সামা বা গান
📚রাহাতুল ক্বুলুব ✍🏻নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)
এ আলোচনা কালে হযরত শায়খ বদরুদ্দিন গজনবী রহমতুল্লাহি আলাইহি ছ'জন দরবেশসঙ্গে নিয়ে হুজুরের খেদমতে হাজির হলেন এবং হযরত শায়খুল ইসলামের সন্নিকটে বসে পড়লেন।
'সামা' বা গান সম্বন্ধে আলোচনা শুরু হলো। যে যার জ্ঞান অনুপাতে সামা সম্বন্ধে বর্ণনা করে যাচ্ছিলেন। হযরত শায়খুল ইসলাম. রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত জামালউদ্দিনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'সামা' অন্তরে শান্তি দান করে এবং প্রেমিকদেরকে গতিশীল করে ওপ্রেম-সমুদ্রে সাঁতার কাটা শিখায়। এর সাথে আরও বললেন যে, প্রেমিকদের রীতি হচ্ছে যখন তারা বন্ধুর নাম শুনে তখন সম্মান প্রদর্শন করার জন্য দাঁড়িয়ে যায়।
'সামা' বা গান সম্বন্ধে আলোচনা শুরু হলো। যে যার জ্ঞান অনুপাতে সামা সম্বন্ধে বর্ণনা করে যাচ্ছিলেন। হযরত শায়খুল ইসলাম. রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত জামালউদ্দিনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'সামা' অন্তরে শান্তি দান করে এবং প্রেমিকদেরকে গতিশীল করে ওপ্রেম-সমুদ্রে সাঁতার কাটা শিখায়। এর সাথে আরও বললেন যে, প্রেমিকদের রীতি হচ্ছে যখন তারা বন্ধুর নাম শুনে তখন সম্মান প্রদর্শন করার জন্য দাঁড়িয়ে যায়।
এরপর হযরত শায়খ বদরুদ্দিন গজনবী রহমতুল্লাহি আলাইহি জিজ্ঞেস করলেন, “সামার মধ্যেযে কিছু লোক বেহুশ হয়ে যায় তার কারণ কি?"
হুজুর এর উত্তরে বললেন যে, বেহুশী (অচৈতন্যতা) “আলাস্তু বে রাব্বেকুম" এর দিন হতেই শুরু হয়েছে। সমস্ত রুহ যখন আলাস্তু বে রাব্বেকুম শুনেছিলো তখনই কিছুরুহ প্রেমাকর্ষণে বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলো। সেই বেহুশীভাবই পুণরায় প্রেমাকর্ষণে তার মাঝে ঝংকারিত হয়।
টিকা -
[আল্লাহ্তায়ালা মানব জাতির সমস্ত রূহ্ সৃষ্টির পর তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিলো, "আলাস্তু বেরাব্বেকুম", আমি কি তোমাদের রব নই?]
এরপর সামস্ দবীর জমীনে চুমু খেয়ে আরজ করলেন, যেদিন আলাস্তু বে রাব্বেকুম বলা হয়েছিলো সেদিন কি সমস্ত রুহ একত্র ছিলো, না, পৃথক পৃথক ভাবে?
উত্তরে তিনি বললেন, সকলে একত্র ছিলো।
উত্তরে তিনি বললেন, সকলে একত্র ছিলো।
শাম্স্ দবীর দ্বিতীয় বার আরজ করলেন, তাহলে এতো যুদ্ধ বিগ্রহ দলাদলি রেশারেশি ও বিভিন্ন মতাবলম্বী লোক কেন?
