বেহেশতের উত্তম খাদ্য (মাজালিসে গাযযালী - ৭)



📚মাজালিসে গাযযালী ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
7 সপ্তম মজলিশ

বেহেশতের উত্তম খাদ্য-

দশম রবিউল আউয়াল, বুধবার। আমি পবিত্র দরবারে উপস্থিত ছিলাম। খাদ্যদ্রব্য আনা হইল। এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিল, বেহেশতের উত্তম আহার্য বস্তু কি হইবে?
এরশাদ করিলেন, বেহেশতের উত্তম আহার্য বস্তু হইল গোশত। তাহার প্রতি গ্রাসে সত্তর প্রকার স্বাদ বিদ্যমান থাকিবে। একটি স্বাদের সাথে অন্যটির কোন প্রকার সামঞ্জস্য থাকিবে না। কিন্তু বেহেশতের গোশত এই পৃথিবীর গোশতের ন্যায় নহে। কারণ পৃথিবীর গোশত নশ্বর আর বেহেশতের গোশত কখনও শেষ হইবে না। সুতরাং উভয়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য। তাহা যতই খাওয়া হউক না কেন, শেষ কখনও হইবে না।যেমন- পৃথিবীতে এক নেয়ামত পবিত্র কোরআন। এই কোরআন যতই তেলাওয়াত করা যায়, যতই বর্ণনা করা এবং শুনা যায়, তাহার স্বাদ কখনও শেষ হয় না বা কোন প্রকার তারতম্য হয় না।


এই সম্বন্ধে একটি কাহিনী বর্ণনা করিলেন যে, হযরত জোনায়েদ বাগদাদী (রহঃ)-এর সাথে এক ইহুদীর খুব ভালবাসা ছিল। একদিন ইহুদী তাঁহার নিকট আগমন করিল এবং কিছুক্ষণ অবস্থান করার পর ফিরিয়া যাওয়ার জন্য উঠিল। হযরত জিজ্ঞাসা করিলেন, কোথায় যাইতেছ?

ইহুদী বলিল, আজ আমাদের একটি সমাবেশ আছে। সকল ইহুদীই সেখানে উপস্থিত হইবে। আমিও সেখানে যাইব।

হযরত জোনায়েদ (রঃ) বলিলেন, আমাকেও তোমার সাথে লইয়া চল।

ইহুদী বলিল, জনাব! আপনি সেখানে যাইতে পারিবেন না। কারণ, সেখানে কোন মুসলমানকে দেখিলে সাথে সাথেই ইহুদীরা তাহাকে হত্যা করিয়া ফেলিবে।

হযরত জোনায়েদ বলিলেন, আমি তোমাদের বেশ-ভূষায়ই যাইব। মোটকথা, হযরত জোনায়েদ তাহার সাথে সেখানে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, একটি উঁচু আসন তৈয়ার করা হইয়াছে। কিছুক্ষণ পর একজন অতি দুর্বল বৃদ্ধকে সেই আসনে আনিয়া বসান হইল। এই বৃদ্ধ প্রতি বৎসর এখানে বসিয়া উপস্থিত জনতাকে একটি মাত্র উপদেশ দিতেন। তাহারা সকলে তাহার সেই উপদেশ পালন করিত।

কিন্তু এইবার দুর্বল বৃদ্ধ চুপ করিয়া বসিয়া রহিল, একটি কথাও বলিল না। তাহার ভক্তগণও চুপ করিয়া তাহার কথা শুনিবার জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিল। যখন কোন কথাই বৃদ্ধের মুখ দিয়া বাহির হইল না, তখন ভক্তদের মধ্য হইতে কেহ তাহার নিকট গিয়া বলিল, আপনি আজ কিছু বলিতেছেন না কেন? আমরা সকলেই যে আপনার বাণী শুনার জন্য অধীরভাবে অপেক্ষমাণ। বৃদ্ধ বলিল, এই মজলিসে একজন মুসলমান আছেন, তাই আমি কোন কথা বলিতে পারিতেছি না।

ইহুদীগণ এই কথা শুনিয়া অগ্নিশর্মা হইয়া বলিল, কে সেই মুসলমান! কোথায় সে! বলুন, এখনই আমরা তাহাকে হত্যা করিব। বৃদ্ধ বলিল, না, হত্যা নহে। বরং তোমরা যদি ওয়াদা কর তাঁহাকে হত্যা করিবে না, তবেই আমি তাঁহার সন্ধান দিব। সকল ইহুদী একবাক্যে হত্যা না করার প্রতিশ্রুতি দিলে বৃদ্ধ বলিল, ঐ ব্যক্তি। তাঁহাকে আমার নিকট লইয়া আস।

হযরত জোনায়েদ (রহঃ)-কে বৃদ্ধের নিকট লইয়া আসা হইল। বৃদ্ধ বলিল, আপনি কেন এখানে আসিয়াছেন?

তিনি বলিলেন, তামাশা দেখার জন্য। 

বৃদ্ধ বলিল, আপনি যখন আসিয়াছেন তখন আমার কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিন। হযরত জোনায়েদ বলিলেন, আমি যদি তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি তবে তুমি ইসলাম গ্রহণ করিবে কি?

বৃদ্ধ বলিল, হাঁ! আমি ওয়াদা করিতেছি যে, আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিলে আমি অবশ্যই ইসলাম গ্রহণ করিব।

হযরত জোনায়েদ (রহঃ) বলিলেন, তুমি প্রশ্নকারী। সুতরাং তুমি আসন হইতে নামিয়া আস। আমি ঐখানে বসিয়া তোমার প্রশ্নের উত্তর দিব।

বৃদ্ধ আসন হইতে নামিয়া আসিলে তিনি সেই আসনে গিয়া উপবেশন করিলেন।

বৃদ্ধ বলিল, ওহে শায়খ ! আপনাদের ধর্মের তিনটি বিষয় আমার বুঝে আসে না। আপনি যদি উহার উত্তর পৃথিবীর বিষয়বস্তুর উদাহরণ দ্বারা বুঝাইয়া দিতে পারেন তবে আমি ঈমান আনিয়া মুসলমান হইব।

হযরত জোনায়েদ বলিলেন, প্রশ্ন কর।

ইহুদী বলিল, 

(১ম) আপনারা বলিয়া থাকেন, বেহেশতে এত পানাহারের পরও পায়খানা-প্রস্রাবের প্রয়োজন হইবে না। 

(২য়) বেহেশতে এমন একটি বৃক্ষ থাকিবে যাহার শাখা-প্রশাখা বেহেশতের প্রতিটি ঘরের উপর বিস্তার লাভ করিবে এবং 

(৩য়) বেহেশতের নেয়ামত যতই খাওয়া হউক না কেন তাহার ঘাটতি হইবে না। ইহা তো অসম্ভব কথা। ইহা কিভাবে সম্ভবপর হইতে পারে? পার্থিব উদাহরণের সাথে আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিলে আমি ঈমান আনিব।

হযরত জোনায়েদ (রহঃ) বলিলেন, 

তোমার প্রথম প্রশ্নের উদাহরণ এই যে, সন্তান যখন মাতৃগর্ভে থাকে তখন সে পানাহার করে, কিন্তু পায়খানা-প্রস্রাবের প্রয়োজন হয় না।


দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর হইল, পৃথিবীতে সূর্য একটি। কিন্তু উহার আলো সকল গৃহের উপরই পতিত হয় ভিন্ন ভিন্ন দেশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন সূর্যের প্রয়োজন হয় না।


তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর হইল, কোরআন শরীফ। অগণিত লোক তাহা তেলাওয়াত করে, শ্রবণ করে এবং তাহা দ্বারা উপকৃত হয়। কিন্তু তাহার স্বাদ ও মাধুর্যে কখনও কোন পরিবর্তন আসে নাই এবং আসিবেও না।


অতঃপর হযরত জোনায়েদ (রঃ) বলিলেন, ওহে বৃদ্ধ! আমি তোমার তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিয়াছি। এখন আমি একটি মাত্র প্রশ্ন করিতেছি, উত্তর দাও।

বৃদ্ধ বলিল, প্রশ্ন করুন, আমি উত্তর দিব।

হযরত জোনায়েদ বলিলেন, বেহেশতের দরজার উপর কি লেখা রহিয়াছে?

বৃদ্ধ এই প্রশ্ন শুনিয়া চুপ করিয়া রহিল।

ইহুদীগণ সমস্বরে বলিয়া উঠিল, আপনি আমাদের বুযুর্গ এবং ধর্মীয় নেতা। আপনি তিনটি প্রশ্ন করিয়াছেন তিনি উত্তর দিয়াছেন। তিনি একটি মাত্র প্রশ্ন করিয়াছেন, আপনি কেন চুপ করিয়া রহিলেন? তাঁহার প্রশ্নের উত্তর দিন।

বৃদ্ধ বলিল, আমি যে উত্তর দিব তোমরা যদি তাহা মানিয়া লওয়ার অঙ্গীকার কর তবেই আমি উত্তর দিব। অন্যথায় নহে। তাহারা সকলেই অঙ্গীকার করিল, হাঁ। আমরা আপনার কথায় বিশ্বাস করিয়া অবশ্যই মানিয়া লইব।


বৃদ্ধ বলিল, বেহেশতের দরজার উপর লিখা রহিয়াছে-


‎لا إلهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ


(লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ মুহম্মদুর রসূলুল্লাহ)


এই উত্তর শুনিয়া সকলেই কালেমা তাওহীদ পাঠ করত ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করিল। ইহার পর পীর ও মুরশিদ এরশাদ করিলেন, বেহেশতবাসী মনে মনে যে বস্তু পাওয়ার ইচ্ছা করিবে, সাথে সাথেই মেহেরবান আল্লাহ উহা তাহাকে দান করিবেন।

তারপর আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, হযরত! বেহেশতবাসী যদি সেখানে শরীয়ত বিরোধী কোন বস্তু কামনা করে তবে দান করা হইবে কিনা?

এরশাদ করিলেন, শরীয়ত বিরোধী কোন বস্তুর কথা সেখানে কাহারও মনে উদয়ই হইবে না। বেহেশতবাসী সেখানে যে কাজ করিবে তাহা সবই হইবে প্রশংসনীয়।

তারপর বলিলেন, কোন কোন লোক প্রশ্ন করিয়া থাকে যে, বেহেশতে কোন প্রকার চিন্তা-ভাবনা থাকিবে না- ইহা কি প্রকারে সম্ভবপর হইতে পারে? বাবা বেহেশতী আর পুত্র দোযখী অথবা পুত্র বেহেশতী এবং বাবা দোযখী হইলে অবশ্যই একে অন্যের জন্য চিন্তা করিবে। সুতরাং বেহেশতে চিন্তা-ভাবনা থাকিবে না, ইহা আমাদের ধারণায় আসে না।

উত্তরে বলিলেন, যাহাদের জন্য চিন্তা-ভাবনা হইতে পারে, বেহেশতবাসীদের মনে তাহাদের কথা উদয়ই হইবে না। বর্ণিত আছে, বেহেশতবাসী যখন স্ব স্ব স্থানে প্রতিষ্ঠিত হইয়া বসিবে তখন আল্লাহ তাআলা এক বিশেষ প্রকার বাতাস প্রবাহিত হওয়ার নির্দেশ দিবেন। সেই বাতাস বেহেশতবাসীদের দেহ স্পর্শ করার সাথে সাথে যাহাদের জন্য চিন্তা-ভাবনা হইতে পারে, এমনকি তাহার যে আপনজন দোযখী হইবে তাহার আকৃতি পর্যন্ত সে ভুলিয়া যাইবে। যেমন- আমরা এই পৃথিবীতে অনেক লোকের কথা ভুলিয়া যাই। আসল কথা হইল, আল্লাহর ইচ্ছাই ইচ্ছা এবং আল্লাহর কথাই কথা। অর্থাৎ তিনি যাহা ইচ্ছা সম্পাদন করেন এবং যাহা ইচ্ছা নির্দেশ দেন।

কোন এক বুযুর্গ বলেন, আল্লাহর হেকমত প্রসঙ্গে কথা বলার অধিকার তোমার কোথায়? নিশ্বাস ছাড়িও না! অন্যথায় ফাঁসী কাষ্ঠের উপর তোমার স্থান। ধৈর্যধারণ এবং চুপ করিয়া থাকাই তোমার পথ। তাহার চেয়ে উত্তম কোন পথ আর তোমার জন্য নাই।

ইহার পর কথাবার্তা এবং চলাফেরার সততা সম্বন্ধে বলিলেন, সততা এক প্রকার শক্ত রশি। ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কাজে মোমেনের কর্তব্য সততার আশ্রয় গ্রহণ করা, যেন তাহার দোজাহানের কাজের পরিণতি মঙ্গলময় হয়।


হযরত যুননূন মিসরী (রঃ) বলিয়াছেন, সততা আল্লাহর তরবারি। দুনিয়াতে এমন কোন বস্তু নাই যাহার উপর সেই তরবারি দ্বারা আঘাত করার পর উহা অক্ষত অবস্থায় থাকিতে পারে। তাই নিরাপত্তার জন্য সততার আশ্রয় গ্রহণ কর। তোমার  পক্ষ হইতে সততা প্রকাশ পাইলে আল্লাহর পক্ষ হইতে বিজয় আসিবে। মোমেনের কর্তব্য ঈমানের ব্যাপারে সততার আশ্রয় গ্রহণ করা এবং পদস্খলন হইতে সতর্ক থাকা। ইহা হইলেই পূর্ণভাবে নাজাত পাওয়া যাইবে।

