দোযকের উত্তাপ (১৯) মাজালিসে গাযযালী

 📚মাজালিসে গাযযালী ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
১৯- ঊনবিংশ মজলিস

দোযখের উত্তাপ
চব্বিশে রবিউল আউয়াল, বুধবার। দোযখ, শীত ও গরম বাতাসের কথা বলা হইতেছিল। হযরত পীর ও মুরশিদ বলিলেন, দোযখের দুইটি শ্বাসের দরুন এই উত্তাপ। আল্লাহই জানেন দোযখের গরম কত ভয়াবহ।
কোন কোন কিতাবে বর্ণিত আছে, দোযখের আগুন আল্লাহর নিকট ক্রন্দন করিয়া ফরিয়াদ করিল, হে প্রভু! আমার একাংশ অন্যাংশকে খাইয়া ফেলিল। ইহার পর উহার জন্য বৎসরে দুইটি শ্বাস ছাড়িবার ব্যবস্থা করিলেন। এক শ্বাস গরমের সময় অন্য শ্বাস শীতের সময়। উহার গরমের শ্বাস হইতেই আমরা গরম এবং শীতের শ্বাস হইতে শীত অনুভব করিয়া থাকি।
যদিও বাতাস তিন প্রকার। কিন্তু বর্ষা কৃত্রিম। বৃষ্টি হইলেই বর্ষা হয়। বৃষ্টি না হইলে গরম থাকে। সুতরাং শীত ও গরমই মওসুম। দুর্বলচেতা মানুষ দোযখের একটি শ্বাস সহ্য করিতেই অক্ষম। দোযখের সম্পূর্ণ আযাব কিভাবে সহ্য করিবে? দোযখের আযাব ভয়ঙ্কর কঠিন। মানুষ যতই এবাদত-বন্দেগী করুক না কেন, উহার ফলস্বরূপ সে কখনও দোযখের শাস্তি হইতে রেহাই পাইবে না। কিন্তু আল্লাহ অসীম দয়ালু, এই যা আশা-ভরসা। তোমার মেহেরবানী যদি আমার জন্য কার্যকর হয় তবেই আমি মুক্ত। আর যদি আযাব প্রদান কর তবে লজ্জার আর সীমা থাকিবে না। দোযখ সম্বন্ধে আল্লাহর রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন-
"দোযখে সত্তর হাজার ময়দান। প্রতি ময়দানে সত্তর হাজার গহ্বর, প্রতি গহ্বরে সত্তর হাজার সাপ এবং সত্তর হাজার বিচ্ছু। ইহার প্রতিটি স্থানে শাস্তি পাওয়া ব্যতীত কাফের ও মোনাফেকদের গত্যন্তর নাই।"
দোযখের সর্বনিম্ন আযাব হইল, পাপীর পায়ে এক জোড়া আগুনের জুতা পরিধান করাইয়া দেওয়া হইবে। উহার উত্তাপেই মাথার মগজ টগবগ করিতে থাকিবে। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন-
দোযখের নিম্নতম আযাব হইবে এক জোড়া অগ্নি পাদুকা পরাইয়া দেওয়া। যাহার উত্তাপে মাথার মগজ টগবগ করিয়া ফুটিতে থাকিবে। ইহা দ্বারা অনুমান কর যে, ভীষণতর আযাবের রূপ কেমন হইবে? দোযখের আযাব সম্বন্ধে যদি তোমার কোন প্রকার ভ্রান্ত ধারণা থাকে তবে তোমার একটি আঙ্গুল আগুনের মধ্যে রাখিয়া উহাকেই দোযখের আগুন মনে কর। পরকালের আগুনের সম্মুখে দুনিয়ার আগুনের কোন অস্তিত্বই নাই। কারণ, দুনিয়ার আগুনকে রহমত দ্বারা সত্তরবার ধৌত করা হইয়াছে। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন- "পৃথিবীর আগুনকে রহমতের পানি দ্বারা সত্তর বার ধৌত করা হইয়াছে"।
হযরত ঈসা (আঃ) বলিয়াছেন, কেয়ামতের দিন বহু সুস্থ-সবল, সুন্দর এবং মিষ্টভাষী লোক অগ্নির উত্তাপে ক্রন্দন করিতে থাকিবে।
হযরত দাউদ (আঃ) বলিতেন, প্রভু ! সূর্য তাপই তো সহ্য করিতে পারি না, দোযখের গরম কিভাবে সহ্য করিব। তোমার রহমতের আওয়ায সহ্য করার ক্ষমতা নাই। অতএব আযাবের আওয়ায কিভাবে সহ্য করিব?
বিশ্বাস কর, আল্লাহ তাআলা অগ্নিকে খুবই ভয়াবহ করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন। তোমার এবং আমার অক্ষমতার জন্য খুবই দুঃখ। জানি না আমাদের ভাগ্যে কি আছে? আমার এই চিন্তা-ভাবনায় সীমাহীন গভীর পেরেশানী দিন-রাত আমার উপর বিস্তার করিয়া আছে। হায় ! আমার পরিণতি কি হইবে? এই সমস্ত আযাব হইতে যদি রক্ষা পাইতে চাও তবে নেক আমল কর, সৎকাজ কর এবং সর্বদা সৎ পথে চলার চেষ্টা কর। মনে রাখিও, ইহাই তোমার মুক্তির পথ হইবে। এবাদত-বন্দেগী এবং সৎ কাজ এত বেশী পরিমাণ কর যে, তুমি পুণ্যাত্মাদের মধ্যে পরিগণিত হও। কারণ-
নিশ্চয়ই নেক লোক বেহেশতী এবং বদ লোক জাহান্নামী। নেককারদের আমল আল্লাহ নষ্ট করেন না। আল্লাহ তাঁহার পবিত্র বাণীতে বলেন: "আল্লাহ এহসানকারীদের পারিশ্রমিক নষ্ট করেন না।"
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, যে মোমেন পাপের বোঝা লইয়া আল্লাহর দরবারে যায়, আল্লাহ তাহার সাথে তিনটি কাজের একটি করেন। তাহাকে মেহেরবানী করিয়া ক্ষমা করেন অথবা নবীর শাফায়াতে রেহাই দেন অথবা পাপ পরিমাণ শাস্তি দিয়া জান্নাতী করেন। 
তুমি পাপী, তাহাতে কি হইল? তওবার দরজা তো উন্মুক্ত। তওবা কর তওবার দ্বার বন্ধ হওয়ার পূর্বেই। প্রশান্ত মন লইয়া যদি তুমি তাঁহার দরবারে আস তবে চিরোজ্জ্বল হাকীকত তোমার সম্মুখে আসিয়া পড়িবে। সুন্নত আল-জামাআতের মতে, কুফরী ব্যতীত সকল পাপই ক্ষমা করিয়া দেওয়া হইবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
"আল্লাহ তাআলা অংশীবাদিতার পাপ ক্ষমা করেন না। ইহা ব্যতীত যাবতীয় পাপ তিনি ইচ্ছা করিলে ক্ষমা করিয়া দিতে পারেন।" আল্লাহ বলেন, ফিরিয়া আস। আমি তো দরজা খুলিয়া রহিয়াছি। তুমি সাহস করিয়া অগ্রসর হও, আমি তোমার জন্য দণ্ডায়মান আছি। প্রেমের সাথে কাজ আদায় কর, দেখ প্রেমের কি কুদরত। কোন কিছুর পরোয়া করিও না। ইহার সব কিছু রহমত দ্বারা হইয়া থাকে। সকল লোকই যদি নামাযী হইত তবুও প্রেমের রহস্য অবগত হইত না। হেকমতের মনযিল রহমত দ্বারা অতিক্রান্ত করা যায়। সর্বক্ষণ তাঁহার দয়ারই প্রয়োজন হয়।
আল্লাহ তাআলা শিরকের পাপ ক্ষমা না করার কথা ঘোষণা করিয়াছেন। অন্যান্য যাবতীয় পাপ ক্ষমা করা তাঁহার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। সগীরা এবং কবীরা পাপ নহে। সগীরা এবং করীরা গুনাহ ক্ষমা করা তাঁহারই ইচ্ছাধীন। তাঁহার নিকট ক্ষমা পাওয়ার আশাই রাখিবে। নিরাশ কখনও হইবে না। গরীব হও, নিঃসম্বল হও, মুশরিক তো নও। তিনি ভরসা দিয়া নিরাশ করেন নাই। এক বন্ধু বলিয়াছেন, সেই দরবারের রহমতের জন্য যদি তোমার নিকট কোন কিছু না থাকে আর অবস্থা এই হয় যে, তোমার চেয়ে দুর্বল আর কেহ নাই, তবু পরোয়া করিও না। যদি তাঁহার দরবারে বৈরাগ্য এবং পরহেযগারীর কোন মূল্য থাকে তবে দুর্বল বান্দার দুর্বলতাও ক্রয় করা হয়।

রমজান মাসে মোমেনের মৃত্যু (১৮) 📚মাজালিসে গাযযালী ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)



