দুনিয়াদার লোক পশমী পোষাক পড়া অনুচিত (রাহাতুল ক্বুলুব)



দুনিয়াদার লোক পশমী পোষাক পড়া অনুচিত 
📚রাহাতুল ক্বুলুব ✍🏻নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.) 

এরপর তিনি আমার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেনআসলে  পথে পবিত্র অন্তঃকরণের প্রয়োজন। পবিত্র অন্তঃকরণ সেই লাভ করতে পারে যে প্রতিটি হারাম কর্ম হতে দূরে থাকে এবং দুনিয়াদারদের নিকট হতে পালিয়ে বেড়ায়। এমন না হলে তাদের কম্বল  পশমী বস্ত্রপরিধান করা উচিত নয়। কেননা কম্বল হযরত মূসা কলিমুল্লাহ আলাইহিস্ সালামহযরত আদামু সফিউল্লাহ আলাইহিস্ সালামহযরত ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ আলাইহিস্ সালাম  হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) দ্বারা সম্মানিত। 

এরপর এরশাদ করলেন যেআমি হযরত খা'জা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট শুনেছিতিনি বলেছিলেনআমি হযরত খা'জা মওদুদ চিন্তী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর খেদমতে ১০ বছর উপস্থিত ছিলাম।  সময়ের মধ্যে আমি কোন দিনও তাঁকে কোন ধনী ব্যক্তিবা কোন বাদশাহের সাথে সাক্ষাৎ করতে দেখিনি। শুধুমাত্র জুমআ' নামাজ পড়ার জন্য তিনি তাঁর বাসস্থান হতে জামে মসজিদে গমন করতেন। হযরত খা'জা মওদুদ চিন্তী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর পবিত্র মুখে আমি শুনেছি যখন কোন দরবেশ কোন বাদশাহ্ অথবা ধনী ব্যক্তিদের দরজায় পা রাখে তখন তার কম্বল  সাথের দরবেশী জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়া উচিত। প্রথমে তাকে নিষেধ করে সতর্ক করতে হবে যদি সে পথে না আসে তাহলে তার কম্বল ও খিরকা যা সে পরিধান করে সে সমস্ত আগুনে নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দেয়া দরকার। কেননাদুনিয়া  দুনিয়াদারদের সঙ্গলাভকারী কখনও দরবেশ হতে পারে না।  ধরনের দরবেশীর দাবীদার প্রতারক  মিথ্যাবাদী। 

এরপর তিনি বললেনযখন কোন আহলে সূফফা (সুফীগণবা কম্বল পরিধানকারীর কোন কিছুর প্রয়োজন হয় তখন সে দরবেশী পোষাক পরিধান করে গলায় শিকল লাগিয়ে ইলাহির দরবারে প্রার্থনা করে: 'ইয়া ইলাহি দরবেশী পোষাকের বরকতে আমার প্রয়োজন মিটিয়ে দাও।তখন আল্লাহতায়ালা তার সমস্ত প্রয়োজন মিটিয়েদেন। 

তিনি এরপর বললেনযে ব্যক্তি পশমী জামা পরিধান করে তার উচিত নয় যে সে কোনচর্বি বা দুগ্ধজাত খাদ্য আহার করে এবং যে ব্যক্তি আহলে সুলুকের পোষাক পরিধান করে কোন বাদশাহ্ বা দুনিয়াদারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং  কাজকে উত্তম মনে করে তাহলে তার পোষাক সালেকদের মধ্যে বিশ্বাসভঙ্গকারী রূপে চিহ্নিত হয়। 