তোমার পদযুগল যখন বিশ্বাসের দৃঢ়তায় সুদৃঢ় হইবে, তখন সমুদ্র হইতে মাটি এবং অগ্নি হইতে নম্রতা বাহির করিয়া লও। অর্থাৎ, তখন যেকোন কঠিন কাজই তুমি সুচারুরূপে সম্পন্ন করিতে পারিবে।

লায়লাতুল রাগায়েব (মাজালিসে গাযযালী -৬)



📚মাজালিসে গাযযালী ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
(6 )ষষ্ঠ মজলিস

লায়লাতুল রাগায়েব–
দরবার শরীফ হইতে এক বন্ধু দাঁড়াইয়া বলিলেন, আগামীকাল জমাদিউল আখের মাসের শেষ দিন বৃহস্পতিবার, দিনে রোযা রাখিয়া রাতে লায়লাতুর রাগায়েব নামায আদায় করিব কিনা?
পীর ও মুরশিদ বলিলেন, কিতাবে লিখিত আছে, রজব মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার রোযা রাখিয়া দিনগত রাতে অর্থাৎ রজবের প্রথম শুক্রবারের রাতে লায়লাতুর রাগায়েব নামায পড়িবে। আজ রজব মাসের প্রথম শুক্রবারের রাত নহে। 
লায়লাতুর রাগায়েব নামায রজব মাসের প্রথম শুক্রবার রাতে পড়িতে হয়। কিন্তু নামায পড়া উচিত এবং আগামী বৃহস্পতিবার রোযা রাখিবে। সতর্কতা অবলম্বনস্বরূপ আগামী শুক্রবারের রাতেও জামাআতের সাথে লায়লাতুর রাগায়েবের নামায আদায় করিবে।
মাওলানা যাহেদ জিজ্ঞাসা করিলেন, সমস্ত মাস ও দিন আল্লাহর সৃষ্টি। তবে কেন একের উপর অন্যকে মর্যাদা দান করা হইয়াছে ?
হযরত পীর সাহেব বলিলেন, এ কথা ঠিক যে, সমস্ত মাস ও দিন আল্লাহর সৃষ্টি। কিন্তু প্রতিটি বস্তুর জন্য মর্যাদা নির্ধারণ করা হইয়াছে যেন তাঁহার বান্দাগণ অধিক পুণ্য অর্জনের মাধ্যমরূপে সেইগুলি ব্যবহার করিতে পারে। তেমনি মানুষের মধ্যে মর্যাদার তারতম্য নির্ণয় করা হইয়াছে। কাহাকেও পয়গম্বর, কাহাকেও ওলী আবার কাহাকেও আলেম করিয়াছেন। অতঃপর পয়গম্বরদের মধ্যে মর্যাদার পার্থক্য রহিয়াছে । কেহ নবী আবার কেহ বা নবী ও রাসূল।
আল্লাহ তাআলা এরশাদ করিয়াছেন-
"এই সমস্ত রাসূলের মধ্যে আমি একের উপর অন্যকে মর্যাদা দান করিয়াছি তাহাদের মধ্যে কেহ আল্লাহর সাথে কথোপকথন করিয়াছেন। আল্লাহ তাহাদের মধ্যে কাহারও কাহারও মর্যাদা উন্নত করিয়াছেন।”
কোন পয়গম্বরই আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনার সমকক্ষ নহেন। আমাদের হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যে স্থানে গিয়াছিলেন সে স্থান সম্বন্ধে কোন নবী বা কোন ফেরেশতা ই অবগত ছিলেন না। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্বয়ং এই মর্যাদা সম্বন্ধে এরশাদ করিয়াছেন :
“আল্লাহর সাথে আমার এমন একটি সময় নির্ধারিত রহিয়াছে যখন কোন ফেরেশতা এবং নবী-রাসূলের স্থান হয় না।”
তেমনি ওলীদেরকেও বিভিন্ন প্রকার মর্যাদা দান করা হইয়াছে। তাঁহাদের মধ্যে কেহ পথপ্রদর্শক, কেহ আশেক আবার কেহ বা পূর্ণ নিরাপদ।
তদ্রূপ মাটিকেও বিভিন্ন প্রকার মর্যাদার অধিকারী করা হইয়াছে। এক মাটিকে কাবা অন্য মাটিকে গির্জা করিয়াছেন। কোন মাটিই কাবার মাটির সমকক্ষ হইতে পারে না। অন্যান্য যাবতীয় কিছুকে ইহার উপরই ধারণা করিয়া লইবে ।
আল্লাহ তাআলা সমস্ত সৃষ্টিকেই এইভাবে ভিন্ন ভিন্ন মর্যাদা দান করিয়াছেন। মর্যাদার স্তরবিন্যাস না করা হইলে সমস্ত কিছুই এক সমান হইয়া পড়িত। ইহা হেকমত বিরোধী। এই শ্রেণীবিন্যাস দ্বারাই আল্লাহর সৃষ্টির সৌন্দর্যের উৎকর্ষ সাধন করা হইয়াছে। 
তুমি কি লক্ষ্য করিয়া দেখ নাই, পৃথিবীর রাজা-বাদশাহরা লোকজনের পদমর্যাদা অনুযায়ী শ্রেণীবিভাগ করিয়া থাকেন? একজনকে মন্ত্রী আবার অন্য জনকে প্রহরী নিযুক্ত করেন। একজনকে সভাসদ করেন, অন্য জনকে নিকটেও ঘেঁষিতে দেন না। একজনের ধন-সম্পদ কাড়িয়া লইয়া তাহাকে বন্দী করেন আবার আর একজনকে উপাধি ও জায়গীর দিয়া সম্মানিত করেন।
পৃথিবীর বাদশাহই যখন তাহার প্রজাদের মধ্যে এমন শ্রেণীবিভাগ করিতে পারেন, তখন আল্লাহ তাআলার পক্ষে তাঁহার একাধিপত্য ও সৃষ্টির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার জন্য এমন শ্রেণীবিন্যাস করা তো আরও উপযোগী। এই একচ্ছত্র অধিপতি যে আঠার হাজার মাখলুক সৃষ্টি করিয়াছেন তাহার প্রত্যেকটির ভিন্ন ভিন্ন মর্যাদা বহিয়াছে। তাহাতে যদি সামান্য পরিমাণেও কম থাকে তবে তাঁহার রাজত্বে খুঁত থাকিয়া যাইবে এবং সৌন্দর্যের হানি হইবে । তিনি জ্ঞানী ও হাকীম। সুতরাং তাঁহার প্রতিটি কাজ সুশৃঙ্খল । তাহাতে কোন প্রকার খুঁত নাই।
যেমন- কোন শহরে যদি তাঁতী না থাকে তবে ঐ শহরের সৌন্দর্যে ঘাটতি দেখা দিবে। কারণ, কাপড়ের অভাবে লোক উলঙ্গ থাকিবে এবং শীত-তাপ হইতে আত্মরক্ষায় অপারগ হইয়া পড়িবে।
বাদশাহর পক্ষে যেমন দানশীল হওয়া দরকার তেমনি কৃপণতা করাও দরকার । রূঢ় ব্যবহার করার সাথে সাথে তাহাকে দয়াপরবশও হইতে হইবে। কারণ, রাষ্ট্র টিকাইয়া রাখারা জন্য একজন বাদশাহর মধ্যে এই সমস্ত গুণ থাকা একান্ত প্রয়োজন । এই প্রসঙ্গে তিনি একটি কাহিনী বলিলেন যে, —
শামসুদ্দীন কাদীম নামে এক বাদশাহ ছিলেন। তাহার প্রধানমন্ত্রীর নাম ছিল আরসালান। একদিন বাদশাহ মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিলেন, তোমাকে আমার একটি বিষয় জিজ্ঞাস্য আছে, যদি সঠিক উত্তর দাও তবে জিজ্ঞাসা করি ।
মন্ত্রী বলিলেন, বলুন! আমি সঠিক উত্তরই দিব। বাদশাহ বলিলেন, আমার দুই পুত্র। প্রথম পুত্র হাতেম একটি প্রদেশের শাসনকর্তা। দ্বিতীয় পুত্র আযম অন্য দেশের শাসনকর্তা । এখন বল, দুই ভাইয়ের মধ্যে বাদশাহী করার উপযুক্ত কে ?
মন্ত্রী বলিলেন, আপনি সঠিক উত্তর দিতে বলিয়াছেন, আমি তাহাই দিব । দুই ভাইয়ের একজনও রাষ্ট্র পরিচালনা করার উপযুক্ত নহে ।
বাদশাহ মন্ত্রীর কথা শুনিয়া মনঃক্ষুণ্ণ হইলেন । তথাপি জিজ্ঞাসা করিলেন, কেন উপযুক্ত নহে ?
মন্ত্রী বলিলেন, হাতেম সহনশীল এবং দয়ালু। আযম দাম্ভিক, অত্যাচারী এবং খামখেয়ালী স্বভাবের।
দুই ভাই দুই প্রকার চরিত্রের অধিকারী। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনা করার জন্য উভয়বিধ গুণের সমাবেশ থাকিতে হইবে। উভয়ের মধ্যেই খুঁত রহিয়াছে। সুতরাং কেহই বাদশাহ হওয়ার উপযুক্ত নহে।
অতঃপর পীর ও মুরশিদ বলিলেন, মন্ত্রী যাহা বলিয়াছিলেন পরিশেষে তাহাই সঠিক প্রমাণিত হইল । কিছুদিন পর বাদশাহ শামসুদ্দীন কাদীম মারা যান। হাতেম ও আযম তাহাদের স্ব স্ব এলাকার বাদশাহ হইলেন। হাতেম তাহার দয়াপরবশতার জন্য রাজ্য ধ্বংস করিয়া দিলেন। অপরপক্ষে আযমের অত্যাচার-উৎপীড়নের দরুন তাহাকে সিংহাসনচ্যুত করা হইল। ইহা দ্বারা প্রমাণিত হইল যে, রাষ্ট্র পরিচালনা করার জন্য উভয়বিধ গুণের প্রয়োজন । অন্যথায় শাসনক্ষমতা হইতে সরিয়া দাঁড়াইতে হয় ।
 তারপর মাওলানা যাহেদ জিজ্ঞাসা করিলেন, যদি এই আঠার হাজার আলমের মধ্যে কোন একটি আলম ধ্বংস হইয়া যায়, তবে তাঁহার খোদায়ীর মধ্যে কোন প্রকার তারতম্য দেখা দিবে কিনা ?
পীর ও মুরশিদ উত্তর দিলেন, সমস্ত সৃষ্টিও যদি ধ্বংস হইয়া যায় তথাপি তাঁহার সত্তা ও গুণাবলীর মধ্যে কোন প্রকার পার্থক্য পরিলক্ষিত হইবে না। আর যদি আঠার হাজারের পরিবর্তে লক্ষাধিক মাখলুকও সৃষ্টি করেন তবুও তাঁহার পক্ষে কোন বাড়াবাড়ি হইবে না। আবার ধ্বংস করিয়া দিলেও তাঁহার সত্তা ও গুণাবলী যথাবিহিত স্থায়ী থাকিবে। কারণ, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সৃষ্টির জন্য, আল্লাহর জন্য নহে । তিনি অনাদি অনন্ত । কিন্তু সৃষ্টি ধ্বংস হইয়া গেলে রাষ্ট্রের বিধি-ব্যবস্থা বানচাল হইয়া পড়ে ।
তারপর বলিলেন, আল্লাহ তাআলা কখনও তাঁহার প্রেমিকদের উপর রহমতের ঝর্ণাধারা বর্ষণ করেন আবার কখনও বা ক্রোধের লু হাওয়া প্রবাহিত করেন। কিন্তু তাঁহারা জানেন, ভাল-মন্দ সবই আল্লাহর পক্ষ হইতে । তাই তাঁহারা সুখ-দুঃখ সব কিছুই মধুর ন্যায় আকণ্ঠ পান করেন । যদি তাঁহারা ইহাকে বস্তুবাদীদের ন্যায় অন্যের প্রতি প্রযুক্ত করেন, তবে এই বিপদ গ্রাসে তাঁহারা কোন স্বাদ আনন্দ পান না ।
অতঃপর মাওলানা যাহেদ জিজ্ঞাসা করিলেন, এক সত্যের সন্ধানী উদ্দেশ্য সাধনে ব্রতী। সে তাহা কিভাবে অর্জন করিবে ? কারণ, তিনি অনিত্য, ইহা নিত্য, তিনি স্রষ্টা আর ইহা সৃষ্টি । তিনি প্রাচুর্যের মালিক আর ইহা দরিদ্র ! পীর ও মুরশিদ বলিলেন, ইহা সত্য। কিন্তু ইহাও তাঁহার তরফ হইতে । উদাহরণস্বরূপ বলা যাইতে পারে যে, কুকুর কখনও বাদশাহর দরবারে গিয়া বসিতে পারে না। কিন্তু বাদশাহ যদি কুকুরকে দরবারে যাওয়ার এবং সম্মুখে বসার অনুমতি দেন, তবে তাহা কুকুরের ইচ্ছায় নহে ; বরং বাদশাহর ইচ্ছায় সম্পন্ন হইয়া থাকে ।
অতঃপর এক বন্ধু জিজ্ঞাসা করিলেন, মানুষ যখন নিদ্রিত হয়, তখন রূহ দেহ হইতে বাহির হইয়া যায় কিনা?
এরশাদ করিলেন, রূহ দুইভাবে বাহির হয়। প্রথম প্রকার সম্পূর্ণভাবে, দ্বিতীয় প্রকার আংশিক। সম্পূর্ণরূপে বাহির হইয়া গেলে আর ফিরিয়া আসে না, অর্থাৎ মৃত্যুবরণ করে। আংশিক যেমন- কোন লোকের নিদ্রিত হওয়া। যখন জাগ্রত করে জাগিয়া যায়। কিন্তু নিদ্রিত অবস্থায় সে নিশ্চুপ থাকে। তাহার সম্মুখে কোন কথাবার্তা বলিলেও সে শুনিতে পায় না। এই জন্যই নিদ্রাকে আংশিক মৃত্যু বলে। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, নিদ্রা মৃত্যুর ভাই।
অন্য এক বন্ধু জিজ্ঞাসা করিলেন, রূহের প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অবগত ছিলেন কিনা ?
এরশাদ করিলেন, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যদিও প্রকৃত অবস্থা অবগত ছিলেন তথাপি তাঁহার প্রতি নির্দেশ ছিল, আপনি বলিয়া দিন, "রূহ আল্লাহর এক নির্দেশ।" হয়ত হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর ইচ্ছা ছিল রূহ সম্বন্ধে কিছু বলিবেন। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ হইতে দ্বিতীয় নির্দেশ আসিল, “সামান্য জ্ঞান ব্যতীত আপনাকে আর কিছুই দেওয়া হয় নাই।”
বুযুর্গগণ বলেন, আল্লাহর কোন কোন বান্দা রূহের প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে জ্ঞাত। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যদি রূহের প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে জ্ঞাত ছিলেন তবে তাহাতে বিস্ময়ের কি আছে? হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) দোআ করিতেন, হে আল্লাহ ! সমস্ত বস্তুর প্রকৃত অবস্থা আমাকে জ্ঞাত করুন। তাঁহার দোআ আল্লাহর নিকট কবুল হইত। তাই রূহের প্রকৃত অবস্থা তিনি জ্ঞাত ছিলেন। কিন্তু বর্ণনা করার আদেশ ছিল না।
কোন কোন বুযুর্গ রূহকে দেহ বলিয়াছেন। কিন্তু তাহা এত সূক্ষ্ম যে, দৃষ্টিগোচর হয় না। আরও বলেন, ফেরেশতাগণও দেহবিশিষ্ট। কিন্তু এত দ্রুত গতিসম্পন্ন যে, পলকের মধ্যে আসমান হইতে যমীনে এবং যমীন হইতে আসমানে উঠানামা করিতে পারেন। ফেরেশতাদের চলাফেরার প্রয়োজন আছে, রূহের নাই। তাই রূহের কাঠামো ফেরেশতাদের চেয়েও সূক্ষ্ম।