📚মাজালিসে গাযযালী ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
রমযান মাসে মোমেনের মৃত্যু-
তেইশে রবিউল আউয়াল, মঙ্গলবার। দরবার শরীফের ভক্তদের মধ্য হইতে মাওলানা মোয়াইয়েদ আরয করিলেন, হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, যেব্যক্তি পবিত্র রমযান মাসে মৃত্যুবরণ করে তাহার আযাব হয় না। কিন্তু বুঝিতে পারিলাম না, কেয়ামত পর্যন্ত যত রমযান আছে সব রমযান এই বাণীর শামিল কিনা?
পীর ও মুরশিদ এরশাদ করিলেন, 'রওযাতুল ওলামা' কিতাবে বর্ণিত আছে, যে মোমেন রমযান মাসে মৃত্যুবরণ করে তাহার আত্মাকে বেহেশতে স্থান দেওয়া হয়। মাওলানা আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, পুণ্যবান এবং পাপীর মধ্যে কোন প্রকার তারতম্য আছে নাকি? এরশাদ করিলেন, পুণ্যবানদের বেলায় অবশ্য এরূপ হইবে। তবে পাপীদের বেলায় আল্লাহ ইচ্ছা করিলে বেহেশতে স্থান দিতে পারেন, অন্যথায় নাও দিতে পারেন।
আবার তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, বর্তমানে বেহেশতে কতজন লোক আছেন? এরশাদ করিলেন, পুরুষদের মধ্যে হযরত ইদ্রীস (আঃ) এবং হাবীব নাজ্জার (রঃ)। মহিলাদের সম্বন্ধে মতভেদ রহিয়াছে। কেহ বলেন, মারইয়াম (আঃ) আবার কেহ বলেন ফেরআউনের স্ত্রী হযরত আছিয়া।
বর্ণিত আছে, হযরত আছিয়া আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল মূসা (আঃ)-এর প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু তাঁহার ঈমান সম্বন্ধে কেহই অবগত ছিল না। যখন শিশু হযরত মূসা (আঃ)-কে প্রতিপালন করার জন্য ফেরআউনের গৃহে আনা হইল তখন হযরত আছিয়া বলিলেন, ইহাকে আমরা পুত্ররূপে গ্রহণ করিব। আশা করি শীঘ্রই সে আমাদের উপকারে আসিবে।
কেহ কেহ বলেন, এই উপকারের বিষয়বস্তু ছিল আল্লাহর প্রতি আছিয়ার ঈমান আনা। শিশু অবস্থায়ই হযরত মূসা (আঃ)-কে নবুয়ত দান করা হইয়াছিল। হযরত মূসা (আঃ) যখন ইসলাম প্রচার করিতে আরম্ভ করেন তখন আছিয়। বলিলেন, ওহে ফেরআউন। আল্লাহর একত্ববাদ ও মূসার নবুয়তের প্রতি ঈমান আন। এই কথায় ফেরআউন ক্রোধান্বিত হইয়া আছিয়ার উপর অকথ্য নির্যাতন আরম্ভ করিয়া দিল। এই মালউনের কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা ছিল হাতে-পায়ে পেরেক মারিয়া মাটির সাথে গাঁথিয়া রাখা।
আছিয়ার মুখে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার কথা শুনিয়া ফেরআউন বলিল, আছিয়া, তুমি এই কাজ হইতে বিরত থাক এবং আমাকে আল্লাহ বলিয়া স্বীকার কর।
আছিয়া বলিলেন, অসম্ভব' যিনি এই বিশ্বের প্রতিপালক তিনিই তোমার এবং আমার আল্লাহ। ফেরআউন তাঁহার হাতে পায়ে পেরেক মারিয়া বুকের উপর জ্বলন্ত আগুন রাখিয়া দিল। ইহাতেও যখন বিরত হইলেন না তখন তাঁহার বুকের উপর পাথরের পর পাথর দিয়া মারিয়া ফেলিল।
ধ্বংসের দরবারে জীবন সোপর্দকারী 'কেদাম' নামক স্থানের খেরকা পরিধানকারী একবার সাকীর দৃষ্টির সম্মুখে প্রেম শরবত পান করিল। সাকী ব্যতীত আর যাহা কিছু সবই সে পরিত্যাগ করিল।
তারপর মাওলানা জিজ্ঞাসা করিলেন, যেমন আছিয়া বলিয়াছিলেন, তেমনি হযরত ইউসুফ (আঃ) সম্বন্ধেও যোলায়খার স্বামী বলিয়াছিল- আমরা তাহাকে পুত্রবৎ গ্রহণ করিব। আশা করি শীঘ্রই সে আমাদের উপকারে আসিবে। 
আছিয়ার কি উপকার হইয়াছিল তাহা তো দেখিলাম। কিন্তু যোলায়খার স্বামীর কি উপকার হইয়াছিল?
এরশাদ করিলেন, অনুপকার তো হয় নাই। কিন্তু উপকার সম্বন্ধে কোন কিছু কিতাবে নাই? 
মাওলানা বলিলেন এই উপকার হইতে পারে যে যোলায়খা তাঁহার নিকট প্রেম নিবেদন করিতেন আর তিনি প্রত্যাখ্যান করিয়া তাঁহাকে দূরে সরাইয়া রাখিতেন এবং বলিতেন, যোলায়খা! তোমার লজ্জা হয় না যে তোমার স্বামী আমাকে পুত্রবৎ গ্রহণ করিয়াছেন।
এরশাদ করিলেন, ইহাও হইতে পারে। কিন্তু যোলায়খার ঘটনা তো ঐ পর্যন্ত যতদিন পর্যন্ত সে পর-স্ত্রী ছিল। তাহার নফসানী কামনা ছিল। কিন্তু যখন তাহাকে আপন আয়ত্তে লইয়া আসিলেন তখন উভয়ের মধ্যে নফসানী কামনা শেষ হইয়া রূহানী সম্পর্ক স্থাপিত হইল। হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁহার পবিত্রতা বজায় রাখিলেন। যোলায়খা নাফরমানী করিল। তিনি শাহী ফরমান পাইলেন। পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারী ইউসুফ (আঃ)-এর উপর সে দোষারোপ করিল। ইহার ফলে যোলায়খার স্বামীর বাদশাহী ধ্বংস হইয়া গেল এবং রাস্তার ফকীরে পরিণত হইল।
মাওলানা জিজ্ঞাসা করিলেন, পরকালে সকলেই যৌবন লাভ করিবে। যোলায়খা ও কি যৌবন লাভ করিবেন?
এরশাদ করিলেন, পরকালে সকল মোমেন ও মোমেনা দুইটি সৌন্দর্যের অধিকারী হইবে। একটি স্বীয় কাজের প্রতিদান, দ্বিতীয়টি আল্লাহর দয়ার দান। যোলায়খা মোমেনা। সুতরাং সেও সৌন্দর্যের অধিকারিণী হইবে।
অন্যত্র দেখিয়াছি, পরকালে একমাত্র যোলায়খা ব্যতীত অন্য সকল রমণীই সৌন্দর্যের অধিকারিণী হইবে। কারণ, যোলায়খা এই দুনিয়ায়ই তাহার যৌবন চাহিয়া লইয়াছিল। কিন্তু হুর খোদার দান এক বিস্ময়কর সৌন্দর্যের অধিকারিণী হইবে। ইহার পর বলিলেন, আল্লাহ সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন- "আল্লাহ সৌন্দর্যময় তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন।" 
বর্ণিত আছে, হযরত ইউসুফ (আঃ) সীমাহীন সৌন্দর্যের অধিকারী ছিলেন। মিসরের দুর্ভিক্ষে লোকের অনাহারে থাকার সংবাদ যখন তাঁহার কর্ণগোচর হইল, তিনি নির্দেশ দিলেন, ঘোষণা করিয়া দাও, লোকেরা যেন প্রাতদিন শহরের বাহিরে একত্র হয় এবং আমার সৌন্দর্য দেখিয়া তৃপ্ত হইয়া ফিরিয়া যায়। হযরত ইউসুফ (আঃ) সমবেত জনতার সম্মুখে স্বীয় পর্দা উঠাইয়া দিতেন এবং তাহাদিগকে তৃপ্ত হওয়ার সুযোগ দান করিতেন। যেব্যক্তি তাহাকে দেখিত সারাদিন সে আর ক্ষুধা অনুভব করিত না।
অন্তরের শান্তির সাথে এক নজর সুন্দর চেহারা দর্শন করা রাজ মুকুটের চেয়েও মূল্যবান। ইহা সারাজীবন স্মরণ রাখার জন্য যথেষ্ট। 
অতঃপর মাওলানা বলিলেন, লোকে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনি বেশী সুন্দর না ইউসুফ (আঃ)? হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিলেন- ভাই ইউসুফ সুশ্রী আর আমি সুন্দর।
তারপর পীর ও মুরশিদ বলিলেন- হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর সৌন্দর্য ছিল চরম পর্যায়ের। কাফের সম্প্রদায় সময় অসময় বনী ইসরাঈলের উপর আক্রমণ করিত, তাই তাহারা ইউসুফ (আঃ)-এর তাবুত কাবীস পাহাড়ে লইয়া যাওয়ার মনস্থ করে। কিন্তু দিনের বেলা লইয়া যাওয়া অসুবিধাজনক ছিল। তাই রাতের অন্ধকারে মাটি খুঁড়িয়া তাবুত বাহির করিল এবং তাঁহার শবদেহের সৌন্দর্যের আলোতে পথ দেখিয়া কাবীস পাহাড়ে আসিয়া পৌঁছিল। এখানে হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর বংশধরদের কবর ছিল। যেহেতু তিনি বাদশাহ ছিলেন তাই তাঁহার তাবুত কোব্বায় দাফন না করিয়া কাবীস পাহাড়ে দাফন করিল।

নফস (১৭) 📚মাজালিসে গাযযালী ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

 