তারপর তিনি বললেনইসরারুল আরেফীন কিতাবে বর্ণিত আছে যেকোন এক ব্যক্তি হযরতজুন্নুন মিসরী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট আরজ করলোআপনার এক মুরীদ বাদশাহ্ দুনিয়াদারদের নিকট আসা-যাওয়া করে। তিনি সেই মুরীদকে উপস্থিত করতে নির্দেশ দেয়ায় তাকে উপস্থিত করা হলো। সে মুরীদ তখন দরবেশী পোষাকে সজ্জিত ছিলো। হযরত জুন্নুনমিসরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তার দরবেশী পোষাক ছিনিয়ে নিয়ে অগ্নিতে নিক্ষেপ করতে নির্দেশ দিলেন এবং সেই অবাঞ্ছিত মুরীদের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নিক্ষেপ করে বললেনআম্বিয়াআউলিয়া  আরিফদের পোষাক প্রত্যেক দিন অপবিত্র লোকদের মাঝে নিয়ে যেয়ে কলোষিত করার পরও কি করে আশা করো যে  বস্ত্র পরিধান করে ইলাহির মহিমান্বিতদের সম্মুখে আগমন করবেনা তা কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়। 

এরপর হযরত মালিক বিন দীনার রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর একটা ঘটনা বর্ণনা করলেন যেতিনি উপরে নীচে তিনটি করে পোষাক পরিধান করতেনযখন নামাজের সময় হতো তখন একেবারে উপরের  নীচের পোষাক খুলে নিতেন এবং মাঝেরটা পরে নামাজ পড়তেন। এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলতেনউপরের পোষাক দুনিয়ার মলিনতায় মলিন। নীচের পোষাক শরীরের ময়লায় দূষিতকিন্তু মাঝের পোষাকটি উভয় প্রকার দোষমুক্ত এবংএজন্যই আমি মাঝের পোষাক দ্বারা নামাজ সমাধান করতে উত্তম মনে করি। এরপর হযরত শায়খুল ইসলামের চোখ অশ্রুতে ভরে উঠলো। তিনি বললেনপূর্ববর্তীগণ এরূপ সংগ্রামকরেই উচ্চ  শ্রেষ্ঠতর স্তরে পৌঁছেছে।  পর্যন্ত বলার পর পরবর্তী নামাজের সময় হয়ে গেলো। তিনি নামাজে নিমগ্ন হলেন। মজলিস বরখাস্ত (শেষহলো।
-আল্লহামদু লিল্লাহি আলা জালিক।

পরবর্তী পর্ব —
শবেমেরাজ ও তার ফজিলত 

জেকের (রাহাতুল ক্বুলুব )



জেকের 
📚রাহাতুল ক্বুলুব ✍🏻নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.) 

এরপর জেকের সম্বন্ধে আলোচনা শুরু হলো। তিনি বললেনআল্লাহতায়ালার জেকেরে এমনভাবে মশগুল হতে হয় যেন লোমকূপগুলো জেকেরের মুখ হয়ে যায়। 'ইসরারুল আরেফীনকিতাবে উল্লেখ রয়েছেহযরত খা'জা আবু সাঈদ আবুল খায়ের কুদ্দিস্সিররুহ এক সময় আল্লাহর জেকেরে এমনভাবে মশগুল ছিলেন যে প্রতিটি লোমের মূল হতে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল। তাঁর ভক্ত-খেদমতগারেরা তাঁর আসনের নীচে পেয়ালা সংস্থাপন করে রেখেছিলো। কারণপ্রবাহিত রক্ত যেন পেয়ালায় পতিত হয়। তাঁর জেকেরের হাল এমন ছিলো যে অল্প সময়ের মধ্যেই সে পেয়ালা রক্তে ভরে যাচ্ছিলো এবং ভক্তেরা তা পান করে ফেলছিলো।

পরবর্তী পর্ব —
দুনিয়াদার লোক পশমী পোষাক পড়া অনুচিত —

দুনিয়া ও আল্লাহর পথ পরষ্পর বিপরীতমুখি (রাহাতুল ক্বুলুব)


দুনিয়া ও আল্লাহর পথ পরষ্পর বিপরীতমুখি  


📚রাহাতুল ক্বুলুব ✍🏻নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.) 

খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) বলেন,
৬৫৫ হিজরী২রা রজববুধবার। আমি মুর্শিদের  কদমবুসির ঐশ্বর্য লাভ করলাম। শায়খ বোরহানউদ্দিন গজনবীশায়খ জামালউদ্দিন হাসবীমওলানা নাসেহউদ্দিন পেসরহাজী কাজী হামিদউদ্দিন নাগোরীমাওলানা শামসউদ্দিন বোরহান এবং অন্যান্য মাশায়েখীনে ইজাম রেদওয়ানাল্লাহ্তায়ালা আলাইহিম খেদমতে উপস্থিত ছিলেন। 
হুজুর (শেখ ফরিদ রহ.) এরশাদ করলেন যেহুজুর (সল্লাল্লহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছেন, – "দুনিয়া-প্রেম সমস্ত পাপের মূল।"
 অন্যত্র বলেন  - "যে ব্যক্তি দুনিয়া ত্যাগ করেছে সে ফেরেস্তা হয়ে গেছে এবং যে দুনিয়াকে আঁকড়িয়ে ধরেছে সে ধ্বংস হয়েছে।

হযরত সোহেল তসতরী হতে বর্ণিত আছে যে দুনিয়া এবং দুনিয়া-প্রেম হতে বড় কোন পর্দা (প্রতিবন্ধকতাআল্লাহ  তাঁর বান্দার মাঝে নেই। 

দুনিয়ার প্রতি যে যতটুকু আকৃষ্ট হবে সে ততটুকু আল্লাহ্ হতে দূরে থাকবে।  সম্বন্ধে একটা উপমা দিয়ে বললেন যেধর একটা লোক দাঁড়িয়ে আছেসে সম্মুখের সব কিছুই দেখতে পাচ্ছে কিন্তু সে যদি মুখ পিছনের দিকে ঘুরিয়ে নেয়তাহলে সে সামনের কিছুই দেখতে পাবে না। সুতরাং প্রত্যেকের উচিত দুনিয়ার প্রতি প্রেমাশক্ত না হওয়াযদি হয় তাহলে আল্লাহ্ হতে বিচ্ছিন্ন হবে।

এরপর এরশাদ করলেন যেআমি আমার পীর  মুর্শেদ হতে শুনেছি তিনি তাঁর উস্তাদের বরাত দিয়ে বলেছেনযখন মানুষ দুনিয়ার প্রেম হতে মুক্ত হওয়ার জন্য সংগ্রাম করে নিজের অন্তর-মনকে পবিত্র করে এবং আল্লাহ্ তায়ালার জেকেরে নিবদ্ধ হয় এবং সমস্ত কিছু হতে নিজেকে দূরে রাখে তখন আল্লাহ তায়ালার বন্ধুত্ব লাভ হয়। যদি এরূপ না করতে পারে তাহলে কস্মিনকালেও উদ্দেশ্য সফল হবে না। 

এরপর বললেনদেহের জন্য যেমন জীবন-মৃত্যু রয়েছে তেমনি হৃদয়ের জন্যও জীবন  মৃত্যু রয়েছে। দেহ হতে রূহ বেরিয়ে গেলে যেমন তাকে দাফন করতে হয়। কিন্তু অন্তরের মৃত্যু অন্য ধরনের।  সম্বন্ধে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, "দুনিয়ার প্রতি অত্যধিক আকৃষ্ট না হওয়া এবং আল্লাহতায়ালার জেকেরে নিমগ্ন থাকা।" 

