দুনিয়া ও আল্লাহর পথ পরষ্পর বিপরীতমুখি
📚রাহাতুল ক্বুলুব ✍🏻নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)
খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) বলেন,
৬৫৫ হিজরী, ২রা রজব, বুধবার। আমি মুর্শিদের কদমবুসির ঐশ্বর্য লাভ করলাম। শায়খ বোরহানউদ্দিন গজনবী, শায়খ জামালউদ্দিন হাসবী, মওলানা নাসেহউদ্দিন পেসর, হাজী কাজী হামিদউদ্দিন নাগোরী, মাওলানা শামসউদ্দিন বোরহান এবং অন্যান্য মাশায়েখীনে ইজাম রেদওয়ানাল্লাহ্তায়ালা আলাইহিম খেদমতে উপস্থিত ছিলেন।
হুজুর (শেখ ফরিদ রহ.) এরশাদ করলেন যে, হুজুর (সল্লাল্লহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছেন, – "দুনিয়া-প্রেম সমস্ত পাপের মূল।"
অন্যত্র বলেন - "যে ব্যক্তি দুনিয়া ত্যাগ করেছে সে ফেরেস্তা হয়ে গেছে এবং যে দুনিয়াকে আঁকড়িয়ে ধরেছে সে ধ্বংস হয়েছে।"
হুজুর (শেখ ফরিদ রহ.) এরশাদ করলেন যে, হুজুর (সল্লাল্লহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছেন, – "দুনিয়া-প্রেম সমস্ত পাপের মূল।"
অন্যত্র বলেন - "যে ব্যক্তি দুনিয়া ত্যাগ করেছে সে ফেরেস্তা হয়ে গেছে এবং যে দুনিয়াকে আঁকড়িয়ে ধরেছে সে ধ্বংস হয়েছে।"
হযরত সোহেল তসতরী হতে বর্ণিত আছে যে দুনিয়া এবং দুনিয়া-প্রেম হতে বড় কোন পর্দা (প্রতিবন্ধকতা) আল্লাহ ও তাঁর বান্দার মাঝে নেই।
দুনিয়ার প্রতি যে যতটুকু আকৃষ্ট হবে সে ততটুকু আল্লাহ্ হতে দূরে থাকবে। এ সম্বন্ধে একটা উপমা দিয়ে বললেন যে, ধর একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে, সে সম্মুখের সব কিছুই দেখতে পাচ্ছে কিন্তু সে যদি মুখ পিছনের দিকে ঘুরিয়ে নেয়, তাহলে সে সামনের কিছুই দেখতে পাবে না। সুতরাং প্রত্যেকের উচিত দুনিয়ার প্রতি প্রেমাশক্ত না হওয়া; যদি হয় তাহলে আল্লাহ্ হতে বিচ্ছিন্ন হবে।
এরপর এরশাদ করলেন যে, আমি আমার পীর ও মুর্শেদ হতে শুনেছি তিনি তাঁর উস্তাদের বরাত দিয়ে বলেছেন, যখন মানুষ দুনিয়ার প্রেম হতে মুক্ত হওয়ার জন্য সংগ্রাম করে নিজের অন্তর-মনকে পবিত্র করে এবং আল্লাহ্ তায়ালার জেকেরে নিবদ্ধ হয় এবং সমস্ত কিছু হতে নিজেকে দূরে রাখে তখন আল্লাহ তায়ালার বন্ধুত্ব লাভ হয়। যদি এরূপ না করতে পারে তাহলে কস্মিনকালেও উদ্দেশ্য সফল হবে না।
এরপর বললেন, দেহের জন্য যেমন জীবন-মৃত্যু রয়েছে তেমনি হৃদয়ের জন্যও জীবন ও মৃত্যু রয়েছে। দেহ হতে রূহ বেরিয়ে গেলে যেমন তাকে দাফন করতে হয়। কিন্তু অন্তরের মৃত্যু অন্য ধরনের। এ সম্বন্ধে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, "দুনিয়ার প্রতি অত্যধিক আকৃষ্ট না হওয়া এবং আল্লাহতায়ালার জেকেরে নিমগ্ন থাকা।"
