সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য (মাজালিসে গাযযালী- ৫)



📚মাজালিসে গাযযালী ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
5 পঞ্চম মজলিস 

সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য

তৃতীয় রবিউল আউয়াল, বুধবার। হযরত পীর ও মুরশিদ (ইমাম গাজ্জালী রহঃ) জামে মসজিদে বহু লোকের সমাবেশে উপবিষ্ট ছিলেন। এই জনতার মধ্য হইতে এক ব্যক্তি দাঁড়াইয়া বলিলেন, আমার ইচ্ছা আমি হুযুরের দাসদের একজন হিসাবে পরিগণিত হই। কয়েকবার তিনি এই কথা বলার পর পীর ও মুরশিদ তাহাকে বায়আত করিলেন। অতঃপর সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য সম্বন্ধে কথাবার্তা আরম্ভ হইল। এক বন্ধু জিজ্ঞাসা করিলেন, প্রত্যেক লোকের জন্যই কি সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য লিখিত হইয়াছে।


মাখদুম জাঁহা উত্তর দিলেন, প্রত্যেক ব্যক্তির সৌভাগ্য তাহার মায়ের গর্ভে থাকাকালীন অবস্থায় নির্ধারিত করা হইয়াছে। যতক্ষণ পর্যন্ত সেই সৌভাগ্য তাহার পক্ষে না বর্তায় ততক্ষণ পর্যন্ত সে শান্তি পায় না। যাহার ভাগ্যে দুর্ভাগ্য লিখিত রহিয়াছে তাহা মায়ের উদরে থাকা অবস্থায়ই লিখিত হইয়াছে। এই হতভাগ্যের দুর্ভাগ্য আলেমদের এলম এবং চিকিৎসকদের চিকিৎসায় কখনও দূর হইতে পারে না।


হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন : মায়ের উদরে থাকাকালীন যাহাকে ভাগ্যবান করা হইয়াছে সে-ই ভাগ্যবান। পক্ষান্তরে মায়ের উদরে যাহাকে দুর্ভাগা লেখা হইয়াছে সে-ই দুর্ভাগা।


আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা সৌভাগ্যশালী এবং যাহাকে ইচ্ছা দুর্ভাগা করিয়া রাখিয়াছেন। যেমন, আল্লাহ তাআলা এরশাদ করিয়াছেন, “আমি তোমাদের কিসমত তোমাদের মধ্যে বণ্টন করিয়া রাখিয়াছি।"


যে পরিমাণ নেকী যেব্যক্তির জন্য নির্ধারণ করা হইয়াছে উহা তাহার দ্বারা কার্যকরী হয় এবং উহা করার জন্য সে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকে। তাহার প্রতিটি কাজ ও কথায় নেকী প্রকাশ পায়; সমস্ত অন্যায়-অত্যাচার তাহার নিকট হইতে দূর হইয়া যায়। সে তাহার সৌভাগ্যের প্রতিদান দিতে থাকে। অর্থাৎ পুণ্যের কাজে আত্মনিয়োগ করে।

তারপর বলিলেন, আবার এমনও দেখা গিয়াছে যে, বহু লোক নিজেকে পাপী এবং দুর্ভাগ্য বলিয়া মনে করে। ইহা জানা সত্ত্বেও দৃঢ়তার সাথে ভাল হওয়ার জন্য উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়া যায় যেন সে তাহার লক্ষ্যস্থলে পৌঁছিতে পারে। অর্থাৎ, সে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হওয়ার মানসে কোন কামেল পীরের নিকট আত্মসমর্পণ করে। ইহার প্রতি ইঙ্গিত করিয়াই বলা হইয়াছে :


অক্ষম পিঁপড়া কাবায় পৌঁছার চিন্তায় বিভোর। পরিশেষে সে কবুতরের পায়ে জড়াইয়া পড়িল। ফলে সে উহার লক্ষ্যস্থল কাবায় গিয়া পৌছিল।


অতঃপর বলিলেন, আল্লাহ তাআলা অনাদিকালেই বান্দার এই সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য নির্ধারণ করিয়া রাখিয়াছেন। আর ইহাও কেহ দৃঢ়তার সাথে বলিতে পারে না, কে নেকবখত আর কে বদবখত। তবে পুণ্যের কাজ করা, সৎ পথে চলা নেকবখতার এবং শরীয়তের বিরোধিতা করা, পাপে আত্মনিয়োগ করা বদবখতীর লক্ষণ


তারপর বলিলেন, এমন বহু লোক আছে, পবিত্র মক্কা শরীফে বসবাস করা সত্ত্বেও কোন দিন তাহারা কাবার যিয়ারত করে নাই বা কোন বৎসর হজ্জও করে নাই। কারণ, এই পবিত্র কাজ করা তাহাদের ভাগ্যে লিখিত নাই। তাই তাহারা এই কাজ করার চিন্তাও করে না। ইহারা কাবার মান-মর্যাদা কি অবগত হইতে পারে? হে কাবা ! তুমি আমার নিকটবর্তী ! অথচ আমি তোমার প্রতি উদাসীন। সত্য বলিতে কি, এই জাতীয় মক্কাবাসী কাবার মর্যাদা কি বুঝিবে?


দুনিয়ায় বহু লোক অধিক আগ্রহের সাথে কাবার যিয়ারত করার জন্য রওয়ানা হন। এই সমস্ত আগ্রহী লোকদের মধ্যে কেহ কেহ মক্কা শরীফে পৌঁছিয়া কাবার দর্শন লাভ করত ধন্য হন। আবার কেহ বা পথিমধ্যেই ইনতেকাল করেন। যাহারা পথিমধ্যে ইনতেকাল করেন, প্রতি বৎসর তাহাদের নামে একটি করিয়া কবুল হজ্জ লিখিত হইয়া থাকে।


হে কাবার অধিপতি ! আমাকেও ঐ সমস্ত লোকের মত পথিক মনে করিয়া গ্রহণ করার যোগ্যতা দান করুন। আমি হজ্জ করি নাই বটে, কিন্তু ঐ পথে চলিয়াছি।


অতঃপর বলিলেন, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর যুগে মদীনা শরীফে চারিশত মোনাফেক ছিল। সাহাবায়ে কেরাম অনেক কাজ সুসম্পন্ন করিতেই তাহাদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হইতেন। এই কারণে তাঁহারা দুঃখিত এবং মনঃক্ষুণ্ণ থাকিতেন।


দ্বীনে মুহাম্মদী প্রচার করার মানসে যখনই সাহাবাগণ কাফেরদের সাথে জিহাদ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেন, তখনই এই সমস্ত মোনাফেক গোপনে কাফেরদিগকে সংবাদ পরিবেশন করিত। সাহাবায়ে কেরাম যখন এই অবস্থা বুঝিতে পারিলেন, তখন পশ্চিম দিকে যুদ্ধ করার হইলে পূর্ব দিকে রওয়ানা হইতেন। দুই তিন মনযিল পূর্ব দিকে চলার পর আবার গন্তব্যস্থল পশ্চিম দিকে রওয়ানা হইতেন। সাহাবায়ে কেরামের এই অবস্থা দেখিয়া মোনাফেকরা হতভম্ব হইয়া যাইত এবং যথার্থ খবর পরিবেশন করিতে সক্ষম হইত না।


বাদশাহের জন্য এরূপ জঙ্গী চাল সুন্নত। সাহাবায়ে কেরাম যে কাজ করার মনস্থ করিতেন, মোনাফেকরা সেই কাজের ক্ষতি সাধন করার জন্য উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়া যাইত। সাহাবায়ে কেরামের কাজ এই কারণেই কাফেরদের নিকট আর গোপন থাকিত না। অথচ এই মোনাফেকরা প্রকাশ্যে জামাআতের সাথে নামায পড়িত, রমযানের রোযা রাখিত আর প্রত্যেকেই বলিত; আমি একজন মুসলমান। পবিত্র কোরআন ইহাদের সম্বন্ধে বলে : মোমেনদের সাথে সাক্ষাত হইলে তাহারা বলে আমরাও মোমেন। আর যখন শয়তানের নেতার সাথে মিলিত হয়, তখন বলে, আমরা তো মুসলমানদের সাথে ঠাট্টা করি।


কোরআনে ইহাদের সম্বন্ধে কঠোর আযাবের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে। আল্লাহ তাআলা বলেন :

“নিশ্চয় মোনাফেক সম্প্রদায় অগ্নির শেষ স্তরে থাকিবে।”


আর এক বন্ধু জিজ্ঞাসা করিলেন, মানুষের মধ্যে যেমন নেকবখত ও বদবখত আছে, তেমনি মাটিও বদবখত ও নেকবখত হয় নাকি?

হযরত পীর ও মুরশিদ বলিলেন, মাটিও নেকবখত এবং বদবখত হয়। যে মাটি উর্বর, সে মাটির গাছ প্রচুর পরিমাণে ফসল দেয়, যে মাটি প্রচুর পরিমাণে ফলস দেয় সেই মাটি নেকবখত। আর যে মাটি অনুর্বর, ফসল দেয় না, উহা বদবখত। নেকবখত ও বদবখত সমস্ত সৃষ্টির মধ্যেই আছে।

মোটকথা, আল্লাহ যাহাকে নেকবখত বা ভাগ্যবান করিয়াছেন সে শয়তানের ফাঁদে পড়িয়া কখনও দুর্ভাগা হইতে পারে না। আর যাহাকে আল্লাহ দুর্ভাগা করিয়াছেন সে দুনিয়ায় ওলীদের চেষ্টায়ও ভাগ্যবান হইতে পারে না।

-------------

সুলুক এবং আহলে সুলুক (মাজালিসে গাযযালী- ৪)



📚মাজালিসে গাযযালী ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
4  চতুর্থ মাজালিস

সুলুক এবং আহলে সুলুক-

ঊনত্রিশে সফর, রবিবার। উপস্থিত মুরীদ ও ভক্তদের উদ্দেশে হুজ্জাতুল ইসলাম পীরে কামেল হযরত ইমাম গায্যালী (রহঃ) এরশাদ করিলেন, যাহারা আপাদমস্তক মহব্বতে ডুবিয়া থাকেন তাহারাই সালেক। এমন কোন মুহূর্ত খালি যায় না যেই মুহূর্তে মহব্বতের জগত হইতে তাহাদের উপর প্রেমের বারিধারা বর্ধিত না হয়। আর যাহার উপর আলমে আসরার (রহস্যজগত) হইতে প্রতিক্ষণে হাজার অবস্থার সৃষ্টি হয় আর তিনি মত্ততার জগতে এমনভাবে বিভোর থাকেন যে, তাঁহার বুকের উপর যদি আঠার হাজার আলম চাপাইয়া দেওয়া হয় তবুও তিনি উহার খবর রাখেন না; এমন ব্যক্তিকেই আরেফ বলা হয়।


অতঃপর বলিলেন, আমি একবার সমরকন্দে এমন একজন বুযুর্গকে দেখি যিনি বিস্ময়ের জগতে ডুবিয়া রহিয়াছেন। আমি লোকের নিকট জিজ্ঞাসা করিলাম, কত বৎসর যাবত তিনি এই অবস্থায় আছেন? তাহারা বলিল, বিশ বৎসর যাবত আমরা তাঁহাকে একই অবস্থায় দেখিতেছি। যাহা হউক, আমি বেশ কিছুদিন তাঁহার নিকট রহিলাম। এক সময় আমি তাঁহাকে আলমে ছোহওতে অর্থাৎ হুশের অবস্থায় পাইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, কতদিন যাবত আপনি এই অবস্থায় আছেন? কেহ আপনার নিকট আসা যাওয়া করিলে আপনি অবগত হইতে পারেন কিনা ?