এক বন্ধু বলিলেন, আমি একটি কবিতা দেখিয়াছি যাহার অর্থ নিম্নরূপ : 
সুন্দর মুখের অধিকারী সর্বক্ষণ ইসলামকে ধ্বংস করে। আমি যখনই কোন সুন্দর মুখের অধিকারী মুসলমানকে দেখিয়াছি তখনই কাফের হইয়া গিয়াছি। ইহার অর্থ কি ?
এরশাদ করিলেন, এমন সব কথার প্রতি মনঃসংযোগ করিতে নাই। কারণ, পাগলের কথায় জ্ঞানবানদের পক্ষে আমল করা ঠিক নহে। কারণ, খোদা প্রেমিক পাগলগণ এক বিশেষ অবস্থা এবং সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে কথা বলেন। কিন্তু জ্ঞানবানদের পক্ষে তাহা বলা অন্যায়। আল্লাহ পাগলের ঐ কথাকেই কবুল করিয়া থাকেন।
হযরত মূসা (আঃ)-এর যুগ। দেশে বৃষ্টি নাই, ফসল নাই। মানুষ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়িয়া হা-হুতাশ করিতেছে। সকলে ময়দানে আসিয়া বৃষ্টির জন্য নামায পড়িল, দোয়া করিল। কিন্তু বৃষ্টি হইল না। অবশেষে তাহারা হযরত মূসা (আঃ)-এর নিকট আসিয়া বলিল, আপনি আল্লাহর নবী, যুগের শ্রেষ্ঠ বুযুর্গ। আপনি বৃষ্টির জন্য আল্লাহর নিকট দোআ করুন।
হযরত মূসা (আঃ) হাত উঠাইয়া আল্লাহর দরবারে দোআ করিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
“মূসা যখন তাহার দেশবাসীর জন্য বৃষ্টি কামনা করিল । আল্লাহ তাআলা প্রত্যাদেশ দিলেন, শহরে চলিয়া যাও এবং বারাখ নামক এক পাগলের সন্ধান কর । সে যদি বৃষ্টির জন্য দোআ করে তবেই বৃষ্টি হইবে।
আল্লাহর নির্দেশমত হযরত মূসা (আঃ) শহরে গেলেন এবং বারাখের সন্ধান করিতে লাগিলেন। অনেক সন্ধান করার পর তাঁহার সাক্ষাত পাইলেন ।
হযরত মূসা (আঃ) বলিলেন, বৃষ্টির জন্য আপনি আল্লাহর নিকট দোআ করুন। বারাখ বলিলেন, আপনি আল্লাহর নবী। আপনি থাকিতে আমি এরূপ ধৃষ্টতা করিতে পারি না।
হযরত মূসা (আঃ) বলিলেন, আল্লাহ নির্দেশ দিয়াছেন, বারাখ দোআ করিলে দৃষ্টি দিব।
বারাখ উঠিয়া দাঁড়াইলেন এবং আকাশের দিকে মুখ করিয়া বলিলেন, কাহার নিকট তুমি এই কৃপণতা শিখিলে?
এই কথা তাঁহার মুখ হইতে বাহির হইতে না হইতেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়িতে আরম্ভ করিল। পরদিন হযরত মূসা (আঃ) বারাখের নিকট গেলেন। বারাখ বলিলেন, আপনি লক্ষ্য করিয়াছেন কি, আমি গতকাল আল্লাহকে কি বলিয়াছি?

অবশ্য পাগলের পাগলামি করা অন্যায় কিছু নহে। তাহার সকল ঔদ্ধত্যই বৈধ। এখানে ভাল-মন্দ সব কিছু বিলুপ্ত হইয়া যায়। তাহার সকল কথাই গ্রহণযোগ্য।
এই প্রসঙ্গে তিনি আর একটি কাহিনী বর্ণনা করিলেন যে, রোম শহরে এক দরবেশ ছিলেন। তাঁহার নাম আবদুল্লাহ ইসহাক। তাঁহার মুরীদ ও ভক্তের দল ছিল অগণিত। এক রাতে তিনি কিছু বিরক্তির ভাব লইয়া খানকা হইতে বাহির হইয়া এক মন্দিরে প্রবেশ করিলেন এবং নিজের গলায় পৈতা পরিধান করিলেন। মুরীদ ও ভক্তের দল পীর সাহেবের এই অন্যায় কাজ দেখিয়া প্রায় সকলে তাঁহাকে ছাড়িয়া চলিয়া গেল। হাতেগনা কয়েকজন লোকমাত্র তাঁহার সাথে রহিল কয়েকদিন পর তাঁহার এক ভক্ত স্বপ্নে দেখিলেন, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) শহর প্রাচীরের নিকট আগমন করত অতিশয় ক্ষিপ্রতার সাথে শহরে প্রবেশ করিতেছেন।

এই ভক্ত অতি বিনয়ের সাথে জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! এত ক্ষিপ্রতার সহিত কোথায় তাশরীফ লইয়া যাইতেছেন? এরশাদ করিলেন, আবদুল্লাহ ইসহাক আল্লাহর প্রতি খুবই ক্রোধান্বিত হইয়াছে। আমি সন্ধি করানোর জন্য যাইতেছি।
মুরীদ জাগ্রত হইয়া আনন্দের সাথে তখনই মন্দিরের দিকে দৌড় দিলেন। গিয়া দেখেন পীর সাহেব গলার পৈতা দূরে নিক্ষেপ করত সেজদায় পড়িয়া বলিতেছেন : আমি তওবা করিতেছি, তওবা করিতেছি। হে খোদা! সন্ধি করিয়া লও, মেহেরবানী কর, ক্ষমা কর।
-----------------------

সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য (মাজালিসে গাযযালী- ৫)



📚মাজালিসে গাযযালী ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
5 পঞ্চম মজলিস 

সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য

তৃতীয় রবিউল আউয়াল, বুধবার। হযরত পীর ও মুরশিদ (ইমাম গাজ্জালী রহঃ) জামে মসজিদে বহু লোকের সমাবেশে উপবিষ্ট ছিলেন। এই জনতার মধ্য হইতে এক ব্যক্তি দাঁড়াইয়া বলিলেন, আমার ইচ্ছা আমি হুযুরের দাসদের একজন হিসাবে পরিগণিত হই। কয়েকবার তিনি এই কথা বলার পর পীর ও মুরশিদ তাহাকে বায়আত করিলেন। অতঃপর সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য সম্বন্ধে কথাবার্তা আরম্ভ হইল। এক বন্ধু জিজ্ঞাসা করিলেন, প্রত্যেক লোকের জন্যই কি সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য লিখিত হইয়াছে।


মাখদুম জাঁহা উত্তর দিলেন, প্রত্যেক ব্যক্তির সৌভাগ্য তাহার মায়ের গর্ভে থাকাকালীন অবস্থায় নির্ধারিত করা হইয়াছে। যতক্ষণ পর্যন্ত সেই সৌভাগ্য তাহার পক্ষে না বর্তায় ততক্ষণ পর্যন্ত সে শান্তি পায় না। যাহার ভাগ্যে দুর্ভাগ্য লিখিত রহিয়াছে তাহা মায়ের উদরে থাকা অবস্থায়ই লিখিত হইয়াছে। এই হতভাগ্যের দুর্ভাগ্য আলেমদের এলম এবং চিকিৎসকদের চিকিৎসায় কখনও দূর হইতে পারে না।


হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন : মায়ের উদরে থাকাকালীন যাহাকে ভাগ্যবান করা হইয়াছে সে-ই ভাগ্যবান। পক্ষান্তরে মায়ের উদরে যাহাকে দুর্ভাগা লেখা হইয়াছে সে-ই দুর্ভাগা।


আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা সৌভাগ্যশালী এবং যাহাকে ইচ্ছা দুর্ভাগা করিয়া রাখিয়াছেন। যেমন, আল্লাহ তাআলা এরশাদ করিয়াছেন, “আমি তোমাদের কিসমত তোমাদের মধ্যে বণ্টন করিয়া রাখিয়াছি।"


যে পরিমাণ নেকী যেব্যক্তির জন্য নির্ধারণ করা হইয়াছে উহা তাহার দ্বারা কার্যকরী হয় এবং উহা করার জন্য সে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকে। তাহার প্রতিটি কাজ ও কথায় নেকী প্রকাশ পায়; সমস্ত অন্যায়-অত্যাচার তাহার নিকট হইতে দূর হইয়া যায়। সে তাহার সৌভাগ্যের প্রতিদান দিতে থাকে। অর্থাৎ পুণ্যের কাজে আত্মনিয়োগ করে।

তারপর বলিলেন, আবার এমনও দেখা গিয়াছে যে, বহু লোক নিজেকে পাপী এবং দুর্ভাগ্য বলিয়া মনে করে। ইহা জানা সত্ত্বেও দৃঢ়তার সাথে ভাল হওয়ার জন্য উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়া যায় যেন সে তাহার লক্ষ্যস্থলে পৌঁছিতে পারে। অর্থাৎ, সে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হওয়ার মানসে কোন কামেল পীরের নিকট আত্মসমর্পণ করে। ইহার প্রতি ইঙ্গিত করিয়াই বলা হইয়াছে :


অক্ষম পিঁপড়া কাবায় পৌঁছার চিন্তায় বিভোর। পরিশেষে সে কবুতরের পায়ে জড়াইয়া পড়িল। ফলে সে উহার লক্ষ্যস্থল কাবায় গিয়া পৌছিল।


অতঃপর বলিলেন, আল্লাহ তাআলা অনাদিকালেই বান্দার এই সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য নির্ধারণ করিয়া রাখিয়াছেন। আর ইহাও কেহ দৃঢ়তার সাথে বলিতে পারে না, কে নেকবখত আর কে বদবখত। তবে পুণ্যের কাজ করা, সৎ পথে চলা নেকবখতার এবং শরীয়তের বিরোধিতা করা, পাপে আত্মনিয়োগ করা বদবখতীর লক্ষণ


তারপর বলিলেন, এমন বহু লোক আছে, পবিত্র মক্কা শরীফে বসবাস করা সত্ত্বেও কোন দিন তাহারা কাবার যিয়ারত করে নাই বা কোন বৎসর হজ্জও করে নাই। কারণ, এই পবিত্র কাজ করা তাহাদের ভাগ্যে লিখিত নাই। তাই তাহারা এই কাজ করার চিন্তাও করে না। ইহারা কাবার মান-মর্যাদা কি অবগত হইতে পারে? হে কাবা ! তুমি আমার নিকটবর্তী ! অথচ আমি তোমার প্রতি উদাসীন। সত্য বলিতে কি, এই জাতীয় মক্কাবাসী কাবার মর্যাদা কি বুঝিবে?