📚মাজালিসে গাযযালী ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
১৭- সপ্তদশ মাজালিশ
নফস
বাইশে রবিউল আউয়াল, সোমবার। নফসের দোষ সম্বন্ধে আলাপ-আলোচনা হইতেছিল।
পীর ও মুরশিদ এরশাদ করিলেন, আল্লাহ তাআলা নফসকে পয়দা করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তোর পরিচয় কি? নফস বলিল- আমি আমি, তুমি তুমি।
ইহার পর আল্লাহ তাআলা নফসকে অনাহারে রাখিয়া শাস্তি দিলেন। নফস ক্ষুধায় কাতর হইয়া পড়িল।
এইবার জিজ্ঞাসা করিলেন, তোর পরিচয় কি?
 নফস বলিল,
খোদাওয়ান্দ! তুমি আমার শক্তিশালী মালিক। আমি তোমার দুর্বল দাস।
এখন চিন্তা করিয়া দেখ যে, ক্ষুধা কেমন বস্তু। নাফরমানকেও আল্লাহর বন্দেগী করায়, তাঁহার সম্মুখে মাথানত করিতে বাধ্য করে। এই ধোঁকাবাজ নফস ক্ষুধার শাস্তি পাওয়া ব্যতীত আর কিছুতেই মাথানত করে না। আমাদের নফস ফেরআউনের অবাধ্য নফসের ন্যায় গর্বিত এবং মাথা উত্তোলন করিয়া দাঁড়ায়। কিন্তু ফেরআউনের নফস প্রকাশ্যভাবে বলিত- "আমি তোমার মহান প্রভু"। আর আমাদের নফস অতি সংগোপনে বলে, আমি তোমাদের মহান প্রভু। আমিত্বের এই দাবী প্রত্যেক নফসই করিয়া থাকে। পার্থক্য এতটা যে. ফেরআউনের দাবী ছিল প্রকাশ্য। ইহার কারণ এই যে, ফেরআউন কাহাকেও ভয় করিত না। সেই যুগে তাহার চেয়ে প্রভাবশালী আর কেহ ছিল ন! যে তাহার ক্ষতিসাধন করিতে পারে। তাই যাহা কিছু বলার সর্বজনসমক্ষে এবং প্রকাশ্যেই বলিত। আল্লাহ তাআলা বলেন-
"হে নবীবর ! আপনি কি তাহাদের অবস্থা লক্ষ্য করেন নাই যাহারা তাহাদের নফসকে স্বীয় খোদায় পরিণত করিয়াছে।"
শয়তান সাত হাজার বৎসর খোদার এবাদত-বন্দেগী করিয়া পরিশেষে নফসের বান্দায় পরিণত হইল। আল্লাহর এবাদত পরিত্যাগ করিয়া নফসের তাবেদার হইল। আল্লাহ যখন তাহাকে বলিলেন, আদমকে সেজদা কর। তখন সে বলিয়া উঠিল, আমি আদমের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তুমি আমাকে অগ্নি দ্বারা সৃষ্টি করিয়াছ। নফস তাহার উপর বিজয়ী হওয়ায় সে আল্লাহর হুকুমের অবাধ্য হইয়া আদমকে সেজদা করিল না, কাফের হইয়া গেল। কোরআন বলে, "সে গর্বভরে অস্বীকার করিয়া কাফের হইল।" নফসের একটি নির্দেশ পালন করিয়া হাজার হাজার বৎসরের সাধনা নষ্ট করিয়া ফেলিল। চিরকালের জন্য অভিশপ্ত হইয়া আল্লাহর দরবার হইতে বাহির হইয়া আসিল। হাজার হাজার বৎসর এবাদত করার পরও গলায় লানতের বেড়ি পরাইয়া দেওয়া হইল। তাহার কপালে কলঙ্কের টিকা এইভাবে লাগাইয়া দেওয়া হইল-
"আমার লানত তোমার উপর কেয়ামত পর্যন্ত থাকিবে।" নফসে আম্মারাকে আয়ত্তে আনা এবং দুর্বল করার জন্যই সমস্ত বুযুর্গ রিয়াযত মুজাহাদার আগুনে দগ্ধ হইয়াছেন। নফসকে দমন ও ঘৃণিত করিয়া রাখার জন্যই তাঁহারা মোটা কম্বল আর খেরকা পরিধান করিতেন। তাই যদি কোন সময় তুমি তোমার নফসের উপর ক্রোধ প্রকাশ কর তবে নফসের দোষ তোমা হইতে দূর হইয়া যাইবে। এই সময় নফসকে অগ্নিকুণ্ডের উপর রাখিয়া দাও। ফলে নফস সম্পূর্ণরূপে ভস্মীভূত হইয়া তোমার দেহ নূরের আলোকে আলোকিত হইয়া উঠিবে।
নফসকে দমন ও দুর্বল করার মানসেই আল্লাহর নবীগণ ক্ষুধার্ত থাকিতেন, দরিদ্রতা পছন্দ করিতেন। তাঁহারা নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও এক মুহূর্তের জন্যও নফস হইতে নির্ভয় থাকিতেন না। তাঁহারা আল্লাহর নিকট রাজত্ব বা ধন-সম্পদ কামনা করিলে অবশ্যই পাইতেন। কিন্তু তাহা কামনা করেন নাই। রাজ্য ও সম্পদে মুক্তির আলো দেখেন নাই। বরং তাহাতে নফসের আধিপত্যই দেখিয়াছিলেন। তাহাতে মুক্তির চেয়ে বন্দীত্বকেই বেশী দেখিতে পাইতেন। দরিদ্রতা ও অনাহারে থাকার মধ্যেই মুক্তি ও পরকালে সফলকাম হওয়া নিহিত রহিয়াছে। নফসের পূজা করা আমাদের জন্য নহে। আমরা এবং আমাদের মযহাব অন্য কিছু।
বর্ণিত আছে, স্বেচ্ছায় দরিদ্রতাবরণ ও অনাহারে থাকার অবস্থা এতটা ছিল যে, একাদিক্রমে দুই তিন দিন হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর ঘরে রান্নাবান্নার কোন ব্যবস্থা থাকিত না। আবার কখনও তৈলের অভাবে পবিত্র গৃহ প্রদীপের আলোকে আলোকিত হইত না।
আল্লাহর বান্দার উপর আল্লাহর পক্ষ হইতে যে বিপদ অবতীর্ণ হয়, আল্লাহ তাআলা সেই বিপদের মধ্যে মেহেরবানীর এক বিরাট ভাণ্ডার লুক্কায়িত রাখেন। 
অবাধ্য নফসের বিরুদ্ধে শেকায়েত সম্বন্ধে সুলতানুল আরেফীন হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহঃ) হইতে একটি রেওয়ায়েত আছে, তিনি বলিতেন, কাল কেয়ামতের দিন আমি আল্লাহর নিকট দরখাস্ত করিব যে, হে খোদা ! আমাকে দোযখে প্রবেশ করার অনুমতি দেন। যে কাফের নফস দুনিয়ায় অন্তরের রক্ত প্রবাহিত করাইয়াছে, আজ আমি উহাকে ক্রোধের অগ্নি দ্বারা জ্বালাইয়া দিব।
বর্ণিত আছে, পাক পবিত্র-থাকা সত্ত্বেও হযরত সোলায়মান (আঃ) বলিয়াছিলেন, আমি আমার নফসকে পরীক্ষা করিয়া দেখিব, সে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন কিছুতে সন্তুষ্ট কিনা? দেখিলেন, নফস স্বভাবে ঠিক একই আছে। তিনি ধারণা করিলেন, সমস্ত পৃথিবীর বাদশাহ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা হইতে নফস পিছপা নহে। তাই তিনি সীমাহীন বাদশাহী দ্বারাই নফসকে যাচাই করিতে চাহিয়া প্রার্থনা করিলেন- "হে আল্লাহ! আমাকে এমন রাজত্ব দান কর যেন আমার পর আর কেহ তেমন বিশাল রাজত্বের অধিকারী না হইতে পারে। নিশ্চয়ই তুমি দানকারী"।

এক বন্ধু জিজ্ঞাসা করিলেন, যদি নফসকে যাচাই করার উদ্দেশ্যই ছিল তবে "আমার পর আর কেহই যেন তেমন বিশাল রাজত্বের অধিকারী না হইতে পারে" বলার অর্থ কি? এরশাদ করিলেন, ইহার বহু প্রকার ব্যাখ্যা বর্ণিত আছে। কেহ বলেন, শুধু বাদশাহী চাহিলে পূর্ণ রাজত্ব হইত না। অর্থাৎ এমন রাজত্ব হইত যেখানে অন্যান্য রাজা-বাদশাহও থাকিত, একচ্ছত্র অধিপতি হইতে পারিতেন না। রাজ্যের অংশীদার থাকিলে ক্ষতি হয়, পূর্ণতা অবশিষ্ট থাকে না। অথচ তাঁহার ইচ্ছা ছিল পূর্ণভাবে নফসকে যাচাই করা। পূর্ণতার যাচাই পূর্ণতা দ্বারাই হইয়া থাকে, অংশ দ্বারা নহে।
আবার কোন কোন তাফসীরকার বলেন, বাদশাহী চাওয়ার অর্থ, তিনি খুব যুদ্ধপ্রিয় ছিলেন এবং যুদ্ধ ব্যতীত দেশ জয় লাভ করা যায় না। যুদ্ধ করার জন্য রাজত্ব কামনা করিয়াছিলেন। ফলে আল্লাহ তাঁহাকে সমগ্র পৃথিবীর একচ্ছত্র বাদশাঃ করিয়াছিলেন।
হযরত সোলায়মান (আঃ)-এর একহাজার স্ত্রী ছিলেন। প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর যাহাদিগকে বিবাহ করেন তাঁহাদের সংখ্যাই ছিল সাত শত। অবশিষ্ট তিন শত কুমারীর পাণি গ্রহণ করিয়াছিলেন।
এতসংখ্যক বিবাহ করার উদ্দেশ্য ছিল বহু সন্তান লাভের আশা। এই সন্তানগণই যেন তাঁহাকে যুদ্ধে সাহায্য করিতে পারে। বায়ু তাঁহার সিংহাসন বহন করিত। বহুদূর পর্যন্ত মানব সৈন্য ছড়াইয়া থাকিত। পরী, জিন ও পক্ষীকুল পলক মেলিয়া এই সৈন্যবাহিনীকে সূর্য তাপ হইতে ছায়া দান করিত।
এই সৈন্যদের রসদপত্র ও অন্যান্য আসবাবপত্র দেও-দৈত্যগণ যথাস্থানে মুহূর্তের মধ্যে পৌছাইয়া দিত। সমুদ্র হইতে মণি-মুক্তা উঠাইয়া আনিত। সারা পৃথিবীতে হযরত সোলায়মান (আঃ)-এর গোয়েন্দা বাহিনী নিয়োজিত ছিল। যেখানে যাহা কিছু শুনিত বা দেখিত তাহারা তাঁহার কর্ণগোচর করিত। আল্লাহ তাআলা বলেন-
"আমি প্রবাহিত বাতাস তাহার অধীনস্থ করিয়া দিয়াছিলাম।সে তাহার ইচ্ছানুযায়ী বাতাসকে পরিচালনা করিত।"

