বিষয়) যে, আল্লাহতায়ালা রকম-প্রকার বিহীন; ইহার সহিত উহুদ মোশাহাদা বা আত্মীক দর্শনের সহস্র মাছআলাকে তাহারা সমতুল্য জানেন না । যে আত্মীক অবস্থা ও প্রতিবিম্ব ও শরীয়তের কোন একটি হুকুমের বিপরীত প্রকাশ পায়, তাহাকে অর্ধ-যব আবির্ভাব সমূহ তুল্য মূল্য প্রদানেও ক্রয় করেন না; বরং উক্ত আবির্ভাবকে এস্তেদরাজ বা ছলনামূলক বলিয়া গণ্য করেন । ইহারাই ঐ সকল ব্যক্তি যাহাদিগকে আল্লাহ্তায়ালা হেদায়েত করিয়াছেন ।

অতএব তোমরা ইহাদের হেদায়েতের পথে অনুসরণ কর; ইহারাই ওলামায়ে রাছেখ, ইহাদিগকে আল্লাহতায়ালা প্রকৃত তত্ত্বের অবগতি প্রদান করিয়াছেন; শরীয়তের আদব-সম্মান রক্ষা করার বরকতে আল্লাহপাক ইহাদিগকে হকীকতে শরীয়ত বা শরীয়তের প্রকৃত তত্ত্বে উপনীত করিয়াছেন । দ্বিতীয় সম্প্রদায় ইহার বিপরীত, তাহারা যদিও হকীকতের প্রতি মনোযোগী ও আকৃষ্ট এবং শরীয়তের হুকুম আহকাম পালনে চুল পরিমাণ ব্যতিক্রম করেন না, কিন্তু তাঁহারা হকীকত-কে শরীয়তের বাহিরে বলিয়া জানেন, এবং শরীয়ত-কে উহার খোলস তুল্য মনে করেন । অতএব তাহারা বাধ্য হইয়া উক্ত হকীকতের প্রতিবিম্বের কোন এক প্রতিবিম্বের মধ্যে থাকিয়া যান এবং উক্ত হকীকতের মূল তত্ত্বে উপনীত হইবার পথ প্রাপ্ত হন না; সুতরাং ইহাদের বেলায়েত প্রতিবিম্বজাত ও ইহাদের নৈকট্য ছেফাত বা গুণ সদ্ভূত । ওলামায়ে রাছেখীনগণের বেলায়েত ইহার বিপরীত; উহা অতি সত্য ও দৃঢ় এবং মূল বস্তুর প্রতি পথ প্রাপ্ত । উহা প্রতিবিম্বের ব্যবধানসমূহ পূর্ণরূপে অতিক্রম করিয়াছে । কাজেই ইহাদের বেলায়েত অবিকল পয়গাম্বর (আঃ)-গণের বেলায়েত, এবং পূৰ্ব্ব বর্ণিত অলীগণের বেলায়েত, পয়গাম্বর (আঃ)-গণের বেলায়েতের প্রতিবিম্ব । দীর্ঘদিন পর্যন্ত এ ফকীরের ‘মোতাশাবেহ আয়াত সমূহের তাবিল (ভাব-অর্থ) আল্লাহতায়ালার এলমের প্রতি ন্যস্ত করিয়াছিল এবং ওলামায়ে রাছেখীনগণের জন্য ইহার প্রতি ঈমান আনয়ন ব্যতীত অন্য কিছুই প্রাপ্ত হইত না । সূফী আলেমগণ যে তাবিলসমূহ বর্ণনা করিয়া থাকেন, তাহা উক্ত মোতাশাবেহাতের উপযোগী বলিয়া জানিত না এবং যে রহস্য সমূহ গুপ্ত রাখার উপযোগী, উহা যে তাহা, ইহা ধারণা করিত না । যেরূপ আয়নুল কোজাত উহার তাবিলে বলিয়াছেন যে, ‘আলিফ, লাম, মিম’-এর তাবিল ‘আলম' । আলম শব্দের অর্থ 'কষ্ট', যাহা প্রেম-ভালবাসার জন্য অনিবাৰ্য; ইত্যাদি । অবশেষে যখন আল্লাহ ছোবহানাহু ওয়া তায়ালা স্বীয় অনুগ্রহে মোতাশাবেহাতের তাবিল এ ফকীরের প্রতি প্রকাশ করিয়া দিলেন এবং উক্ত প্রশান্ত মহাসাগর হইতে এই মিছকিনের যোগ্যতার ক্ষেত্রভূমিতে যেন একটি নহর প্রবাহিত করিয়াদিলেন, তখন জানিলাম যে, ওলামায়ে রাছেীনগণ উক্ত মোতাশাবেহাতের তাবিলের পূর্ণ অংশধারী । যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহতায়ালার জন্য, যিনি আমাদিগকে ইহার প্রতি হেদায়েত করিয়াছেন । আল্লাহ্পাক হেদায়েত না করিলে আমরা হেদায়েত প্রাপ্ত হইতাম না, নিশ্চয় আমাদের প্রতিপালকের রসুল (আলাইহিস্সলাম)-গণ সত্য লইয়াই আগমন করিয়ায়াছেন । স্বপ্নের তাবির যাহা তলব করিয়াছেন, তাহা সাক্ষাতের অপেক্ষায় রাখিলাম । উক্ত বিষয় কিছু লিখিলাম না । কি করি ? অন্য মারেফতের দিকে কলম চলিল, এবং অন্য এক বিষয়ের সম্মুখীন হইতে হইল, ক্ষমা করিবেন । আপনাদের ও যাহারা হেদায়েতের অনুগামী ও হজরত মোস্তফা (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর দৃঢ় অনুসরণকারী তাহাদের প্রতি ছালাম । হজরত নবীয়ে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এবং তাঁহার বংশধর ও তাহার ভ্রাতৃবৃন্দের (পয়গাম্বর (আঃ)-গণের প্রতি উচ্চ দরূদ ও শ্রেষ্ঠ ছালাম বর্ষিত হউক ।