তিনি বলিলেন, ওহে নাদান ! দরবেশ যখন প্রেম জগতে নিমজ্জিত থাকেন এবং তাহার উপর রহস্যের জোতি প্রকাশ পাইতে থাকে তখন তাহার কোন কিছুর খবরই থাকে না। এই অবস্থায় যদি তাহাকে টুকরা টুকরা করিয়াও ফেলা হয় তবু তিনি কিছুই বুঝিতে পারেন না।


দরবেশগণ ! এই পথ তো জীবনবাজি লাগানোর পথ। যে এই পথে পা রাখিয়াছে সে জীবন লইয়া ফিরিতে পারে নাই। হযরত ইয়াহ্ইয়া (আঃ)-এর গলায় যখন শত্রুগণ ছুরি চালাইতে আরম্ভ করে, তখন তিনি ফরিয়াদ করার মনস্থ করেন প্রত্যাদেশ আসিল 

“ইয়াহ্ইয়া ! তুমি যদি একটুও আহ উহ কর তবে আমার বন্ধুদের তালিকা হইতে তোমার নাম কাটিয়া দেওয়া হইবে।” তেমনি যখন হযরত যাকারিয়া (আঃ)-এর মাথায় করাত চলা আরম্ভ করিল, তখন তিনি ফরিয়াদ করিতে মনস্থ করেন। এনন সময় হযরত জিবরাঈল (আঃ) আগমন করিয়া বলিলেন, আল্লাহ বলিয়াছেন, “এই সময় যদি তোমার মুখ হইতে দুঃখ-যাতনাসূচক কোন একটি শব্দও বাহির হয়, তবে পয়গম্বরদের দপ্তর হইতে তোমার নাম খারিজ করিয়া দেওয়া হইবে।”


অতঃপর তিনি অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলিলেন, যে কেহ মহব্বতের দাবী করত বালা-মসিবতে পড়িয়া আল্লাহর দরবারে সহনশক্তি দাবী করে, সে সত্যিকারের প্রেমিক নহে। বরং সে তাহার দাবীতে মিথ্যাবাদী।


বন্ধুর পক্ষ হইতে যতই বিপদাপদই আসুক না কেন, তাহাতে যে ধৈর্যধারণ করে এবং বারংবার শুকরিয়া আদায় করে সে-ই যথার্থ বন্ধু। বন্ধুর দাবীতে সে সত্যবাদী এবং সাথে সাথে এই কথাও বলে যে, এই বাহানায় তিনি আমাকে স্মরণ করিয়াছেন। হযরত রাবেয়া বসরীর উপর যেদিন কোন বিপদাপদ হইত সেদিন তিনি আনন্দ গদগদ কণ্ঠে বলিতেন আজ আমার মাহবুব এই দুর্বলাকে স্মরণ করিয়াছেন। আর যেদিন তিনি বিপদমুক্ত থাকিতেন সেদিন খুব কাঁদিতেন আর বলিতেন, আজ আমি এমন কি অন্যায় করিলাম যেজন্য আমার বন্ধু আমাকে স্মরণ করেন নাই।


বন্ধুগণ ! সলুকুপন্থী হইল ঐ ব্যক্তি যে প্রেম-মহব্বতের দাবী করে, আর যে প্রেমিক হওয়ার দাবী করে এবং বন্ধুর দেওয়া দুঃখ-কষ্ট আনন্দের সাথে গ্রহণ না করে, সে আহলে মারেফাতের নিকট মিথ্যাবাদী।

অতঃপর ময়দানে গায়েব অর্থাৎ অদৃশ্যলোকের কথা উঠিলে পীর ও মুরশিদ এরশাদ করিলেন, যেব্যক্তি পূর্ণতার স্তরে পৌঁছিয়া অকপট অবস্থায় দীর্ঘ দিন সেখানে আছেন তাহাকে অদৃশ্য হইতে আহ্বান করা হয়। ওসমান নামক আমার এক বন্ধু এবং পীর ভাই ছিলেন। তিনি যখন আধ্যাত্মিকতার চরম শিখরে পৌঁছেন তখন এক অদৃশ্য লোক তাঁহার সাথে সাক্ষাত করিয়াছিলেন। একদিন তিনি তাঁহার বন্ধু-বান্ধবের সমাবেশে বসা ছিলেন। আমিও সেখানে ছিলাম। আমরা সকলে শুনিতে পাইলাম কে যেন বলিলেন, হে শায়খ ওসমান। এদিকে আস। আওয়ায় পাওয়ার সাথে সাথে তিনি উঠিয়া দাঁড়াইলেন এবং যেদিক হইতে আওয়ায আসিতেছিল সেদিকে রওয়ানা হইলেন। মুহূর্তের মধ্যে তিনি আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে চলিয়া গেলেন। ইহার পর আমরা তাঁহার আর কোন সন্ধান পাই নাই।


একবার আমি এবং আমার এক বন্ধু কাবার তাওয়াফ করিতেছিলাম। শায়খ ওসমান নামক একজন বুযুর্গের সন্ধান পাইয়া আমরা তাঁহার পিছনে পিছনে চলিলাম। তিনি যেদিকে যাইতেছিলেন আমরাও সেদিকে যাইতেছিলাম। তিনি আমাদের উদ্দেশ্য বুঝিতে পারিলেন এবং আমাদের দিকে ফিরিয়া বলিলেন, আমার পিছনে পিছনে আসিলে কি হইবে ? বরং আমি যাহা কিছু করি তোমরাও তাহা কর । আমরা জিজ্ঞাসা করিলাম, হযরত আপনি কি করেন ? 

তিনি বলিলেন, আমি প্রত্যেক দিন হাজার বার কোরআন খতম করি।

আমাদের মনে খটকা লাগিল যে, ইহা কিভাবে সম্ভব হইতে পারে। তিনি আমাদের মনের অবস্থা বুঝিতে পারিয়া মাথা উঁচু করিয়া বলিলেন, হাঁ, অক্ষরে অক্ষরে তেলাওয়াত করিয়াই হাজার বার কোরআন খতম করি। আমরা বুঝিতে পারিলাম, যাহা মানুষের বোধগম্যের বাহিরে তাহাই কারামত। হাজার বার কোরআন খতম করা এই বুযুর্গের খাস কারামত ছিল।


অতঃপর মজলিসের আদব সম্বন্ধে আলোচনা আরম্ভ হওয়ায় এরশাদ করিলেন, মজলিসের যেখানে স্থান পাইবে সেখানেই বসিবে এবং উহাই তোমার বসার স্থান। একবার হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবায়ে কেরাম দ্বারা পরিবেষ্টিত হইয়া বসা ছিলেন। এমন সময় সেখানে তিন ব্যক্তি উপস্থিত হইলেন। একজন সেই মজলিসে স্থান পাইয়া বসিলেন। দ্বিতীয়জন স্থান না পাইয়া পিছনে বসিলেন। তৃতীয়জন স্থান না পাইয়া চলিয়া গেলেন। এক মুহূর্ত অতিবাহিত না হইতেই হযরত জিবরাঈল (আঃ) আগমন করিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আল্লাহ তাআলা এরশাদ করিয়াছেন, যেব্যক্তি আসিয়া বৃত্তের মধ্যে স্থান পাইয়া বসিয়াছে আমি তাহাকে আমার আশ্রয়ে স্থান দিয়াছি। আর যে স্থান না পাইয়া লজ্জার সাথে বৃত্তের বাহিরে বসিয়াছে আমিও তাহার নিকট লজ্জিত। পরকালে তাহার কোন অসুবিধা হইবে না। আর যেব্যক্তি স্থান না পাইয়া মুখ ফিরাইয়া চলিয়া গেল, আমিও তাহার দিক হইতে রহমতের মুখ ফিরাইয়া লইলাম।

সুতরাং মজলিসে উপস্থিত হইয়া যেখানে স্থান পাইবে সেখানেই বসিবে । বৃত্তের মধ্যে স্থান না পাইলে পিছনে বসিবে। কেননা, উহাই অগন্তুকের বসার স্থান। সব সময় বৃত্তের মধ্যে বসার চেষ্টা করিবে না। 


হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে দিন-রাত কখন হয় কিছুই বলিতে পারি না। তোমার জন্য আল্লাহ আজ আমাকে এই বাস্তব জগতে ফিরাইয়া দিয়াছেন।

বন্ধু, তুমি ফিরিয়া যাও ! আল্লাহ এই কষ্টের প্রতিদান অবশ্যই তোমাকে দান করিবেন। স্মরণ রাখিও, তুমি যখন এই পথে পা রাখিয়াছ, তখন পৃথিবী ও পার্থিব বস্তুর প্রতি কখনও আকৃষ্ট হইও না, লোক সংস্রব পরিহার করিয়া চলিও। তুমি যাহা কিছু উপার্জন করিবে বা উপঢৌকন হিসাবে পাইবে, উহা কখনও সঞ্চয় করিয়া রাখিবে না; দান করিয়া দিবে। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন কিছুর প্রতি আকৃষ্ট হইলে কষ্ট পাইবে। এই কথা বলিয়াই তিনি আবার বিস্ময়ের জগতে ডুবিয়া গেলেন ।

-----------

ইলম ও আমল (মাজালিসে গাযযালী - ৩)



📚মাজালিসে গাযযালী ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
৩ - তৃতীয় মজলিস 

ইলম ও আমল
আটাশে সফর শনিবার। দরবার শরীফে ইলম ও আমল সম্বন্ধে আলাপ-আলোচনা হইতেছিল
হযরত পীর ও মুরশিদ (ইমাম গাজ্জালী রহঃ) বলিলেন, কেহ যদি ইলম সম্বন্ধীয় প্রশ্ন করে তবে পশ্নকারীর অবস্থ। এবং হাল-হাকীকত অনুযায়ী উত্তর দিতে হয়।