দুনিয়ায় বহু লোক অধিক আগ্রহের সাথে কাবার যিয়ারত করার জন্য রওয়ানা হন। এই সমস্ত আগ্রহী লোকদের মধ্যে কেহ কেহ মক্কা শরীফে পৌঁছিয়া কাবার দর্শন লাভ করত ধন্য হন। আবার কেহ বা পথিমধ্যেই ইনতেকাল করেন। যাহারা পথিমধ্যে ইনতেকাল করেন, প্রতি বৎসর তাহাদের নামে একটি করিয়া কবুল হজ্জ লিখিত হইয়া থাকে।


হে কাবার অধিপতি ! আমাকেও ঐ সমস্ত লোকের মত পথিক মনে করিয়া গ্রহণ করার যোগ্যতা দান করুন। আমি হজ্জ করি নাই বটে, কিন্তু ঐ পথে চলিয়াছি।


অতঃপর বলিলেন, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর যুগে মদীনা শরীফে চারিশত মোনাফেক ছিল। সাহাবায়ে কেরাম অনেক কাজ সুসম্পন্ন করিতেই তাহাদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হইতেন। এই কারণে তাঁহারা দুঃখিত এবং মনঃক্ষুণ্ণ থাকিতেন।


দ্বীনে মুহাম্মদী প্রচার করার মানসে যখনই সাহাবাগণ কাফেরদের সাথে জিহাদ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেন, তখনই এই সমস্ত মোনাফেক গোপনে কাফেরদিগকে সংবাদ পরিবেশন করিত। সাহাবায়ে কেরাম যখন এই অবস্থা বুঝিতে পারিলেন, তখন পশ্চিম দিকে যুদ্ধ করার হইলে পূর্ব দিকে রওয়ানা হইতেন। দুই তিন মনযিল পূর্ব দিকে চলার পর আবার গন্তব্যস্থল পশ্চিম দিকে রওয়ানা হইতেন। সাহাবায়ে কেরামের এই অবস্থা দেখিয়া মোনাফেকরা হতভম্ব হইয়া যাইত এবং যথার্থ খবর পরিবেশন করিতে সক্ষম হইত না।


বাদশাহের জন্য এরূপ জঙ্গী চাল সুন্নত। সাহাবায়ে কেরাম যে কাজ করার মনস্থ করিতেন, মোনাফেকরা সেই কাজের ক্ষতি সাধন করার জন্য উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়া যাইত। সাহাবায়ে কেরামের কাজ এই কারণেই কাফেরদের নিকট আর গোপন থাকিত না। অথচ এই মোনাফেকরা প্রকাশ্যে জামাআতের সাথে নামায পড়িত, রমযানের রোযা রাখিত আর প্রত্যেকেই বলিত; আমি একজন মুসলমান। পবিত্র কোরআন ইহাদের সম্বন্ধে বলে : মোমেনদের সাথে সাক্ষাত হইলে তাহারা বলে আমরাও মোমেন। আর যখন শয়তানের নেতার সাথে মিলিত হয়, তখন বলে, আমরা তো মুসলমানদের সাথে ঠাট্টা করি।


কোরআনে ইহাদের সম্বন্ধে কঠোর আযাবের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে। আল্লাহ তাআলা বলেন :

“নিশ্চয় মোনাফেক সম্প্রদায় অগ্নির শেষ স্তরে থাকিবে।”


আর এক বন্ধু জিজ্ঞাসা করিলেন, মানুষের মধ্যে যেমন নেকবখত ও বদবখত আছে, তেমনি মাটিও বদবখত ও নেকবখত হয় নাকি?

হযরত পীর ও মুরশিদ বলিলেন, মাটিও নেকবখত এবং বদবখত হয়। যে মাটি উর্বর, সে মাটির গাছ প্রচুর পরিমাণে ফসল দেয়, যে মাটি প্রচুর পরিমাণে ফলস দেয় সেই মাটি নেকবখত। আর যে মাটি অনুর্বর, ফসল দেয় না, উহা বদবখত। নেকবখত ও বদবখত সমস্ত সৃষ্টির মধ্যেই আছে।

মোটকথা, আল্লাহ যাহাকে নেকবখত বা ভাগ্যবান করিয়াছেন সে শয়তানের ফাঁদে পড়িয়া কখনও দুর্ভাগা হইতে পারে না। আর যাহাকে আল্লাহ দুর্ভাগা করিয়াছেন সে দুনিয়ায় ওলীদের চেষ্টায়ও ভাগ্যবান হইতে পারে না।

-------------

সুলুক এবং আহলে সুলুক (মাজালিসে গাযযালী- ৪)



📚মাজালিসে গাযযালী ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
4  চতুর্থ মাজালিস

সুলুক এবং আহলে সুলুক-

ঊনত্রিশে সফর, রবিবার। উপস্থিত মুরীদ ও ভক্তদের উদ্দেশে হুজ্জাতুল ইসলাম পীরে কামেল হযরত ইমাম গায্যালী (রহঃ) এরশাদ করিলেন, যাহারা আপাদমস্তক মহব্বতে ডুবিয়া থাকেন তাহারাই সালেক। এমন কোন মুহূর্ত খালি যায় না যেই মুহূর্তে মহব্বতের জগত হইতে তাহাদের উপর প্রেমের বারিধারা বর্ধিত না হয়। আর যাহার উপর আলমে আসরার (রহস্যজগত) হইতে প্রতিক্ষণে হাজার অবস্থার সৃষ্টি হয় আর তিনি মত্ততার জগতে এমনভাবে বিভোর থাকেন যে, তাঁহার বুকের উপর যদি আঠার হাজার আলম চাপাইয়া দেওয়া হয় তবুও তিনি উহার খবর রাখেন না; এমন ব্যক্তিকেই আরেফ বলা হয়।


অতঃপর বলিলেন, আমি একবার সমরকন্দে এমন একজন বুযুর্গকে দেখি যিনি বিস্ময়ের জগতে ডুবিয়া রহিয়াছেন। আমি লোকের নিকট জিজ্ঞাসা করিলাম, কত বৎসর যাবত তিনি এই অবস্থায় আছেন? তাহারা বলিল, বিশ বৎসর যাবত আমরা তাঁহাকে একই অবস্থায় দেখিতেছি। যাহা হউক, আমি বেশ কিছুদিন তাঁহার নিকট রহিলাম। এক সময় আমি তাঁহাকে আলমে ছোহওতে অর্থাৎ হুশের অবস্থায় পাইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, কতদিন যাবত আপনি এই অবস্থায় আছেন? কেহ আপনার নিকট আসা যাওয়া করিলে আপনি অবগত হইতে পারেন কিনা ?


তিনি বলিলেন, ওহে নাদান ! দরবেশ যখন প্রেম জগতে নিমজ্জিত থাকেন এবং তাহার উপর রহস্যের জোতি প্রকাশ পাইতে থাকে তখন তাহার কোন কিছুর খবরই থাকে না। এই অবস্থায় যদি তাহাকে টুকরা টুকরা করিয়াও ফেলা হয় তবু তিনি কিছুই বুঝিতে পারেন না।


দরবেশগণ ! এই পথ তো জীবনবাজি লাগানোর পথ। যে এই পথে পা রাখিয়াছে সে জীবন লইয়া ফিরিতে পারে নাই। হযরত ইয়াহ্ইয়া (আঃ)-এর গলায় যখন শত্রুগণ ছুরি চালাইতে আরম্ভ করে, তখন তিনি ফরিয়াদ করার মনস্থ করেন প্রত্যাদেশ আসিল 

“ইয়াহ্ইয়া ! তুমি যদি একটুও আহ উহ কর তবে আমার বন্ধুদের তালিকা হইতে তোমার নাম কাটিয়া দেওয়া হইবে।” তেমনি যখন হযরত যাকারিয়া (আঃ)-এর মাথায় করাত চলা আরম্ভ করিল, তখন তিনি ফরিয়াদ করিতে মনস্থ করেন। এনন সময় হযরত জিবরাঈল (আঃ) আগমন করিয়া বলিলেন, আল্লাহ বলিয়াছেন, “এই সময় যদি তোমার মুখ হইতে দুঃখ-যাতনাসূচক কোন একটি শব্দও বাহির হয়, তবে পয়গম্বরদের দপ্তর হইতে তোমার নাম খারিজ করিয়া দেওয়া হইবে।”


অতঃপর তিনি অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলিলেন, যে কেহ মহব্বতের দাবী করত বালা-মসিবতে পড়িয়া আল্লাহর দরবারে সহনশক্তি দাবী করে, সে সত্যিকারের প্রেমিক নহে। বরং সে তাহার দাবীতে মিথ্যাবাদী।


বন্ধুর পক্ষ হইতে যতই বিপদাপদই আসুক না কেন, তাহাতে যে ধৈর্যধারণ করে এবং বারংবার শুকরিয়া আদায় করে সে-ই যথার্থ বন্ধু। বন্ধুর দাবীতে সে সত্যবাদী এবং সাথে সাথে এই কথাও বলে যে, এই বাহানায় তিনি আমাকে স্মরণ করিয়াছেন। হযরত রাবেয়া বসরীর উপর যেদিন কোন বিপদাপদ হইত সেদিন তিনি আনন্দ গদগদ কণ্ঠে বলিতেন আজ আমার মাহবুব এই দুর্বলাকে স্মরণ করিয়াছেন। আর যেদিন তিনি বিপদমুক্ত থাকিতেন সেদিন খুব কাঁদিতেন আর বলিতেন, আজ আমি এমন কি অন্যায় করিলাম যেজন্য আমার বন্ধু আমাকে স্মরণ করেন নাই।


বন্ধুগণ ! সলুকুপন্থী হইল ঐ ব্যক্তি যে প্রেম-মহব্বতের দাবী করে, আর যে প্রেমিক হওয়ার দাবী করে এবং বন্ধুর দেওয়া দুঃখ-কষ্ট আনন্দের সাথে গ্রহণ না করে, সে আহলে মারেফাতের নিকট মিথ্যাবাদী।

অতঃপর ময়দানে গায়েব অর্থাৎ অদৃশ্যলোকের কথা উঠিলে পীর ও মুরশিদ এরশাদ করিলেন, যেব্যক্তি পূর্ণতার স্তরে পৌঁছিয়া অকপট অবস্থায় দীর্ঘ দিন সেখানে আছেন তাহাকে অদৃশ্য হইতে আহ্বান করা হয়। ওসমান নামক আমার এক বন্ধু এবং পীর ভাই ছিলেন। তিনি যখন আধ্যাত্মিকতার চরম শিখরে পৌঁছেন তখন এক অদৃশ্য লোক তাঁহার সাথে সাক্ষাত করিয়াছিলেন। একদিন তিনি তাঁহার বন্ধু-বান্ধবের সমাবেশে বসা ছিলেন। আমিও সেখানে ছিলাম। আমরা সকলে শুনিতে পাইলাম কে যেন বলিলেন, হে শায়খ ওসমান। এদিকে আস। আওয়ায় পাওয়ার সাথে সাথে তিনি উঠিয়া দাঁড়াইলেন এবং যেদিক হইতে আওয়ায আসিতেছিল সেদিকে রওয়ানা হইলেন। মুহূর্তের মধ্যে তিনি আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে চলিয়া গেলেন। ইহার পর আমরা তাঁহার আর কোন সন্ধান পাই নাই।


একবার আমি এবং আমার এক বন্ধু কাবার তাওয়াফ করিতেছিলাম। শায়খ ওসমান নামক একজন বুযুর্গের সন্ধান পাইয়া আমরা তাঁহার পিছনে পিছনে চলিলাম। তিনি যেদিকে যাইতেছিলেন আমরাও সেদিকে যাইতেছিলাম। তিনি আমাদের উদ্দেশ্য বুঝিতে পারিলেন এবং আমাদের দিকে ফিরিয়া বলিলেন, আমার পিছনে পিছনে আসিলে কি হইবে ? বরং আমি যাহা কিছু করি তোমরাও তাহা কর । আমরা জিজ্ঞাসা করিলাম, হযরত আপনি কি করেন ? 

তিনি বলিলেন, আমি প্রত্যেক দিন হাজার বার কোরআন খতম করি।

আমাদের মনে খটকা লাগিল যে, ইহা কিভাবে সম্ভব হইতে পারে। তিনি আমাদের মনের অবস্থা বুঝিতে পারিয়া মাথা উঁচু করিয়া বলিলেন, হাঁ, অক্ষরে অক্ষরে তেলাওয়াত করিয়াই হাজার বার কোরআন খতম করি। আমরা বুঝিতে পারিলাম, যাহা মানুষের বোধগম্যের বাহিরে তাহাই কারামত। হাজার বার কোরআন খতম করা এই বুযুর্গের খাস কারামত ছিল।


অতঃপর মজলিসের আদব সম্বন্ধে আলোচনা আরম্ভ হওয়ায় এরশাদ করিলেন, মজলিসের যেখানে স্থান পাইবে সেখানেই বসিবে এবং উহাই তোমার বসার স্থান। একবার হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবায়ে কেরাম দ্বারা পরিবেষ্টিত হইয়া বসা ছিলেন। এমন সময় সেখানে তিন ব্যক্তি উপস্থিত হইলেন। একজন সেই মজলিসে স্থান পাইয়া বসিলেন। দ্বিতীয়জন স্থান না পাইয়া পিছনে বসিলেন। তৃতীয়জন স্থান না পাইয়া চলিয়া গেলেন। এক মুহূর্ত অতিবাহিত না হইতেই হযরত জিবরাঈল (আঃ) আগমন করিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আল্লাহ তাআলা এরশাদ করিয়াছেন, যেব্যক্তি আসিয়া বৃত্তের মধ্যে স্থান পাইয়া বসিয়াছে আমি তাহাকে আমার আশ্রয়ে স্থান দিয়াছি। আর যে স্থান না পাইয়া লজ্জার সাথে বৃত্তের বাহিরে বসিয়াছে আমিও তাহার নিকট লজ্জিত। পরকালে তাহার কোন অসুবিধা হইবে না। আর যেব্যক্তি স্থান না পাইয়া মুখ ফিরাইয়া চলিয়া গেল, আমিও তাহার দিক হইতে রহমতের মুখ ফিরাইয়া লইলাম।