এরপর এরশাদ করলেন, – যে মানুষের অন্তর কিন্তু এর বিপরীত। তারা সর্বদা উত্তম খাদ্যদ্রব্য ও পানীয়, আনন্দ এবং কাম প্রবৃত্তিতে সমাবৃত হয়ে পড়ে। আলস্য তার উপর ভর করে এবং কামনা ও বাসনার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, আল্লাহতায়ালার জেকের হতে নিবৃত হয়ে নানান কু-প্ররোচনায় পতিত হয় এবং এ ভাবেই তাদের অন্তর অন্তঃসার শূন্য হয়ে পড়ে। অন্তরের এ অবস্থাকেই অন্তরের মৃত্যু বুঝায়। যেমন মাটিীতে ঝোপ-ঝাড়ের আধিক্যে আলো প্রবেশ দুর্ভেদ্য হয়; সেখানে বীজ বপন করলে চারা গজায় না। অন্তরের অবস্থাও ঠিক এরূপই হয়ে থাকে। পূর্ব হতে সেখানে কু-প্রবৃত্তি প্রাধান্য বিস্তার করে আল্লাহতায়ালার খেয়াল হতে বিমুখ হয়ে পড়েছে। যে অন্তরে একমাত্র আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কিছু প্রাধান্য পায় না সে অন্তরই জীবিত এবং এমন অন্তরই উজ্জ্বল অন্তরের দৃষ্টান্ত।
এরপর এরশাদ করলেন যে, “উমদাহ” কিতাবেব র্ণিত আছে যে, হযরত জোনায়েদ বোগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, এ পথ হচ্ছে পবিত্র হৃদয়ের পথ। পবিত্র হৃদয় একজনের তখনই অর্জন হয় যখন সে দুনিয়ার সমস্ত কিছুকে বর্জন করে এবং সমস্ত লোভ লালসা আশা-আকাঙ্খাকে বিসর্জন দিয়ে পবিত্র হয়। দরবেশদের আমল ও দরবেশী এরূপই হওয়া উচিত। এ কথা বলতে বলতে হযরত শায়খুল ইসলামের চোখ অশ্রুতে ভরে উঠলো এবং তিনি বললেন যে, যে দরবেশ দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তাঁরসত্বাকে দুনিয়ার নিকট বিলিয়ে দেয় সে কখনও দরবেশ হতে পারে না বরং সে দরবেশ-নামের কলঙ্ক এবং তরীকত পন্থীদের মধ্যে আগাছা স্বরূপ। কেননা তার মাঝে দুনিয়ার আবর্জনা প্রবেশ করেছে।
এরপর এরশাদ করলেন যে, বাগদাদে খা'জা আযল শিরাজী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মজলিসে শুনেছিলাম, তিনি হযরত সৈয়দ আত্তায়েফা রচিত “উমদাহ” কিতাবের বর্ণনা হতে বলেছিলেন যে, দরবেশদেরকে দুনিয়া এবং দুনিয়াদারদের সাথে সংস্রব রাখা হারাম। এরপর এরশাদ করলেন যে, একবার ইরাকের বাদশাহ এমন কঠিন রোগেআক্রান্ত হলো যে একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লো এবং এভাবে তিন বছর অতিবাহিত হলো।বাদশাহ হযরত শোহেল তসতরী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর স্মরণাপন্ন হলো। খা'জা সোহেল তসতরী রহমতুল্লাহি আলাইহি বাদশাহের নিকট গমন করে নিজের হাত বাদশাহের শরীরে রাখতেই আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর হাতের সম্মানে তাকে রোগমুক্ত করলেন।
হযরত আবদুল্লাহ্ শোহেল তসতরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর এ কাজের কাফ্ফারা স্বরূপ সাত বছর পর্যন্ত দুনিয়াদারদের নিকট হতে দূরে সড়ে রইলেন।
এরপর হযরত শায়খুল ইসলাম রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন যে, বুজুর্গানে-দ্বীন ও তরীকার পীরগণের নির্দেশ রয়েছে- "ধনীদের সঙ্গ ফকিরদের জন্য প্রাণনাশক যহর তুল্য।
অর্থাৎ ধনীদের সঙ্গ হতে ও দুনিয়ার সংস্রব হতে যথাসম্ভব বেঁচে থাকো। যে ব্যক্তি দুনিয়ারসাথে প্রেম করে তার বন্ধুত্ব গ্রহণ করবে না। কেননা, দুনিয়া-প্রেম তার অন্তরে অস্ত্র হয়ে বসে আছে। যে তার সাথে প্রেম করবে সেও আক্রান্ত হবে।
সম্মানিত সুফিগণ বলেন যে, যে দরবেশের অন্তরে দুনিয়ার প্রতি সামান্যতম প্রেমও দেখা যাবে যে "মরদুদে তরীকত” অর্থাৎ এপথে সে বিশ্বাসঘাতক।
পরবর্তী পর্ব —
জেকের

No comments:
Post a Comment