এরপর এরশাদ করলেন, – যে মানুষের অন্তর কিন্তু এর বিপরীত। তারা সর্বদা উত্তম খাদ্যদ্রব্য ও পানীয়আনন্দ এবং কাম প্রবৃত্তিতে সমাবৃত হয়ে পড়ে। আলস্য তার উপর ভর করে এবং কামনা  বাসনার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েআল্লাহতায়ালার জেকের হতে নিবৃত হয়ে নানান কু-প্ররোচনায় পতিত হয় এবং  ভাবেই তাদের অন্তর অন্তঃসার শূন্য হয়ে পড়ে। অন্তরের এ অবস্থাকেই অন্তরের মৃত্যু বুঝায়। যেমন মাটিীতে ঝোপ-ঝাড়ের আধিক্যে আলো প্রবেশ দুর্ভেদ্য হয়সেখানে বীজ বপন করলে চারা গজায় না। অন্তরের অবস্থাও ঠিক এরূপই হয়ে থাকে। পূর্ব হতে সেখানে কু-প্রবৃত্তি প্রাধান্য বিস্তার করে আল্লাহতায়ালার খেয়াল হতে বিমুখ হয়ে পড়েছে। যে অন্তরে একমাত্র আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কিছু প্রাধান্য পায় না সে অন্তরই জীবিত এবং এমন অন্তরই উজ্জ্বল অন্তরের দৃষ্টান্ত। 

এরপর এরশাদ করলেন যে, “উমদাহ” কিতাবেব র্ণিত আছে যেহযরত জোনায়েদ বোগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন পথ হচ্ছে পবিত্র হৃদয়ের পথ। পবিত্র হৃদয় একজনের তখনই অর্জন হয় যখন সে দুনিয়ার সমস্ত কিছুকে বর্জন করে এবং সমস্ত লোভ লালসা আশা-আকাঙ্খাকে বিসর্জন দিয়ে পবিত্র হয়। দরবেশদের আমল  দরবেশী এরূপই হওয়া উচিত।  কথা বলতে বলতে হযরত শায়খুল ইসলামের চোখ অশ্রুতে ভরে উঠলো এবং তিনি বললেন যেযে দরবেশ দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তাঁরসত্বাকে দুনিয়ার নিকট বিলিয়ে দেয় সে কখনও দরবেশ হতে পারে না বরং সে দরবেশ-নামের কলঙ্ক এবং তরীকত পন্থীদের মধ্যে আগাছা স্বরূপ। কেননা তার মাঝে দুনিয়ার আবর্জনা প্রবেশ করেছে। 

এরপর এরশাদ করলেন যেবাগদাদে খা'জা আযল শিরাজী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মজলিসে শুনেছিলামতিনি হযরত সৈয়দ আত্তায়েফা রচিত “উমদাহ” কিতাবের বর্ণনা হতে বলেছিলেন যেদরবেশদেরকে দুনিয়া এবং দুনিয়াদারদের সাথে সংস্রব রাখা হারাম। এরপর এরশাদ করলেন যেএকবার ইরাকের বাদশাহ এমন কঠিন রোগেআক্রান্ত হলো যে একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লো এবং এভাবে তিন বছর অতিবাহিত হলো।বাদশাহ হযরত শোহেল তসতরী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর স্মরণাপন্ন হলো। খা'জা সোহেল তসতরী রহমতুল্লাহি আলাইহি বাদশাহের নিকট গমন করে নিজের হাত বাদশাহের শরীরে রাখতেই আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর হাতের সম্মানে তাকে রোগমুক্ত করলেন। 

হযরত আবদুল্লাহ্ শোহেল তসতরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর  কাজের কাফ্ফারা স্বরূপ সাত বছর পর্যন্ত দুনিয়াদারদের নিকট হতে দূরে সড়ে রইলেন।

 এরপর হযরত শায়খুল ইসলাম রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন যেবুজুর্গানে-দ্বীন  তরীকার পীরগণের নির্দেশ রয়েছে- "ধনীদের সঙ্গ ফকিরদের জন্য প্রাণনাশক যহর তুল্য।

অর্থাৎ ধনীদের সঙ্গ হতে  দুনিয়ার সংস্রব হতে যথাসম্ভব বেঁচে থাকো। যে ব্যক্তি দুনিয়ারসাথে প্রেম করে তার বন্ধুত্ব গ্রহণ করবে না। কেননাদুনিয়া-প্রেম তার অন্তরে অস্ত্র হয়ে বসে আছে। যে তার সাথে প্রেম করবে সেও আক্রান্ত হবে। 

সম্মানিত সুফিগণ বলেন যেযে দরবেশের অন্তরে দুনিয়ার প্রতি সামান্যতম প্রেমও দেখা যাবে যে "মরদুদে তরীকত” অর্থাৎ পথে সে বিশ্বাসঘাতক।

পরবর্তী পর্ব —
জেকের 

প্রকৃত দরবেশের গুনাবলী (রাহাতুল ক্বুলুব)



প্রকৃত দরবেশের গুনাবলী  

📚রাহাতুল ক্বুলুব ✍🏻নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.) 