শায়খুল ইসলাম এর উত্তরে বললেন, ইমাম মুহম্মদ গায্যালী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর পুস্তকে লিখেছেন, যখন আল্লাহতায়ালা বললেন 'আলাস্তু বে রাব্বেকুম' তখন সমস্ত রুহ চারটি শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়লো।
১ম শ্রেণীতে যারা ছিলেন তাঁরা অন্তর ও মুখ দিয়ে বলেছিলেন, 'বালা' অর্থাৎ 'হাঁ, এবংসেজদাবনত হলেন। এ রুহগুলো আম্বিয়া, আউলিয়া ও শহীদানদের মর্যাদা লাভ করে।
২য় শ্রেণীতে যারা ছিলো তারা অন্তর দিয়ে বললো এবং সেজদা করলো কিন্তু মুখ দিয়েবললোনা। এ রুহগুলো কাফের (আল্লাহকে অস্বীকারকারী) ও অন্যান্য বেদ্বীনদের ঘরে জন্মনেয় কিন্তু পরবর্তীতে তারা মুসলমান হয়।
৩য় শ্রেণীতে যারা ছিলো তারা মুখে 'বালা' বলছে এবং সেজদা করেছে কিন্তু অন্তর দিয়েবলেনি। এসব রুহ মুসলমানদের ঘরে মুসলমান হয়েই জন্ম নেয় কিন্তু পরে পথভ্রষ্ট ওবিপথগামী হয়। সর্বশেষে কাফের হয়ে দোজখ ভোগ করবে।
৪র্থ শ্রেণীর রুহগুলো 'বালা' بَلَى না মুখে বলেছে না অন্তরে। এমনকি তারা সেজদাও করেনি। এরা কাফের ও নাস্তিক হয়ে জন্ম নেয় এবং কাফের ও নাস্তিক হয়েই মৃত্যু বরণ করবে।
হযরত শায়খুল ইসলাম এরপর পুনরায় সামার প্রসঙ্গে ফিরে এসে বললেন, যে সব প্রেমিক সামা শ্রবণ করে বেহুঁশ হয়, তারা ঐ দিনও বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলো। সেই বেহুঁশী হতেই এবেহুঁশীর জন্ম। সেই বেহুঁশী এই বেহুঁশীর মাঝে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। যখন সে বন্ধুর নাম শ্রবণকরে তখন 'গতি, বিহ্বলতা, অচৈতন্যতা ও শান্তি, (হরকত, হয়রাত, বেহুঁশী ও যওক) এ চারজিনিস তার প্রেম-সাগরে তরঙ্গ হয়ে তার প্রেমবীণায় ঝংকার দিয়ে বাজতে থাকে। এ সব মা'রফাতের কারণেই ঘটে থাকে অর্থাৎ যে পর্যন্ত মা'রফাত হাসেল না হয় সে পর্যন্ত এ চারজিনিসের উপলব্ধি সে করতে পারে না। কোরান শরীফে আল্লাহ্পাক এরশাদ করেছেন-"ওয়ামা খালাকু জিন্না ওয়াল ইনসা ইল্লা লেইয়া'বুদুন"। অর্থাৎ-"আমি জিন এবং ইনসানকে সৃষ্টি করেছি আমার বন্দেগীর জন্য"।
ইমাম জাহেদ রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর তফসীরে বর্ণনা করেছেন, আহলে সুলুকদের নিকট 'লেইয়া'বুদুন' শব্দের তাৎপর্য হচ্ছে 'লে ইয়ারেফুন'- উদ্দেশ্য হচ্ছে বন্ধুর পরিচয় লাভ করা। যেপর্যন্ত আল্লাহকে চেনা না যাবে সে পর্যন্ত ভক্তি শ্রদ্ধায় কোন মজা পাওয়া যাবে না। প্রেমিকের অন্তর দিয়ে বিচার করলে দেখা যাবে যে, যখন একজন অপর জনের প্রতি আশেক হয় সে যেপর্যন্ত না মাশুককে দেখবে সে পর্যন্ত পূর্ণ আশেক হতে পারবে না।
অনুরূপভাবে এক বন্ধু যখন অন্য বন্ধুকে না দেখে ততক্ষণ পর্যন্ত বন্ধুত্ব মজবুত হয় না বা বন্ধুত্বই হয় না। তরীকত ও হকীকতেরও একই হুকুম: “যে পর্যন্ত আল্লাহ্ জাতের পরিচিতি না পাবে সেপর্যন্ত সে আউলিয়াদের অন্তর্ভূক্ত হতে পারবে না এবং যে পর্যন্ত কেউ নিজেকে অন্য কোনপ্রকৃত ওলিআল্লাহ্র সাথে আবদ্ধ না করবে সে পর্যন্ত বন্দেগীর আনন্দ হাসেল হওয়া দুষ্কর।"
