প্রকৃত দরবেশের গুনাবলী (রাহাতুল ক্বুলুব)



প্রকৃত দরবেশের গুনাবলী  

📚রাহাতুল ক্বুলুব ✍🏻নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.) 

 খাজা নিজামুদ্দিন (রহ.) বলেন ৬৫৫ হিজরীর ১৬ই রজব, সোমবার। মুর্শিদের কদমবুসির ঐশ্বর্য লাভ করলাম। শায়খ বদরুদ্দিন গজনবী, শায়খ জামালউদ্দিন হাছবী, মাওলানা শরফউদ্দিন নিবিয়াই ও কাজী হামিউদ্দিন নাগোরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারাও খেদমতে হাজির ছিলেন। হুজুর (শেখ ফরিদ গঞ্জশেখর রহ.) এরশাদ করলেন, দরবেশদের নিকট ধনী-দরিদ্র যে কেউ আসুক তাঁর উচিত কাউকে নিরাশ না করা, যা কিছু উপস্থিত থাকে তা তাদেরকে প্রদান করা। 

এরপর বললেন যে, অনেকে আছে যারা আমার নিকট কিছু নজর নিয়ে আসে, কিন্তু যদি কোন ফকির শূন্য হাতে আসে তাহলে আমার জন্য ফরজ হয়ে যায় তাকে কিছু দান করা। 

এবার তাঁর চোখ অশ্রুশিক্ত হয়ে উঠলো। তিনি পুনরায় বলতে লাগলেন, হযরত রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট সাহাবাগণ আসতেন এবং যে সব উপদেশ, আদেশ, নিষেধ, নির্দেশ ও জ্ঞান অর্জন করতেন সে সব তাঁরা তাঁদের অনুপস্থিত ভাইদের নিকট বলতেন এবং সে সমস্ত পালনের জন্য উপদেশ দিতেন। 

এরপর বললেন শহীদুল মুহাব্বাত হযরত খাজা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) -এর নিয়ম ছিলো, যেদিন তাঁর লঙ্গরখানায় কোন প্রকার খাদ্য দ্রব্য মওজুত থাকতোনা সেদিন তিনি খানকার খাদিম শায়খ বদরুদ্দিন গজনবীকে বলতেন যদি পানি মওজুদ থেকে থাকে তাহলে পানিই পরিবেশন কর। কেননা এ দিনটিও যেন অনুগ্রহ ও দান হতে বাদ না পড়ে। 

এরপর এরশাদ করলেন, বাগদাদ এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় যখন আমি ভ্রমণ করেছি তখন খাজা আযল সিরাজী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিলো। আমি তাঁকে সালাম পেশ করলাম তিনি সালামের জবাব দিয়ে মুসাফাহ (ইসলামী কায়দায় করমর্দন) করলেন এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন–
"হে লঙ্গর বিশারদ পবিত্র তব আগমন”

আমি এ কথা শুনে বসে গেলাম। তিনি তাঁর কৃপা ও দয়া দ্বারা আমার সম্বন্ধে আরও অনেক কিছু বর্ণনা করলেন। তাঁর অভ্যাসের মধ্যে দেখলাম তিনি অভ্যাগতদেরকে শূন্য হস্তে বিদায় দেন না। বিশেষ করে আমি কখনও দেখলাম না যে কোন আগন্তুক তাঁর নিকট হতে খালি হাতে গেলো। 

যখন কিছুই থাকতোনা তখন তিনি নিজের শুকনো খোরমা হতে দান করতেন। আমার বিদায় সময়ে তিনি দোয়া করলেন,– “আল্লাহ্ তায়ালা তোমার রিজিক্ বৃদ্ধি করুন।” আমি ফেরার পথে শুনতে পেলাম তিনি 'বাক্সিদ্ধ মহাপুরুষ' যাকে যখন যা বলেন সাথে সাথে তাই হয়ে যায়। এমন কি এ দোয়া তার পরবর্তী বংশধরদের পর্যন্তও স্থায়ী থকে। 