সুতরাং মজলিসে উপস্থিত হইয়া যেখানে স্থান পাইবে সেখানেই বসিবে । বৃত্তের মধ্যে স্থান না পাইলে পিছনে বসিবে। কেননা, উহাই অগন্তুকের বসার স্থান। সব সময় বৃত্তের মধ্যে বসার চেষ্টা করিবে না। 


হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে দিন-রাত কখন হয় কিছুই বলিতে পারি না। তোমার জন্য আল্লাহ আজ আমাকে এই বাস্তব জগতে ফিরাইয়া দিয়াছেন।

বন্ধু, তুমি ফিরিয়া যাও ! আল্লাহ এই কষ্টের প্রতিদান অবশ্যই তোমাকে দান করিবেন। স্মরণ রাখিও, তুমি যখন এই পথে পা রাখিয়াছ, তখন পৃথিবী ও পার্থিব বস্তুর প্রতি কখনও আকৃষ্ট হইও না, লোক সংস্রব পরিহার করিয়া চলিও। তুমি যাহা কিছু উপার্জন করিবে বা উপঢৌকন হিসাবে পাইবে, উহা কখনও সঞ্চয় করিয়া রাখিবে না; দান করিয়া দিবে। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন কিছুর প্রতি আকৃষ্ট হইলে কষ্ট পাইবে। এই কথা বলিয়াই তিনি আবার বিস্ময়ের জগতে ডুবিয়া গেলেন ।

-----------

ইলম ও আমল (মাজালিসে গাযযালী - ৩)



📚মাজালিসে গাযযালী ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
৩ - তৃতীয় মজলিস 

ইলম ও আমল
আটাশে সফর শনিবার। দরবার শরীফে ইলম ও আমল সম্বন্ধে আলাপ-আলোচনা হইতেছিল
হযরত পীর ও মুরশিদ (ইমাম গাজ্জালী রহঃ) বলিলেন, কেহ যদি ইলম সম্বন্ধীয় প্রশ্ন করে তবে পশ্নকারীর অবস্থ। এবং হাল-হাকীকত অনুযায়ী উত্তর দিতে হয়।


এই প্রসঙ্গে তিনি বলিলেন, এক ব্যক্তি খুব মূল্যবান পোশাক পরিধান করিয়া এক বুযুর্গের দরবারে উপস্থিত হইল এবং প্রশ্ন করিল, বৈরাগ্য কি? 
এই ব্যক্তি ধন সম্পত্তির প্রতি প্রবল আসক্ত ছিল। বুযুর্গ তাহার ধর্মীয় উপকারিতার প্রতি লক্ষ্য করিয়া উত্তর দিলেন, ধন-সম্পদের মায়া পরিত্যাগ করাকেই যোহদ বা বৈরাগ্য বলা হয়।
উত্তরদানকারীর কর্তব্য প্রশ্নকারীর অবস্থা ও বুঝ-ব্যবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া উত্তর দেওয়া, যাহাতে প্রশ্নকারী সহজে বুঝিয়া উপকৃত হইতে পারে। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করিয়াছেন, 
“উদ্দেশিত ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তার পরিমাপে কথা বল।”
এই প্রসঙ্গে কোন বুযুর্গ বলিয়াছেন, লোকের বুদ্ধিমত্তা অনুযায়ী কথা বলিবে যাহাতে তাহারা "আমার কথা বুঝিতে পারে।
কোন লোক কোন বুযুর্গের নিকট প্রশ্ন করিলে বুযুর্গ যদি স্বীয় বুদ্ধিমত্তা অনুযায়ী উত্তর দেন তবে প্রশ্নকারী তাহা দ্বারা কোন প্রকার উপকৃত হয় না। উত্তরদাতার কর্তব্য প্রশ্নকারীকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যে, তাহার কথার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন আছে কিনা? 
যদি উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলিয়া মনে হয় তবে তাহার বুঝশক্তি মোতাবেক উত্তর দিবে। আর যদি যদি মনে হয় যে, প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কোন প্রয়োজন নাই, তবে উত্তর দিবে না। বরং টালবাহানা করিয়া এড়াইয়া যাইবে। কারণ, তাহার প্রশ্ন অবান্তর : ধর্মের প্রতি তাহার কোন আসক্তি নাই। ধর্মের সন্ধান করা, যাহা তাহার পক্ষে ফরয, সে তাহা পরিত্যাগ করিয়াছে অযথা প্রশ্ন করিয়া সময় নষ্ট করিতে আসিয়াছে। বর্ণিত আছে, একবার এক গ্রাম্য আরব হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে উপস্থিত হইয়া বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আমাকে গুরুত্বপূর্ণ এলম শিখাইয়া দিন।
হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাহার দিকে তাকাইয়া বুঝিলেন, প্রশ্নকারী যে প্রশ্ন করিয়াছে সে তাহা বুঝে নাই। তাই তিনি তাহাকে এরশাদ করিলেন, মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও। 
অতঃপর পীর ও মুরশিদ বলিলেন এই যুগে এমন লোকও আছে যাহারা ফরয,ওয়াজিব, সুন্নত ও মুস্তাহাব আদায় করে না, কিন্তু ধুমধামের সাথে হজ্জ করিতে যায়। অথচ হজ্জ করা ফরয হওয়ার কোন শর্তই তাহাদের মধ্যে পাওয়া যায় না। আবার এমন বহু লোকও আছে যাহারা বাপ-মায়ের হুকুম ব্যতীতই বিদেশ ভ্রমণে বাহির হয় এবং অহংকারের সহিত বলে আমি এমন এমন বস্তু দেখিয়াছি, এতবার বিদেশ ভ্রমণ করিয়াছি, অমুক অমুক বুযুর্গের সাক্ষাত লাভ করিয়াছি অমুক বড় বড় খানকায় গিয়াছি। এই জাতীয় সমস্ত সফরই হারাম।
তারপর বলিলেন, সফর চারি প্রকার।
প্রথম প্রকার হজ্জের সফর। যদি হজ্জের জন্য আর্থিক সামর্থ্য এবং রাস্তা বিপদমুক্ত থাকে তবে হজ্জ করা ফরয হয়। যেমন- আল্লাহ তাআলা বলেন, যেব্যক্তি পথ খরচে সক্ষম তাহার পক্ষে আল্লাহর ঘরের হজ্জ করা ফযর। 
দ্বিতীয় সফর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর রওযা যিয়ারত করার মানসে মদীনা শরীফ গমন করা।
তৃতীয় সফর বায়তুল মোকাদ্দাস যিয়ারতের জন্য গমন করা। 
চতুর্থ সফর ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের জন্য বিদেশযাত্রা।
নিজের দেশে যদি ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের কোন প্রকার সুযোগ-সুবিধা না থাকে তবে অন্যত্র যাওয়া যায়। কেননা, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উপর ফরয।
আর এক হাদীসে বর্ণিত আছে, চীন দেশে গিয়া হইলেও এলম শিক্ষা কর। 
এক বন্ধু জিজ্ঞাসা করিলেন, কোন কোন বুযুর্গ জুমআর নামাযে উপস্থিত হন না, ইহার কারণ কি এবং ইহার রহস্য কোথায়?
তিনি উত্তরে বলিলেন, কোন কোন বুযুর্গ নির্জনতা অবলম্বন করিয়া এক বিশেষ অবস্থার মধ্যে থাকেন। নির্জনতায় থাকিয়া সেই বিশেষ অবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ করেন। জুমআর জামাআতে উপস্থিত না হওয়ায় তাঁহাদের আসলে কোন প্রকার ক্ষতি হয় না। ফলে তাঁহারা উপকার ও অপকারের প্রতি লক্ষ্য রাখেন। যে কাজে বেশী উপকার দেখেন তাহাই অবলম্বন করেন। মসজিদে যাওয়া-আসা করিলে বহু লোকের সাথে মেলামেশা করিতে হয়। ইহাতে তাঁহাদের সময়ের অপচয় হয়। উপকারের চেয়ে অপকারই বেশী হয়। তাই তাঁহারা মসজিদে যাওয়া-আসা পরিত্যাগ করেন।
কিন্তু যে সমস্ত অকর্মণ্য লোক এই বিশেষ অবস্থায় না পৌঁছিয়া ঐ অবস্থার দাবী করত জুমআ ও জামাআত পরিত্যাগ করে এবং কোন স্বার্থসিদ্ধির মানসে নির্জনতা অবলম্বন করিয়া নিজের মর্যাদা বুযুর্গদের মর্যাদার সমতুল্য করিতে চায়, তাহাদের মত দুর্ভাগা আর কে আছে ? তাহারা গোমরাহ-পথভ্রষ্ট।
আবার কোন কোন বুযুর্গ বয়সের আধিক্য এবং দুর্বলতার জন্যও জুমআ এবং জামাআতে যাইতে অক্ষম থাকেন। এই দুর্বলতা ও অক্ষমতা শরীয়তের দৃষ্টিতে মার্জনীয়। যদিও তাঁহারা ইশারায় অনেক কিছু করার ক্ষমতা রাখেন তথাপি তাঁহারা অক্ষম। এই জন্যই তাঁহারা মসজিদে উপস্থিত হন না।
আবার কোন কোন বুযুর্গ আল্লাহর ধ্যানে ডুবিয়া থাকেন। এই ডুবিয়া থাকাতে তাঁহারা অনেক উপকার মনে করেন। মসজিদে যাওয়া আসা এবং সেখানে লোকের সাথে মেলামেশা করিয়া সময় নষ্ট করা এই ডুবিয়া থাকার পক্ষে ক্ষতিকর মনে করেন। এই সমস্ত ধ্যানমগ্ন লোকদের উদ্দেশেই হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, আল্লাহর সাথে যাহার মধুর সম্পর্ক স্থাপিত হইয়াছে, লোকের সাথে মেলামেশা করিতে সে ভয় পায়।
কিন্তু প্রকৃত কথা হইল. যে আরেফ মসজিদে উপস্থিত থাকিয়া ফরয, ওয়াজিব ও সুন্নত আদায় করেন সেই আরেফকেই পরিপূর্ণ নিরাপদ বলিব। কারণ, তরীকতের উপর শরীয়ত মোতাবেক আমল করাই কর্তব্য এবং উভয়ের মধ্যে কোন প্রকার তারতম্য আসিতে না দেওয়াই উচিত।
তারপর তিনি এরশাদ করিলেন, বুযুর্গদের নীতি হইল, মতবিরোধযুক্ত মাসআলার যে দিকটা কঠিন সেই দিকটাই তাঁহারা অবলম্বন করেন এবং সেই মতেই নফসকে চলার নির্দেশ দেন। কারণ, ইহাতে নফসের কৃচ্ছ্র সাধন হয়।
প্রতিটি সাধারণ লোক যে তাঁহাদের অসাধারণ বাণীর অনুসরণ করে, তুমি মনে রাখিও, তাহাতে আসলে বহু দোষ আছে। কারণ, তাহার নফস তৃপ্তি ও সহজ পন্থার সন্ধানী এবং নফসের খুশীমত ঠিকভাবে এবাদত হয় না।
এক বন্ধু জিজ্ঞাসা করিলেন, যখন হইতে আমি এই হাদীস “দুই জামা বিশিষ্ট লোকের ঈমানে স্বাদ নাই" দেখিলাম, তখন হইতেই আমার মনে কেমন যেন খটকা লাগিয়া রহিয়াছে। এই হাদীসের অর্থ কি? পীর ও মুরশিদ বলিলেন, এই হাদীসের ব্যাখ্যা মতে দুই স্ত্রীওয়ালা লোক ঈমানের স্বাদ পায় না।
তারপর বলিলেন, অধিক বিবাহ করা উচিত নহে। কারণ, অধিক বিবাহের ফলে পুরুষ বিপদাপন্ন হয়। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, পরিবারের সংখ্যাধিক্য এবং সম্পদের অপ্রাচুর্য লোকের পক্ষে অবমাননাকর।
প্রকৃতপক্ষে দুই জামার অধিকারী শব্দটির আরও সুন্দর একটি অর্থ আছে। অর্থাৎ, যেব্যক্তি দুই জামার অধিকারী, তাহার চেয়ে এক জামার মালিক অধিক সংসারবিরাগী। আর যেব্যক্তি সংসারবিরাগী নহে সে ঈমানের স্বাধ কিভাবে পাইতে পারে?
যে বস্তু তোমাকে বন্ধু হইতে দূরে রাখে তাহা খারাপ। আর যে বস্তু তোমাকে বন্ধুর নৈকট্যলাভে সহায়তা করে তাহা খুবই ভাল। তাই এক বুযুর্গ কি সুন্দর বলিয়াছেন, তুমি দুনিয়াতেই দুনিয়ার আসক্তি ত্যাগ কর। এরূপ করিলেই তুমি আল্লাহর সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করিতে পারিবে। আমার ও আল্লাহর মধ্যে ইহাই অন্তরায় । ইহাই সত্য অনুধাবন করা। ইহাই সঠিক পথ।
---------------

সৃষ্টি রহস্য (মাজালিসে গাযযালী- ২)



📚মাজালিসে গাযযালী ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
২ - দ্বিতীয় মজলিস 
সৃষ্টি রহস্য-

সাতাশে সফর, শুক্রবার। আমি দরবার শরীফে উপস্থিত হইয়া আরয করিলাম, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, আল্লাহ তাঁহার সৃষ্টিকে অন্ধকারে সৃষ্টি করিয়া পরে স্বীয় নূর দ্বারা আলোকিত করেন। ইহার অর্থ বুঝিতে পারিলাম না।


হযরত পীর ও মুরশিদ বলিলেন, যাবতীয় কিছুর সৃষ্টি অন্ধকারে হইয়াছিল। পরে আল্লাহর নূরে সেইসব আলোকিত হয়; প্রত্যেকে স্বীয় ক্ষমতানুযায়ী সেই নূরের জ্যোতি গ্রহণ করিয়া আলোকোজ্জ্বল হয়। সৃষ্টিতে যে নূর আছে তাহা আল্লাহর নূর হইতে বিচ্ছিন্ন নহে। যেমন সূর্যোদয় হইলে রাতের অন্ধকার দূর হইয়া আলোকোজ্জ্বল দিন প্রকাশ পায়। কিন্তু এই আলো আংশিক ও খণ্ডিত নহে। এমনও নহে যে, অন্ধকার বাড়িয়া যায় অথবা অন্ধকার আলোময় হইয়া যায়, অথবা স্বয়ং সূর্যের আলোর ঘাটতি হয়। অন্ধকার এক বস্তু, আলো অন্য বস্তু; বরং একটি অন্যটির বিপরীত। আবার সূর্যোদয়ের পর চাঁদের আলো চলিয়া যায়। কোন কোন তারকা চন্দ্রের আলোর প্রভাবে স্তিমিত হইয়া পড়ে। ইহার পর বলিলেন, যেমন হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, পুণ্যশীলদের পুণ্য আল্লাহর নৈকট্য লাভকারীদের জন্য পাপস্বরূপ। পাপ এবং পুণ্য সম্পূর্ণরূপে বিপরীতধর্মী। তাই পুণ্য কিভাবে পাপে পরিণত হয় ?