এই প্রসঙ্গে তিনি বলিলেন, এক ব্যক্তি খুব মূল্যবান পোশাক পরিধান করিয়া এক বুযুর্গের দরবারে উপস্থিত হইল এবং প্রশ্ন করিল, বৈরাগ্য কি? 
এই ব্যক্তি ধন সম্পত্তির প্রতি প্রবল আসক্ত ছিল। বুযুর্গ তাহার ধর্মীয় উপকারিতার প্রতি লক্ষ্য করিয়া উত্তর দিলেন, ধন-সম্পদের মায়া পরিত্যাগ করাকেই যোহদ বা বৈরাগ্য বলা হয়।
উত্তরদানকারীর কর্তব্য প্রশ্নকারীর অবস্থা ও বুঝ-ব্যবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া উত্তর দেওয়া, যাহাতে প্রশ্নকারী সহজে বুঝিয়া উপকৃত হইতে পারে। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করিয়াছেন, 
“উদ্দেশিত ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তার পরিমাপে কথা বল।”
এই প্রসঙ্গে কোন বুযুর্গ বলিয়াছেন, লোকের বুদ্ধিমত্তা অনুযায়ী কথা বলিবে যাহাতে তাহারা "আমার কথা বুঝিতে পারে।
কোন লোক কোন বুযুর্গের নিকট প্রশ্ন করিলে বুযুর্গ যদি স্বীয় বুদ্ধিমত্তা অনুযায়ী উত্তর দেন তবে প্রশ্নকারী তাহা দ্বারা কোন প্রকার উপকৃত হয় না। উত্তরদাতার কর্তব্য প্রশ্নকারীকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যে, তাহার কথার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন আছে কিনা? 
যদি উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলিয়া মনে হয় তবে তাহার বুঝশক্তি মোতাবেক উত্তর দিবে। আর যদি যদি মনে হয় যে, প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কোন প্রয়োজন নাই, তবে উত্তর দিবে না। বরং টালবাহানা করিয়া এড়াইয়া যাইবে। কারণ, তাহার প্রশ্ন অবান্তর : ধর্মের প্রতি তাহার কোন আসক্তি নাই। ধর্মের সন্ধান করা, যাহা তাহার পক্ষে ফরয, সে তাহা পরিত্যাগ করিয়াছে অযথা প্রশ্ন করিয়া সময় নষ্ট করিতে আসিয়াছে। বর্ণিত আছে, একবার এক গ্রাম্য আরব হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে উপস্থিত হইয়া বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আমাকে গুরুত্বপূর্ণ এলম শিখাইয়া দিন।
হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাহার দিকে তাকাইয়া বুঝিলেন, প্রশ্নকারী যে প্রশ্ন করিয়াছে সে তাহা বুঝে নাই। তাই তিনি তাহাকে এরশাদ করিলেন, মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও। 
অতঃপর পীর ও মুরশিদ বলিলেন এই যুগে এমন লোকও আছে যাহারা ফরয,ওয়াজিব, সুন্নত ও মুস্তাহাব আদায় করে না, কিন্তু ধুমধামের সাথে হজ্জ করিতে যায়। অথচ হজ্জ করা ফরয হওয়ার কোন শর্তই তাহাদের মধ্যে পাওয়া যায় না। আবার এমন বহু লোকও আছে যাহারা বাপ-মায়ের হুকুম ব্যতীতই বিদেশ ভ্রমণে বাহির হয় এবং অহংকারের সহিত বলে আমি এমন এমন বস্তু দেখিয়াছি, এতবার বিদেশ ভ্রমণ করিয়াছি, অমুক অমুক বুযুর্গের সাক্ষাত লাভ করিয়াছি অমুক বড় বড় খানকায় গিয়াছি। এই জাতীয় সমস্ত সফরই হারাম।
তারপর বলিলেন, সফর চারি প্রকার।
প্রথম প্রকার হজ্জের সফর। যদি হজ্জের জন্য আর্থিক সামর্থ্য এবং রাস্তা বিপদমুক্ত থাকে তবে হজ্জ করা ফরয হয়। যেমন- আল্লাহ তাআলা বলেন, যেব্যক্তি পথ খরচে সক্ষম তাহার পক্ষে আল্লাহর ঘরের হজ্জ করা ফযর। 
দ্বিতীয় সফর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর রওযা যিয়ারত করার মানসে মদীনা শরীফ গমন করা।
তৃতীয় সফর বায়তুল মোকাদ্দাস যিয়ারতের জন্য গমন করা। 
চতুর্থ সফর ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের জন্য বিদেশযাত্রা।
নিজের দেশে যদি ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের কোন প্রকার সুযোগ-সুবিধা না থাকে তবে অন্যত্র যাওয়া যায়। কেননা, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উপর ফরয।
আর এক হাদীসে বর্ণিত আছে, চীন দেশে গিয়া হইলেও এলম শিক্ষা কর। 
এক বন্ধু জিজ্ঞাসা করিলেন, কোন কোন বুযুর্গ জুমআর নামাযে উপস্থিত হন না, ইহার কারণ কি এবং ইহার রহস্য কোথায়?
তিনি উত্তরে বলিলেন, কোন কোন বুযুর্গ নির্জনতা অবলম্বন করিয়া এক বিশেষ অবস্থার মধ্যে থাকেন। নির্জনতায় থাকিয়া সেই বিশেষ অবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ করেন। জুমআর জামাআতে উপস্থিত না হওয়ায় তাঁহাদের আসলে কোন প্রকার ক্ষতি হয় না। ফলে তাঁহারা উপকার ও অপকারের প্রতি লক্ষ্য রাখেন। যে কাজে বেশী উপকার দেখেন তাহাই অবলম্বন করেন। মসজিদে যাওয়া-আসা করিলে বহু লোকের সাথে মেলামেশা করিতে হয়। ইহাতে তাঁহাদের সময়ের অপচয় হয়। উপকারের চেয়ে অপকারই বেশী হয়। তাই তাঁহারা মসজিদে যাওয়া-আসা পরিত্যাগ করেন।
কিন্তু যে সমস্ত অকর্মণ্য লোক এই বিশেষ অবস্থায় না পৌঁছিয়া ঐ অবস্থার দাবী করত জুমআ ও জামাআত পরিত্যাগ করে এবং কোন স্বার্থসিদ্ধির মানসে নির্জনতা অবলম্বন করিয়া নিজের মর্যাদা বুযুর্গদের মর্যাদার সমতুল্য করিতে চায়, তাহাদের মত দুর্ভাগা আর কে আছে ? তাহারা গোমরাহ-পথভ্রষ্ট।
আবার কোন কোন বুযুর্গ বয়সের আধিক্য এবং দুর্বলতার জন্যও জুমআ এবং জামাআতে যাইতে অক্ষম থাকেন। এই দুর্বলতা ও অক্ষমতা শরীয়তের দৃষ্টিতে মার্জনীয়। যদিও তাঁহারা ইশারায় অনেক কিছু করার ক্ষমতা রাখেন তথাপি তাঁহারা অক্ষম। এই জন্যই তাঁহারা মসজিদে উপস্থিত হন না।
আবার কোন কোন বুযুর্গ আল্লাহর ধ্যানে ডুবিয়া থাকেন। এই ডুবিয়া থাকাতে তাঁহারা অনেক উপকার মনে করেন। মসজিদে যাওয়া আসা এবং সেখানে লোকের সাথে মেলামেশা করিয়া সময় নষ্ট করা এই ডুবিয়া থাকার পক্ষে ক্ষতিকর মনে করেন। এই সমস্ত ধ্যানমগ্ন লোকদের উদ্দেশেই হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, আল্লাহর সাথে যাহার মধুর সম্পর্ক স্থাপিত হইয়াছে, লোকের সাথে মেলামেশা করিতে সে ভয় পায়।
কিন্তু প্রকৃত কথা হইল. যে আরেফ মসজিদে উপস্থিত থাকিয়া ফরয, ওয়াজিব ও সুন্নত আদায় করেন সেই আরেফকেই পরিপূর্ণ নিরাপদ বলিব। কারণ, তরীকতের উপর শরীয়ত মোতাবেক আমল করাই কর্তব্য এবং উভয়ের মধ্যে কোন প্রকার তারতম্য আসিতে না দেওয়াই উচিত।
তারপর তিনি এরশাদ করিলেন, বুযুর্গদের নীতি হইল, মতবিরোধযুক্ত মাসআলার যে দিকটা কঠিন সেই দিকটাই তাঁহারা অবলম্বন করেন এবং সেই মতেই নফসকে চলার নির্দেশ দেন। কারণ, ইহাতে নফসের কৃচ্ছ্র সাধন হয়।
প্রতিটি সাধারণ লোক যে তাঁহাদের অসাধারণ বাণীর অনুসরণ করে, তুমি মনে রাখিও, তাহাতে আসলে বহু দোষ আছে। কারণ, তাহার নফস তৃপ্তি ও সহজ পন্থার সন্ধানী এবং নফসের খুশীমত ঠিকভাবে এবাদত হয় না।
এক বন্ধু জিজ্ঞাসা করিলেন, যখন হইতে আমি এই হাদীস “দুই জামা বিশিষ্ট লোকের ঈমানে স্বাদ নাই" দেখিলাম, তখন হইতেই আমার মনে কেমন যেন খটকা লাগিয়া রহিয়াছে। এই হাদীসের অর্থ কি? পীর ও মুরশিদ বলিলেন, এই হাদীসের ব্যাখ্যা মতে দুই স্ত্রীওয়ালা লোক ঈমানের স্বাদ পায় না।
তারপর বলিলেন, অধিক বিবাহ করা উচিত নহে। কারণ, অধিক বিবাহের ফলে পুরুষ বিপদাপন্ন হয়। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, পরিবারের সংখ্যাধিক্য এবং সম্পদের অপ্রাচুর্য লোকের পক্ষে অবমাননাকর।
প্রকৃতপক্ষে দুই জামার অধিকারী শব্দটির আরও সুন্দর একটি অর্থ আছে। অর্থাৎ, যেব্যক্তি দুই জামার অধিকারী, তাহার চেয়ে এক জামার মালিক অধিক সংসারবিরাগী। আর যেব্যক্তি সংসারবিরাগী নহে সে ঈমানের স্বাধ কিভাবে পাইতে পারে?
যে বস্তু তোমাকে বন্ধু হইতে দূরে রাখে তাহা খারাপ। আর যে বস্তু তোমাকে বন্ধুর নৈকট্যলাভে সহায়তা করে তাহা খুবই ভাল। তাই এক বুযুর্গ কি সুন্দর বলিয়াছেন, তুমি দুনিয়াতেই দুনিয়ার আসক্তি ত্যাগ কর। এরূপ করিলেই তুমি আল্লাহর সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করিতে পারিবে। আমার ও আল্লাহর মধ্যে ইহাই অন্তরায় । ইহাই সত্য অনুধাবন করা। ইহাই সঠিক পথ।
---------------

সৃষ্টি রহস্য (মাজালিসে গাযযালী- ২)



📚মাজালিসে গাযযালী ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
২ - দ্বিতীয় মজলিস 
সৃষ্টি রহস্য-

সাতাশে সফর, শুক্রবার। আমি দরবার শরীফে উপস্থিত হইয়া আরয করিলাম, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, আল্লাহ তাঁহার সৃষ্টিকে অন্ধকারে সৃষ্টি করিয়া পরে স্বীয় নূর দ্বারা আলোকিত করেন। ইহার অর্থ বুঝিতে পারিলাম না।


হযরত পীর ও মুরশিদ বলিলেন, যাবতীয় কিছুর সৃষ্টি অন্ধকারে হইয়াছিল। পরে আল্লাহর নূরে সেইসব আলোকিত হয়; প্রত্যেকে স্বীয় ক্ষমতানুযায়ী সেই নূরের জ্যোতি গ্রহণ করিয়া আলোকোজ্জ্বল হয়। সৃষ্টিতে যে নূর আছে তাহা আল্লাহর নূর হইতে বিচ্ছিন্ন নহে। যেমন সূর্যোদয় হইলে রাতের অন্ধকার দূর হইয়া আলোকোজ্জ্বল দিন প্রকাশ পায়। কিন্তু এই আলো আংশিক ও খণ্ডিত নহে। এমনও নহে যে, অন্ধকার বাড়িয়া যায় অথবা অন্ধকার আলোময় হইয়া যায়, অথবা স্বয়ং সূর্যের আলোর ঘাটতি হয়। অন্ধকার এক বস্তু, আলো অন্য বস্তু; বরং একটি অন্যটির বিপরীত। আবার সূর্যোদয়ের পর চাঁদের আলো চলিয়া যায়। কোন কোন তারকা চন্দ্রের আলোর প্রভাবে স্তিমিত হইয়া পড়ে। ইহার পর বলিলেন, যেমন হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, পুণ্যশীলদের পুণ্য আল্লাহর নৈকট্য লাভকারীদের জন্য পাপস্বরূপ। পাপ এবং পুণ্য সম্পূর্ণরূপে বিপরীতধর্মী। তাই পুণ্য কিভাবে পাপে পরিণত হয় ?

উত্তর এই যে, পুণ্যবানদের পুণ্য নৈকট্য লাভকারীদের পাপ এই অর্থে যে, পুণ্যবানদের পুণ্য বড় এবং নৈকট্য লাভকারীদের পুণ্য উহার চেয়েও অধিক শ্রেষ্ঠ। নৈকট্য লাভকারীগণ যখন মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ, তখন তাহাদের পক্ষে তাহাদের মর্যাদার দিক হইতে সাইয়্যেআহকে পাপ বলা হইয়াছে। যদিও তাহাদের পদমর্যাদায় স্বয়ং হাসান অর্থাৎ সুন্দর। কিন্তু অধিক সুন্দরের দিক হইতে কম মর্যাদাসম্পন্ন। এদিকে ইঙ্গিত করিয়াই হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, পুণ্যবানদের পুণ্য নৈকট্য লাভকারীদের জন্য পাপস্বরূপ। আল্লাহ অধিক জ্ঞাত।


ইহার পর এরশাদ করিলেন, হযরত আদম (আঃ) এই ভুলই করিয়াছিলেন। কারণ, তিনি শ্রেষ্ঠ হইতেও শ্রেষ্ঠতর। সেই কাহিনী হইল, আল্লাহ তাআলা আদম (আঃ)-কে নির্দেশ দিলেন, হে আদম! তুমি এবং তোমার স্ত্রী জান্নাতে আরামে 'বসবাস কর এবং বেহেশতের নেয়ামত যাহা ইচ্ছা পানাহার কর। কিন্তু ঐ বৃক্ষের নিকট যাইও না। (যদি যাও) তবে উভয়ে নাফরমান বলিয়া পরিগণিত হইবে।

একমাত্র গম ব্যতীত বেহেশতের যাবতীয় কিছু হযরত আদম ও হাওয়া (আঃ)-এর জন্য আল্লাহ মোবাহ বা বৈধ করিয়া দিয়াছিলেন। হযরত আদম (আঃ) যখন বেহেশতে প্রবেশ করেন, তখন নিষিদ্ধ বৃক্ষটি তাঁহার যতটা ভাল মনে হইল, অন্য কোন নেয়ামতই ততটা পছন্দ হইল না। নিষিদ্ধ গাছের প্রতি দৃষ্টি পড়িতেই তাহা তাঁহার নিকট খুব ভাল মনে হইতে লাগিল।

হাদীস শরীফে আছে, মানব চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হইল, যে বস্তু হইতে মানুষকে বিরত থাকিতে বলা হয় উহার প্রতিই তাহার আসক্তি বেশী থাকে, উহার প্রতিই সে বেশী আকৃষ্ট হয়৷


হযরত আদম (আঃ) স্বীয় এজতেহাদ ও শয়তানের প্ররোচনায় পড়িয়া সেই নিষিদ্ধ বস্তুই ভক্ষণ করিলেন। যে গাছের ফল খাইতে নিষেধ করা হইয়াছিল । অবশ্য ঠিক ঐ গাছের ফল খান নাই। কারণ, বেহেশতে ঐ একই জাতীয় গাছ বহু প্রকারের ছিল