 খাজা নিজামুদ্দিন (রহ.) বলেন ৬৫৫ হিজরীর ১৬ই রজব, সোমবার। মুর্শিদের কদমবুসির ঐশ্বর্য লাভ করলাম। শায়খ বদরুদ্দিন গজনবী, শায়খ জামালউদ্দিন হাছবী, মাওলানা শরফউদ্দিন নিবিয়াই ও কাজী হামিউদ্দিন নাগোরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারাও খেদমতে হাজির ছিলেন। হুজুর (শেখ ফরিদ গঞ্জশেখর রহ.) এরশাদ করলেন, দরবেশদের নিকট ধনী-দরিদ্র যে কেউ আসুক তাঁর উচিত কাউকে নিরাশ না করা, যা কিছু উপস্থিত থাকে তা তাদেরকে প্রদান করা। 

এরপর বললেন যে, অনেকে আছে যারা আমার নিকট কিছু নজর নিয়ে আসে, কিন্তু যদি কোন ফকির শূন্য হাতে আসে তাহলে আমার জন্য ফরজ হয়ে যায় তাকে কিছু দান করা। 

এবার তাঁর চোখ অশ্রুশিক্ত হয়ে উঠলো। তিনি পুনরায় বলতে লাগলেন, হযরত রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট সাহাবাগণ আসতেন এবং যে সব উপদেশ, আদেশ, নিষেধ, নির্দেশ ও জ্ঞান অর্জন করতেন সে সব তাঁরা তাঁদের অনুপস্থিত ভাইদের নিকট বলতেন এবং সে সমস্ত পালনের জন্য উপদেশ দিতেন। 

এরপর বললেন শহীদুল মুহাব্বাত হযরত খাজা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) -এর নিয়ম ছিলো, যেদিন তাঁর লঙ্গরখানায় কোন প্রকার খাদ্য দ্রব্য মওজুত থাকতোনা সেদিন তিনি খানকার খাদিম শায়খ বদরুদ্দিন গজনবীকে বলতেন যদি পানি মওজুদ থেকে থাকে তাহলে পানিই পরিবেশন কর। কেননা এ দিনটিও যেন অনুগ্রহ ও দান হতে বাদ না পড়ে। 

এরপর এরশাদ করলেন, বাগদাদ এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় যখন আমি ভ্রমণ করেছি তখন খাজা আযল সিরাজী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিলো। আমি তাঁকে সালাম পেশ করলাম তিনি সালামের জবাব দিয়ে মুসাফাহ (ইসলামী কায়দায় করমর্দন) করলেন এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন–
"হে লঙ্গর বিশারদ পবিত্র তব আগমন”

আমি এ কথা শুনে বসে গেলাম। তিনি তাঁর কৃপা ও দয়া দ্বারা আমার সম্বন্ধে আরও অনেক কিছু বর্ণনা করলেন। তাঁর অভ্যাসের মধ্যে দেখলাম তিনি অভ্যাগতদেরকে শূন্য হস্তে বিদায় দেন না। বিশেষ করে আমি কখনও দেখলাম না যে কোন আগন্তুক তাঁর নিকট হতে খালি হাতে গেলো। 