শামস তাবরিজি রহঃ

 

শামস তাবরিজি রহঃ

শামস তাবরিজি রহঃ প্রকৃত না শামস আল দিন মোহাম্মাদ। শামস তাবরিজি ছিলেন একজন ইরানি সুফি সাধক। ইসলামের অন্তনির্হিত রুপ এবং ইসলামের অন্তর্গত আধ্যাত্মিকতা নিয়ে যে ধারায় আলোচনা করা হয়ে থাকে, তাই সুফিবাদ। সুফিবাদ হলো এমন একটি ধারা যেখানে মানুষের আত্মা স্বর্গীয় সত্ত্বার সাথে মিলনে ব্যাকুল, পাগল এবং আত্মহারা হয়ে থাকে। তিনি ১১৮৫ সালে ইরানের প্রসিদ্ধ শহর, যা বর্তমানে পূর্ব আজারবাইজানের রাজধানী, তাবরিজে জন্ম গ্রহন করেন। তা ছাড়াও তিনি জালালউদ্দিন রুমির অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। জানা যায়, তিনি প্রখ্যাত সুফিসাধক জালালউদ্দিন রুমিকে চল্লিশ দিন শিক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি মানুষকে সপ্নের ব্যাখ্যা দিতেন। যার কারনেই তাকে সুফি উপাধিতে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাঁর পিতার নাম ছিলো ইমাম আলা আলদিন, তিনি ছিলেন একজন ইমাম।

তখনকার সময়ে তাবরেজ শহরের খ্যাতি ছিল এ জন্য যে সে সময়ে ইমাম গাজ্জালী, নাজিম উদ্দিন কোবরা সহ অসখ্য সুফি সাধকগণ সেখানে তাদের জীবনের অনেক সময় অবস্থান করেছিলেন । সেখানেই শামসের শৈশব কাটে । এবং সেখানেই তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় । শামস ছিলেন শাফি মাজহাবের অনুসারী।

তিনি সবসময় চটের ছালা পড়ে পাগল বেশে আল্লাহর প্রেমে মত্ত হয়ে ঘুরে বেড়াতেন যাতে লোকে তাকে চিনতে না পারে।