ঐ অঞ্চলে আরও একজন খ্যাতনামা বুজুর্গ ছিলেন। তাঁর সাথেও আমার সাক্ষাৎ হয়েছিলো; সৌজন্য বাক্য বিনিময়ের পর তিনি আমাকে বসতে বললেন, আমি তার আদেশ পালন করলাম। তাঁর বাসস্থান ছিলো জনকোলাহল হতে বহু দূরে, নির্জনে; যেখানে পশু পাখির আনাগুনাও ছিলোনা। এ অবস্থা দেখে আমার মনে প্রশ্ন জাগলো, এ বুজুর্গ এ নির্জনস্থানে কেন বাস করছেন এবং এর উদ্দেশ্যই বা কি? 

এ প্রশ্ন আমার মন হতে অন্তর্ধান না হতেই তিনি আমার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, “হে ফরিদ, ৪০ বছর অতিবাহিত হলো আমি এ বিজন গুহায় বাস করছি। জঞ্জাল ও আবর্জনা প্রীতি এড়ানো ভিন্ন অন্য কোন উদ্দেশ্য এর পিছনে নেই।' 

আমি তাঁর সুতীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি (কাশফ) অবলোকন করে বিহ্বল হয়ে তাঁর কদম মোবারকে মাথা রাখলাম এবং কিছুদিন তাঁর খেদমতে কাটালাম। 

এরপর সেখান থেকে বোখারার দিকে রওয়ানা হলাম। বোখারায় শায়খ সায়ফউদ্দিন বাখিরজী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সাথে সাক্ষাৎ হলো, তিনি অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের বুজুর্গ ছিলেন। তাঁর মজলিসে প্রবেশ করে সালাম নিবেদন করলাম। তিনি বসার জন্য নির্দেশ দিলে বসে পড়লাম।

 তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এ ছেলে একদিন সাহেবে খাল্কা (দরবেশী আশ্রমের অধিশ্বর) হবে। একটু পরে তাঁর পবিত্র কাঁধে রক্ষিত কম্বলটি নামিয়ে আমাকে দান করলেন এবং বললেন, এ গলীম (পশমী কম্বল) গায়ে জড়িয়ে নাও। 

আমি তাঁর এ নির্দেশকে সৌভাগ্য মনে করে পালন করলাম এবং কিছু দিন তাঁর খেদমতে অতিবাহিত করলাম। এর মধ্যে এমন কোনদিন দেখলাম না যেদিন এক হাজার লোকের কম তাঁর দস্তরখানে আহার করে এবং আগন্তুকদের মধ্য হতে কেউ নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 

এর পর আমি সেখান হতে রওয়ানা হয়ে এক মসজিদে রাত্রি যাপন করলাম। শুনতে পেলাম সেখানে ইবাদতখানায় এক বুজুর্গ বাস করেন। আমি শুনামাত্র তাঁর খেদমতে উপস্থিত হলাম এবং মহামান্যের দর্শনে ভাগ্যবান হলাম। 

তিনি তখন ধ্যানমগ্ন হয়ে ঐশী-অচৈতন্য-লোকে দণ্ডায়মান ছিলেন। চার দিন পর তিনি চেতনার জগতে ফিরে এলেন। আমি সালাম আরজ করলাম। তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেন, তুমি আমার জন্য অনেক কষ্ট ভোগ করেছো, এখন বসো। 

আমি তাঁর নির্দেশ পালন করলাম। তিনি তাঁর নিজের কথা বলতে লাগলেন, "আমি হযরত শাদ্দিনের বংশধর। ত্রিশ বছর যাবৎ এখানে বাস করছি। হে ফরিদ, এ ৩০ বছরে ভয় ও ভীতি ছাড়া আর কিছুই অর্জন করতে পারিনি। আমার বিশ্বাস তুমি এর কারণ বুঝতে পেরেছো।” 