যখন কিছুই থাকতোনা তখন তিনি নিজের শুকনো খোরমা হতে দান করতেন। আমার বিদায় সময়ে তিনি দোয়া করলেন,– “আল্লাহ্ তায়ালা তোমার রিজিক্ বৃদ্ধি করুন।” আমি ফেরার পথে শুনতে পেলাম তিনি 'বাক্সিদ্ধ মহাপুরুষ' যাকে যখন যা বলেন সাথে সাথে তাই হয়ে যায়। এমন কি এ দোয়া তার পরবর্তী বংশধরদের পর্যন্তও স্থায়ী থকে। 

ঐ অঞ্চলে আরও একজন খ্যাতনামা বুজুর্গ ছিলেন। তাঁর সাথেও আমার সাক্ষাৎ হয়েছিলো; সৌজন্য বাক্য বিনিময়ের পর তিনি আমাকে বসতে বললেন, আমি তার আদেশ পালন করলাম। তাঁর বাসস্থান ছিলো জনকোলাহল হতে বহু দূরে, নির্জনে; যেখানে পশু পাখির আনাগুনাও ছিলোনা। এ অবস্থা দেখে আমার মনে প্রশ্ন জাগলো, এ বুজুর্গ এ নির্জনস্থানে কেন বাস করছেন এবং এর উদ্দেশ্যই বা কি? 

এ প্রশ্ন আমার মন হতে অন্তর্ধান না হতেই তিনি আমার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, “হে ফরিদ, ৪০ বছর অতিবাহিত হলো আমি এ বিজন গুহায় বাস করছি। জঞ্জাল ও আবর্জনা প্রীতি এড়ানো ভিন্ন অন্য কোন উদ্দেশ্য এর পিছনে নেই।' 

আমি তাঁর সুতীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি (কাশফ) অবলোকন করে বিহ্বল হয়ে তাঁর কদম মোবারকে মাথা রাখলাম এবং কিছুদিন তাঁর খেদমতে কাটালাম। 

এরপর সেখান থেকে বোখারার দিকে রওয়ানা হলাম। বোখারায় শায়খ সায়ফউদ্দিন বাখিরজী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সাথে সাক্ষাৎ হলো, তিনি অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের বুজুর্গ ছিলেন। তাঁর মজলিসে প্রবেশ করে সালাম নিবেদন করলাম। তিনি বসার জন্য নির্দেশ দিলে বসে পড়লাম।

 তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এ ছেলে একদিন সাহেবে খাল্কা (দরবেশী আশ্রমের অধিশ্বর) হবে। একটু পরে তাঁর পবিত্র কাঁধে রক্ষিত কম্বলটি নামিয়ে আমাকে দান করলেন এবং বললেন, এ গলীম (পশমী কম্বল) গায়ে জড়িয়ে নাও। 

আমি তাঁর এ নির্দেশকে সৌভাগ্য মনে করে পালন করলাম এবং কিছু দিন তাঁর খেদমতে অতিবাহিত করলাম। এর মধ্যে এমন কোনদিন দেখলাম না যেদিন এক হাজার লোকের কম তাঁর দস্তরখানে আহার করে এবং আগন্তুকদের মধ্য হতে কেউ নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 

এর পর আমি সেখান হতে রওয়ানা হয়ে এক মসজিদে রাত্রি যাপন করলাম। শুনতে পেলাম সেখানে ইবাদতখানায় এক বুজুর্গ বাস করেন। আমি শুনামাত্র তাঁর খেদমতে উপস্থিত হলাম এবং মহামান্যের দর্শনে ভাগ্যবান হলাম। 

তিনি তখন ধ্যানমগ্ন হয়ে ঐশী-অচৈতন্য-লোকে দণ্ডায়মান ছিলেন। চার দিন পর তিনি চেতনার জগতে ফিরে এলেন। আমি সালাম আরজ করলাম। তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেন, তুমি আমার জন্য অনেক কষ্ট ভোগ করেছো, এখন বসো। 

আমি তাঁর নির্দেশ পালন করলাম। তিনি তাঁর নিজের কথা বলতে লাগলেন, "আমি হযরত শাদ্দিনের বংশধর। ত্রিশ বছর যাবৎ এখানে বাস করছি। হে ফরিদ, এ ৩০ বছরে ভয় ও ভীতি ছাড়া আর কিছুই অর্জন করতে পারিনি। আমার বিশ্বাস তুমি এর কারণ বুঝতে পেরেছো।” 