রুমির সাথে যখন শামসেত তাবরিজির পরিচয় হয় তখন তাবরিজির বয়স ষাটের কোঠায়। তাবরিজি একধরনের সমাজ-বিরোধী এবং জেদি মানুষ ছিলেন। তবে বিস্ময়করভাবে তাবরিজি ছিলেন খুবই শক্তিশালী এক আধ্যাত্মিক পুরুষ। তাঁকে লোকে ‘পাখি’ বলে ডাকতেন। তাঁকে নিয়ে মানুষের ছিল বিপুল কৌতূহল। রহস্যঘেরা ছিল তাবরিজির জীবন। এর বড় কারণ, তিনি এক জায়গায় বেশিক্ষণ থাকতেন না। খুব দ্রুত জায়গা বদল করে অন্যত্র চলে যেতেন। তবে তাবরিজি সবসময় একজন প্রভাবশালী সাগরেদ খুঁজতেন। ভাবতেন তাঁর একজন যোগ্য উত্তরসূরি প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত রুমির মধ্যেই সেই গুণ খুঁজে পেলেন তাবরিজি।

যখন রুমির একুশ বছর, তাবরিজি তখন তাঁর শিষ্য হওয়ার ব্যাপারে প্রাথমিকভাবে জানান। পরে ভেবে দেখলেন, বয়সটা মোটেও তাঁর সাগরেদ হওয়ার জন্য উপযুক্ত নয়। তিনি আরো ষোল বছর অপেক্ষা করলেন।

তাবরিজির সাথে যে নিবিড় এবং গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে তা-ই রুমিকে তাঁর পূর্ণ শিষ্য হওয়ার ব্যাপারে ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করে। একসময় রুমি তাঁর জন্মভূমিতে গুরুকে নিয়ে আসেন। এরপর এক নতুন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাঁদের।

তাবরিজি ভূমিহীন দরিদ্র ছিলেন। তার ওপর ছিলেন মারাত্মকভাবে সমাজ-বিরোধী। এতটাই মেজাজি ছিলেন যে, শিশুদের কাছে তাবরিজি রীতিমতো আতঙ্ক ছিল। এতকিছুর পরও বেশ স্ববিরোধীভাবে গড়ে ওঠা তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিক শক্তিমত্তা ছিল অসাধারণ। কিন্তু তাঁর কাছে রুমি কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল এটি এক বড় প্রশ্ন! এই প্রশ্নের জবাব সবাই জানেনা এবং সবাই বুজবেওনা। কারণ সবাই তো সেই জ্ঞানের পেয়ালায় চুমুক দিতে পারেনি।

প্রথমত, রুমির ব্যক্তিত্ব ছিল সাংঘাতিকরকম আকর্ষণীয়। ধীরে ধীরে তাবরিজির কাছে রুমির ব্যক্তিত্ব একটি বড়সড় ইস্যু হয়ে ওঠে। অপরদিকে তাবরিজির গতিবিধি, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, শ্রেণিগত অবস্থান, ধর্মকর্ম কোনোকিছুই চলমান সমাজের জন্য অনুকূল ছিল না। এমনকি একপর্যায়ে তাবরিজিকে তাঁর ধর্মকর্মের জন্য হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। তাবরিজিকে বলে দেওয়া হয়, এই শহর ছেড়ে চলে যেতে হবে, না হয় হত্যা করা হবে। সবমিলিয়ে তাবরিজিকে নিজের এলাকায় এনে ভয়াবহ ঝুঁকির মুখোমুখি হন রুমি। তবে গভীর সংকটে পড়ে তাবরিজিকে কোনিয়ায় ফিরে যেতে হয়।

সমাজের প্রথাগত সংস্কৃতির ভয়ে দমে যাননি রুমি। কিছুটা কৌশলের আশ্রয় নিতে হয় তাঁকে। তাই সমাজের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে স্বর্ণকারের সাথে যে কৌশল নিয়েছিলেন, একই পন্থা অনুসরণ করলেন রুমি তাবরিজির ব্যাপারেও। সামাজিক সীমাবদ্ধতার তুলনায় রুমি তাঁর শক্তির ব্যাপারে পুরোপুরি সচতেন ছিলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন, তাবরিজিকে তাঁর পরিবারে তাঁর সমাজে যে করেই হোক স্থান দেবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী রুমি তাঁর খুবই কাছের সেময়ে কিমিয়াকে শামস তাবরিজির সাথে বিয়ে দেন।