তিনি যখন ঐ গাছের ফল খাওয়ার মনস্থ করিলেন, তখন ভাবিলেন, আমাকে বিশেষ একটি গাছের ফল খাইতে নিষেধ করা হইয়াছে। কিন্তু ঐ জাতীয় অন্যান্য গাছের ফলও যে খাইতে পারিব না, এমন নির্দেশ তো দেওয়া হয় নাই। সুতরাং তিনি সেই ফল ভক্ষণ করিলেন।

তিনি যে এজতেহাদ বা গবেষণা করিলেন, ইহাই ভুল করিলেন। তাঁহার উচিত ছিল সতর্ক থাকা এবং জিবরাঈল (আঃ)-এর আসার অপেক্ষায় থাকা যে, তিনি এই সম্বন্ধে আল্লাহর কোন নির্দেশ আমাকে দেন কিনা ? তদুপরি ইহা খাওয়ার এমন কি প্রয়োজনই বা ছিল ? খাওয়ার মত বস্তুর কোন অভাবই তো বেহেশতে ছিল না। সুতরাং ওযর আপত্তি পেশ করার মত কোন কিছুই তাঁহার ছিল না।

যখন তিনি নিজের রায় মোতাবেক এবং শয়তানের প্ররোচনায় উহা ভক্ষণ করিলেন, তখন তাঁহার যে শ্রেষ্ঠ মর্যাদা ছিল উহা কমিয়া গেল। আদম (আঃ) আল্লাহর ইচ্ছা বুঝিতে অক্ষম হইল। শাস্তিস্বরূপ মাথার তাজ ও দেহের আবরণ খুলিয়া লওয়া সর্বসাধারণের জন্য শরীরের যে অংশ আবৃত্ত করিয়া রাখার নির্দেশ রহিয়াছে, হজরত আদম (আঃ) শরীরের সেই অংশ কখনও দেখেন নাই । তাঁহার নাভির নিচে এক প্রকার নূর ছিল । কখনও নাভির নিচে দৃষ্টিপাত করিলে সেই নূর নাভির নিম্নাংশ দেখায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিত। যখন সেই নূরানী পর্দা উঠাইয়া লওয়া হইল তখন তিনি দেহের নিম্নাংশ দেখিতে পাইলেন এবং লজ্জা ও ভয় পাইতে লাগিলেন যে, হয়ত ফেরেশতাগণ আমার এই অনাবৃত দেহাংশ দেখিয়া ফেলিবেন। তখন তিনি ভয় ও লজ্জায় বেহেশতময় দৌড়াদৌড়ি আরম্ভ করিলেন এবং লজ্জা ঢাকার জন্য এই গাছ সেই গাছের নিকট পাতা ভিক্ষা চাহিতে লাগিলেন। আল্লাহ তখন এরশাদ করিলেন, হে আদম! তুমি আমার দৃষ্টি হইতে পলায়ন ক্ষরিয়া ফিরিতেছ ? আদম (আঃ) আরয করিলেন, প্রভু ! কখনও না। বরং আমি কোন্ শরমে আপনাকে মুখ দেখাইব?

আল্লাহ নির্দেশ দিলেন, বেহেশত হইতে বাহির হইয়া যাও। তিনি যখন বেহেশত দ্বারে পৌঁছিলেন, তখন তাঁহার লজ্জা নিবারণ করার জন্য ফলের গাছ পাতা দান করিল। মোট কথা, হযরত আদম (আঃ)-কে সরন্দ্বীপ এবং হযরত হাওয়া (আঃ)-কে জেদ্দায় নামাইয়া দেওয়া হইল।


ইমাম যাহেদ (রঃ) বলেন, সরন্দ্বীপ এবং জেদ্দার মধ্যে দূরত্ব চৌদ্দ শত মাইল। অতঃপর এই দুনিয়াই হইল তাঁহাদের আবাসভূমি। আল্লাহ তাআলা বলেন, পৃথিবী তোমাদের বাসস্থান। এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমাদের জন্য পৃথিবীতে উপকার নিহিত রহিয়াছে। অতঃপর পৃথিবীর রীতিনীতি মোতাবেক কাজ আরম্ভ। 

পার্থিব রাজা-বাদশাহদের নিয়ম হইল, যখন কোন বাদশাহর কর্মচারী অন্যায় করে তখন তাহাকে সম্মুখ হইতে দূর করিয়া দিয়া বন্দী খানায় পাঠাইয়া দেন। তাই যখন হযরত আদম (আঃ) ভুল করিলেন, তখন আল্লাহ তাঁহাকে শাস্তি দেওয়ার মানসে কয়েদখানাস্বরূপ পৃথিবীতে পাঠাইয়া দিলেন।


এই পৃথিবী মো’মেনদের জন্য বন্দীশালা এবং কাফেরদের জন্য জান্নাত। এদিকে ইঙ্গিত করিয়াই কোন বুযুর্গ বলিয়াছেন-

দৈত্য-দানব ও শয়তানের জন্য এই পৃথিবী আবাসগৃহ। দোস্ত ও মোমেনদের জন্য বন্দীখানা। মোমেনদের জন্য পৃথিবীর এই সমস্ত বস্তু রাখিয়াছেন যাহাতে তাহারা দুনিয়ার প্রয়োজন মনে না করে। দুনিয়ার নেয়ামতকেও যেন অগ্রাহ্য করিয়া চলে। আল্লাহ যেন তোমাদিগকে এই সমস্ত চিন্তা-ভাবনা হইতে নিরাপদ রাখেন।

--------------

ওলীদের কাশফ ও কারামত (মাজালিসে গাযযালী- ১)



📚মাজালিসে গাযযালী ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
১ - প্রথম মজলিস

ওলীদের কাশফ ও কারামত– ১
ছাব্বিশে সফর, বৃহস্পতিবার। পবিত্র দরবারে বহু আলেম-ওলামা এবং আল্লাহর বিশিষ্ট বান্দাদের উপস্থিতিতে ওলীদের কাশফ ও কারামত সম্বন্ধে আলাপ-আলোচনা হইতেছিল । হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গায্যালী (রঃ) বলিলেন-
ভাইসব ! শায়খের কলবের শক্তি এবং পবিত্রতা এই পরিমাণ হইতে হইবে যে, যখন কোন লোক তাহার নিকট আল্লাহর ওয়াস্তে বায়আত গ্রহণ করিতে আসে তখন প্রথমেই শায়খ তাহার বাতেনী দৃষ্টি দ্বারা বায়আত গ্রহণে আগত ব্যক্তির বক্ষদেশে পৃথিবীর প্রতি যেই মায়া-মোহ রহিয়াছে উহা দূর করিয়া দিবেন, যেন তাহার মাঝে হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ-লালসা, দুনিয়ার প্রতি আসক্তি এবং মায়া-মোহ কোন কিছুই অবশিষ্ট না থাকে। এই প্রাথমিক কাজ সমাধা করার পর তাহাকে বায়আত করিবেন এবং আল্লাহপ্রাপ্তির পথে আনিয়া দাঁড় করাইবেন।
এই শক্তি যখন শায়খের মধ্যে থাকিবে না তখন অবশ্যই মনে করিবে, এই পীর ও মুরীদ উভয়েই গোমরাহীর জঙ্গলে উদ্দেশ্যহীনভাবে দিশাহারা হইয়া ঘুরাফেরা করিবে। কোন মতেই তাহারা মনযিলে মকসুদে পৌছিতে সক্ষম হইবে না।

তিনি বলিলেন, একবার এক বুযুর্গ দেশ পর্যটনে বাহির হইলেন। বহু দেশ ঘুরাফেরা করার পর তিনি বদখশান আসিয়া পৌঁছেন। এই বুযুর্গ বলেন, এখানে 'আসিয়া আমি এক বুযুর্গের খানকায় উপস্থিত হই। এই বুযুর্গ এমনই আল্লাহ ওয়ালা এবং খোদাভীরু ছিলেন যে, তা বর্ণনাতীত। আমি তাঁহাকে সালাম করিলাম। তিনি হাসিমুখে সালামের উত্তর দিয়া তাঁহার পাশেই আমাকে বসাইলেন । আমি তাঁহার খেদমতে কিছু দিন থাকার মনস্থ করিলাম ।
তিনি প্রতিদিন রোযা রাখিতেন। ইফতারের সময় হইলে গায়েব হইতে তাঁহার নিকট দুইখানি রুটি আসিত। তিনি একখানি দ্বারা ইফতার করিতেন এবং অন্য রুটিখানি আমাকে দিতেন। একদিন এই বুযুর্গ শহরের শাসনকর্তাকে দরবারে ডাকিয়া আনিয়া বলিলেন, আমার জন্য দুইটি খানকা তৈয়ার কর । শাসনকর্তা খানকা তৈয়ার করিয়া দরবেশকে সংবাদ দিলেন। দরবেশ শাসনকর্তাকে প্রত্যহ একটি গোলাম কিনিয়া দিতে বলিলেন। শাসনকর্তা প্রতিদিন বাজার হইতে একজন করিয়া গোলাম ক্রয় করিয়া আনিয়া তাঁহাকে দিতেন। বুযুর্গ ক্রীতদাসের হাত ধরিয়া খানকায় লইয়া যাইতেন এবং সাজ্জাদায় বসাইয়া বলিতেন, আমি তোমাকে আল্লাহর নিকট সোপর্দ করিলাম। এইভাবে খানকাদ্বয় আবাদ হইয়া গেল।
তাহাদের মর্যাদা এমনই উন্নত মানের হইল যে, তাহারা অনায়াসে পানির উপর দিয়া চলিয়া যাইতে পারিতেন। যাহাকে যেই কথা বলিয়া দিতেন তাহা কার্যে পরিণত হইত। এই অবস্থা দেখিয়া আমার বিস্ময়ের আর অবধি রহিল না। আমার অবস্থা দেখিয়া উক্ত বুযুর্গ বলিলেন, ভাই ! ইহাতে বিস্ময়ের কি আছে? সাজ্জাদার অধিকারী তো ঐ ব্যক্তি, যে কোন ব্যক্তির হাত ধরিয়া তাহাকে সাজ্জাদার অধিকারী বানাইয়া দিতে পারে। যাহার মধ্যে এই শক্তি নাই সে আবার কিসের পীর? বরং সে তো সুলুকধারীদের মধ্যে মিথ্যাবাদী।

অতঃপর হুজ্জাতুল ইসলাম এরশাদ করিলেন, পুরুষের পৌরুষ বা পূর্ণতা চারিটি বস্তু দ্বারা সাধিত হয়। যথা- কম নিদ্রা যাওয়া, কম আহার করা, কম কথা বলা এবং লোকের সাথে অপারগতায় মেলামেশা করা।

তিনি (ইমাম গাজ্জালী) বলিলেন, গজনীতে একজন অবিবাহিত দরবেশ ছিলেন। সমস্ত দিন তিনি যাহা কিছু পাইতেন রাত পর্যন্ত তাহা দান করিয়া দিতেন। একটি কপর্দকও নিজের জন্য রাখিতেন না। আবার রাতে কিছু পাইলে দিনে তাহা দান করিয়া দিতেন। ছোট হউক বা বড়, দরবেশ হউক বা ধনী, যেকোন লোকই তাঁহার নিকট আসিত, কেহই খালি হাতে যাইত না। যদি কোন ব্যক্তি বস্ত্রহীন অবস্থায় আসিত তিনি তাঁহার পরিধেয় ভাল কাপড় খুলিয়া তাহাকে দান করিতেন। এই দরবেশ খুবই দানশীল এবং মুক্তহস্ত ছিলেন। আমি বহু দিন তাঁহার সাথে অবস্থান করি।

একদিন এই দরবেশ আমাকে বলিলেন, আমি একাদিক্রমে চল্লিশ বৎসর কৃচ্ছ্র সাধনা করিয়া আল্লাহর এবাদত-বন্দেগীতে ডুবিয়া রহিয়াছি। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে আমি আমার মধ্যে এমন কোন নূর এবং উন্নতি দেখিতে পাই নাই যাহা চারিটি বিষয় অবলম্বন করার পর দেখিতে পাইয়াছি। অর্থাৎ, (১) কম খাওয়া, (২) কম কথা বলা, (৩) কম নিদ্রা যাওয়া, এবং (৪) লোকের সাথে কম মেলামেশা করা। 