আমি বললাম, আপনার কথার তাৎপর্য বুঝতে পারিনি, দয়া করে জ্ঞান দান করলে বাধিত হব। তিনি বললেন, এটা একটা ব্যতিক্রমধর্মী পথ। যে ব্যক্তি এ পথে পা রেখেছে সে মঞ্জিলে মাকসুদে পৌঁছে গেছে। বন্ধুর মিলন সে লাভ করবে। যদি এ পথে বন্ধুর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ পা রাখে তাহলে সে জ্বলে যাবে। 

এরপর বললেন, যেদিন আমার ইলাহির বন্ধুত্ব হাসেল হলো সেদিন আমার ও আল্লাহ্ তায়ালার মাঝে ৭০ হাজার পর্দা ছিলো। আওয়াজ হলো সামনে এসো, তখন প্রথম পর্দা উঠে গেল। দেখলাম একটা দরবারে বন্ধুর সহচর নিজের দৃষ্টি ঊর্ধ্বে নিবদ্ধ রেখেছে এবং বলছে আমি তোমার দর্শন প্রার্থী। এর পর দ্বিতীয় পর্দা উঠে গেলো, সেখানেও একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। এমনিভাবে যখন খাস ও প্রকৃত পর্দার নিকট পৌঁছলাম তখন আওয়াজ হলো, হে অমুক, এ পর্দা সেই উন্মোচন করতে পারে যে দুনিয়াকে ত্যাগ করে নিজের অস্তিত্ব হতে ভিন্ন হয়ে আমার সাথে সম্বন্ধ স্থাপন করতে চায়। 
আমি আরজ করলাম, আমি সব কিছুকে বর্জন করেছি। আওয়াজ হলো, যদি তুমি সকল জিনিস ত্যাগ করে থাক তাহলে তুমি আমারও বন্ধু হলে! 
তারপর আমি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নিজেকে এ ইবাদতখানায় দেখতে পেলাম। হে ফরিদ, অবশ্যই বুঝতে পারছো যে, এ পথে সমস্ত কিছু ত্যাগ করেই আল্লাহ্ তায়ালার আপন ও বন্ধু হতে হয়। 

এরপর হযরত শায়খুল ইসলাম শায়খ ফরিদ উদ্দিন গঞ্জেশকর্ রহমতুল্লাহি আলাইহি এরশাদ করলেন যে, তাঁর সাথে এ সব কথাবার্তায় সন্ধ্যা নেমে এলো, আমি তাঁর সঙ্গে এক সাথে নামাজ পড়লাম। নামাজ শেষ হওয়ার পর দেখতে পেলাম অদৃশ্যলোক হতে চারটে রুটী ও দু' পেয়ালা ঝুল (সুরওয়া) নেমে এলো। তিনি আমাকে আহার করার জন্য নির্দেশ দিলেন। আমি এক সঙ্গে তাঁর সাথে ঐ খাবার খেলাম সে খাবারের স্বাদ অকল্পনীয় ও অভূতপূর্ব ছিলো, যা আজও আমি অন্য কোন খাবারের মাঝে পাইনি। আমি সে রাত সেখানেই কাটালাম। 

পরে সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে মুলতান পৌঁছলাম। শ্রদ্ধেয় মাওলানা বাহাউদ্দিন যাকারিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। তিনি আমার সাথে হাত মুসাফা করে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি স্বীয় কর্মে কতদূর অগ্রসর হয়েছো? 
আমি উত্তরে বললাম, আমার কর্মের পূর্ণতা এ পর্যন্ত পৌঁছেছে যে, যদি আমি এ চেয়ারটিকে, যেটায় আপনি উপবিষ্ট আছেন, উড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেই তাহলে সাথে সাথে সে হাওয়ার উপর ভর করে চলতে থাকবে। এ কথা আমার মুখ থেকে সম্পূর্ণ নির্গত হওয়ার পূর্বেই চেয়ারটি মাওলানাকে সহ হাওয়ায় ভাসতে লাগলো। 
হযরত বাহাউদ্দিন যাকারিয়া নিজের হাত চেয়ারের উপর মেরে নির্দেশ দিলেন নীচে নেমে যাও। কিন্তু চেয়ার তাঁর নির্দেশ মানলো না। পরে তিনি আমাকে বললেন। তুমি অত্যন্ত উচ্চ স্থানে পৌঁছেছ। 