আমি বললাম, আপনার কথার তাৎপর্য বুঝতে পারিনি, দয়া করে জ্ঞান দান করলে বাধিত হব। তিনি বললেন, এটা একটা ব্যতিক্রমধর্মী পথ। যে ব্যক্তি এ পথে পা রেখেছে সে মঞ্জিলে মাকসুদে পৌঁছে গেছে। বন্ধুর মিলন সে লাভ করবে। যদি এ পথে বন্ধুর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ পা রাখে তাহলে সে জ্বলে যাবে। 

এরপর বললেন, যেদিন আমার ইলাহির বন্ধুত্ব হাসেল হলো সেদিন আমার ও আল্লাহ্ তায়ালার মাঝে ৭০ হাজার পর্দা ছিলো। আওয়াজ হলো সামনে এসো, তখন প্রথম পর্দা উঠে গেল। দেখলাম একটা দরবারে বন্ধুর সহচর নিজের দৃষ্টি ঊর্ধ্বে নিবদ্ধ রেখেছে এবং বলছে আমি তোমার দর্শন প্রার্থী। এর পর দ্বিতীয় পর্দা উঠে গেলো, সেখানেও একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। এমনিভাবে যখন খাস ও প্রকৃত পর্দার নিকট পৌঁছলাম তখন আওয়াজ হলো, হে অমুক, এ পর্দা সেই উন্মোচন করতে পারে যে দুনিয়াকে ত্যাগ করে নিজের অস্তিত্ব হতে ভিন্ন হয়ে আমার সাথে সম্বন্ধ স্থাপন করতে চায়। 
আমি আরজ করলাম, আমি সব কিছুকে বর্জন করেছি। আওয়াজ হলো, যদি তুমি সকল জিনিস ত্যাগ করে থাক তাহলে তুমি আমারও বন্ধু হলে! 
তারপর আমি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নিজেকে এ ইবাদতখানায় দেখতে পেলাম। হে ফরিদ, অবশ্যই বুঝতে পারছো যে, এ পথে সমস্ত কিছু ত্যাগ করেই আল্লাহ্ তায়ালার আপন ও বন্ধু হতে হয়। 

এরপর হযরত শায়খুল ইসলাম শায়খ ফরিদ উদ্দিন গঞ্জেশকর্ রহমতুল্লাহি আলাইহি এরশাদ করলেন যে, তাঁর সাথে এ সব কথাবার্তায় সন্ধ্যা নেমে এলো, আমি তাঁর সঙ্গে এক সাথে নামাজ পড়লাম। নামাজ শেষ হওয়ার পর দেখতে পেলাম অদৃশ্যলোক হতে চারটে রুটী ও দু' পেয়ালা ঝুল (সুরওয়া) নেমে এলো। তিনি আমাকে আহার করার জন্য নির্দেশ দিলেন। আমি এক সঙ্গে তাঁর সাথে ঐ খাবার খেলাম সে খাবারের স্বাদ অকল্পনীয় ও অভূতপূর্ব ছিলো, যা আজও আমি অন্য কোন খাবারের মাঝে পাইনি। আমি সে রাত সেখানেই কাটালাম। 

পরে সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে মুলতান পৌঁছলাম। শ্রদ্ধেয় মাওলানা বাহাউদ্দিন যাকারিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। তিনি আমার সাথে হাত মুসাফা করে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি স্বীয় কর্মে কতদূর অগ্রসর হয়েছো? 
আমি উত্তরে বললাম, আমার কর্মের পূর্ণতা এ পর্যন্ত পৌঁছেছে যে, যদি আমি এ চেয়ারটিকে, যেটায় আপনি উপবিষ্ট আছেন, উড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেই তাহলে সাথে সাথে সে হাওয়ার উপর ভর করে চলতে থাকবে। এ কথা আমার মুখ থেকে সম্পূর্ণ নির্গত হওয়ার পূর্বেই চেয়ারটি মাওলানাকে সহ হাওয়ায় ভাসতে লাগলো। 
হযরত বাহাউদ্দিন যাকারিয়া নিজের হাত চেয়ারের উপর মেরে নির্দেশ দিলেন নীচে নেমে যাও। কিন্তু চেয়ার তাঁর নির্দেশ মানলো না। পরে তিনি আমাকে বললেন। তুমি অত্যন্ত উচ্চ স্থানে পৌঁছেছ। 