এই নিয়ম মুখ্য ব্রত হিসাবে গ্রহণ করার পর আমি আকাশের দিকে তাকাইলে আল্লাহর আরশ পর্যন্ত দেখিতে পাই। ইহাতে কোন কিছুই আমার দৃষ্টিপথে অন্তরায় হইয়া দাঁড়ায় না। আবার যখন মাটির দিকে দৃষ্টিপাত করি, তখন সপ্ততল যমীনে যাহা কিছু আছে উহার সব কিছুই আমি দেখিতে পাই। 

অতঃপর বলিলেন, হে দরবেশগণ ! যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা কম না খাইবে, কম কথা না বলিবে, কম নিদ্রা না যাইবে এবং লোকের সাথে কম মেলামেশা না করিবে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের কেহই দরবেশীর রত্নভাণ্ডার আয়ত্ত করিতে পারিবে না।

প্রকৃত দরবেশ তো তাহারাই যাহারা নিদ্রা হারাম করিয়া দিয়াছেন ; কথা বলা পরিত্যাগ করিয়া বোবায় পরিণত হইয়াছেন, লতাপাতা চিবাইয়া জীবন রক্ষা করেন এবং লোকসঙ্গকে হলাহলতুল্য মনে করেন। এই গুণাবলী অর্জন করার পরই আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের মর্তবায় উপনীত হওয়া যায় ।

স্মরণ রাখিও, ভাল পেশাক পরিধান করিলে লোকে তাহার দিকে ফিরিয়া চাহিবে, জনসমাজ তাহাকে সম্মান করিবে, এই আশায় যে উৎকৃষ্ট পোশাক পরিধান করে সে সুলুকের পথের মিথ্যাবাদী। 

যে দরবেশ প্রবৃত্তির তাড়নায় পেট ভরিয়া খায়, আলস্য নিদ্রায় গা ভাসাইয়া দেয় এবং অযথা লোকের সাথে মেলামেশা পছন্দ করে, সে তো দরবেশ নামের কলঙ্ক ।

তিনি (ইমাম গাজ্জালী রহঃ) এরশাদ করিলেন, একবার আমি নদী পথে ভ্রমণ করিতেছিলাম। এই সময় এমন একজন দরবেশের সাথে আমার সাক্ষাত হইল, অত্যধিক বিয়াযত-মুজাহাদা করার দরুন তাঁহার দেহের চামড়া হাড়ের সাথে মিলিয়া গিয়াছিল। কিন্তু নিয়ম ছিল, চাশতের নামায আদায় করার পর তাঁহার সম্মুখে দস্তরখানা বিছানো হইত এবং প্রায় হাজার মণ পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য তাহাতে রাখা হইত। যে কেহ তাঁহার নিকট আসিত সে-ই খাইত। অথচ তিনি রোযা রাখিতেন। চাশত হইতে যোহর পর্যন্ত এইভাবে পানাহার চলিত এবং বস্ত্রহীনকে বস্ত্রদান করিতেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি কিছুই তাঁহার নিকট রাখিতেন না।
ইহার পরও বলিতেন, যাহার যাহা কিছুর প্রয়োজন আমার নিকট আস। অতঃপর কেহ তাঁহার নিকট আসিলে জায়নামাযের নিচে হাত দিতেন, যাহা কিছু হাতে আসিত তাহাই দান করিতেন। ইফতারের সময় আলমে গায়েব হইতে চারিটি খুরমা আসিত। আমাকে দুইটি দিতেন এবং নিজে দুইটি দ্বারা ইফতার করিতেন। তিনি আমাকে বলিতেন, কম কথা বলা, কম খাওয়া, কম নিদ্রা যাওয়া এবং নির্জনতা অবলম্বন করা ব্যতীত কেহই দরবেশের মর্যাদা লাভ করিতে পারে না।

হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধেও তিনি এই জাতীয় একটি কাহিনীতে এরশাদ করিলেন যে, যালেমদের হাত হইতে উদ্ধার করিয়া যখন হযরত ঈসা (আ.)-কে চতুর্থ আসমানে নেওয়া হইল, তখন মহান আল্লাহ তা'আলা  নির্দেশ দিলেন, তাহাকে ঐখানেই রাখ। এখনও তাহার নিকট পার্থিব সুখ-সম্পদের বস্তু রহিয়াছে।
হযরত ঈসা (আ.) এই বাণী শুনিয়া বিস্মিত হইলেন এবং লক্ষ্য করিতে লাগিলেন, পার্থিব সুখ-সম্পদের কোন বস্তু তাঁহার নিকট এখনও অবশিষ্ট রহিয়াছে। দেখিলেন, একটি সুই এবং এক পেয়ালা চর্বি রহিয়াছে। তিনি আরয করিলেন, হে পরওয়ারদেগারে আলম ! এখন আমি ইহা কি করিব?
এরশাদ হইল, তুমিই তোমার পায়ে কুঠারাঘাত হানিয়াছ। তুমি কি উহা পৃথিবীতেই ফেলিয়া আসিতে পার নাই? সুতরাং আর সম্মুখে অগ্রসর হইতে পারিবে না, ঐখানেই অবস্থান কর।

অথচ এই হযরত ঈসা (আ.) জীবনে বিবাহ করেন নাই, রৌদ্র-বৃষ্টি হইতে আত্মরক্ষা করার জন্য ঘর-বাড়ী তৈয়ার করেন নাই। বিশ্রাম করার প্রয়োজন হইলে একখণ্ড পাথর, ইট বা অন্য কিছু মাথার নিচে দিয়া ক্ষণিকের জন্য বিশ্রাম করিয়া লইতেন।

বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা (আ.) মাথার চুল ও দাড়ি আঁচড়ানোর জন্য একখানা চিরুনি এবং একটি পানপাত্র সর্বক্ষণ সাথে রাখিতেন। একদিন নদীর তীর দিয়া যাওয়ার সময় দেখিতে পাইলেন, এক ব্যক্তি অঞ্জলি ভরিয়া পানি পান করিতেছে। তিনি ভাবিলেন, তাই তো ! অঞ্জলি ভরিয়াই যখন পানি পান করা যায় তখন আর পানপাত্র কেন? সাথে সাথেই তিনি পানপাত্র দূরে ফেলিয়া দিলেন। 
আর একদিন দেখিলেন, এক ব্যক্তি হাতের আঙ্গুল দ্বারা মাতার চুল ও দাড়ি বিন্যাস করিতেছে। সেই দিন হইতে তিনি চিরুনিও আর সাথে রাখিলেন না।

হে দরবেশগণ ! এখানে চিন্তা করিয়া দেখার বিষয় যে, হযরত ঈসা (আ."") ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তু সাথে রাখার জন্য সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার অনুমতি পাইলেন না ; বরং চতুর্থ আসমানেই থাকিতে হইল। সেই ক্ষেত্রে যাহারা পার্থিব বিষয়বস্তুর সহিত ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাহারা কিভাবে বন্ধুর দরবারে পৌঁছার আশা পোষণ করিতে পারে।
দরবেশের কর্তব্য সর্বক্ষণ বিস্ময়াপন্ন থাকা। কেননা, তিনি প্রতিদিন এক স্থান হইতে অন্য স্থানে এবং এক দেশ হইতে অন্য দেশে গমন করেন। এইভাবে তিনি একটির পর একটি উন্নতির সোপান অতিক্রম করিয়া যান।

এক দরবেশ সম্বন্ধে বর্ণিত আছে, তিনি সব সময় চিন্তা-ভাবনা করিতেন এবং বিস্ময়াপন্ন হইয়া থাকিতেন। লোকে তাঁহাকে ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিতেন, আমার প্রতিটি পলক এমন এক দেশের উপর পড়ে যাহা প্রথমটি হইতে শত গুণে বড়। প্রতিটি দেশই প্রথমটি হইতে অধিক রহস্যময়। সুতরাং এই রহস্য স্বচক্ষে দেখিয়াই আমি বিস্ময়াভিভূত হইয়া 
পড়ি।
এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার চক্ষুদ্বয় অশ্রুসিক্ত হইয়া পড়িল। কিছুক্ষণ নিচের দিকে মাথা রাখিয়া আবার বলিলেন, বিস্ময়াভিভূত আহলে সুলুক বলেন, দরবেশ তাহাকে বলা হয় যিনি প্রতিদিন হাজার হাজার দেশ অতিক্রম করিয়া যান এবং তাহাতেই নিমগ্ন থাকেন। যেই দরবেশ আলমে গায়েব হইতে কোন সংবাদ পায় না সে দরবেশ নহে।

অতঃপর বলিলেন, আল্লাহর কোন কোন ওলী প্রেমাধিক্য এবং মত্ততার (সুকর) অবস্থায় কিছু কিছু রহস্য প্রকাশ করিয়া দেন। আবার এমন ওলীও আছেন যাঁহারা কোন অবস্থায়ই রহস্য প্রকাশ পাইতে দেন না। অতএব এই পথে সুলুকধারীদের শক্তি-সাহস আরও প্রশস্ত হওয়া উচিত, যেন রহস্য তাঁহার মধ্যেই সীমিত থাকে। কারণ, মাহবুবের রহস্যে যে পূর্ণতাপ্রাপ্ত, সে তাহা কখনও নষ্ট হইতে দেয় না। 

বহু দিন পর্যন্ত আমি আমার মুরশিদের খেদমতে অবস্থান করিয়াছি। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে আমি কোন দিন শুনি নাই যে, তিনি রহস্যময় কোন কথা বলিয়াছেন। আর আমি ইহাও দেখি নাই যে, তাঁহার মধ্যে যে নূরের আবির্ভাব হইয়াছে তাহা প্রকাশ করিয়াছেন। 

কামেল দরবেশের অবস্থা তো এমন যে, তিনি কোন মতেই রহস্য প্রকাশ হইতে দেন না। ফলে অন্য রহস্য সম্বন্ধে তিনি অবগত হইতে পারেন। তাই মানসূর হাল্লাজ যদি পূর্ণতা প্রাপ্ত হইতেন তবে কখনও তিনি তাঁহার বন্ধুর রহস্য লোক সমাজে প্রকাশ করিতেন না। বন্ধুর রহস্যের সামান্য কিছুটা প্রকাশ করার ফলেই তিনি প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হইয়াছিলেন।

হযরত মানসূর হাল্লাজের এক বোন ছিলেন উঁচু স্তরের একজন ওলী। অর্ধ রাত অতিবাহিত হওয়ার পর তিনি ঘর ছাড়িয়া বাগদাদের উন্মুক্ত মরুভূমিতে চলিয়া যাইতেন এবং একাগ্র চিত্তে বহুক্ষণ আল্লাহর এবাদত-বন্দেগীতের লিপ্ত থাকিতেন। বাড়ী ফিরার সময় হইলে আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদিগকে বলিতেন, আমার প্রেম মদিরার এক পেয়ালা বেহেশতী সুরা তাহাকে পান করিতে দাও। ফেরেশতাগণ পানপাত্র তাঁহার হাতে তুলিয়া দিতেন। তিনি উহা পান করিয়া গৃহে প্রত্যাবর্তন করিতেন। 
হযরত মানসূর বোনের গৃহ হইতে বাহির হইয়া যাওয়ার বিষয় অবগত হইতে পারিলেন। বোন কোথায় যায় জানার জন্য এক রাতে তাঁহার পিছনে পিছনে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেলেন। নিয়মিতভাবেই বাড়ী ফিরার পূর্বে ফেরেশতাগণ তাঁহার সম্মুখে পানপাত্র ধরিলেন। তিনি প্রেম সুধার সামান্য পরিমাণ পান করিতেই মানসূর পিছন হইতে ডাকিয়া বলিলেন, বোন! তুমি একা পান করিও না, আমাকে একটু দাও । পিছনে ফিরিয়া ভাইকে দেখিয়া তো তিনি অবাক! তিনি বলিলেন, হায় অদৃষ্ট ! আমার এতদিনের রহস্য আজ প্রকাশ পাইয়া গেল ! তারপর ভাইকে বলিলেন, তুমি ইহা পান করিও না। আমার বিশ্বাস, তুমি ইহার প্রভাব সহ্য করিতে পারিবে না। ভাই তাঁহার কথায় কর্ণপাত করিলেন না। সেই সুধা পান করিলেন। আর যায় কোথায় ! সঙ্গে সঙ্গেই তাঁহার মুখ হইতে বাহির হইয়া পড়িল, আনাল হক। আমিই সত্য। ভাইয়ের অবস্থা দর্শনে বোন দুঃখে কাঁদিয়া ফেলিলেন। বলিলেন, ওহে অপদার্থ! আমার কথা না শুনিয়া নিজেও দুর্নামগ্রস্ত হইলে আর সাথে সাথে আমাকেও হেয় করিয়া ছাড়িলে। 