আমি সেখান থেকে বিদায় নিয়ে দিল্লী গেলাম। দিল্লীতে আমি কয়েকদিন বিশ্রাম নিলাম। আমি হযরত খাজা শায়খ কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী আউশী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর গোলামী হাসিল করেছি এবং এ গোলামীর মাধ্যমে যে আজমত ও নিয়ামত লাভ করেছি তা এ সব সফরের কোন ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে লাভ করতে পারিনি। আমি তাঁর মুরীদ হলাম। 

তৃতীয় দিনে তিনি তাঁর দয়া ও করুণার দ্বার আমার জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন এবং বললেন, ফরিদ স্বীয় কর্মে পরিপূর্ণতা (কামালিয়াত) অর্জন করার পর আমার নিকট এসেছে। তিনি এ কথা বর্ণনা করার সময় এতো জোরে চিৎকার করে উঠলেন যে বেহুশ হয়ে গেলেন। 

তিন দিন পর যখন জ্ঞান ফিরে পেলেন তখন আমার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, আল্লাহ্ তায়ালার বীর পুরুষগণ বহু বুজুর্গের সঙ্গ ও নৈকট্যলাভের সৌভাগ্য অর্জন করার পরই এমন উচ্চাসনে স্থান পেয়েছে। এ সৌভাগ্যের পথ সমস্ত বনি আদমের জন্যই উন্মুক্ত রয়েছে এবং আল্লাহ্ তায়ালার আশীষও সকলের জন্যই খোলা আছে কিন্তু গ্রহণকারীকে বীরদীপ্ত হতে হয়, যাতে সে জীবনের সাথে সংগ্রাম করে উচ্চারোহণের সোপানগুলো অতিক্রম করতে পারে। 

এরপর এরশাদ করলেন, এ পথে ভ্রমণ করবে আন্তরিকতার সাথে, যে পদক্ষেপ হবে সিদ্দিকের মতো আর চর্মচক্ষু ব্যতীত অবলোকন করবে। তা না হলে কোন অবস্থাতেই নৈকট্যের স্তরে পৌঁছতে পারবে না। এরপর তিনি নিম্নোক্ত রূবাই পাঠ করলেন।

অনুবাদ-
"তুমি রাস্তায় চল নাই তাই তুমি দেখ নাই, 
দরজায় আঘাত না হানলে সেটা খুলবে না। 
বন্ধুর পথে প্রাণ দিতে ডাকলে প্রত্যাবর্তন করো না, 
যদি এমন হও তবেই তাঁকে পাবে।"

হযরত শায়খুল ইসলাম পুনঃপুনঃ এ রূবাই আবৃত্তি করতে লাগলেন এবং প্রতিবারই আবৃত্তি শেষ করে মাথা সেজদাবনত করে রাখতেন। পুনরায় মাথা উত্তোলন করে আবার সেটা পাঠ করতেন এবং আবার সেজদাবনত হতেন। এ রকম করতে করতে যোহরের নামাজের সময় হয়ে গেলো। মুয়াজ্জেন আজান দিলে তিনি উঠে যেয়ে নামাজে নিবিষ্ট হলেন। মজলিস শেষ হলো।
-আল্লহামদু লিল্লাহি আলা জালিক। 

পরবর্তী পর্ব —
দুনিয়া ও আল্লাহর পথ পরষ্পর বিপরীতমুখি  

__