খোদা প্রেমিকদের সম্বন্ধে বর্ণিত আছে, একদিন এক কবুতর তার সঙ্গিনীর সাথে খেলা করিতেছিল। কিন্তু মাদী কবুতর সঙ্গী নর কবুতরটিকে তেমন আমল দিতেছিলন অর্থাৎ খেলার প্রতি উহার কোন মনোযোগ ছিল না। নর কবুতর বলিল তোর জন্য কি দেশটি তছনছ করিয়া ফেলিব? গোয়েন্দা এই কথা শুনিতেছিল। সে হযরত সোলায়মান (আঃ)-কে এই সংবাদ দিল। পর দিন সকালে তিনি উক্ত কবুতরটিকে সংবাদ দিয়া দরবারে হাযির করিলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন, গতকাল তুমি তোমার সঙ্গিনীর সাথে খেলা করার সময় কি একথা বলিয়াছিলে যে, তোর জন্য কি দেশটা তছনছ করিয়া ফেলিব? কবুতর বলিল, জি হাঁ ! বলিয়াছিলাম। হযরত সোলাময়মান (আঃ) বলিলেন, কিভাবে তুমি তছনছ করিবে বল। কবুতর বলিল, হে আল্লাহর নবী ! প্রেমিকদের কথা শ্রবণ করা হয় এবং স্বাদ পাওয়া যায়। এই উত্তর শুনিয়া হযরত সোলায়মান (আঃ) খুবই সন্তুষ্ট হইলেন এবং কবুতরটি উড়াইয়া দিলেন।
আর একদিন হযরত সোলায়মান (আঃ) কোথাও যাইতেছিলেন। পিঁপড়ার বাদশাহ দেখিলেন হযরত সোলায়মান (আঃ) তাঁহার সেনাবাহিনী লইয়া আসিতেছেন। সে তাহার সঙ্গী-সাথীদিগকে বলিল, তোমরা পদদলিত হওয়ার পূর্বেই গর্তে চলিয়া যাও। আল্লাহ তাআলা বলেন-
"এমনকি পিঁপড়ারা ময়দানে আসিল, তখন এক পিঁপড়া বলিল, হে পিঁপড়াকুল। তোমরা তোমাদের গর্তে ঢুকিয়া পড়। অসাবধানতাবশত সোলায়মান এবং তাঁহার বাহিনী যেন তোমাদিগকে পদদলিত করিয়া না ফেলেন।"
সংবাদদাতা হযরত সোলায়মান (আঃ)-কে এই সংবাদ জ্ঞাপন করিল। হযরত সোলায়মান (আঃ) বায়ুকে নির্দেশ দিলেন আমার সিংহাসন এখানে অবতরণ করাও। আর তোমরা স্ব স্ব কর্তব্য কাজ কর। অতঃপর তিনি পিঁপড়ার গর্তের পাশে বসিয়া পড়িলেন। পিঁপড়ার বাদশাহ গর্ত হইতে বাহির হইয়া আসিয়া বলিল, হে আল্লাহর নবী ! বলুন, আল্লাহ আপনাকে কি কি বস্তু দান করিয়াছেন?
হযরত সোলায়মান (আঃ) বলিলেন, সেই শ্রেষ্ঠ বাদশাহ আমাকে এমন সিংহাসন দান করিয়াছেন যে, উহার উপর চারি হাজার কুরসী বসানো আছে। প্রত্যেক কুরসীতে একজন আলেম বসিয়া ধর্মজ্ঞান শিক্ষা দেন। জ্বিন, ইনসান, দৈত্য, পশু-পাখী সব কিছু আমার আজ্ঞাধীন করিয়া দিয়াছেন। এমনকি বাতাস আমার কথামত পরিচালিত হয়। পিপড়া জিজ্ঞাসা করিল, বাতাস পরিচালনা করার মধ্যে কি রহস্য আছে আপনি জানেন কি? হযরত সোলায়মান (আঃ) এই প্রশ্নে হতবাক হইয়া রহিলেন। পিঁপড়া বলিল, ইহারা সব বাতাসী দুর্গ, আপনার ক্ষমতাধীন কিছুই নহে। এই পৃথিবীর গঠন যতই উচ্চ পর্যায়ের হউক না কেন, একদিন অবশ্যই ধ্বংস হইয়া যাইবে। দুনিয়ার সম্পদ ও রাজত্ব অর্থহীন। ইহা বরবাদী ব্যতীত আর কিছুই নহে। বায়ু তাঁহার সিংহাসন একমাসের পথ একদিনে লইয়া যাইত আবার রাতে ফিরিয়া আসিত। যখন তিনি পানিবিহীন কোন স্থানে অবতরণ করিতেন তখন দৈত্য-দানবকে নির্দেশ দিতেন মাটি খুঁড়িয়া পানি বাহির করিতে। এই সমস্ত কিছু ধোঁকাবাজ নফসকে যাচাই করার জন্য ছিল। সমগ্র পৃথিবীর একচ্ছত্র অধিপতি হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজ হাতে খেজুর পাতার থলি তৈয়ার করিতেন এবং তাহা বিক্রয় করিয়া সন্ধ্যায় ইফতার করিতেন। হযরত সোলায়মান (আঃ) সমগ্র পৃথিবীর অধিপতি হওয়া সত্ত্বেও দরিদ্রতার দরুন থলি তৈয়ার করিয়া জীবিকানির্বাহের পন্থা করিয়া লইয়াছিলেন। এইভাবে জীবন যাপন করিলেই এই দুনিয়া তোমার জন্য রহমতস্বরূপ হইবে। ধর্মের জন্যই দুনিয়াকে গ্রহণ কর। 
বর্ণিত আছে, সমস্ত নবীর পর হযরত সোলায়মান ও ইউসুফ (আঃ) বেহেশতে প্রবেশ করার অনুমতি পাইবেন। কারণ, তাঁহারা বাদশাহীর প্রতি আসক্ত না থাকিলেও বাদশাহ ছিলেন।
তারপর বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলিলেন, হযরত সোলায়মান (আঃ) বলিয়াছেন, "আমার পর যেন আর কাহারও এমন রাজত্ব না থাকে।" অর্থাৎ নবী ব্যতীত অন্য কেহ যেন এমন রাজ্যের অধিপতি না হয়। এমন প্রার্থনা অন্য কেহ করেন নাই। এমন বিস্ময়কর রাজ্য ও সিংহাসনের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও নফস তাঁহার উপর কোন প্রকার কর্তৃত্ব করিতে পারে নাই। আম্বিয়া ব্যতীত অন্যদের অবস্থা ইহার বিপরীত। কারণ, তাহারা নিষ্পাপ বা শয়তান ও নফসের ধোঁকা হইতে নিরাপদ নহে। তাহারা যদি এমন বাদশাহীর অধিকারী হয় তবে অতি শীঘ্রই ধ্বংসের কূপে নিপতিত হইবে। তাই আল্লাহর সৃষ্টির নিরাপত্তার জন্য হযরত সোলায়মান (আঃ) বলিয়াছিলেন, "আমার পরে যেন অন্য কেহ এমন বিশাল রাজ্যের অধিপতি না হয়।"
পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে বর্ণিত আছে, হযরত ইউসুফ (আঃ) এবং অন্যান্য বহু নবী হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধর ছিলেন। একমাত্র ইউসুফ (আঃ) ব্যতীত অন্যান্য সকল নবীকে কোব্বার মধ্যে কবর দেওয়া হইয়াছে। কারণ, হযরত ইউসুফ (আঃ) নবী থাকা সত্ত্বেও মিসরের বাদশাহ ছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, 
"এমনিভাবে আমি পৃথিবীতে ইউসুফকে ক্ষমতাশালী করিয়াছিলাম যাহাতে সে তাহার ইচ্ছামত কাজ করিতে পারে। যাহাকে ইচ্ছা আমি আমার রহমতের অংশীদার করি। আমি এহসানকারীদের পারিশ্রমিক কম করি না।"
নফস এমনই খারাপ যে, আল্লাহর বিরোধিতা করিতে আরম্ভ করিয়া দেয়। আল্লাহ তাআলা বান্দাদিগকে বলেন, 
"আমার একত্ববাদ স্বীকার করিয়া আমার প্রশংসা কর, আমি ব্যতীত আর কাহারও উপাসনা করিও না এবং আমার নির্দেশ পালন কর।" ঠিক তেমন নফস আদেশ করে, আমার প্রশংসা কর, আমার আদেশের বিরোধিতা করিও না এবং আমি ব্যতীত আর কাহারও সম্মুখে মাথা নত করিও না। প্রত্যেক ব্যক্তির নফসই এই দাবী করে। প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজেকে অন্যের চেয়ে বুযুর্গ মনে করে এবং বলে, আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কেহ নাই।
তৃপ্তি সহকারে আহার, অধিক পার্থিব ধন-সম্পদ সঞ্চয় এবং আরাম-আয়েশের কারণেই নফস আল্লাহর সমতুল্য হওয়ার দাবী করিয়া থাকে। যেমন- কথিত আছে, ফেরআউন যদি ক্ষুধার্ত থাকিত তবে খোদায়ী দাবি করার সাহস পাইত না। একমাত্র এই কারণেই বুযুর্গগণ ধোঁকাবাজ নফসের মনস্কামনা পূর্ণ হইতে দিতেন না। সুতরাং নফসানী যিন্দেগী হইতে নিরাপত্তার উদ্দেশ্যেই তিনি তাঁহার বন্ধুদিগকে ক্ষুধার্ত রাখেন। আশ্চর্য যে, লুক্কায়িত কাফের নফস তবুও খোদায় দাবী করে। এই দুর্ভাগা কুকুর আমার সহিত সব কিছুই করে। সে এমন কিছু করে যাহা রোমী কাফেরও করে না।
নফস আয়ত্তে আসিয়াছে কিনা ইহা অবগত হইতে ইচ্ছা করিলে নিজের প্রতি লক্ষ্য করিবে। নিজের মধ্যে সামান্যতম গর্ব থাকিলেও বুঝিবে, তোমার নফস এখনও অবশিষ্ট রহিয়াছে। নিজেকে সাধারণ একটি কুকুরের চেয়েও ভাল মনে করিলে গর্ব-অহংকার এখনও বাকী রহিয়াছে। যতদিন আত্মঅহংকার থাকিবে ততদিন নফসও জীবিত থাকিবে। নফস যতদিন থাকিবে বিপদও ততদিন থাকিবে। ইসলামের সৌন্দর্য অর্জন করা হইতে ততই দূরে থাকিবে। ইসলামে গর্ব ও অহংকারের স্থান কোথায়?
কোন কোন দরবেশনামা ব্যক্তি মনে করেন, আমি আল্লাহর মনোনীতদের একজন। কিন্তু সে জানে না, সারাজীবনের সঞ্চয় তাহার একমাত্র গর্ব ও অহংকার ব্যতীত আর কিছুই নহে। যদি কোন ব্যক্তি নিজেকে রাস্তার কুকুরের চেয়েও অধম মনে করে তবে মানিয়া লওয়া যাইতে পারে যে, সে তাহার নফসকে আয়ত্তে আনিতে সমর্থ হইয়াছে।
আল্লাহ ব্যতীত অন্যের পর্দা যখন মধ্যস্থল হইতে অপসারণ হইয়া যায় তখন সঠিক কথা এই হইয়া যাইবে যে, আমি মারেফাতের আসমানের চন্দ্রে পরিণত হইব। দেহ এবং প্রাণের মায়া পরিত্যাগ করিতে যখন তুমি সক্ষম হইবে তখন তোমার যাহা কিছু থাকিবে তাহাই যথার্থ।