ইহার পর মানসূর প্রকাশ্য জনসমাজে আনাল হক, আনাল হক বলিয়া বেড়াইতে থাকেন। শরীয়তমতে তাঁহাকে শূল দণ্ডে দণ্ডিত করা হইল। শূলে চড়ানোর পূর্বে বোন তাঁহার নিকট গিয়া বলিলেন, মানসূর ! আমি না তোমাকে বলিয়াছিলাম, উহা পান করার শক্তি তোমার নাই। আমার কথায় কর্ণপাত না করিয়া আজ সর্বসাধারণ্যে বন্ধুর রহস্য প্রকাশ করিয়া দিয়া মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হইলে।
লোকে বলাবলি করিতে লাগিল, মানসূর এমন পৌরুষের অধিকারী ছিলেন যে, বন্ধুর প্রেমে স্বীয় জীবন উৎসর্গ করিলেন। কিন্তু বোন লোকের কথা শুনিয়া বলিলেন, মানসূর ছিল একজন কাপুরুষ। সে পৌরুষের অধিকারী হইলে সামান্য পরিমাণ প্রেম মদিরা পান করিয়া এমনভাবে বিপথগামী হইত না। আমি আজ বিশ বৎসর যাবত এই মদিরা পান করিয়া আসিতেছি, অথচ আমি তো কোন দিন বিপথে চলি নাই। বরং বলিয়াছি, আরও দাও।

হযরত জোনায়েদ (রহ.) যখন প্রেমবিহ্বল অবস্থায় থাকিতেন, তখন শুধু এই কথাই বলিতেন যে, প্রেমিক সম্প্রদায়ের জন্য হাজার আফসোস, তাহারা প্রেম ও বন্ধুত্বের দাবী করে, তারপর আলমে গায়েব হইতে তাহাদের উপর যে রহস্য অবতীর্ণ হয় তাহা লোক সমাজে প্রকাশ করিয়া বেড়ায়।

আমি আমার পীর ও মুরশিদের নিকট শুনিয়াছি, একজন বুযুর্গ কয়েকশত বৎসর পর্যন্ত আল্লাহর এবাদত ও মুজাহাদায় নিয়োজিত থাকেন। একদিন তাঁহার উপর প্রেম রহস্য প্রকাশ লাভ করিল। তিনি কিছুটা দুর্বল প্রকৃতির থাকায় তাহা সহ্য করিতে পারিলেন না। সাথে সাথে প্রকাশ করিয়া দিলেন। দ্বিতীয় দিন তাঁহার নিকট হইতে সেই রহস্য ছিনাইয়া লওয়া হইল। দরবেশ সেই দুঃখে ম্রিয়মাণ হইয়া পড়িলেন।গায়েবী আওয়ায হইল, ওহে দরবেশ ! তুমি যদি এই রহস্য  প্রকাশ না করিতে, তবে তোমাকে আরও অনেক কিছু দান করা হইত। সুতরাং তুমি উহার উপযুক্ত না হওয়ায় তোমার নিকট হইতে ছিনাইয়া লইয়া অন্যকে দান করা হইয়াছে।

একবার এক বুযুর্গ আর এক বুযুর্গের নিকট লিখিলেন, ঐ ব্যক্তি সম্বন্ধে আপনার কি অভিমত যে এক পেয়ালা প্রেম সুধা পান করিয়াই বলিয়া উঠে, আমি অনেক কিছু পাইয়াছি। দরবেশ উত্তরে লিখিলেন, এমন ব্যক্তি তো অত্যন্ত- দুর্বলচেতা। যেব্যক্তি সমুদ্রের পর সমুদ্র প্রেম সুধা পান করিয়াও হজম করিয়া ফেলে এবং বলে, আরও দাও, সে-ই বাহাদুর ! কিন্তু আমি তোমাদিগকে বলিতেছি তোমরা কখনও এইরূপ করিও না। কারণ, যাহারা গোপন রহস্য প্রকাশ করে তাহারা কিছুই অর্জন করিতে পারে না।

দরবেশ যতক্ষণ পর্যন্ত নির্জনতা অবলম্বন করিয়া যাবতীয় সম্পর্ক পরিত্যাগ না করে, সে কোন দিনও আল্লাহর নৈকট্য লাভ করিতে সক্ষম হয় না। সত্তর বৎসর পর হযরত বায়েজীদ (রহ.) যখন আল্লাহ নৈকট্য লাভে সমর্থ হন, তখন নির্দেশ দেওয়া হইল, তাহাকে ফিরাইয়া লইয়া যাও। কেননা, এখনও তাহার নিকট পার্থিব উপকরণ রহিয়াছে। তিনি চিন্তা করিলেন, আমার নিকট কি আছে? লক্ষ্য করিয়া দেখিলেন, একটি চামড়ার ছেঁড়া জামা এবং একটি ভাঙ্গা পানপাত্র। তিনি তখনই উহা ফেলিয়া দিয়া প্রতিবন্ধকতা দূর করিলেন।

ভাইসব ! এমন একজন বুযুর্গ যখন এই সামান্য বস্তুর জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভে সমর্থ হন নাই, তখন তোমার-আমার ঠিকানা কোথায় ? 
আমরা তো পার্থিব আসবাব-উপকরণ দ্বারা পরিবেষ্টিত হইয়া রহিয়াছি। পৃথিবীর মায়াজালে আবদ্ধ। হে দরবেশ ! দরবেশী এক বস্তু. সঞ্চয় করা অন্য বস্তু। প্রকৃত দরবেশ তো ঐ ব্যক্তি, তিনি যাহা মুখে বলেন তাহা কার্যে পরিণত হয়, একটুও এদিক সেদিক হয় না।

একবার আমি এবং আমার একজন অন্তরঙ্গ সাথী নদী পথে ভ্রমণ করার জন্য রওয়ানা হই। হঠাৎ আমরা আল্লাহর কুদরতের এমন একটি নিদর্শন দেখিতে পাই যাহা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। নদীর তীরে আমরা বসা। ক্ষুধার তাড়নায় অস্থির। একদিকে জঙ্গল অন্য দিকে নদী। কোথায় পাই খাবার বস্তু। এমন সময় একজন কাফ্রী আসিয়া আমাদের সম্মুখে দুইখানি যবের রুটি রাখিয়া চলিয়া গেল। আমরা আল্লাহর এই নেয়ামত খাওয়া আরম্ভ করিলাম। হঠাৎ আমাদের চোখে পড়িল, উটের সমান একটি বিচ্ছু দ্রুতবেগে নদীতে ঝাঁপাইয়া পড়িয়া ততোধিক দ্রুত গতিতে নদীর অপর তীরের দিকে ধাবিত হইয়াছে। আমরা মনে করিলাম, নিশ্চয়ই কোন প্রয়োজনে উহা যাইতেছে। কি প্রয়োজন দেখার জনা আমরাও উঠিয়া দাঁড়াইলাম। কিন্তু কিভাবে নদী অতিক্রম করিব? আমরা আল্লাহর নিকট দোআ করিলাম। নদীর পানি দুই ভাগ হইয়া আমাদের পথ করিয়া দিল। নদী পার হইয়া দেখিলাম, একটি গাছের তলায় এক ব্যাক্তি গভীর নিদ্রায় নিদ্রিত। আরও দেখিলাম, বিরাট এক অজগর তাহাকে দংশন করার জন্য গাছ হইতে নামিয়া আসিতেছে। ইত্যবসরে উট সদৃশ সেই বিছু অজগরটিকে দংশন করিল। অজগরটি সাথে সাথে মরিয়া গেল। বিচ্ছুটিও আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে চলিয়া গেল। আমরা মনে করিলাম, এই ব্যক্তি নিশ্চয়ই আল্লাহর ওলী, যাঁহাকে অজগরের দংশন হইতে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ তাআলা এই বিচ্ছুটিকে পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। আমরা উক্ত ব্যক্তির নিকট গিয়া যাহা দেখিলাম তাহাতে আমাদের বিবেক-বুদ্ধি লোপ পাইয়া গেল। দেখিলাম, তাহার পাশে মদের বোতল। অতিরিক্ত মদ পান করার দরুণ সে বমি করিয়া নিস্তেজ হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। দুর্গন্ধে তাহার নিকট যাওয়া মুশকিল। আমরা চিন্তা করিতেছিলাম, আল্লাহর এই নিকৃষ্টতম জীবের অবস্থা দেখার জন্য আমরা কেন এখানে আসিলাম ! এমন সময় গায়েব হইতে আওয়ায হইল, ওহে আমার প্রিয়তম বন্ধুদ্বয় ! আমি যদি আমার নেকবখত এবং পুণ্যবানদিগকেই রক্ষণাবেক্ষণ করি তবে আমার গুনাহগার বান্দাদিগকে কে রক্ষা করিবে?
ইত্যবসরে সেই ব্যক্তি জাগ্রত হইয়া পাশে মৃত অজগর এবং আমাদিগকে দেখিয়া অবাক হইয়া তওবা করিল । পরবর্তী সময়ে এই ব্যক্তি খালি পায়ে হাঁটিয়া পনেরবার হজ্জ করিয়াছিল।

বন্ধুগণ! যখন মেহেরবানীর বাতাস প্রবাহিত হইতে থাকে, তখন শত পাপী অপরাধীজনকেও সাজ্জাদার অধিকারী করিয়া দেয়। খোদা না করুন, আবার কখনও যদি ক্রোধের হাওয়া প্রবাহিত হয়, তখন যত বড় সাজ্জাদার অধিকারীই হউক না কেন তাহাকে সাজ্জাদা হইতে বঞ্চিত করেন। সুতরাং এই পথের পথিক কখনও নির্ভয় এবং নিশ্চিন্ত থাকিতে পারে না। কারণ, সে তাহার পরিণতি ভাল হইবে কিনা কিছুই বুঝিতে পারে না। অভিশপ্ত শয়তান যদি তাহার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে জ্ঞাত থাকিত, তবে সে অবশ্যই হযরত আদম (আ.)-কে সেজদা করিত। সে তাহার পরিণতি সম্বন্ধে অজ্ঞ ছিল। বলিয়াই স্বীয় এবাদত-বন্দেগী, রিয়াযত-মুজাহাদার অহংকার করত নিজেকে সকলের চেয়ে গুণী-জ্ঞানী মনে করিয়াই বলিয়া ফেলিল, আমি মাটির তৈয়ারী মানুষকে সেজদা করিব না। ফলে সে নাফরমান হইল। আল্লাহর নির্দেশ পালন না করিয়া বিতাড়িত হইল। তাহার সকল এবাদত-বন্দেগী ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইল। এতদিনের এবাদত-বন্দেগী তাহার মুখের উপর নিক্ষেপ করা হইল।
এই কথা বলিয়া তিনি অঝোর নয়নে কাঁদিতে থাকেন। উপস্থিত সকলেও তাঁহার সাথে ক্রন্দন করিতে থাকেন। কিছুক্ষণ পর তিনি মোনাজাত করিয়া সকলকে  সেই দিনের মত বিদায় দিলেন।
-------------------

উলামায়ে ছূ বা অসৎ আলেম– ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

 উলামায়ে ছূ বা অসৎ আলেম–



📚 মুকাশাফাতুল কুলুব ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


দুনিয়াদার ও অসৎ আলেম যারা, তারাই উলামায়ে ছূ। ইল্ম হাসিলের দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য থাকে, কেবল দুনিয়াবী নেয়ামত ও জাগতিক যাবতীয় দ্রব্য-সত্তার জমা করা এবং উচ্চপদস্থ বড় বড় লোকদের কাছে মান-সম্মান ও মর্যাদা হাসিল করা। নবী করীম (সাল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেনঃ 

“কেয়ামতের দিন সর্বাপেক্ষা কঠিন আযাব হবে সেই আলেমের যে নিজের ইল্ম দ্বারা উপকৃত হয় নাই।” 

তিনি (সাল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আরও ইরশাদ করেছেন : 

“যে কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত আলেম হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে নিজের ইল্ম অনুযায়ী আমল না করবে।” 

হুযূর আকরাম (সাল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আরও ইরশাদ করেনঃ ইলম দুই প্রকার

