শবেমেরাজ ও তার ফজিলত —
📚রাহাতুল ক্বুলুব ✍🏻নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)
মঙ্গলবার, ২৭শে রজব, ৬৫৫ হিজরী। কদমবুসির ঐশ্বর্য লাভে ভাগ্যবান হলাম। শায়খ জামালউদ্দিন হাছবী, শায়খ নজিবউদ্দিন মোতাওয়াক্কোল, শায়খ বদরুউদ্দিন গজনবী, শায়খ দবীরউদ্দিন ও অন্যান্য বহু বুজুর্গ হযরতের খেদমতে হাজির ছিলেন। আলোচনা শ'বে-মেরাজও তার ফজিলত সম্বন্ধে শুরু হলো।
হুজুর (শেখ ফরিদ রহ.) বললেন, শ'বে-মেরাজ অত্যন্ত মহতি ও বরকতপূর্ণ রজনী। কেননা হযরত রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এ রাত্রিতে ঊর্ধ্বলোকে স্রষ্টার সাথে স্বশরীরে সম্মুখ-সান্নিধ্য লাভ করেছেন।
যে ব্যক্তি এ রাতকে জীবন্ত রাখে অর্থাৎ ইবাদতবন্দেগীর মাঝে সারা রাত জেগে থাকে, বহু প্রমাণ সাপেক্ষে বলা যায় যে তারও মে'রাজ লাভ হয়। অর্থাৎ মে'রাজের সৌভাগ্য ও তার ছওয়াব (পূণ্য) সেই ব্যক্তির কর্মফলে সংযুক্ত হয়।
এরপর এরশাদ করলেন যে, একবার আমি বাগদাদের পথে মোসাফির ছিলাম। ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিলো কোন আল্লাহ-প্রাপ্ত মহাপুরুষের (আল্লাহর ওলির) দর্শনের সৌভাগ্যে ভাগ্যবান হওয়া। বাগদাদে পৌঁছে আমার এ ইচ্ছা অনেকের নিকট প্রকাশ করলাম। এবংবুজুর্গানে-দ্বীনদের সন্ধান করতে লাগলাম। বহু অনুসন্ধানের পর জানতে পারলাম দজলানদীর তীরে এক বুজুর্গ বাস করেন । আমি তাঁর খেদমতে তথায় উপস্থিত হয়ে দেখতে পেলাম। তিনি শনামাজে দণ্ডায়মান। তাঁর নামাজ শেষ না হওয়া অবধি আমি দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। তাঁর নামাজ শেষ হলে আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, বসো। আমি তাঁর নির্দেশ পালন করলাম।
তাঁর চেহারায় দেখতে পেলাম একটাভয়-বিহ্বলতা জড়িয়ে রয়েছে এবং চেহারাটা মনে হচ্ছিলো পূর্ণিমার চন্দ্রের মতো স্নিগ্ধ ও আলোকিত। একটু পরে তিনি আমার প্রতি মনোনিবেশ করে বললেন, “কোথা হতে আসা হয়েছে?” আমি বললাম অযোধন হতে।
তিনি বললেন, যদি বুজুর্গানেদ্বীনদের জিয়ারতের (দর্শনের) অভিপ্রায়ে বের হয়ে থাক তাহলে আল্লাহতায়ালা তোমাকে বুজুর্গী দান করবেন।
আমি সম্মানে তাঁর প্রতি মস্তক অবনত করলাম।
তিনি বললেন, যদি বুজুর্গানেদ্বীনদের জিয়ারতের (দর্শনের) অভিপ্রায়ে বের হয়ে থাক তাহলে আল্লাহতায়ালা তোমাকে বুজুর্গী দান করবেন।
আমি সম্মানে তাঁর প্রতি মস্তক অবনত করলাম।
এরপর তিনি (বুযুর্গ) তাঁর নিজের কথা বলতে যেয়ে বললেন, হে মাওলানা ফরিদ, আমি প্রায় পঞ্চাশ বছর হলো এ গুহায় অবস্থান করছি, আমি হযরত খা'জা জোনায়েদ বোগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর বংশধর। জরি-বটী আমার খোরাক। গত রাতটা ২৭শে রজবের রাত ছিলো, আমি জাগ্রত ছিলাম। হে ফরিদ যদি তুমি এ রাতের ঘটনা শুনতে চাও তো বলি।
আমি বললাম, অত্যন্ত সাগ্রহে শুনবো।
তিনি বললেন, গত বিশ বছর যাবত রাত জেগে থাকি। কিন্তু গতরাতে হঠাৎ আমার চোখ বন্ধহয়ে জায়নামাজে পড়ে গেছি; খোয়াব (সপ্ন) দেখলাম যে, ৭০,০০০ হাজার ফেরেস্তা অবতরণ করে আমার রুহকে আলমে বালায় (ঊর্ধ্ব জগৎ) নিয়ে গেলো। যখন প্রথম আসমানে পৌঁছলাম তখন দেখলাম ফেরেস্তাগণ পড়ছে 'সোবহানা জিল মুলকে ওয়াল মালাকুতে'।
আমি জিজ্ঞেস করলাম এরা কখন থেকে এভাবে দাঁড়িয়ে আছে? আওয়াজ হলো, যেদিন হতে এদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেদিন হতে এরা এভাবে দাঁড়িয়ে এ তসবীহ পাঠ করছে।
পরে দ্বিতীয় আসমানে পৌঁছলাম, ইলাহির কুদরত দেখে এমন বিস্ময়াবিভূত হলাম যার প্রশংসাও অবস্থা বর্ণনার বহির্ভূত।
আল্লাহ্তায়ালা তাঁর কুদরতের মাধ্যমে এমন সৌন্দর্য ও আশ্চর্য আশ্চর্য জিনিস এখানে সংস্থাপন করেছেন যার তুলনা স্বচক্ষে দর্শন ব্যতীত উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