শা'বান মাসের ফযীলত



 শা'বান মাসের ফযীলত
📚মুকাশাফাতুল-কুলুব ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


'শা'বান' (شعبان) অর্থ শাখা-প্রশাখা বের হওয়া। এ মাস প্রচুর কল্যাণ ও নেকীর মাস। তাই, এর নামকরণ হয়েছে 'শা'বান'। আরেক অর্থে 'শা'বান : (شِعْب  থেকে নির্গত, পাহাড়ে যাওয়ার পথ) কল্যাণের পথ।


হযরত আবু উমামা বাহেলী (রঃ) থেকে বর্ণিত, যখন শা'বান মাস উপস্থিত হতো, তখন হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলতেন: "এ মাসে তোমরা তোমাদের অন্তরকে পাক-পবিত্র করে নাও এবং নিয়তকে সঠিক করে নাও।"


হযরত আয়েশা (রঃ) থেকে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অনেক সময় একাধারে এতো অধিক রোযা রাখতেন, আমরা মনে করতাম, তিনি আর রোযা ছাড়বেন না। আবার কখনও এমন হতো যে, একাধারে তিনি রোযা রাখছেন না, তখন আমরা মনে করতাম; তিনি আর রোযা রাখবেন না। তাঁর অধিকাংশ রোযা হতো শাবান মাসে।"


হযরত উসামা (রঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আরজ করেছি, ইয়া রাসূলাল্লাহ! (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)  শা'বান মাসে আপনাকে যত অধিক সংখ্যায় রোযা রাখতে দেখি, তত অন্য মাসে দেখি না, এর কারণ কি? 

তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)  বললেন: এ (শা'বান) মাস রজব ও রমযানের মাঝখানের (ফযীলতময়) মাস; অথচ লোকেরা এ মাসের ব্যাপারে উদাসীন। মানুষের আমলসমূহ এ মাসে রাব্বুল আলামীনের দরবারে পেশ করা হয়। আমার আমল যখন পেশ করা হয়, তখন রোযা অবস্থায় থাকা আমি পছন্দ করি।"


বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আয়েশা (রঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আমি রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে রমযান ছাড়া কখনও পূর্ণ মাস রোযা রাখতে দেখি নাই এবং শা'বান মাসে যত অধিক সংখ্যায় রোযা রেখেছেন, তেমন অন্য কোন মাসে দেখি নাই।"


এক রেওয়ায়াতে আছে- “রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) পূরা শা'বান মাস রোযা রাখতেন।" 

মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে- "তিনি স্বল্প সংখ্যক দিন ব্যতীত পুরা শা'বান মাস রোযা রাখতেন।"


বস্তুতঃ এ দ্বিতীয় রেওয়ায়াতটি প্রথম রেওয়ায়াতের জন্য ব্যাখ্যাস্বরূপ অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) শা'বান মাসে এতো বেশী রোযা রাখতেন যেন পূরা মাসটিকে ঘিরে নিতেন। সুতরাং 'পূরা মাস'- এর দ্বারা এখানে 'অধিকাংশ'-কে উদ্দেশ্য করা হয়েছে।


বর্ণিত আছে, মুসলমানদের জন্য দুনিয়াতে যেমন দু'টি ঈদের দিন আছে, তেমনি ফেরেশতাদের জন্যেও আসমানে দু'টি ঈদের রাত্র আছে। মুসলমানদের জন্য ঈদুল-ফিতর ও কুরবানীর ঈদ আর ফেরেশতাদের জন্য শবে বরাত ও লাইলাতুল-কদর। এ জন্যেই শবে বরাত-কে 'ঈদুল-মালায়িকাহ্' নাম দেওয়া হয়েছে।"


ইমাম সুরকী (রহঃ) তদীয় তফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, শবে-বরাতে ইবাদত করার ওসীলায় বছরের গুনাহ্ মাফ হয় আর জুম'আর রাতে ইবাদতের ওসীলায় সপ্তাহের গুনাহ্ মাফ হয় এবং শবে কদরে ইবাদত করলে জীবনের গুনাহ্ মাফ হয়। এ জন্যেই শবে-বরাতকে গুনাহ্-মাফীর রাত্রও বলা হয়। অনুরূপ, এ রাত্রিকে 'হায়াত বা 'জীবনের রাত্রি'ও বলা হয়। 

ইমাম মুনযিরী (রহঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) থেকে হাদীস নকল করেছেন- "যে ব্যক্তি দুই ঈদের দুই রাত্রি এবং অর্ধ শা'বানের রাত্রি জেগে ইবাদত করবে, তার অন্তর সে দিনও (কিয়ামতের দিন) মরবে না, যেদিনটি অন্তরসমূহের মৃত্যুর দিন হবে।" এ রাত্রিকে 'শাফায়াতের রাত্রি'ও বলা হয়। 


হাদীস শরীফে আছে, হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উম্মতের জন্য ১৩ই শা'বানের রাত্রি সুপারিশ করেছিলেন, তাতে কবুল হয়েছিল এক তৃতীয়াংশ, অতঃপর ১৪ই শা'বানের রাত্রিতে পুনরায় সুপারিশ করেছেন, তাতে কবুল হয়েছে আরেক তৃতীয়াংশ, অতঃপর ১৫ই শা'বানের রাত্রির সুপারিশে অবশিষ্ট তৃতীয়াংশ কবুলিয়ত- প্রাপ্ত হয়ে তা' পূর্ণতা লাভ করে। তবে যে সকল বান্দা উদ্ভ্রান্ত উটের ন্যায় অবাধ্য হয়ে দূরে পলায়ন করে, তাদের জন্য কবুল হয় নাই।

এ রাত্রিকে 'মাগফিরাতের রাত্রি'ও বলা হয়। 

ইমাম আহমদ (রহঃ) রেওয়ায়াত করেছেন, হুযূর আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন: "আল্লাহ্ তা'আলা অর্ধশা'বানের রাত্রিতে বান্দাদের প্রতি বিশেষ করুণাদৃষ্টি করেন এবং দুই শ্রেণীর লোক ব্যতীত সকলের মাগফিরাত করে দেন: এক, মুশরিক আর দ্বিতীয় হিংসুক।"


এ রাত্রিকে 'পরিত্রাণ ও মুক্তির রাত্রি'ও বলা হয়। 

ইবনে ইসহাক (রহঃ) বর্ণনা করেন, হযরত আনাস (রঃ) বলেন: একদা রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কোন জরুরী কাজে আমাকে হযরত আয়েশা (রঃ) এর ঘরে পাঠালেন। আমি তাঁকে (হযরত আয়েশাকে) বললাম, আপনি শীঘ্র করুন, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে দেখে এসেছি তিনি অর্ধশা'বানের রাত্রি সম্পর্কিত জরুরী বিষয়াবলী বর্ণনা করছেন। 

হযরত আয়েশা (রঃ) বললেন, হে আনাস! বস, আমি তোমাকে অর্ধশা'বানের রাত্রি সম্পর্কে একটি ঘটনা শুনাই। একদা সেই রাত্রটি ছিল রাসূলুল্লাহ এর কাছে আমার হিস্স্সা। তিনি আমার সাথে শয্যা গ্রহণ করলেন। কিন্তু রাত্রিতে এক সময় সজাগ হয়ে আমি তাঁকে বিছানায় অনুপস্থিত পেলাম। মনে মনে ভাবলাম তাহলে কি তিনি কিবতী বাঁদীর পার্শ্বে চলে গেলেন! বের হয়ে হঠাৎ আমার পা গিয়ে পড়লো হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর। তখন লক্ষ্য করে শুনি- তিনি একাগ্র মনে বলছেন:

"আয় আল্লাহ্! সর্বান্তঃকরণে- আমার দেহ আমার মুখমণ্ডল সবকিছু আপনার জন্য সেজদাবনত। আমার অন্তঃকরণ আপনার প্রতি ঈমান এনেছে। এই যে আমার হাত- সে-ও আপনার প্রতি বিশ্বাসী। এ হাত ও অন্যান্য আর যা কিছু দিয়ে আমি কোন অপরাধ করি- আমাকে মাফ করুন; হে মহান, মহা অপরাধের ক্ষমার জন্যেও যার অনুগ্রহের আশা করা হয়- আমার বড় বড় গুনাহ্-ও মাফ করে দিন। আমার মুখমণ্ডলকে, আমাকে যিনি সৃষ্টি করেছেন, আকৃতি দিয়েছেন, কর্ণ ও শ্রবণশক্তি, চক্ষু ও দৃষ্টিশক্তি যিনি দান করেছেন- আমাকে ক্ষমা করুন।"


অতঃপর তিনি মাথা উঠালেন এবং এই দো'আ পড়লেন :-

"আয় আল্লাহ্! আপনার ভয়ে শিরক থেকে পবিত্র, গুনাহ থেকে স্বচ্ছ অন্তর আমাকে দান করুন- যার মধ্যে কুফরের লেশমাত্র না থাকে, যে অন্তর কোনদিন বঞ্চিত ও দূর্ভাগা না-হয়।"


অতঃপর তিনি পুনরায় সেজদায় গেলেন। এ সময় তাঁকে আমি এই দো'আ পড়তে শুনেছিঃ


"আয় আল্লাহ্! আপনার সন্তুষ্টির দোহাই দিয়ে আপনার রোষ ও অসন্তুষ্টি হতে পানাহ্ চাই। আপনার ক্ষমার দোহাই দিয়ে আপনার আযাব ও গজব হতে পানাহ্ চাই। আপনার দোহাই দিয়ে আপনি থেকে পানাহ্ চাই। আপনার প্রশংসা করে শেষ করা আমার জন্য সম্ভব নয়। আপনি তেমনি যেমন আপনি নিজের প্রশংসা করেছেন। আমি তা-ই বলি যা আমার ভাই দাউদ বলেছিলেন—আমি আমার প্রভুর জন্য আমার চেহারা মাটিতে