উত্তর এই যে, পুণ্যবানদের পুণ্য নৈকট্য লাভকারীদের পাপ এই অর্থে যে, পুণ্যবানদের পুণ্য বড় এবং নৈকট্য লাভকারীদের পুণ্য উহার চেয়েও অধিক শ্রেষ্ঠ। নৈকট্য লাভকারীগণ যখন মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ, তখন তাহাদের পক্ষে তাহাদের মর্যাদার দিক হইতে সাইয়্যেআহকে পাপ বলা হইয়াছে। যদিও তাহাদের পদমর্যাদায় স্বয়ং হাসান অর্থাৎ সুন্দর। কিন্তু অধিক সুন্দরের দিক হইতে কম মর্যাদাসম্পন্ন। এদিকে ইঙ্গিত করিয়াই হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, পুণ্যবানদের পুণ্য নৈকট্য লাভকারীদের জন্য পাপস্বরূপ। আল্লাহ অধিক জ্ঞাত।


ইহার পর এরশাদ করিলেন, হযরত আদম (আঃ) এই ভুলই করিয়াছিলেন। কারণ, তিনি শ্রেষ্ঠ হইতেও শ্রেষ্ঠতর। সেই কাহিনী হইল, আল্লাহ তাআলা আদম (আঃ)-কে নির্দেশ দিলেন, হে আদম! তুমি এবং তোমার স্ত্রী জান্নাতে আরামে 'বসবাস কর এবং বেহেশতের নেয়ামত যাহা ইচ্ছা পানাহার কর। কিন্তু ঐ বৃক্ষের নিকট যাইও না। (যদি যাও) তবে উভয়ে নাফরমান বলিয়া পরিগণিত হইবে।

একমাত্র গম ব্যতীত বেহেশতের যাবতীয় কিছু হযরত আদম ও হাওয়া (আঃ)-এর জন্য আল্লাহ মোবাহ বা বৈধ করিয়া দিয়াছিলেন। হযরত আদম (আঃ) যখন বেহেশতে প্রবেশ করেন, তখন নিষিদ্ধ বৃক্ষটি তাঁহার যতটা ভাল মনে হইল, অন্য কোন নেয়ামতই ততটা পছন্দ হইল না। নিষিদ্ধ গাছের প্রতি দৃষ্টি পড়িতেই তাহা তাঁহার নিকট খুব ভাল মনে হইতে লাগিল।

হাদীস শরীফে আছে, মানব চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হইল, যে বস্তু হইতে মানুষকে বিরত থাকিতে বলা হয় উহার প্রতিই তাহার আসক্তি বেশী থাকে, উহার প্রতিই সে বেশী আকৃষ্ট হয়৷


হযরত আদম (আঃ) স্বীয় এজতেহাদ ও শয়তানের প্ররোচনায় পড়িয়া সেই নিষিদ্ধ বস্তুই ভক্ষণ করিলেন। যে গাছের ফল খাইতে নিষেধ করা হইয়াছিল । অবশ্য ঠিক ঐ গাছের ফল খান নাই। কারণ, বেহেশতে ঐ একই জাতীয় গাছ বহু প্রকারের ছিল

তিনি যখন ঐ গাছের ফল খাওয়ার মনস্থ করিলেন, তখন ভাবিলেন, আমাকে বিশেষ একটি গাছের ফল খাইতে নিষেধ করা হইয়াছে। কিন্তু ঐ জাতীয় অন্যান্য গাছের ফলও যে খাইতে পারিব না, এমন নির্দেশ তো দেওয়া হয় নাই। সুতরাং তিনি সেই ফল ভক্ষণ করিলেন।

তিনি যে এজতেহাদ বা গবেষণা করিলেন, ইহাই ভুল করিলেন। তাঁহার উচিত ছিল সতর্ক থাকা এবং জিবরাঈল (আঃ)-এর আসার অপেক্ষায় থাকা যে, তিনি এই সম্বন্ধে আল্লাহর কোন নির্দেশ আমাকে দেন কিনা ? তদুপরি ইহা খাওয়ার এমন কি প্রয়োজনই বা ছিল ? খাওয়ার মত বস্তুর কোন অভাবই তো বেহেশতে ছিল না। সুতরাং ওযর আপত্তি পেশ করার মত কোন কিছুই তাঁহার ছিল না।

যখন তিনি নিজের রায় মোতাবেক এবং শয়তানের প্ররোচনায় উহা ভক্ষণ করিলেন, তখন তাঁহার যে শ্রেষ্ঠ মর্যাদা ছিল উহা কমিয়া গেল। আদম (আঃ) আল্লাহর ইচ্ছা বুঝিতে অক্ষম হইল। শাস্তিস্বরূপ মাথার তাজ ও দেহের আবরণ খুলিয়া লওয়া সর্বসাধারণের জন্য শরীরের যে অংশ আবৃত্ত করিয়া রাখার নির্দেশ রহিয়াছে, হজরত আদম (আঃ) শরীরের সেই অংশ কখনও দেখেন নাই । তাঁহার নাভির নিচে এক প্রকার নূর ছিল । কখনও নাভির নিচে দৃষ্টিপাত করিলে সেই নূর নাভির নিম্নাংশ দেখায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিত। যখন সেই নূরানী পর্দা উঠাইয়া লওয়া হইল তখন তিনি দেহের নিম্নাংশ দেখিতে পাইলেন এবং লজ্জা ও ভয় পাইতে লাগিলেন যে, হয়ত ফেরেশতাগণ আমার এই অনাবৃত দেহাংশ দেখিয়া ফেলিবেন। তখন তিনি ভয় ও লজ্জায় বেহেশতময় দৌড়াদৌড়ি আরম্ভ করিলেন এবং লজ্জা ঢাকার জন্য এই গাছ সেই গাছের নিকট পাতা ভিক্ষা চাহিতে লাগিলেন। আল্লাহ তখন এরশাদ করিলেন, হে আদম! তুমি আমার দৃষ্টি হইতে পলায়ন ক্ষরিয়া ফিরিতেছ ? আদম (আঃ) আরয করিলেন, প্রভু ! কখনও না। বরং আমি কোন্ শরমে আপনাকে মুখ দেখাইব?

আল্লাহ নির্দেশ দিলেন, বেহেশত হইতে বাহির হইয়া যাও। তিনি যখন বেহেশত দ্বারে পৌঁছিলেন, তখন তাঁহার লজ্জা নিবারণ করার জন্য ফলের গাছ পাতা দান করিল। মোট কথা, হযরত আদম (আঃ)-কে সরন্দ্বীপ এবং হযরত হাওয়া (আঃ)-কে জেদ্দায় নামাইয়া দেওয়া হইল।


ইমাম যাহেদ (রঃ) বলেন, সরন্দ্বীপ এবং জেদ্দার মধ্যে দূরত্ব চৌদ্দ শত মাইল। অতঃপর এই দুনিয়াই হইল তাঁহাদের আবাসভূমি। আল্লাহ তাআলা বলেন, পৃথিবী তোমাদের বাসস্থান। এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমাদের জন্য পৃথিবীতে উপকার নিহিত রহিয়াছে। অতঃপর পৃথিবীর রীতিনীতি মোতাবেক কাজ আরম্ভ। 

পার্থিব রাজা-বাদশাহদের নিয়ম হইল, যখন কোন বাদশাহর কর্মচারী অন্যায় করে তখন তাহাকে সম্মুখ হইতে দূর করিয়া দিয়া বন্দী খানায় পাঠাইয়া দেন। তাই যখন হযরত আদম (আঃ) ভুল করিলেন, তখন আল্লাহ তাঁহাকে শাস্তি দেওয়ার মানসে কয়েদখানাস্বরূপ পৃথিবীতে পাঠাইয়া দিলেন।


এই পৃথিবী মো’মেনদের জন্য বন্দীশালা এবং কাফেরদের জন্য জান্নাত। এদিকে ইঙ্গিত করিয়াই কোন বুযুর্গ বলিয়াছেন-

দৈত্য-দানব ও শয়তানের জন্য এই পৃথিবী আবাসগৃহ। দোস্ত ও মোমেনদের জন্য বন্দীখানা। মোমেনদের জন্য পৃথিবীর এই সমস্ত বস্তু রাখিয়াছেন যাহাতে তাহারা দুনিয়ার প্রয়োজন মনে না করে। দুনিয়ার নেয়ামতকেও যেন অগ্রাহ্য করিয়া চলে। আল্লাহ যেন তোমাদিগকে এই সমস্ত চিন্তা-ভাবনা হইতে নিরাপদ রাখেন।

--------------

ওলীদের কাশফ ও কারামত (মাজালিসে গাযযালী- ১)



📚মাজালিসে গাযযালী ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
১ - প্রথম মজলিস

ওলীদের কাশফ ও কারামত– ১
ছাব্বিশে সফর, বৃহস্পতিবার। পবিত্র দরবারে বহু আলেম-ওলামা এবং আল্লাহর বিশিষ্ট বান্দাদের উপস্থিতিতে ওলীদের কাশফ ও কারামত সম্বন্ধে আলাপ-আলোচনা হইতেছিল । হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গায্যালী (রঃ) বলিলেন-
ভাইসব ! শায়খের কলবের শক্তি এবং পবিত্রতা এই পরিমাণ হইতে হইবে যে, যখন কোন লোক তাহার নিকট আল্লাহর ওয়াস্তে বায়আত গ্রহণ করিতে আসে তখন প্রথমেই শায়খ তাহার বাতেনী দৃষ্টি দ্বারা বায়আত গ্রহণে আগত ব্যক্তির বক্ষদেশে পৃথিবীর প্রতি যেই মায়া-মোহ রহিয়াছে উহা দূর করিয়া দিবেন, যেন তাহার মাঝে হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ-লালসা, দুনিয়ার প্রতি আসক্তি এবং মায়া-মোহ কোন কিছুই অবশিষ্ট না থাকে। এই প্রাথমিক কাজ সমাধা করার পর তাহাকে বায়আত করিবেন এবং আল্লাহপ্রাপ্তির পথে আনিয়া দাঁড় করাইবেন।
এই শক্তি যখন শায়খের মধ্যে থাকিবে না তখন অবশ্যই মনে করিবে, এই পীর ও মুরীদ উভয়েই গোমরাহীর জঙ্গলে উদ্দেশ্যহীনভাবে দিশাহারা হইয়া ঘুরাফেরা করিবে। কোন মতেই তাহারা মনযিলে মকসুদে পৌছিতে সক্ষম হইবে না।

তিনি বলিলেন, একবার এক বুযুর্গ দেশ পর্যটনে বাহির হইলেন। বহু দেশ ঘুরাফেরা করার পর তিনি বদখশান আসিয়া পৌঁছেন। এই বুযুর্গ বলেন, এখানে 'আসিয়া আমি এক বুযুর্গের খানকায় উপস্থিত হই। এই বুযুর্গ এমনই আল্লাহ ওয়ালা এবং খোদাভীরু ছিলেন যে, তা বর্ণনাতীত। আমি তাঁহাকে সালাম করিলাম। তিনি হাসিমুখে সালামের উত্তর দিয়া তাঁহার পাশেই আমাকে বসাইলেন । আমি তাঁহার খেদমতে কিছু দিন থাকার মনস্থ করিলাম ।
তিনি প্রতিদিন রোযা রাখিতেন। ইফতারের সময় হইলে গায়েব হইতে তাঁহার নিকট দুইখানি রুটি আসিত। তিনি একখানি দ্বারা ইফতার করিতেন এবং অন্য রুটিখানি আমাকে দিতেন। একদিন এই বুযুর্গ শহরের শাসনকর্তাকে দরবারে ডাকিয়া আনিয়া বলিলেন, আমার জন্য দুইটি খানকা তৈয়ার কর । শাসনকর্তা খানকা তৈয়ার করিয়া দরবেশকে সংবাদ দিলেন। দরবেশ শাসনকর্তাকে প্রত্যহ একটি গোলাম কিনিয়া দিতে বলিলেন। শাসনকর্তা প্রতিদিন বাজার হইতে একজন করিয়া গোলাম ক্রয় করিয়া আনিয়া তাঁহাকে দিতেন। বুযুর্গ ক্রীতদাসের হাত ধরিয়া খানকায় লইয়া যাইতেন এবং সাজ্জাদায় বসাইয়া বলিতেন, আমি তোমাকে আল্লাহর নিকট সোপর্দ করিলাম। এইভাবে খানকাদ্বয় আবাদ হইয়া গেল।
তাহাদের মর্যাদা এমনই উন্নত মানের হইল যে, তাহারা অনায়াসে পানির উপর দিয়া চলিয়া যাইতে পারিতেন। যাহাকে যেই কথা বলিয়া দিতেন তাহা কার্যে পরিণত হইত। এই অবস্থা দেখিয়া আমার বিস্ময়ের আর অবধি রহিল না। আমার অবস্থা দেখিয়া উক্ত বুযুর্গ বলিলেন, ভাই ! ইহাতে বিস্ময়ের কি আছে? সাজ্জাদার অধিকারী তো ঐ ব্যক্তি, যে কোন ব্যক্তির হাত ধরিয়া তাহাকে সাজ্জাদার অধিকারী বানাইয়া দিতে পারে। যাহার মধ্যে এই শক্তি নাই সে আবার কিসের পীর? বরং সে তো সুলুকধারীদের মধ্যে মিথ্যাবাদী।