এক প্রকার ইল্ম যা শুধু মুখের কথা ও ভাষায় ব্যক্ত করা পর্যন্ত সীমিত থাকে; বস্তুতঃ এ ইল্ম অর্জনকারীর বিরুদ্ধে আল্লাহ্ তা'আলার কাছে সাক্ষ্য ও প্রমাণস্বরূপ। 

দ্বিতীয় প্রকার ইল্ম হচ্ছে, অস্তর ও অভ্যন্তরের ইল্ম। বস্তুতঃ এটাই প্রকৃত ইলম; এবং অর্জনকারীর জন্য এ ইলমই নাফে  ও উপকারী।”

হুযূর আকরাম (সাল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন: 

“তোমরা এ উদ্দেশ্যে ইল্ম অর্জন করো না যে, সমকালীন আলেমদের সাথে গর্ব করবে; তাদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করবে, নির্বোধ লোকদের সাথে বাক-বিতণ্ডা ও ঝগড়া করবে এবং মানুষকে নিজের প্রতি আকর্ষণ করবে। কেননা, যে ব্যক্তি এহেন উদ্দেশ্যে ইল্ল্ম হৗসিল করবে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে দোযখে নিক্ষেপ করবেন।”


হুযূর আকরাম (সাল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আরও ইরশাদ করেছেন  : 

“কোন ব্যক্তিকে তার জানা বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে যদি সে তা গোপন করে তবে কেয়ামতের দিন তাকে আগুনের লাগাম পরিয়ে দেওয়া হবে।” 

তিনি (সাল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আরও ইরশাদ করেছেন 

“আমি তোমাদের ব্যাপারে কতিপয় ব্যক্তিকে দাজ্জালের চেয়েও বেশী ভয়ঙ্কর মনে করি”। 

কেউ জিজ্ঞাসা করলো : ইয়া রাসূলাল্লাহ্ ! তারা কারা? তিনি বললেন  : 

“ভ্রষ্ট পথে পরিচালনাকারী সমাজ ও জাতির নেতারা”। 

অপর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)  ইরশাদ করেন 

“যে ব্যক্তি কেবল অধিক বিদ্যাই অর্জন করে গেল; অথচ হেদায়াতের পথে আসলো না - এরূপ বিদ্যার্জন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ থেকে ক্রমবর্ধমান দূরত্বেরই কারণ হয়।” 

হযরত ঈসা (আলাইহিস্সালাম) বলেনঃ “ওহে ! আর কতদিন অন্ধকার রাতের পথচারীদের জন্য পথ পরিষ্কার করবে আর দিশাহারা লক্ষ্যচ্যুত লোকদের সহবাস গ্রহণ করে থাকবে !”  উপরোল্লিখিত রেওয়ায়াতসমূহ এবং আরও অন্যান্য রেওয়ায়াতে ইলমের অপরিসীম গুরুত্ব বুঝা যায় এবং সেই সঙ্গে এ কথাও প্রতীয়মান হয় যে, ইলম হাসিল করার পর সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালন না করা খুবই ক্ষতিকর ও মারাত্মক অপরাধ। তাই আলেম ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে তার সার্বিক দায়িত্ব পালন করে যেমন চির সৌভাগ্যের অধিকারী হতে পারে, অপরদিকে এর বিপরীত করে সে চির ধ্বংসও হতে পারে। সুতরাং সে যদি অত্যস্ত সতর্কতার সহিত ইলমের হক ও দায়িত্ব আদায় না করে, তাহলে অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে বঞ্চনার সম্মুখীন হতে হবে। 

হযরত উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন– “এই উম্মতের মধ্যে আমি ‘ইল্মধারী মুনাফিকের’ বিষয়টিকে বড় ভয়ঙ্কর ও আশংকাজনক বোধ করি”। 

লোকেরা জিজ্ঞাসা করলো  হে আমীরুল মুমেনীন ! 

আলেম মুনাফেক হয় কি করে ? তিনি বললেন  :  মুখের ভাষায় ও কথনে সে বড় বিদ্বান ও আলেম, কিন্তু অন্তর এবং আমল এ উভয় দিক থেকেই সে জাহেল-মূর্খ।


হযরত হাসান (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন : “খবরদার ! তুমি ঐসব লোকের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা বড় বড় বিদ্বান লোকের বিদ্যা এবং বড় বড় তত্ত্বজ্ঞানীদের প্রজ্ঞা একত্রিত করে নিয়েছে কিন্তু আমলের প্রশ্নে একেবারে শূন্য; নির্বোধ ও অজ্ঞ লোকদের পথ ধরেছে।” 

এক ব্যক্তি হযরত আবূ হুরাইরাহ্ (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট আরজ করলো : আমার ইলম হাসিল করতে ইচ্ছা হয়; কিন্তু আশংকা বোধ করি যে, হয়তঃ আমি ইলমের হক আদায় করতে পারবো না; বরং আরো বরবাদ করবো। হযরত আবূ হুরাইরাহ্ (রদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন  : “ইল্ম হাসিল না করাও মূলতঃ ইল্ল্মকে বরবাদ করার অন্তর্ভুক্ত। 

হযরত ইব্রাহীম ইব্‌নে উয়াইনাহ্ (রদিয়াল্লাহু আনহু)– কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলঃ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী লজ্জিত হয় কে? 

তিনি বলেছেন “দুনিয়াতে ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে বেশী লজ্জিত হয়, যে অকৃতজ্ঞ লোকের প্রতি এহ্সান ও অনুগ্রহ করে। 

আর আখেরাতে সবচেয়ে বেশী লজ্জিত হবে অসৎ আলেম।” 

হযরত খলীল ইব্‌নে আহমদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন  “লোকেরা সাধারণতঃ চার প্রকারের হয়ে থাকে  : 

(১) যে জানে (অর্থাৎ ইল্ল্ম শিক্ষা করেছে এবং এ কথাও জানে অর্থাৎ অনুভূতি রাখে  যে, সে জানে (অর্থাৎ নিজের ইলমের দায়িত্বজ্ঞান আছে), এরূপ ব্যক্তি সত্যিকার আলেম; তোমরা তার অনুসরণ কর। 

(২) যে জানে এবং একথা জানে না যে, সে জানে - এরূপ লোক ঘুমন্ত অবস্থায় রয়েছে; তাকে তোমরা জাগ্রত কর। 

(৩) যে জানে না (অর্থাৎ অজ্ঞ) এবং এ কথা জানে (অর্থাৎ অনুভূতি আছে) যে, সে জানে না - এরূপ ব্যক্তি সত্যপথের অনুসন্ধানী; তাকে তোমরা সত্য ও হেদায়াতের পথ দেখিয়ে দাও। 

(৪) যে জানে না (অর্থাৎ অজ্ঞ-মূর্খ) এবং এ কথাও জানে না যে, সে জানে না- এ ব্যক্তি জাহেল, দাম্ভিক; তাকে তোমরা পরিহার কর এবং এ থেকে বেঁচে চল। 


”হযরত সুফিয়ান সওরী (রহঃ) বলেন  : “ইলম চিৎকার করে আমলের দাবী জানায়, যদি তার দাবী ও আহ্বানে সাড়া দেওয়া হয় অর্থাৎ আলেম ব্যক্তি তার ইলম অনুযায়ী আমল করে, তবে সেই ইলম তার কাছে থাকে, অন্যথায় সে বিদায় নিয়ে নেয়।” 


হযরত ইব্‌নে মুবারক (রহঃ) বলেন : 

“একজন লোক সত্যিকার আলেম বা জ্ঞানী হতে হলে সর্বদা (নিজকে মুখাপেক্ষী জ্ঞান করে) জ্ঞান অন্বেষায় মগ্ন থাকতে হবে। আর যদি সে নিজকে আলেম বা জ্ঞানী ভেবে নেয়, তাহলে সে প্রকৃত আলেম বা জ্ঞানী নয়; জাহেল মূর্খ।” 

হযরত ফুযাইল ইব্‌নে ইয়ায (রহঃ) বলেন : তিন শ্রেণীর লোকের উপর আমার বড় করুণা আসে : (১) সমাজের শীর্ষস্থানীয় মান্য-গণ্য ব্যক্তি যদি অপমানিত হয়। 

(২) সমাজের বিত্তশালী ও ধনাঢ্য ব্যক্তি যদি দরিদ্র ও অভাবী হয়ে যায়। 

(৩) যে আলেম মানুষের শ্রদ্ধা-সম্মান হারিয়ে ফেলেছে; লোকেরা যাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সাথে হেয় দৃষ্টিতে দেখে।” 


হযরত হাসান (রহঃ) বলেন : “আলেমের শাস্তি হচ্ছে, তার অন্তর মরে যাওয়া, আর অন্তর মরে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে, দ্বীন ও আখেরাতের কাজ করে দুনিয়া তলব করা।” এ প্রসঙ্গে জনৈক আরবী কবি কতই না চমৎকার বলেছেন  : “আমি বিস্মিত হই সে ব্যক্তির উপর যে হিদায়াতের বিনিময়ে গোমরাহী খরিদ করে, আর যে ব্যক্তি দ্বীন বিক্রি করে দুনিয়া খরিদ করে তার অবস্থা আরও অধিক বিস্ময়কর।” 

“এ দুয়ের মধ্যে অধিকতর বিস্ময়কর হলো তার অবস্থা যে সমান দামে দ্বীন বিক্রি করে দুনিয়া নিয়ে নেয় ।” 


হুযূর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন

“(অসৎ) আলেমকে এমন কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে যে, দোযখবাসীরা তার আশে-পাশে জমা হয়ে যাবে ।” হযরত উসামাহ্ ইব্‌নে যায়েদ (রঃ) বলেন, হুযূর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম)-কে আমি বলতে শুনেছি যে, “কিয়ামতের দিন (অসৎ) আলেমকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে; তার নাড়ি-ভুঁড়ি বের হয়ে আসবে এবং এমনভাবে ঘুরতে থাকবে যেমন গাধা চাকীর চতুর্পার্শ্বে ঘুরতে থাকে। দোযখীরা তার আশে পাশে জমা হয়ে জিজ্ঞাসা করবে - তোমার এ শাস্তি কি জন্যে হচ্ছে ? সে বলবে, আমি মানুষকে সৎকাজের উপদেশ দিয়েছি কিন্তু নিজে সে অনুযায়ী আমল করি নাই, লোকদেরকে আমি মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য নসীহত করেছি; কিন্তু নিজে মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকি নাই ।” 

আলেমের শাস্তি এতো অধিক হওয়ার কারণ হচ্ছে, সে জেনেশুনে আল্লাহর না ফরমানী করেছে। এ জন্যেই আল্লাহ্ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন  :  “নিশ্চয় মুনাফিকরা দোযখের সর্বনিম্ন স্তরে হবে।” (নিসা : ১৪৫ ) মুনাফিকদের শাস্তির কঠোরতার কারণ তারা সত্য বিষয় জানার পরেও অস্বীকার করেছে। এমনিভাবে, নাসরাদের তুলনায় ইহুদীদেরকে অধিকতর অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়েছে; অথচ এরা নাসারাদের মত আল্লাহর জন্য পুত্রের কথা এবং ত্রিত্ববাদের কথা বলে নাই; এর কারণ হচ্ছে, এই ইহুদীরা জেনে-বুঝে এবং ভালভাবে পরিচয়লাভের পরও অস্বীকার করেছে। যেমন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “তারা তাঁকে এরূপ চিনে, যেরূপ তারা আপন পুত্রকে চিনে থাকে” (বাকারাহ্ : ১৪৬ )  “অতঃপর যখন তাদের নিকট আসলো সেই পরিচিত কিতাব, তখন তারা একে অস্বীকার করে বসলো; সুতরাং আল্লাহর লা'নত হোক এরূপ কাফেরদের উপর ।” (বাকারাহ্ ৮৯) 

অনুরূপ, বাল্আম বাউরের ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে কুরআনে ইরশাদ হয়েছে  : 

“আর তাদেরকে সেই ব্যক্তির অবস্থা পাঠ করে শুনিয়ে দিন যাকে আমি আমার আয়াতগুলো প্রদান করেছিলাম, অতঃপর সে তা হতে সম্পূর্ণরূপে বের হয়ে পড়লো, অতএব শয়তান তার পিছনে লেগে গেল, ফলে সে বিপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।” (আ'রাফ  : ১৭৫ ) 

উক্ত প্রসঙ্গের শেষ পর্যায়ে ইরশাদ হয়েছে; “ ফলতঃ তার অবস্থা কুকুরের মত হয়ে গেল— তুমি যদি এটাকে আক্রমণ কর তবুও হাঁপাতে থাকে, অথবা যদি এটাকে নিজ অবস্থায় ছেড়ে দাও তবুও হাঁপাতে থাকে।” 