এরপর আমি যখন আরশের নীচে পৌঁছলাম তখন আওয়াজ হলো, 'ওখানেই থামো', আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। আম্বিয়া আলাইহিস্ সালাম ও আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং আমার দাদা হযরত জোনায়েদ বোগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
কিন্তু তাঁর মাথাটা একটু অবনত ও তাঁকে চিন্তিত মনে হলো। এমনসময় আমার নাম ধরে কেউ ডাক দিলো। আমি প্রতি উত্তরে “লাব্বায়েক বললাম"।
নির্দেশ হলো ভালোই এসেছো এবং আল্লাহতায়ালার ইবাদতও ভালোই করেছো। এখনতোমাকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। তোমার স্থান ঈল্লীনে। আমি এ ফরমান শুনে আস্বস্ত হলাম এবং সেজদায় নত হলাম।
নির্দেশ হলো ভালোই এসেছো এবং আল্লাহতায়ালার ইবাদতও ভালোই করেছো। এখনতোমাকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। তোমার স্থান ঈল্লীনে। আমি এ ফরমান শুনে আস্বস্ত হলাম এবং সেজদায় নত হলাম।
পুনরায় নির্দেশ হলো, 'মাথা তুলো'। আমি মাথা উত্তোলন করে আরজ করলাম, আমি এরচেয়ে উচ্চতর দরজার আকাঙ্খী।
আদেশ হলো, হে বান্দা, এ জায়গা হতে আগে যেতে পারবে না, মিরাজ তোমার এ পর্যন্তই।যখন এর চেয়ে অধিক কর্ম করবে তখন উচ্চতর দরজার উপযুক্ত হবে।
আমি এ আওয়াজ শুনে আমার দাদা হযরত জোনায়েদ বোগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এরনিকট এলাম এবং তাঁর পায়ে পড়ে গেলাম। পরে জিজ্ঞেস করলাম আপনি এতো চিন্তিত ওমাথা অবনত করে ছিলেন কেন?
তিনি বললেন, যখন তোমাকে এখানে আনা হলো তখন আমার ভয় হচ্ছিল হয়তো এর দ্বারা কোন অন্যায় কার্য সমাধা হয়েছে যার জন্য একে এখানে আনা হয়েছে এবং এর জন্য আমাকে লজ্জা দেয়া হবে যে, তোমার নাতী তোমার তরীকার খেলাপ চলেছে।
আমি এ কথা শুনে জেগে গেলাম এবং আমার দেহ এখানেই দেখতে পেলাম।
হে ফরিদ, এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো যে, যে আল্লাহকে চায় আল্লাহ্ তায়ালাও তাকে চায়।মানুষের উচিত নিজের সাধ্যাতীত চেষ্টা করতে থাকা। যে ব্যক্তি শবে মেরাজের রাত্রি জাগরণকরবে সে অবশ্যই এ রাতের সৌভাগ্য লাভ করবে। এ পর্যন্ত বলে তিনি নিশ্চুপ হলেন।
আমি সে রাত তাঁর সাথেই কাটালাম এবং তাঁর বন্দেগীর পদ্ধতিও দেখতে পেলাম। তিনি এশার নামাজের পর মা'কুসের নামাজ ফজরের পূর্ব পর্যন্ত পাঠ করেন । আমি সকালে সেখান থেকে বাগদাদে ফিরে এলাম।
এর পর হযরত শায়খুল ইসলাম এরশাদ করলেন যে, শবে মিরাজের রাত্রিতে নিম্ন প্রক্রিয়ায় ১০০ রাকাত নামাজ পড়া দরকার।
১। সূরা ফাতেহার পর সূরা এখলাস ৫ বার (প্রত্যেক রাকাতে)
২। নামাজান্তে ৭ বার আস্তাগফার (সম্পূর্ণ)
৩। তারপর দরূদ শরীফ ১০০ বার (যে কোন দরূদ)
৪। এর পর সেজদায় নিজের প্রার্থনা জানাতে হবে। ইন্শাআল্লাহ্তায়ালা ইচ্ছা পূরণ হবে।
এরপর এরশাদ করলেন যে, কুতুবুল মাশায়েখ খা'জা মুঈনউদ্দিন হাসান চিন্তী সঞ্জরীরহমতুল্লাহি আলাইহি বলতেন যে, ২৭শে রজবের রাত্রি হলো রহমতের রাত্রি। যে ব্যক্তি এরাতকে তাজা রাখবে আল্লাহ্তায়ালার জাত থেকে আশা করছি যে সে বধির থাকবে না। অর্থাৎ সে তার কাজের স্বীকৃতির ঘোষণা শুনতে পাবে।
এরপর এরশাদ করলেন যে, হযরত রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ২৭শে রজবের রাতে ৭০ হাজার ফেরেস্তা নিজেদের মাথায় ইলাহির নূরের তবক বহন করে জমীনে অবতরণ করে এবং যে ঘরে আল্লাহতায়ালার ধ্যানে লোকজাগ্রত থাকে তাদের মাথার উপর উক্ত নূরের তবক ঢেলে দেয়ার জন্য আল্লাহ্ তা'আলা নির্দেশ দেন।
কথা বলতে বলতে হযরত শায়খুল ইসলামের চোখ অশ্রুতে ভরে উঠলো। তিনি দুঃখ করে বলতে লাগলেন, জানিনা মানুষ কি কারণে এমন শ্রেষ্ঠ নেয়ামত হতে দূরে থাকে।
পরবর্তী পর্ব —
সামা বা গান

No comments:
Post a Comment