অতঃপর হুজ্জাতুল ইসলাম এরশাদ করিলেন, পুরুষের পৌরুষ বা পূর্ণতা চারিটি বস্তু দ্বারা সাধিত হয়। যথা- কম নিদ্রা যাওয়া, কম আহার করা, কম কথা বলা এবং লোকের সাথে অপারগতায় মেলামেশা করা।

তিনি (ইমাম গাজ্জালী) বলিলেন, গজনীতে একজন অবিবাহিত দরবেশ ছিলেন। সমস্ত দিন তিনি যাহা কিছু পাইতেন রাত পর্যন্ত তাহা দান করিয়া দিতেন। একটি কপর্দকও নিজের জন্য রাখিতেন না। আবার রাতে কিছু পাইলে দিনে তাহা দান করিয়া দিতেন। ছোট হউক বা বড়, দরবেশ হউক বা ধনী, যেকোন লোকই তাঁহার নিকট আসিত, কেহই খালি হাতে যাইত না। যদি কোন ব্যক্তি বস্ত্রহীন অবস্থায় আসিত তিনি তাঁহার পরিধেয় ভাল কাপড় খুলিয়া তাহাকে দান করিতেন। এই দরবেশ খুবই দানশীল এবং মুক্তহস্ত ছিলেন। আমি বহু দিন তাঁহার সাথে অবস্থান করি।

একদিন এই দরবেশ আমাকে বলিলেন, আমি একাদিক্রমে চল্লিশ বৎসর কৃচ্ছ্র সাধনা করিয়া আল্লাহর এবাদত-বন্দেগীতে ডুবিয়া রহিয়াছি। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে আমি আমার মধ্যে এমন কোন নূর এবং উন্নতি দেখিতে পাই নাই যাহা চারিটি বিষয় অবলম্বন করার পর দেখিতে পাইয়াছি। অর্থাৎ, (১) কম খাওয়া, (২) কম কথা বলা, (৩) কম নিদ্রা যাওয়া, এবং (৪) লোকের সাথে কম মেলামেশা করা। 

এই নিয়ম মুখ্য ব্রত হিসাবে গ্রহণ করার পর আমি আকাশের দিকে তাকাইলে আল্লাহর আরশ পর্যন্ত দেখিতে পাই। ইহাতে কোন কিছুই আমার দৃষ্টিপথে অন্তরায় হইয়া দাঁড়ায় না। আবার যখন মাটির দিকে দৃষ্টিপাত করি, তখন সপ্ততল যমীনে যাহা কিছু আছে উহার সব কিছুই আমি দেখিতে পাই। 

অতঃপর বলিলেন, হে দরবেশগণ ! যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা কম না খাইবে, কম কথা না বলিবে, কম নিদ্রা না যাইবে এবং লোকের সাথে কম মেলামেশা না করিবে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের কেহই দরবেশীর রত্নভাণ্ডার আয়ত্ত করিতে পারিবে না।

প্রকৃত দরবেশ তো তাহারাই যাহারা নিদ্রা হারাম করিয়া দিয়াছেন ; কথা বলা পরিত্যাগ করিয়া বোবায় পরিণত হইয়াছেন, লতাপাতা চিবাইয়া জীবন রক্ষা করেন এবং লোকসঙ্গকে হলাহলতুল্য মনে করেন। এই গুণাবলী অর্জন করার পরই আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের মর্তবায় উপনীত হওয়া যায় ।

স্মরণ রাখিও, ভাল পেশাক পরিধান করিলে লোকে তাহার দিকে ফিরিয়া চাহিবে, জনসমাজ তাহাকে সম্মান করিবে, এই আশায় যে উৎকৃষ্ট পোশাক পরিধান করে সে সুলুকের পথের মিথ্যাবাদী। 

যে দরবেশ প্রবৃত্তির তাড়নায় পেট ভরিয়া খায়, আলস্য নিদ্রায় গা ভাসাইয়া দেয় এবং অযথা লোকের সাথে মেলামেশা পছন্দ করে, সে তো দরবেশ নামের কলঙ্ক ।

তিনি (ইমাম গাজ্জালী রহঃ) এরশাদ করিলেন, একবার আমি নদী পথে ভ্রমণ করিতেছিলাম। এই সময় এমন একজন দরবেশের সাথে আমার সাক্ষাত হইল, অত্যধিক বিয়াযত-মুজাহাদা করার দরুন তাঁহার দেহের চামড়া হাড়ের সাথে মিলিয়া গিয়াছিল। কিন্তু নিয়ম ছিল, চাশতের নামায আদায় করার পর তাঁহার সম্মুখে দস্তরখানা বিছানো হইত এবং প্রায় হাজার মণ পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য তাহাতে রাখা হইত। যে কেহ তাঁহার নিকট আসিত সে-ই খাইত। অথচ তিনি রোযা রাখিতেন। চাশত হইতে যোহর পর্যন্ত এইভাবে পানাহার চলিত এবং বস্ত্রহীনকে বস্ত্রদান করিতেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি কিছুই তাঁহার নিকট রাখিতেন না।
ইহার পরও বলিতেন, যাহার যাহা কিছুর প্রয়োজন আমার নিকট আস। অতঃপর কেহ তাঁহার নিকট আসিলে জায়নামাযের নিচে হাত দিতেন, যাহা কিছু হাতে আসিত তাহাই দান করিতেন। ইফতারের সময় আলমে গায়েব হইতে চারিটি খুরমা আসিত। আমাকে দুইটি দিতেন এবং নিজে দুইটি দ্বারা ইফতার করিতেন। তিনি আমাকে বলিতেন, কম কথা বলা, কম খাওয়া, কম নিদ্রা যাওয়া এবং নির্জনতা অবলম্বন করা ব্যতীত কেহই দরবেশের মর্যাদা লাভ করিতে পারে না।

হযরত ঈসা (আঃ) সম্বন্ধেও তিনি এই জাতীয় একটি কাহিনীতে এরশাদ করিলেন যে, যালেমদের হাত হইতে উদ্ধার করিয়া যখন হযরত ঈসা (আ.)-কে চতুর্থ আসমানে নেওয়া হইল, তখন মহান আল্লাহ তা'আলা  নির্দেশ দিলেন, তাহাকে ঐখানেই রাখ। এখনও তাহার নিকট পার্থিব সুখ-সম্পদের বস্তু রহিয়াছে।
হযরত ঈসা (আ.) এই বাণী শুনিয়া বিস্মিত হইলেন এবং লক্ষ্য করিতে লাগিলেন, পার্থিব সুখ-সম্পদের কোন বস্তু তাঁহার নিকট এখনও অবশিষ্ট রহিয়াছে। দেখিলেন, একটি সুই এবং এক পেয়ালা চর্বি রহিয়াছে। তিনি আরয করিলেন, হে পরওয়ারদেগারে আলম ! এখন আমি ইহা কি করিব?
এরশাদ হইল, তুমিই তোমার পায়ে কুঠারাঘাত হানিয়াছ। তুমি কি উহা পৃথিবীতেই ফেলিয়া আসিতে পার নাই? সুতরাং আর সম্মুখে অগ্রসর হইতে পারিবে না, ঐখানেই অবস্থান কর।

অথচ এই হযরত ঈসা (আ.) জীবনে বিবাহ করেন নাই, রৌদ্র-বৃষ্টি হইতে আত্মরক্ষা করার জন্য ঘর-বাড়ী তৈয়ার করেন নাই। বিশ্রাম করার প্রয়োজন হইলে একখণ্ড পাথর, ইট বা অন্য কিছু মাথার নিচে দিয়া ক্ষণিকের জন্য বিশ্রাম করিয়া লইতেন।

বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা (আ.) মাথার চুল ও দাড়ি আঁচড়ানোর জন্য একখানা চিরুনি এবং একটি পানপাত্র সর্বক্ষণ সাথে রাখিতেন। একদিন নদীর তীর দিয়া যাওয়ার সময় দেখিতে পাইলেন, এক ব্যক্তি অঞ্জলি ভরিয়া পানি পান করিতেছে। তিনি ভাবিলেন, তাই তো ! অঞ্জলি ভরিয়াই যখন পানি পান করা যায় তখন আর পানপাত্র কেন? সাথে সাথেই তিনি পানপাত্র দূরে ফেলিয়া দিলেন। 
আর একদিন দেখিলেন, এক ব্যক্তি হাতের আঙ্গুল দ্বারা মাতার চুল ও দাড়ি বিন্যাস করিতেছে। সেই দিন হইতে তিনি চিরুনিও আর সাথে রাখিলেন না।

হে দরবেশগণ ! এখানে চিন্তা করিয়া দেখার বিষয় যে, হযরত ঈসা (আ."") ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তু সাথে রাখার জন্য সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার অনুমতি পাইলেন না ; বরং চতুর্থ আসমানেই থাকিতে হইল। সেই ক্ষেত্রে যাহারা পার্থিব বিষয়বস্তুর সহিত ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাহারা কিভাবে বন্ধুর দরবারে পৌঁছার আশা পোষণ করিতে পারে।
দরবেশের কর্তব্য সর্বক্ষণ বিস্ময়াপন্ন থাকা। কেননা, তিনি প্রতিদিন এক স্থান হইতে অন্য স্থানে এবং এক দেশ হইতে অন্য দেশে গমন করেন। এইভাবে তিনি একটির পর একটি উন্নতির সোপান অতিক্রম করিয়া যান।

এক দরবেশ সম্বন্ধে বর্ণিত আছে, তিনি সব সময় চিন্তা-ভাবনা করিতেন এবং বিস্ময়াপন্ন হইয়া থাকিতেন। লোকে তাঁহাকে ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিতেন, আমার প্রতিটি পলক এমন এক দেশের উপর পড়ে যাহা প্রথমটি হইতে শত গুণে বড়। প্রতিটি দেশই প্রথমটি হইতে অধিক রহস্যময়। সুতরাং এই রহস্য স্বচক্ষে দেখিয়াই আমি বিস্ময়াভিভূত হইয়া 
পড়ি।
এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার চক্ষুদ্বয় অশ্রুসিক্ত হইয়া পড়িল। কিছুক্ষণ নিচের দিকে মাথা রাখিয়া আবার বলিলেন, বিস্ময়াভিভূত আহলে সুলুক বলেন, দরবেশ তাহাকে বলা হয় যিনি প্রতিদিন হাজার হাজার দেশ অতিক্রম করিয়া যান এবং তাহাতেই নিমগ্ন থাকেন। যেই দরবেশ আলমে গায়েব হইতে কোন সংবাদ পায় না সে দরবেশ নহে।

অতঃপর বলিলেন, আল্লাহর কোন কোন ওলী প্রেমাধিক্য এবং মত্ততার (সুকর) অবস্থায় কিছু কিছু রহস্য প্রকাশ করিয়া দেন। আবার এমন ওলীও আছেন যাঁহারা কোন অবস্থায়ই রহস্য প্রকাশ পাইতে দেন না। অতএব এই পথে সুলুকধারীদের শক্তি-সাহস আরও প্রশস্ত হওয়া উচিত, যেন রহস্য তাঁহার মধ্যেই সীমিত থাকে। কারণ, মাহবুবের রহস্যে যে পূর্ণতাপ্রাপ্ত, সে তাহা কখনও নষ্ট হইতে দেয় না। 

বহু দিন পর্যন্ত আমি আমার মুরশিদের খেদমতে অবস্থান করিয়াছি। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে আমি কোন দিন শুনি নাই যে, তিনি রহস্যময় কোন কথা বলিয়াছেন। আর আমি ইহাও দেখি নাই যে, তাঁহার মধ্যে যে নূরের আবির্ভাব হইয়াছে তাহা প্রকাশ করিয়াছেন। 

কামেল দরবেশের অবস্থা তো এমন যে, তিনি কোন মতেই রহস্য প্রকাশ হইতে দেন না। ফলে অন্য রহস্য সম্বন্ধে তিনি অবগত হইতে পারেন। তাই মানসূর হাল্লাজ যদি পূর্ণতা প্রাপ্ত হইতেন তবে কখনও তিনি তাঁহার বন্ধুর রহস্য লোক সমাজে প্রকাশ করিতেন না। বন্ধুর রহস্যের সামান্য কিছুটা প্রকাশ করার ফলেই তিনি প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হইয়াছিলেন।