স্থাপন করি-এতে আমি তাঁর ক্ষমা অবশ্যই পেতে পারি।"


অতঃপর তিনি মাথা উত্তোলন করলেন। আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনার উপর আমার পিতা-মাতা কুরবান হউন-আপনি কী করছেন আর আমি কি ভাবছি! হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, "হে হুমায়রা (হযরত আয়েশার অপর নাম)! তুমি কি জান না- আজকের এই রাত্রি অর্ধশা'বানের রাত্রি, এ রাত্রিতে আল্লাহ্ তা'আলা বনী কাল্ব গোত্রের অসংখ্য ছাগলের পশমের পরিমাণ লোককে দোযখ থেকে পরিত্রাণ ও মুক্তি দান করেন, তবে ছয় শ্রেণীর লোক ব্যতীত : ১। মদ্যপায়ী ২। পিতা-মাতার অবাধ্য ৩। ব্যভিচারী ৪। সম্পর্ক ছিন্নকারী ৫। ফেত্নাবাজ ৬। চুগলখোর। এক বর্ণনায় ফেতনাবাজের স্থলে প্রাণীর ছবি অংকনকারীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।


অর্ধশা'বানের এ রাত্রিকে 'কিসমত ও তকদীরের রাত্রি' বা 'বরাতের রাত্রি'ও বলা হয়। 

হযরত আতা' ইবনে ইয়াসার (রহঃ) বর্ণনা করেন, এক শা'বান থেকে পরবর্তী শা'বান পর্যন্ত যারা মারা যাবে, তাদের নামের লিখিত সূচী এই অর্ধশা'বানের রাত্রিতে মউতের ফেরেশতার নিকট হস্তান্তর করা হয়। অথচ এই মুহূর্তে তাদের কেউ কেউ ক্ষেতে-খামারে কাজ করতে থাকে, কেউ কেউ বিবাহ করতে থাকে, কেউ কেউ অট্টালিকা তৈরীতে মত্ত থাকে, এদিকে মালাকুল মউত অপেক্ষায় থাকে যে, আল্লাহ্র হুকুম হবে আর তৎক্ষণাৎ তার জান কবজ করে নিবে।"

————-

#শাবান

#আত্মার_আলোকমণি

#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

ইশক বা প্রেম-আসক্তি ( ৫) ইশকের নিগূঢ়তত্ব



ইশক বা প্রেম-আসক্তি (পর্ব - ৫)
📚আত্মার_আলোকমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ইশকের নিগূঢ়তত্ব—

ইশকের নিগূঢ়তত্ব হচ্ছে, গোপনীয়তার পর্দা ও আবরণ উৎখাত করে দেওয়া, আচ্ছাদিত রহস্যাবলী উন্মোচিত করে দেওয়া, প্রেমাস্পদের ধ্যানমগ্নতা ও স্মৃতিচারণের অমৃত আস্বাদ ও উন্মত্ততায় আত্মহারা হওয়া, যেন শরীরের কোন অঙ্গ কর্তন করা হলেও বিন্দুমাত্র অনুভব না হয়।

এক ব্যক্তি ফুরাত নদীর তীরে গোসল করছিল। এমন সময় অপর এক ব্যক্তির কণ্ঠে নিম্নের এ আয়াতটির তিলাওয়াত শুনেছিল? 

"হে অপরাধীরা। আজ তোমরা ভিন্ন হয়ে যাও”। (সুরা ইয়াসীন : ৫৯) 

আয়াতটির তিলাওয়াত শুনার সাথে সাথে এর হৃদয়বিদারক প্রতিক্রিয়ার প্রভাবে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে তৎক্ষণাৎ সে নদীতে ডুবে মারা যায়।

মুহম্মদ আবদুল্লাহ বাগদাদী (রহঃ) বলেছেন : ‘আমি বসরা শহরে জনৈক যুবককে দেখেছি, উচু একটি অট্টালিকার ছাদের উপর থেকে উকি দিয়ে সে পথচারীকে উদ্দেশ্য করে বলছে – ইশক ও মহব্বতের তরে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে কেউ কোনদিন কল্যাণ সাধন করতে পারে নাই। সুতরাং যদি কোন নিবেদিত প্রাণ ব্যক্তি প্রেমাস্পদের তরে প্রাণ বিসর্জন দিতে চায়, তা হলে সে যেন এভাবে মৃত্যুবরণ করে। একথা বলে সে তৎক্ষণাৎ ছাদের উপর থেকে মাটিতে পড়ে গেল । পরক্ষণেই লোকজন তাকে উঠিয়ে দেখে, সে মৃত্যুবরণ করেছে।

হযরত জুনাইদ বাগদাদী (রহঃ) বলেনঃ ‘প্রকৃত তাসাওউফ হচ্ছে সর্বপ্রকার খবর ও অবস্থা থেকে বেখবর ও গাফেল থাকার নাম।


একদা হযরত যুনুন মিসরী (রহঃ) মক্কা মুকারমায় মসজিদে হারামের একটি স্তম্ভের নীচে একজন যুবককে দেখলেন নেহায়েত পীড়িত ও বিবস্ত্র অবস্থায় পড়ে আছে; তার বেদনা ভারাক্রান্ত অন্তর থেকে আহ আহ শব্দ বের হচ্ছে। হযরত যুনুন বলেন : এ অবস্থা দেখে আমি তাকে সালাম দিয়ে পরিচয় জিজ্ঞাসা করলাম। সে বললো : আমি একজন মুসাফির আশেক; প্রেম-পীড়িত হয়ে পথে পড়ে আছি। তার উত্তর শুনে আমি বিষয়টি উপলব্ধি করে বললাম : ‘আমিও তোমার মতই একজন। একথা শুনে সে কাঁদতে লাগলো এবং আমিও তার সাথে কাঁদলাম। অতঃপর সে জিজ্ঞাসা করলো : "তুমিও যে কাদলে?” আমি বললাম : ‘তোমার মত আমিও একজন আশেক মুসাফির। একথা শুনে সে আরও অধিক পরিমাণে কাঁদতে লাগলো এবং এ অবস্থাতেই হঠাৎ সজোরে এক চিৎকার দিয়ে মারা গেল। অতঃপর আমি কাপড় দিয়ে তার শরীর আচ্ছাদিত করে কাফন খরিদ করার জন্য বাজারে গমন করলাম। বাজার থেকে কাফন এনে দেখি, সে নাই। তখন আমি আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললাম : সুবহানাল্লাহ (কোথায় গেল) ! এমন সময় একটি গায়েবী আওয়ায আমার কানে ভেসে আসলো— “হে যুনুন ! সে এমন এক পথিক, যাকে শয়তান আক্রমণ করতে চেয়েছে; কিন্তু পারে নাই, তোমার সম্পদের কিয়দাংশ তাকে স্পর্শ করতে চেয়েছে; তা ও হয় নাই, রিদওয়ান ফেরেশতা তাকে জান্নাতে আহ্বান জানিয়েছে; তা ও সে প্রত্যাখ্যান করেছে। 

আমি জিজ্ঞাসা করলাম : এখন সে কোথায় আছে?  

উত্তর আসলো "যোগ্য আসনে, সর্বাধিপতি সম্রাটের সান্নিধ্যে।" (কামারঃ ৫৪) 

লোকটিকে উক্ত পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে সে আল্লাহর আশেক ছিল, অত্যধিক ইবাদতে নিমগ্ন থাকতো এবং তওবা ও অনুতাপে দ্রুত অগ্রগামী হতো।


জনৈক বুযুর্গকে ইশক ও মহব্বতের তাৎপর্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন : 'মাখলুকের সাথে সম্পর্ক কম রাখবে, অধিকতর নির্জনতা ও একাকীত্ব অবলম্বন করবে, সর্বদা চিন্তাশীল থাকবে, নিচুপ থাকবে, চক্ষু উত্তোলন করবে কিন্তু দৃষ্টিপাত করবে না, সম্বোধন করা হলে শুনবে না, কিছু বলা হলে অনুধাবন করবে না, মুসীবতে ধৈর্যহারা হবে না, ক্ষুধার্ত হলে অনুভব করবে না, বিবস্ত্র হলে খবর থাকবে না, গালি বা ভৎর্সনা দিলে বুঝবে না, মানবকে ভয় করবে না, নির্জনে আল্লাহ তা'আলার ধ্যানে মগ্ন থাকবে, সর্বদা তার প্রতি আকৃষ্ট থাকবে, একাকীত্বে মুনাজাত করবে, পার্থিব ঝঞ্চাটে দুনিয়াদার লোকদের সাথে জড়িত হবে না।


হযরত আবু হুরাব বখশী (রহঃ) মহব্বত সম্পর্কে নিম্নের কয়েকটি পংক্তি আবৃত্তি করেছেন, যেগুলোর সারমর্ম হচ্ছে : ‘পার্থিব কোন ব্যাপারে ধোকায় পড়ো না; প্রতারিত হয়ো না। কেননা : এসবই প্রেমিকের জন্য প্রেমাস্পদের উপঢৌকন। দুঃখ-কষ্ট ও বালা-মুসীবত যা প্রেমাস্পদের পক্ষ থেকে এসে থাকে, সবই সে আনন্দচিত্তে বরণ করে নেয়। অভাব-অনটন ও দারিদ্রকেও প্রেমাস্পদের পক্ষ থেকে নগদ দান, সম্মান ও সন্তুষ্টির প্রতীক জ্ঞান করে নেয়। প্রকৃত প্রেমিকের আরেকটি লক্ষণ হচ্ছে, শত্রুর শত ধিক্কার ও প্রতারণা সত্ত্বেও তার পদঙ্খলন হয় না; বরং উত্তরোত্তর প্রেমাস্পদের প্রতি তার প্রত্যয় ও আসক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে।


একদা হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম একজন যুবকের পার্শ্ব দিয়ে পথ অতিক্রম করছিলেন। যুবকটি বাগানে পানি-সিঞ্চন কার্যে রত ছিল। হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে দেখে সে আরয করলো : “হে আল্লাহর নবী ! আপনি দো'আ করুন, যেন আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে তার মহব্বতের অণু পরিমাণ অংশ দান করেন। হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম বললেন :