এরপর হযরত শায়খুল ইসলাম রহমতুল্লাহি আলাইহি এরশাদ করলেন যে মার'ফাতপন্থীদের জন্য আসল মাকসুদ 'আলাস্তু বে রাব্বেকুম'-এর দিন হতে। অর্থাৎ যে পর্যন্ত আল্লাহতায়ালাকে না চিনবে সে পর্যন্ত তৃপ্তির আনন্দ পাবে না। এক সময় হযরত শায়খ আহাদ কিরমানি রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কাওয়াল (গায়ক) মুহম্মদ শাহ তার দলবল নিয়ে হুজুরের খেদমতে হাজির হলেন। একই সময় জামালউদ্দিন হাছবী এবং শায়খ বদরউদ্দিন গজনবীও উপস্থিত হলেন এবং কাওয়ালকে রাগ পরিবেশন করতে নির্দেশ দিলেন। কাওয়াল নির্দেশ পেয়ে রাগশুরু করলো। হযরত শায়খুল ইসলামের 'ওজদ' (প্রেমাকর্ষণে আত্মচেতনার বিলুপ্তি) আরম্ভ হলো এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি ঐশী-অচৈতন্যলোকে গমন করলেন এবং 'ওজদ' হাল(অবস্থা) ৭ দিবা-রাত্র পর্যন্ত স্থায়ী ছিলো। নামাজের সময় হলে 'হুশ' (চেতনা) ফিরে পেতেন কিন্তু নামাজ শেষ হলেই পুনরায় 'ওজদ-হালে' প্রত্যাবর্তন করতেন। ৭ দিন পর পূর্ণ চেতনাফিরে পেলেন।
মুহাম্মদ শাহ কাওয়ালের গীত গজলটি নিম্নে দেওয়া গেলো:
বাংলা উচ্চারণ:—
"মালামত করদান আন্দর যে আশেকি রাস্ত -
মালামত কে কুনাদ আঁকাছ কে বিনা আস্ত -
না হর তর দামনে রা ইশকে জবি -
নিশানে আশেকাঁ আজ দূর পয়দা আস্ত -
নিজামি তাতোয়ানি পারছা বাশ -
কে নূরে পারছাঈ শামা দিলহা আস্ত -"
অর্থ:
"করো সংশোধন, নিজে নিজকে,
সেইতো পথ প্রেমিকের দর্শনেন্দ্রিয় খোলা যার সেই হয় সংশোধন।
দেখায়োনা পথ তাকে প্রেমে নয় যার আঁচল ভেজা, প্রেমিকদের চিহ্ন বিস্তৃত বহু দূর।
নিজামি, করবে কবে গ্রহণ তুমি ফকিরি রয়েছে অন্তরে তোমার ফকিরীর নূরের বাতি।"
হযরত শায়খুল ইসলাম রহমতুল্লাহি আলাইহি এরপর সুলুকের একটা ঘটনার মাধ্যমে সামার (নির্দোষ গান) হাল বর্ণনা করলেন। বললেন যে প্রকৃত সামা শ্রবণকারীদের অবস্থা এমনই যে যখন সে সামার মাঝে নিমজ্জিত থাকে তখন তার মাথায় হাজার তরবারীর আঘাত হানলেও সে টের পায় না। আরিফ যখন ঐশী-অচৈতন্য-লোকে থাকে তখন তার নিকট কে এলো বা কে গেলো তার কোন সংবাদ সে রাখে না। সে সময় যদি হাজার হাজার ফেরেস্তাও তার এক কানদিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে বের হয়ে যায় তবু সে কিছুই উপলব্ধি করতে পারবে না।
এরপর আগত সে ছ'জন দরবেশ হুজুরের নিকট আরজ করলো যে, হুজুর আমরা মোসাফির, আমাদের ইচ্ছা আমরা ভ্রমণ করবো, কিন্তু আমাদের নিকট রাস্তায় চলার মত কোন পাথেয় নেই। সুতরাং কিছু অনুগ্রহ করলে আমরা কৃতার্থ হয়ে বিদায় নিতাম। তিনি সম্মুখে রক্ষিত শুকনো খোরমা হতে কয়েকটি তুলে নিয়ে দরবেশদেরকে দান করলেন। খোরমা হাতে নিয়েতারা বিদায় নিলো এবং একে অন্যকে বলতে লাগলো, এ শুকনো খোরমা দিয়ে কি হবে, এসব ফেলে দেয়াই ভালো। খোরমায় আমাদের কোন প্রয়োজন নেই। কিন্তু ফেলে দেয়ার সময় হাতের দিকে নজর করতেই দেখতে পেলো খোরমাগুলো খাঁটী স্বর্ণে রূপান্তরিত হয়েছে। তারাএ কারামত দেখে সকলেই শায়খুল ইসলামের খেদমতগার রূপে নিজেদেরকে উৎসর্গ করলো এবং নিজেদের মনজিলে মাসুদের দিকে যাত্রা শুরু করলো। এমন সময় যোহরের নামাজের আজান শুরু হলো। মজলিস স্থগিত হলো। হযরত শায়খুল ইসলাম ও অন্যান্যরা নামাজে মনোনিবেশ করলেন।
-আলহামদু লিল্লাহি আলা জালিক
পরবর্তী পর্ব —
মুরীদ হওয়া ও মুরীদ করা
মুরীদ হওয়া ও মুরীদ করা

No comments:
Post a Comment