কিমিয়ার তখন পনেরো বছর বয়স। কথিত আছে, কিমিয়ার সাথে বিয়ে হওয়ার পর জীবনে প্রথম তাবরিজি কারো প্রেমে পড়েন। তাবরিজি আরো বেশি বিস্মিত মুগ্ধ হয়ে পড়ে রুমির প্রতি। শিষ্য বানাতে গিয়ে পরিস্থিতিতে পড়ে শিষ্যের কন্যাকে বিয়ের ঘটনা তাঁর জীবনে এক স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে যায়। বিয়ের মাত্র কয়েক মাস পর কিমিয়া হঠাত্ অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। স্ত্রী বিয়োগের বিষয়টি গভীর আঘাত হানে তাবরিজির জীবনে। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে রুমি-তাবরিজির সম্পর্কের প্রায় সমাপ্তি ঘটে।

কথিত আছে, কিমিয়ার চলে যাওয়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাবরিজি অদৃশ্য হয়ে যান। যেন বনের পাখি বনেই ফিরে গেল। কিন্তু তাবরিজি আদৌ রহস্যময় হয়ে গেলেন, হারিয়ে গেলেন নাকি কোনো পক্ষ তাঁকে গুপ্ত-হত্যার মাধ্যমে দুনিয়া থেকে চিরতরে অদৃশ্য করে ফেলে। এমন গুঞ্জন বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল তখন। পরবর্তীকালে এ নিয়ে অসংখ্য গবেষণা হয়।

তাবরিজির এভাবে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়া নিয়ে বহু গল্প থাকলেও, অনেকে এর বাস্তব কারণ তলিয়ে দেখাটাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।


মৃত্যু – ১২৪৮ খৈয়, ইরান


কছিদায়ে গাউছিয়া শরীফ

 #কছিদায়ে গাউছিয়া শরীফ

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
(#রসুল_সঃ_এর_সুন্নত_ই_আদর্শ)
#_কছিদায়ে_গাউছিয়া

আচ্ছালাম আয় নুরে চশমে আম্বীয়া,
আচ্ছালাম আয় বাদশাহে আউলিয়া ।
( প্রত্যেক ছন্দের পর পরবেন )
***********************
(১) ছকানিল হুববু কা'ছাতিল বেছালী,
ফকুলতো লেখামরাতী নাহবী তা আলী ।

(২) ছা' আত্.ওয়া মাশাত লে নাহভী ফিকুউছিন,
ফাহিমুতু বে ছুকরাতী বাইনাল মাওয়ালী ।

(৩) ফাকুল্.তু লেছায়েরীল আকতাবে লুন্নু,
বেহালী ওয়াদখুলু আনতুম রেজালী ।

(৪) ওয়া হান্নু ওয়াশরাবু আনতুম জুনুদী,
ফাছাকীল্ কাওমে বিলি্ ওয়াফি মালালী ।

(৫) শারিবতুম ফুদলাতী মিম্ বা'দে ছুকরী,
ওয়ালা নিলতুম উলুব্বী ওয়াত্তেছালী ।

(৬) মকামুকু-মুল উলা জামআউ ওয়ালাকিন্,
মকামী ফউকাকুম মাজা'লা আ-লী ।

(৭) আনা ফি হজরতিত্ তকরীবে ওয়াহদী ।
ইউছারারেফুনি ওয়া হাছবী জুল জালালী ।

(৮) আনাল বা-জিউ অশ্ হাবু কুল্লে শায়খিন্,
ওয়া মান্ জা - ফির রেজালে উতা মেছালী ।

(৯) কাছানী খিল আতান বেতারাজে আজমিন,
ওয়া তাওয়াজানী বেতীজানিল কামালী ।

(১০) ওয়া আতলা'আনী আলা ছির -রিন কদি - মিন,
ওয়া কাল্লাদানী ওয়া আ'তানী ছুয়ালী ।

(১১) ওয়া ওয়াল্লা-নী আলাল্ আক্ তাবে জানি আন,
ফা হুকমী নাফেজুন ফি কুল্লি হালী ।

(১২) ওয়া লাও আল্ কাইতু ছিররি ফি বিহারিন,
লা ছারাল কুল্লু গাওরান ফি জাওয়ালী ।

(১৩) ওয়া লাও আল্-কাইতু ছিররি ফি জিবালিন,
লা দুক্-কাত ওয়াখ্ তাফাত্ বাইনার রিমালী।

(১৪) ওয়ালাউ আল্-ক্বাইতু ছিররি ফাওক্বা নারিন,
লা খামাদাত্ ওয়ান্-তাফাত্ মিন ছিররি হালী ।