অনুরূপ, অসৎ আলেমেরও ঠিক একই পরিণাম। কেননা, বাল্আম বাউরকেও আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় কিতাবের ইলম দান করেছিলেন; কিন্তু সে কাম-প্রবৃত্তির অনুসরণে নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিল। এ জন্যেই আল্লাহ্ তা'আলা তাকে কুকুরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ, সে জ্ঞান-বিদ্যার কোনই পরোয়া করে নাই; ইল্ল্ম আছে বা নাই - এ প্রশ্নই তার থাকে নাই; খাহেশাত ও কুপ্রবৃত্তির বাসনা চরিতার্থকরণে সে নিমজ্জিত হয়ে গেছে।

হযরত ঈসা (আঃ) বলেছেনঃ 

“অসৎ আলেমের উদাহরণ সেই পাথরের ন্যায়, যেটি প্রবাহিত ঝর্ণার বহির্মুখে পতিত হয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেয় ; সে নিজেও পানি পান করে না এবং শস্যক্ষেত্রেও পানি যেতে দেয় না।”

**********

#অসত_আলেম

#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিয়াহ

#মুকাশাফাতুল_কুলুব

ক্বিয়ামতের বিভীষিকা ইমাম গাজ্জালী রহঃ

 ক্বিয়ামতের বিভীষিকা



✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) 📚মুকাশাফাতুল_কুলুব

হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রঃ) বর্ণনা করেন যে, একদা আমি রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) উনাকে জিজ্ঞাসা করেছি- ইয়া রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) ক্বিয়ামতের দিন কি বন্ধু বন্ধুকে স্মরণ করবে? তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন “কিয়ামতের দিন তিন জায়গায় কেউ কাউকে স্মরণ করবে না। 

(১) মীযান-পাল্লার নিকট যে পর্যন্ত না সে জানতে পারবে যে, তার পাল্লা হালকা রয়েছে কি ভারী হয়েছে। 
(২) আমলনামা বিতরণের সময়; যে পর্যন্ত না সে জানতে পারবে যে, আমলনামা সে ডান হাতে প্রাপ্ত হবে কি বাম হাতে। 
(৩) যখন দোযখের মধ্য থেকে বিরাট-বিশাল একটি গর্দান বের হয়ে তাদেরকে অগ্নির লেলিহান শিখায় আবদ্ধ করে নিবে এবং বলতে থাকবে যে, আল্লাহ্ আমাকে তিন ধরনের লোকের উপর ন্যস্ত করে দিয়েছেন, দুনিয়াতে যারা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকে মাবূদ বানিয়েছে, আর অবাধ্যতা ও হঠকারিতা করেছে, আর যারা ক্বিয়ামতের দিনকে অবিশ্বাস করেছে। এই তিন শ্রেণীর লোকদেরকে সে পেঁচিয়ে জাহান্নামের কঠিন শাস্তির মধ্যে নিক্ষেপ করবে। 

জাহান্নামের একটি পুল রয়েছে চুলের চেয়েও সূক্ষ্ম তরবারীর চেয়েও ধারালো– এতে রয়েছে অগ্রভাগ বাঁকানো আঁকড়া বা লৌহ-শলাকা; উপরন্তু কাঁটাদার ছোট ছোট চারা গাছ।” হযরত আবূ হুরাইরাহ্ (রঃ) রেওয়ায়াত করেছেন, রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা আসমান-যমীন সৃষ্টি করার সময়ই (ক্বিয়ামতের) সিঙ্গা সৃষ্টি করেছেন এবং তা হযরত ইস্রাফিল (আঃ) এর হাতে দিয়ে রেখেছেন । তিনি আরশের দিকে তাকিয়ে অপলক নেত্রে প্রতীক্ষা করছেন যে, কখন ফুৎকারের আদেশ করা হয়। অত্র হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত আবূ হুরাইরাহ (রঃ) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম)-উনাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া

রাসূলাল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম), সিঙ্গা কি ? তিনি বললেনঃ নুরের শিং। আবার জিজ্ঞাসা করলাম, তা কেমন? তিনি বললেনঃ “ঐ সত্তার কসম, যিনি আমাকে সত্য নবীরূপে পাঠিয়েছেন, আসমান-যমীনের প্রশস্ততা জুড়ে এর পরিধি; তিনবার এতে ফুৎকার দেওয়া হবে - ‘নফ্‌খায়ে ফাযা’ (ভয়–বিভীষিকা ও ত্রাসের ফুৎকার ), নফ্‌খায়ে সাক্কু (বেহুঁশকরণের ফুৎকার) এবং নফ্‌খায়ে বাছ (পুনরুত্থানের ফুৎকার)। 

আর এই শেষোক্ত ফুৎকারে আত্মাসমূহ (রূহ্) বের হবে। তখন এমন দেখা যাবে, যেন অসংখ্য-অগণিত মক্ষিকায় আসমান-যমীন ভরে গেছে। অতঃপর এসব রূহ্ (আত্মা) নাকের ছিদ্র পথ দিয়ে দেহসমূহে প্রবেশ করবে। এরপর হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) বললেন  : আমি সে ব্যক্তি যার কবর সর্বপ্রথম বিদীর্ণ (উন্মুক্ত) হবে।” 

অন্য এক রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত জিব্রাঈল, মিকাঈল ও ইস্রাফিল (আঃ)-কে যখন যিন্দা করা হবে, তখন তাঁরা হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম)  এর কবরের পার্শ্বে গিয়ে উপস্থিত হবেন। তাঁদের নিকট থাকবে (হুযূরের আরোহণের জন্য) বুরাক্ক, আরও থাকবে জান্নাতের পোষাক। কবর মুবারক বিদীর্ণ হওয়ার পর নবী করিম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) জিব্রাঈল (আঃ)-কে জিজ্ঞাসা করবেন, হে জিবরাঈল। আজকে এ কোনদিন? তিনি বলবেন, আজকে ক্বিয়ামত দিবস। 

[এখানে একটি কথা উল্লেখ করা জরুরী যে আল্লাহর রসুল (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) তা জানেননা এমন নয়; যেমন বিদায় হজ্জের খুতবায় তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন ‘আজকের এই দিন কোন্ দিন?’।কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম উনাকেই উঠানো হবে তা তিনি এখনো জানেন তখনো জানবেন ]

হক–নাহাকের ফয়সালার দিবস। ক্বারিয়াহ্ তথা করাঘাতকারীর দিবস। তিনি জিজ্ঞাসা করবেন, হে জিব্রাঈল আল্লাহ্ তা'আলা আমার উম্মতের সাথে কিরূপ আচরণ করেছেন? তিনি বলবেন, আপনি সুসংবাদ নিন; সর্বপ্রথম আপনার কবরই বিদীর্ণ হয়েছে। 

হযরত আবূ হুরাইরাহ্ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) বলেছেনঃ আল্লাহ্ তা'আলা বল্‌বেন  : “হে জ্বিন ও মানবকুল ! আমি তোমাদের মঙ্গল চেয়েছি, এই নাও তোমাদের কর্মফল তোমাদের আমলনামায় রয়েছে। যদি ভাল হয়ে থাকে, তবে আল্লাহ্র প্রশংসা কর। আর যদি বিপরীত কিছু পাও, তবে অন্য কাউকে নয় নিজকেই ভর্ৎসনা কর।” 

হযরত ইয়াহইয়া ইব্‌নে রাযী (রহঃ) এর মজলিসে এক ব্যক্তি এ আয়াতখানি তিলাওয়াত করেছিল
“যেদিন আমি মুক্তাকীদেরকে করুণাময়ের নিকট মেহমানরূপে একত্রিত করবো, আর পাপীদের তৃষ্ণার্ত অবস্থায় দোযখের দিকে তাড়িয়ে নিবো।” (মরইয়াম : ৮৬ ) 
অর্থাৎ পাপীদেরকে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পায়ে হাঁটিয়ে নেওয়া হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন “হে লোকসকল ! কোথায় দৌড়ােচ্ছ— থাম, থাম; এইতো আগামীকল্যই তোমাদেরকে হাশরের ময়দানে একত্রিত করা হবে। চতুর্দিক থেকে তোমরা দলে দলে উপস্থিত হতে থাকবে এবং আল্লাহ্র সম্মুখে একা একা দন্ডায়মান হবে। জীবনের প্রতিটি কথা ও কাজ সম্পর্কে তোমাদেরকে অক্ষরে অক্ষরে জিজ্ঞাসা করা হবে। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদেরকে সম্মান ও মর্যাদা সহকারে জামাআত বন্দী অবস্থায় পরম করুণাময়ের মহান দরবারে পৌঁছিয়ে দেওয়া হবে। আর পাপীদেরকে পায়ে হাঁটিয়ে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় কঠিন আযাবের সোপর্দ করা হবে ; দলে দলে তারা দোযখে প্রবেশ করবে। ওহে ভাইয়েরা আমার ! তোমাদের সামনে এমন একদিন রয়েছে, যে দিনটির পরিমাণ তোমাদের গণনা অনুযায়ী পঞ্চাশ হাজার বছর দীর্ঘ হবে। সে দিনটি হবে প্রকম্পনকারী সিঙ্গা - ফুঁকের দিন। মহা বিভীষিকাময় ক্বিয়ামতের দিন। বিশ্বজগতের রব্বের সন্মুখে দণ্ডায়মান হওয়ার দিন। লজ্জা, অনুতাপ, অনুশোচনা ও হায় আপসুস করার দিন । চুলচেরা ও পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে হিসাব-নিকাশের দিন। দুঃখ-দৈন্য অভাব-অনটন ও ঘাট্‌তি-কমৃতির দিন। চিৎকার, আহাজারি ও আর্তনাদের দিন। হক ও সত্য প্রকাশিত হওয়ার দিন। উত্থান ও পুনর্জীবিত হওয়ার দিন। আপন কৃতকর্ম স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করার দিন। লাভ-লোকসান চূড়ান্ত হওয়ার দিন। চেহারা কালো কিংবা সাদা হওয়ার দিন। ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন কাজে না আসার দিন তবে হাঁ, যারা পবিত্র আত্মা নিয়ে উপস্থিত হবে। অনাচারীদের উযর-আপত্তি কোন কাজে না আসার উপর তাদের উপর অভিশাপ ও খারাবী বর্ষিত হওয়ার দিন।”

হযরত মুক্বাতিল ইব্‌নে সুলাইমান (রহঃ) বলেন, ক্বিয়ামতের দিন সমগ্র মখ্লূক একশত বছর নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকবে ; কোনই কথা বলবে না। একশত বছর গভীর অন্ধকারে বিপন্ন ও দিশাহারা হয়ে থাকবে। আর একশত বছর উত্তাল তরঙ্গের ন্যায় পরস্পর উলট-পালট খেতে থাকবে আর স্বীয় রব্বের নিকট কাতর মোকদ্দমা নিবেদন করতে থাকবে। পক্ষান্তরে, পঞ্চাশ হাজার বছর বিলম্বিত দিনটি নিষ্ঠাবান মুমিনের উপর একটি হালকা ফরয নামাযের ন্যায় স্বল্প সময়ে অতিবাহিত হয়ে যাবে। হুযূর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন

“(হাশরের দিন) বান্দাকে চারটি প্রশ্ন না করা পর্যন্ত তার পদদ্বয় আপন জায়গা থেকে নড়বে না
(১) তার জীবন কি কাজে ব্যয় করেছে ? 
(২) তার শরীরকে কি বিষয়ে সে জীর্ণ করেছে ? 
(৩) যে বিদ্যা সে অর্জন করেছে, সেই অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছে ? 
(৪) ধন-দৌলত কোথা হতে উপার্জন করেছে এবং তা কিভাবে ব্যয় করেছে?” 

হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া-সাল্লাম) ইরশাদ করেছেনঃ “প্রত্যেক নবীকে একটি মকবূল দো'আর অধিকার দেওয়া হয়েছে। সকল নবী তা দুনিয়াতেই গ্রহণ করে নিয়েছেন। কিন্তু আমি তা আখেরাতে আমার উম্মতের শাফা'আতের জন্য সংরক্ষিত রেখেছি।” 

আয় আল্লাহ ! আমাদেরকেও তোমার প্রিয় হাবীবের শাফা'আত নসীব করুন। আমীন ॥

——————-

#মুকাশাফাতুল_কুলুব

#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

__