হযরত মানসূর হাল্লাজের এক বোন ছিলেন উঁচু স্তরের একজন ওলী। অর্ধ রাত অতিবাহিত হওয়ার পর তিনি ঘর ছাড়িয়া বাগদাদের উন্মুক্ত মরুভূমিতে চলিয়া যাইতেন এবং একাগ্র চিত্তে বহুক্ষণ আল্লাহর এবাদত-বন্দেগীতের লিপ্ত থাকিতেন। বাড়ী ফিরার সময় হইলে আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদিগকে বলিতেন, আমার প্রেম মদিরার এক পেয়ালা বেহেশতী সুরা তাহাকে পান করিতে দাও। ফেরেশতাগণ পানপাত্র তাঁহার হাতে তুলিয়া দিতেন। তিনি উহা পান করিয়া গৃহে প্রত্যাবর্তন করিতেন। 
হযরত মানসূর বোনের গৃহ হইতে বাহির হইয়া যাওয়ার বিষয় অবগত হইতে পারিলেন। বোন কোথায় যায় জানার জন্য এক রাতে তাঁহার পিছনে পিছনে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেলেন। নিয়মিতভাবেই বাড়ী ফিরার পূর্বে ফেরেশতাগণ তাঁহার সম্মুখে পানপাত্র ধরিলেন। তিনি প্রেম সুধার সামান্য পরিমাণ পান করিতেই মানসূর পিছন হইতে ডাকিয়া বলিলেন, বোন! তুমি একা পান করিও না, আমাকে একটু দাও । পিছনে ফিরিয়া ভাইকে দেখিয়া তো তিনি অবাক! তিনি বলিলেন, হায় অদৃষ্ট ! আমার এতদিনের রহস্য আজ প্রকাশ পাইয়া গেল ! তারপর ভাইকে বলিলেন, তুমি ইহা পান করিও না। আমার বিশ্বাস, তুমি ইহার প্রভাব সহ্য করিতে পারিবে না। ভাই তাঁহার কথায় কর্ণপাত করিলেন না। সেই সুধা পান করিলেন। আর যায় কোথায় ! সঙ্গে সঙ্গেই তাঁহার মুখ হইতে বাহির হইয়া পড়িল, আনাল হক। আমিই সত্য। ভাইয়ের অবস্থা দর্শনে বোন দুঃখে কাঁদিয়া ফেলিলেন। বলিলেন, ওহে অপদার্থ! আমার কথা না শুনিয়া নিজেও দুর্নামগ্রস্ত হইলে আর সাথে সাথে আমাকেও হেয় করিয়া ছাড়িলে। 

ইহার পর মানসূর প্রকাশ্য জনসমাজে আনাল হক, আনাল হক বলিয়া বেড়াইতে থাকেন। শরীয়তমতে তাঁহাকে শূল দণ্ডে দণ্ডিত করা হইল। শূলে চড়ানোর পূর্বে বোন তাঁহার নিকট গিয়া বলিলেন, মানসূর ! আমি না তোমাকে বলিয়াছিলাম, উহা পান করার শক্তি তোমার নাই। আমার কথায় কর্ণপাত না করিয়া আজ সর্বসাধারণ্যে বন্ধুর রহস্য প্রকাশ করিয়া দিয়া মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হইলে।
লোকে বলাবলি করিতে লাগিল, মানসূর এমন পৌরুষের অধিকারী ছিলেন যে, বন্ধুর প্রেমে স্বীয় জীবন উৎসর্গ করিলেন। কিন্তু বোন লোকের কথা শুনিয়া বলিলেন, মানসূর ছিল একজন কাপুরুষ। সে পৌরুষের অধিকারী হইলে সামান্য পরিমাণ প্রেম মদিরা পান করিয়া এমনভাবে বিপথগামী হইত না। আমি আজ বিশ বৎসর যাবত এই মদিরা পান করিয়া আসিতেছি, অথচ আমি তো কোন দিন বিপথে চলি নাই। বরং বলিয়াছি, আরও দাও।

হযরত জোনায়েদ (রহ.) যখন প্রেমবিহ্বল অবস্থায় থাকিতেন, তখন শুধু এই কথাই বলিতেন যে, প্রেমিক সম্প্রদায়ের জন্য হাজার আফসোস, তাহারা প্রেম ও বন্ধুত্বের দাবী করে, তারপর আলমে গায়েব হইতে তাহাদের উপর যে রহস্য অবতীর্ণ হয় তাহা লোক সমাজে প্রকাশ করিয়া বেড়ায়।

আমি আমার পীর ও মুরশিদের নিকট শুনিয়াছি, একজন বুযুর্গ কয়েকশত বৎসর পর্যন্ত আল্লাহর এবাদত ও মুজাহাদায় নিয়োজিত থাকেন। একদিন তাঁহার উপর প্রেম রহস্য প্রকাশ লাভ করিল। তিনি কিছুটা দুর্বল প্রকৃতির থাকায় তাহা সহ্য করিতে পারিলেন না। সাথে সাথে প্রকাশ করিয়া দিলেন। দ্বিতীয় দিন তাঁহার নিকট হইতে সেই রহস্য ছিনাইয়া লওয়া হইল। দরবেশ সেই দুঃখে ম্রিয়মাণ হইয়া পড়িলেন।গায়েবী আওয়ায হইল, ওহে দরবেশ ! তুমি যদি এই রহস্য  প্রকাশ না করিতে, তবে তোমাকে আরও অনেক কিছু দান করা হইত। সুতরাং তুমি উহার উপযুক্ত না হওয়ায় তোমার নিকট হইতে ছিনাইয়া লইয়া অন্যকে দান করা হইয়াছে।

একবার এক বুযুর্গ আর এক বুযুর্গের নিকট লিখিলেন, ঐ ব্যক্তি সম্বন্ধে আপনার কি অভিমত যে এক পেয়ালা প্রেম সুধা পান করিয়াই বলিয়া উঠে, আমি অনেক কিছু পাইয়াছি। দরবেশ উত্তরে লিখিলেন, এমন ব্যক্তি তো অত্যন্ত- দুর্বলচেতা। যেব্যক্তি সমুদ্রের পর সমুদ্র প্রেম সুধা পান করিয়াও হজম করিয়া ফেলে এবং বলে, আরও দাও, সে-ই বাহাদুর ! কিন্তু আমি তোমাদিগকে বলিতেছি তোমরা কখনও এইরূপ করিও না। কারণ, যাহারা গোপন রহস্য প্রকাশ করে তাহারা কিছুই অর্জন করিতে পারে না।

দরবেশ যতক্ষণ পর্যন্ত নির্জনতা অবলম্বন করিয়া যাবতীয় সম্পর্ক পরিত্যাগ না করে, সে কোন দিনও আল্লাহর নৈকট্য লাভ করিতে সক্ষম হয় না। সত্তর বৎসর পর হযরত বায়েজীদ (রহ.) যখন আল্লাহ নৈকট্য লাভে সমর্থ হন, তখন নির্দেশ দেওয়া হইল, তাহাকে ফিরাইয়া লইয়া যাও। কেননা, এখনও তাহার নিকট পার্থিব উপকরণ রহিয়াছে। তিনি চিন্তা করিলেন, আমার নিকট কি আছে? লক্ষ্য করিয়া দেখিলেন, একটি চামড়ার ছেঁড়া জামা এবং একটি ভাঙ্গা পানপাত্র। তিনি তখনই উহা ফেলিয়া দিয়া প্রতিবন্ধকতা দূর করিলেন।

ভাইসব ! এমন একজন বুযুর্গ যখন এই সামান্য বস্তুর জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভে সমর্থ হন নাই, তখন তোমার-আমার ঠিকানা কোথায় ? 
আমরা তো পার্থিব আসবাব-উপকরণ দ্বারা পরিবেষ্টিত হইয়া রহিয়াছি। পৃথিবীর মায়াজালে আবদ্ধ। হে দরবেশ ! দরবেশী এক বস্তু. সঞ্চয় করা অন্য বস্তু। প্রকৃত দরবেশ তো ঐ ব্যক্তি, তিনি যাহা মুখে বলেন তাহা কার্যে পরিণত হয়, একটুও এদিক সেদিক হয় না।

একবার আমি এবং আমার একজন অন্তরঙ্গ সাথী নদী পথে ভ্রমণ করার জন্য রওয়ানা হই। হঠাৎ আমরা আল্লাহর কুদরতের এমন একটি নিদর্শন দেখিতে পাই যাহা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। নদীর তীরে আমরা বসা। ক্ষুধার তাড়নায় অস্থির। একদিকে জঙ্গল অন্য দিকে নদী। কোথায় পাই খাবার বস্তু। এমন সময় একজন কাফ্রী আসিয়া আমাদের সম্মুখে দুইখানি যবের রুটি রাখিয়া চলিয়া গেল। আমরা আল্লাহর এই নেয়ামত খাওয়া আরম্ভ করিলাম। হঠাৎ আমাদের চোখে পড়িল, উটের সমান একটি বিচ্ছু দ্রুতবেগে নদীতে ঝাঁপাইয়া পড়িয়া ততোধিক দ্রুত গতিতে নদীর অপর তীরের দিকে ধাবিত হইয়াছে। আমরা মনে করিলাম, নিশ্চয়ই কোন প্রয়োজনে উহা যাইতেছে। কি প্রয়োজন দেখার জনা আমরাও উঠিয়া দাঁড়াইলাম। কিন্তু কিভাবে নদী অতিক্রম করিব? আমরা আল্লাহর নিকট দোআ করিলাম। নদীর পানি দুই ভাগ হইয়া আমাদের পথ করিয়া দিল। নদী পার হইয়া দেখিলাম, একটি গাছের তলায় এক ব্যাক্তি গভীর নিদ্রায় নিদ্রিত। আরও দেখিলাম, বিরাট এক অজগর তাহাকে দংশন করার জন্য গাছ হইতে নামিয়া আসিতেছে। ইত্যবসরে উট সদৃশ সেই বিছু অজগরটিকে দংশন করিল। অজগরটি সাথে সাথে মরিয়া গেল। বিচ্ছুটিও আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে চলিয়া গেল। আমরা মনে করিলাম, এই ব্যক্তি নিশ্চয়ই আল্লাহর ওলী, যাঁহাকে অজগরের দংশন হইতে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ তাআলা এই বিচ্ছুটিকে পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। আমরা উক্ত ব্যক্তির নিকট গিয়া যাহা দেখিলাম তাহাতে আমাদের বিবেক-বুদ্ধি লোপ পাইয়া গেল। দেখিলাম, তাহার পাশে মদের বোতল। অতিরিক্ত মদ পান করার দরুণ সে বমি করিয়া নিস্তেজ হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। দুর্গন্ধে তাহার নিকট যাওয়া মুশকিল। আমরা চিন্তা করিতেছিলাম, আল্লাহর এই নিকৃষ্টতম জীবের অবস্থা দেখার জন্য আমরা কেন এখানে আসিলাম ! এমন সময় গায়েব হইতে আওয়ায হইল, ওহে আমার প্রিয়তম বন্ধুদ্বয় ! আমি যদি আমার নেকবখত এবং পুণ্যবানদিগকেই রক্ষণাবেক্ষণ করি তবে আমার গুনাহগার বান্দাদিগকে কে রক্ষা করিবে?
ইত্যবসরে সেই ব্যক্তি জাগ্রত হইয়া পাশে মৃত অজগর এবং আমাদিগকে দেখিয়া অবাক হইয়া তওবা করিল । পরবর্তী সময়ে এই ব্যক্তি খালি পায়ে হাঁটিয়া পনেরবার হজ্জ করিয়াছিল।

বন্ধুগণ! যখন মেহেরবানীর বাতাস প্রবাহিত হইতে থাকে, তখন শত পাপী অপরাধীজনকেও সাজ্জাদার অধিকারী করিয়া দেয়। খোদা না করুন, আবার কখনও যদি ক্রোধের হাওয়া প্রবাহিত হয়, তখন যত বড় সাজ্জাদার অধিকারীই হউক না কেন তাহাকে সাজ্জাদা হইতে বঞ্চিত করেন। সুতরাং এই পথের পথিক কখনও নির্ভয় এবং নিশ্চিন্ত থাকিতে পারে না। কারণ, সে তাহার পরিণতি ভাল হইবে কিনা কিছুই বুঝিতে পারে না। অভিশপ্ত শয়তান যদি তাহার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে জ্ঞাত থাকিত, তবে সে অবশ্যই হযরত আদম (আ.)-কে সেজদা করিত। সে তাহার পরিণতি সম্বন্ধে অজ্ঞ ছিল। বলিয়াই স্বীয় এবাদত-বন্দেগী, রিয়াযত-মুজাহাদার অহংকার করত নিজেকে সকলের চেয়ে গুণী-জ্ঞানী মনে করিয়াই বলিয়া ফেলিল, আমি মাটির তৈয়ারী মানুষকে সেজদা করিব না। ফলে সে নাফরমান হইল। আল্লাহর নির্দেশ পালন না করিয়া বিতাড়িত হইল। তাহার সকল এবাদত-বন্দেগী ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইল। এতদিনের এবাদত-বন্দেগী তাহার মুখের উপর নিক্ষেপ করা হইল।
এই কথা বলিয়া তিনি অঝোর নয়নে কাঁদিতে থাকেন। উপস্থিত সকলেও তাঁহার সাথে ক্রন্দন করিতে থাকেন। কিছুক্ষণ পর তিনি মোনাজাত করিয়া সকলকে  সেই দিনের মত বিদায় দিলেন।
-------------------

__