(১৫) ওয়ালাও আল্-কা্বাইতু ছিররি ফাওক্বা মাইতিন,
লা-ক্বামা বিকুদরাতিল্ মাওলা ত্বাআ'লি ।

(১৬) ওয়ামা মিন্ হা শুহুরুন্ আও দুহুরুন,
তামুর্ রু ওয়া তান্ ক্বাদী ইল্লা আতালী।

(১৭) ওয়া তুখ্ বিরুনী বিমা ইয়া'তী ইয়াজ্ রী,
ওয়া তু'লিমুনী ফা আক্ ছির্ আন জিদালী।

(১৮) মুরিদী হীম্ওয়া তীব্ওয়াস্ তাহ্ ওয়া গান্নী,
ওয়া ইফ্আল মা তাশাউ ফাল্ ইছ্মু আলী।
(১৯) মুরিদী লাতাখাফ্ আল্লাহু রাব্বী,
আতানী রিফআতান নিল্ তুল্ মানালী।

(২০) মুরিদী লা তাকাফ্ ওয়াশিন্ ফা ইন্নী,
আযুমুন্ ক্বাতিলুন ইন্ দাল্ ক্বিতালী।

(২১) তুবুলী ফিচ্ছামায়ি ওয়াল আরদি দুক্কাত্,
ওয়া শাউছুচ্ ছাআদাতি ক্বাদ্ বাদালী।

(২২) বিলাদুল্লাহি মুল্ কী তাহ্তা হুকুমী,
ওয়া ওয়াক্তি ক্বাব্ লা ক্বাবলী ক্বাদ্ ছাফা-লী ।

(২৩) নাজারতু ইলা বিলাদিল্লাহি জাম্আন্ ,
কাখার্ দালাতিন্ আলা হুক্ মিত্তিছালী।

(২৪) ওয়া কুল্লু অলিয়্যিন আলা ক্বাদমিন্ ওয়া ইন্নি।
আলা ক্বাদমিন্ নাবী বাদ্ রিল কামালী ।

(২৫) মুরীদী লা তাখাপ ওয়াশিন্ ফাইন্নি
আজুমুন্ কাতেলুন এনদাল কেতালী।

(২৬) দারাছ্তুল ইল্ মা হাত্তা ছিরতু কুতুবান ,
ওয়া নিল্ তুছ্ ছা'দা মিম্ মাওলাল্ মাওয়ালী।

(২৭) ফামান্ ফি আউলিয়া ইল্লাহি মিছ্লী ,
ওয়া মান্ ফিল্ ইল্ মি ওয়াত্ তাছ্ রীফি হালী।

(২৮) কাজা ইবনুর রিফায়ী কানা মিন্নী,
ফা ইয়াছ্লুকু ফি ত্বরিক্বী ওয়াশ্ তিগালী ।

(২৯) রিজালুন্ ফি হাওয়াজিরিহিম্ ছিয়ামুন্ ,
ওয়া ফি জুলামিল লায়ালী কাল্ লাআলী ।

(৩০) আনাল হাছানী ওয়াল মাখদা মাক্বামী,
ওয়া আক্বদামী আলা উনুক্বির রিজালী ।

(৩১) ওয়া আব্দুল ক্বাদিরিল্ মাশ্ হুর ইছ্ মি,
ওয়া জাদ্দী ছাহিবুল আইনিল কামালী।

(৩২) নবী উন হাশেমী মক্কি হেজাজি
হুয়া জদ্দি বিহি নিল তুল মাওয়ালী।

(৩৩) ওয়া ছাল্লু কুলুকুম এয়া আইয়্যুয়ান নাছ,
আলল্ মখছুছে মিন খাইরির রেজালী।

(৩৪) আনাল জিলী মুহিউদ্দীন ইছ্ মী ,
ওয়া আ'লামী আ'লা রা'ছিল জিবালী ।

(৩৫) তাকাব্বলনী ওয়ালাতারদুদ ছু আলী,
অগিসনী ছৈয়্যেদী উন্ জুর বেহালী

(৩৬) ফাহাল্লিল এয়া এলাহী কুল্লা ছায়াবিন,
বেহক্কিল মুস্তফা বদরিল কামালী।

মারহাবা এয়া গাউছে আযম মারহাবা,
মারহাবা এয়া কুতুবে আলম মারহাবা।

----------------------------

__