“তোমার মধ্যে তা’ সহ্য করার ক্ষমতা নাই”।

যুবক বললো  : “তা’ হলে অর্ধাণু পরিমাণ মহব্বতের জন্য দো'আ করুন।”  

অতঃপর হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালাম দো'আ করলেন “হে মহান প্রভু ! এই যুবককে আপনার মহব্বতের অর্ধাণু পরিমাণ দান করুন।” 

দো'আর পর হযরত ঈসা (আঃ) আপন পথে চলে গেলেন। দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়ার পর তিনি সেই যুবকের বাড়ীর পার্শ্ব দিয়ে যাওয়ার সময় তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। লোকেরা বললো, বহুদিন যাবত যুবকটি পাগল অবস্থায় কালাতিপাত করছে এবং বর্তমানে সে পর্বতের চূড়ায় চুড়ায় ঘুরে বেড়ায়। এ খবর শুনে হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালাম দো'আ করলেন  “হে আল্লাহ্ সেই নওজওয়ানের সাথে আমাকে সাক্ষাৎ করিয়ে দিন।”  দো'আর পর হযরত ঈসা (আঃ) দেখতে পেলেন– সেই যুবক অসংখ্য পর্বতমালার মাঝখানে একটি উঁচু শিখরে আসমানের দিকে মুখ করে দাড়িয়ে আছে। 

হযরত ঈসা (আঃ) তাকে সালাম দিলেন; কিন্তু সে কোন উত্তর দিল না। পুনরায় হযরত ঈসা নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন  : “আমি ঈসা”। 

এ সময় আল্লাহ’র পক্ষ হতে হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালামের প্রতি ওহী আসলো- “হে ঈসা ! যার অন্তরে আমার মহব্বতের অর্ধাণু পরিমাণও প্রবেশ করেছে, সে কখনও মানুষের আওয়ায শুনতে পারে না। শুনে রাখ, - আমার মহত্ব ও পরাক্রমশীলতার কসম, তুমি যদি করাত দিয়ে তাকে চৌচির করে দাও, তবুও সে বিন্দুমাত্রও অনুভব করবে না।” 


যে ব্যক্তি নিজের জীবনে তিনটি বিষয়ের দাবী করেছে; অথচ আত্মাকে অপর তিনটি বিষয়ের কলুষতা হতে মুক্ত করতে পারে নাই, সে নির্ঘাত ধোকায় পড়ে রয়েছে  :  এক,  হৃদয়ে আল্লাহ্’র যিকরের সুমিষ্ট আস্বাদের দাবী করে; অথচ দুনিয়ার মহব্বত পরিত্যাগ করে নাই।

দুই, - ইবাদতে ইখলাস ও নিষ্ঠার দাবী করে; অথচ মানুষের কাছে সম্মান ও সুযশের লিপ্সা পরিহার করে নাই।

তিন, - আল্লাহ্’র মহব্বতের দাবী করে; অথচ নিজেকে তুচ্ছ ও নিকৃষ্টতম জ্ঞান করে না।


হুযূর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন  : “অদূর ভবিষ্যতে আমার উম্মতের উপর এমন এক সময় আসবে, যখন তারা পাঁচটি বিষয়কে ভালবাসবে; কিন্তু সেই সঙ্গে অপর পাঁচটি বিষয়কে ভুলে যাবে, 

(১) তারা দুনিয়াকে ভালবাসবে; কিন্তু আখেরাতকে ভুলে যাবে।

(২) তারা ধন-দৌলতকে ভালবাসবে; কিন্তু এর হিসাব-নিকাশের কথা ভুলে যাবে।

(৩) তারা সৃষ্টিকে ভালোবাসবে, কিন্তু সৃষ্টিকর্তাকে অবহেলা করবে।

(৪) তারা পাপকার্যকে ভালবাসবে; কিন্তু তওবা করতে ভুলে যাবে।

(৫) তারা বড় বড় অট্টালিকাকে ভালবাসবে; কিন্তু কবরের কথা ভুলে যাবে।”


মনসূর ইবনে আম্মার (রহঃ) এক যুবককে নসীহত করতে গিয়ে বলেছিলেন  : “হে যুবক ! তুমি সদা-সর্বদা সতর্ক থাক; যৌবন যেন তোমাকে প্রতারিত না করে; বহু নওজওয়ানকে দেখা গেছে–জীবনের কৃত পাপরাশি হতে তওবা করতে বিলম্ব করেছে, অন্তরে দীর্ঘ আশা পোষণ করেছে, মৃত্যুকে স্মরণ করে নাই আর শুধু বলেছে, আগামী কল্য অথবা পরশু তওবা করবো; এভাবে দীর্ঘ সময় অতীত হওয়ার পর অবশেষে তওবার সুযোগ আর হয় নাই, বঞ্চিত ও প্রতারিত হয়েই সে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে এবং একেবারে রিক্ত হস্তে কবরে গিয়েছে। পার্থিব প্রচুর ধন-সম্পদ, দাস-দাসী, পিতা-মাতা, আওলাদ-পরিজন কিছুই তার উপকারে আসে নাই। যেমন পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন : “(ক্বিয়ামতের দিন) কোন অর্থ-সম্পদ ও সস্তান-সন্ততি কারও কোন উপকারে আসবে না। একমাত্র সেই ব্যক্তি মুক্তি পাবে, যে সুস্থ অস্তঃকরণ নিয়ে আল্লাহ্’র কাছে পৌছবে"।  (শু'আরা  : ৮৮,৮৯) 

ওগো খোদা ! আমাদেরকে মৃত্যুর পূর্বে তওবার তাওফীক দান করুন, গাফলতি ও উদাসীনতা হতে মুক্তি দান করুন, কিয়ামতের ময়দানে আপনার হাবীব সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম উনার শাফা'আত নসীব করুন।

বস্তুতঃ প্রকৃত ঈমানের পরিচয় হচ্ছে, সুযোগের প্রথম মুহূর্তেই তওবা করা, কৃত পাপকার্যের উপর অনুতপ্ত হওয়া, লজ্জা ও অনুশোচনায় ভেঙ্গে পড়া, নশ্বর পৃথিবীর নূন্যতম রিযিক ও দ্রব্যের উপর তুষ্ট থাকা, যাবতীয় দুনিয়াবী ব্যাপারে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত থাকা এবং ইখলাস ও নিষ্ঠার সাথে আল্লাহ্’র ইবাদতে নিমগ্ন থাকা। 

একদা জনৈক কৃপণ ও মুনাফিক ব্যক্তি নিজের স্ত্রীকে কসম দিয়ে বলেছিলো  : “তুমি যদি কোন মিস্কীনকে দান-খয়রাত কর, তা’হলে আমি তোমাকে তালাক দিয়ে দিবো।”  পরবর্তী কোন এক সময়ে একজন মিস্কীন এসে গৃহের দরজায় হাঁক ছেড়ে বললো : “হে গৃহবাসী ! আমাকে আল্লাহ্’র ওয়াস্তে কিছু দান কর”। ঘর থেকে স্ত্রী তাকে তিনটি রুটি দান করলো। রুটি নিয়ে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে অকস্মাৎ সেই মিস্কীন মুনাফিকের সম্মুখীন হয়ে গেলে জিজ্ঞাসা করলো : “তুমি এ রুটি কোত্থেকে পেলে”?  মিস্কীন লোকটি মুনাফিকের গৃহের কথা বললো। অতঃপর সে বাড়ীতে গিয়ে স্ত্রীকে শাসনের স্বরে জিজ্ঞাসা করলো'আমি কি তোমাকে কসম দিয়ে বলি নাই? দান-খয়রাত করলে তালাক দিয়ে দিবো? স্ত্রী বললো : “আমি আল্লাহর নামে দান-খয়রাত করেছি”। এ কথা শুনে মুনাফিক চটে গিয়ে একটি অগ্নিকুণ্ড প্রজ্জ্বলিত করে উত্তপ্ত অগ্নিতে তাকে আল্লাহর নামে ঝাপ দিতে আদেশ করলো। নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রী গহনা অলঙ্কারে সজ্জিতা হয়ে প্রস্তুত হয়ে গেল। এ সময় মুনাফিক স্বামী তাকে গহনা-অলঙ্কার খুলে ফেলার নির্দেশ দিলে স্ত্রী উত্তরে বললো'বন্ধু বন্ধুর জন্য সাজ-সজ্জা গ্রহণ করে থাকে; এখন আমি আমার প্রিয় বন্ধুর সাক্ষাত লাভে ধন্য হতে যাচ্ছি - একথা বলেই সে অগ্নিকুণ্ডে ঝাপিয়ে পড়লো। অতঃপর মুনাফিক আগুনের গর্তটি উপর দিয়ে ঢেকে রেখে চলে গেলো। তিন দিন পর ফিরে এসে গর্তটি খুলে দেখলো তার স্ত্রী দিব্যি যেমন ছিলো তেমনি সহী–সালামতে জীবিত রয়েছে। এ দৃশ্য দেখে সে বিস্ময়াভিভূত হয়ে গেলো; এমন সময় অদৃশ্য একটি আওয়ায ভেসে আসলো ‘তুমি কি একথা বিশ্বাস কর না যে, অগ্নি আমার প্রিয়জনকে কখনো স্পর্শ করে না।”