আমি সেখান থেকে বিদায় নিয়ে দিল্লী গেলাম। দিল্লীতে আমি কয়েকদিন বিশ্রাম নিলাম। আমি হযরত খাজা শায়খ কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী আউশী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর গোলামী হাসিল করেছি এবং এ গোলামীর মাধ্যমে যে আজমত ও নিয়ামত লাভ করেছি তা এ সব সফরের কোন ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে লাভ করতে পারিনি। আমি তাঁর মুরীদ হলাম। 

তৃতীয় দিনে তিনি তাঁর দয়া ও করুণার দ্বার আমার জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন এবং বললেন, ফরিদ স্বীয় কর্মে পরিপূর্ণতা (কামালিয়াত) অর্জন করার পর আমার নিকট এসেছে। তিনি এ কথা বর্ণনা করার সময় এতো জোরে চিৎকার করে উঠলেন যে বেহুশ হয়ে গেলেন। 

তিন দিন পর যখন জ্ঞান ফিরে পেলেন তখন আমার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, আল্লাহ্ তায়ালার বীর পুরুষগণ বহু বুজুর্গের সঙ্গ ও নৈকট্যলাভের সৌভাগ্য অর্জন করার পরই এমন উচ্চাসনে স্থান পেয়েছে। এ সৌভাগ্যের পথ সমস্ত বনি আদমের জন্যই উন্মুক্ত রয়েছে এবং আল্লাহ্ তায়ালার আশীষও সকলের জন্যই খোলা আছে কিন্তু গ্রহণকারীকে বীরদীপ্ত হতে হয়, যাতে সে জীবনের সাথে সংগ্রাম করে উচ্চারোহণের সোপানগুলো অতিক্রম করতে পারে। 

এরপর এরশাদ করলেন, এ পথে ভ্রমণ করবে আন্তরিকতার সাথে, যে পদক্ষেপ হবে সিদ্দিকের মতো আর চর্মচক্ষু ব্যতীত অবলোকন করবে। তা না হলে কোন অবস্থাতেই নৈকট্যের স্তরে পৌঁছতে পারবে না। এরপর তিনি নিম্নোক্ত রূবাই পাঠ করলেন।

অনুবাদ-
"তুমি রাস্তায় চল নাই তাই তুমি দেখ নাই, 
দরজায় আঘাত না হানলে সেটা খুলবে না। 
বন্ধুর পথে প্রাণ দিতে ডাকলে প্রত্যাবর্তন করো না, 
যদি এমন হও তবেই তাঁকে পাবে।"

হযরত শায়খুল ইসলাম পুনঃপুনঃ এ রূবাই আবৃত্তি করতে লাগলেন এবং প্রতিবারই আবৃত্তি শেষ করে মাথা সেজদাবনত করে রাখতেন। পুনরায় মাথা উত্তোলন করে আবার সেটা পাঠ করতেন এবং আবার সেজদাবনত হতেন। এ রকম করতে করতে যোহরের নামাজের সময় হয়ে গেলো। মুয়াজ্জেন আজান দিলে তিনি উঠে যেয়ে নামাজে নিবিষ্ট হলেন। মজলিস শেষ হলো।
-আল্লহামদু লিল্লাহি আলা জালিক। 

পরবর্তী পর্ব —
দুনিয়া ও আল্লাহর পথ পরষ্পর বিপরীতমুখি  

No comments:

__