ফেরআউনের স্ত্রী হযরত আছিয়া (আঃ) নিজের ঈমানদার হওয়ার বিষয়টি বহুকাল পর্যন্ত ফেরআউন থেকে গোপন করে রেখেছিলেন। অবশেষে বিষয়টি ফেরআউনের গোচরীভূত হওয়ার পর হযরত আছিয়াকে সে বিভিন্নরূপে শাস্তি প্রদানের হুকুম দিল। সেমতে তাঁকে বহু রকমে উৎপীড়ন করা হয়। ফেরআউন তাঁকে বলেছিল : “হে আছিয়া ! তুমি তোমার দ্বীনকে পরিত্যাগ কর”।  কিন্তু হযরত আছিয়া দ্বীন ও ঈমানের উপর অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে স্থিত ছিলেন। পরিশেষে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে কীলক (পেরেক) পুতে দেওয়া হয়েছিল। এ অবস্থায়ও ফেরআউন যখন তাকে দ্বীন ও ঈমান পরিত্যাগ করার নির্দেশ দিচ্ছিল, তখন তিনি উত্তর করছিলেন'হে ফেরআউন ! তুমি আমার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পার; কিন্তু অন্তঃকরণ তো আল্লাহর হাতে; সেখানে তুমি কোনরূপ অধিকার বা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে না; জেনে রাখ, তুমি যদি আমার প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে টুকরা টুকরা করে ফেলো, তাতে আমার ঈমানে কোন প্রকার দুর্বলতা সৃষ্টি হওয়া তো দূরের কথা; বরং এতে আমার ঈমান আরও বৃদ্ধি পাবে। এ সময় হযরত মুসা আলাইহিস্ সালাম হযরত আছিয়ার পার্শ্ব দিয়ে পথ অতিক্রম করছিলেন, তখন হযরত আছিয়া তাকে জিজ্ঞাসা করলেন "হে মুসা ! আপনি বলুন খোদা আমার প্রতি সন্তুষ্ট আছেন কিনা'? হযরত মুসা আলাইহিস্ সালাম বললেন : "হে আছিয়া আসমানের ফেরেশতাকুল তোমার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান এবং আল্লাহ্ তা'আলা তাঁদের সম্মুখে তোমার বিষয়ে গৌরব করছেন, তোমার যা মনোবাসনা আছে, আল্লাহর কাছে তুমি এখন তা' চেয়ে নাও, তিনি তোমার দো'আ কবুল করবেন"। তখন হযরত আছিয়া দো'আ করলেন; কুরআনের ভাষায়  “হে আমার পালনকর্তা ! আপনার সন্নিকটে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন, আমাকে ফেরআউন ও তার দুষ্কর্ম হতে উদ্ধার করুন এবং আমাকে জালেম সম্প্রদায় হতে মুক্তি দিন"। (তাহরীম : ১১)


হযরত সালমান (রঃ) হতে বর্ণিত ফেরআউন তার স্ত্রী আছিয়াকে প্রখর রৌদ্রে শাস্তি দিতো। তখন ফেরেশতারা আপন আপন ডানার সাহায্যে তাকে ছায়া দান করতো। হযরত আছিয়া তখন বেহেশতে স্বীয় আবাসস্থল দেখতে পেতেন। হযরত আবূ হুরায়রাহ্ (রঃ) থেকে বর্ণিত- ফেরআউন তার স্ত্রী আছিয়ার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে চারটি কীলক (পেরেক) পুতে দিয়েছিল এবং বুকের উপর ভারী চাকী বা পেষণ যন্ত্র স্থাপন করে রেখেছিল। এহেন উৎপীড়নের সময় তার চেহারাকে প্রখর উত্তাপময় সূর্যের দিকে ফিরিয়ে দিতো। এ সময় হযরত আছিয়া আকাশ পানে মাথা উঠিয়ে দো'আ করতেন “ওগো খোদা ! আপনার অতি নিকটে বেহেশ্ত মাঝে আমাকে আবাস দান করুন ।”  হযরত হাসান (রঃ) বলেন : 'আল্লাহ্ তা'আলা হযরত আছিয়াকে অতি উত্তমরূপে মুক্তি দান করেছেন এবং বেহেশতে তাঁকে অতি উচ্চ মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি বেহেশতে যেকোন স্থানে বিচরণ করেন এবং পানাহার করে থাকেন'। অতএব সাধকের কর্তব্য হচ্ছে, - সর্বদা আল্লাহর পানাহ্ চাওয়া; একমাত্র তাঁরই নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা। কেননা আপদ-বিপদ ও উৎপীড়ন থেকে মুক্তির জন্য দো'আ করা পুত-চরিত্র নেক বান্দাদের তরীকা ও আদর্শ এবং এটাই প্রকৃত ঈমানের লক্ষণ। 

(সমাপ্ত) আত্মার আলোকমনি


প্রথম পর্ব

ইশক 

ইশক বা প্রেম-আসক্তি (৪) মহব্বতের আলামত



ইশক বা প্রেম-আসক্তি (পর্ব - ৪)
📚আত্মার_আলোকমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মহব্বতের আলামত

মহব্বতের আলামত (লক্ষণ) তিনটি— জনৈক বুযুর্গ বলেছেন খাটি মহব্বতের আলামত (লক্ষণ) তিনটি : (১) নিজের বা অপর কোন মাখলুকের নয়। স্বয়ং মাহবুব তথা প্রেমাষ্পদের যবানে কথা বলা । (২) সমগ্র মাখলুকের সংসর্গ ত্যাগ করে কেবল মাহবুবের সান্নিধ্য অবলম্বন করা (৩) অপরাপর সকলের সন্তুষ্টি ও তোষামোদ পরিহার করে কেবল মাহবুবের সন্তুষ্টির জন্য ব্যগ্রচিত্ত হওয়া ।


পরবর্তী পর্ব

ইশকের নিগূঢ়তত্ব

ইশক বা প্রেম-আসক্তি (৩) মহব্বতের হাকীকত



ইশক বা প্রেম-আসক্তি (পর্ব - ৩)
📚আত্মার_আলোকমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মহব্বতের হাকীকত—

মনসূর হাল্লাজ সম্পর্কে বর্ণিত আছে, লোকেরা তাঁকে আঠার দিন। পর্যন্ত বন্দী করে রেখেছিল। এ সময় হযরত শিবলী (রহঃ) তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন : “হে মনসূর ! বলুন, মহব্বতের হাকীকত কি? তিনি বলেছিলেন : আজকে নয়, আগামী কল্য জিজ্ঞাসা করবেন। পরের দিন লোকেরা তাকে বন্দীশালা থেকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাচ্ছিল। তখন হযরত শিবলীও সে পথ অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন। মনসূর তাকে দেখে চিৎকার করে বললেনঃ হে শিবলী ! শুনে নিন - মহব্বতের হাকীকত হচ্ছে, সূচনাতে অগ্নিদগ্ধ হওয়া আর পরিণামে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া।

মনসূর যখন এ বাস্তব সত্যকে প্রত্যক্ষ করলেন যে, একমাত্র আল্লাহর সত্তা চিরঞ্জীব, শাশ্বত; আর সবকিছুই ভঙ্গুর ও ধ্বংসপ্রাপ্ত, অনুরূপ তিনি যখন দৃঢ়ভাবে হৃদয়ঙ্গম করে নিলেন এবং অন্তরে তার বদ্ধমূল হয়ে গেল। যে, জগতের সবকিছুতে একমাত্র আল্লাহরই সত্তা, কুদরত ও মহিমা বিরাজমান, তখন তিনি নিজের নামটুকুও বিস্মৃত হয়ে গেলেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হতো, আপনি কে? তিনি বলতেন : "আনাল হক" "আমি হক্ব"।


পরবর্তী পর্ব

মহব্বতের আলামত

ইশক বা প্রেম-আসক্তি (২) প্রেমাস্পদের তরে আত্মলীন



ইশক বা প্রেম-আসক্তি (পর্ব - ২)
📚আত্মার_আলোকমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) 

প্রেমাস্পদের তরে আত্মলীন–

একদা লায়লার প্রেমিক মজনুকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল– তোমার নাম কি? সে বলেছিল, আমার নাম লায়লা? বস্তুতঃ প্রেমাস্পদের তরে আত্মলীন হওয়ার ফলশ্রুতিতে নিজের অস্তিত্ব বিস্মৃত হওয়ার কারণেই এমনটা হয়েছে। 

এক ব্যক্তি মজনূকে বলেছিল কিহে মজনু ! লায়লা কি মরে গেছে? 

সে উত্তর করেছিল লায়লা অবশ্যই মারা যায় নাই, সে আমার অন্তরে বিরাজমান; আমিই লায়লা। 

একদা মজনু লায়লার বাড়ীর পার্শ্ব দিয়ে যাওয়ার সময় আসমানের দিকে দৃষ্টি উচু করে দেখছিল। তখন এক ব্যক্তি বলেছিল– “হে মজনু ! আকাশের দিকে তাকাচ্ছ কেন? লায়লার গৃহপ্রাচীরের দিকে দৃষ্টি কর, এভাবে হয়ত তাকে এক নজর দেখে নিতে পারবে। 

তখন মজনু বলেছিল : "আমি আকাশের তারকারাজি দেখছি, এগুলো আমার কাছে অতি প্রিয়; কারণ, এগুলোর ছায়া লায়লার বাড়ীর উপর পতিত হয়।"


পরবর্তী পর্ব

মহব্বতের হাকীকত

ইশক বা প্রেম-আসক্তি (১) ইশক



ইশক বা প্রেম-আসক্তি (পর্ব- ১)
📚আত্মার_আলোকমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ইশক 

‘মহব্বত' বলতে কোন সুন্দর ও মনোরম বস্তুর প্রতি অন্তরে আগ্রহ ও আকর্ষণ সৃষ্টি হওয়াকে বুঝায। এই আগ্রহ ও আকর্ষণই যখন অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে তীব্রতর রূপ ধারণ করে, তখন তার নাম হয় ‘ইশক’। এই ইশকের ক্ষেত্রে সর্বশেষ পর্যায়ে আশেক বা প্রেমিক ব্যক্তি প্রেমাস্পদের জন্য নিবেদিত প্রাণ দাসানুদাসে পরিণত হয়। স্বীয় প্রেমাস্পদের খাতিরে নিজের ধন-দৌলত, মান-সম্মান সব অকাতরে বিসর্জন দেয়।

প্রেমিকা যুলায়খা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ইশকে উন্মত্ত হয়ে স্বীয় রূপ-গুণ ও ধন-সম্পদ সবকিছু বিলীন করে দিয়েছিলেন। সত্তরটি উটের বোঝা পরিমাণ তার স্বর্ণ-রৌপ্যের অলংকার ছিল; এসবকিছুকে তিনি একমাত্র হযরত ইউসুফের জন্য উৎসর্গ করে দেন। যে কেউ তার কাছে এসে যদি শুধু এতটুকু বলতো যে, আমি তোমার ইউসুফকে দেখেছি, তা হলে বলার সাথে সাথে তাকে একটি অমূল্য স্বর্ণের মালা উপহার দিয়ে জীবনের তরে ধনবান করে দিতেন। অবশেষে তিনি নিজে সম্পূর্ণ রিক্ত হস্ত দরিদ্রে পরিণত হয়েছিলেন। তার এ অবস্থাকে কেন্দ্র করে লোকমুখে প্রবাদ প্রচলিত ছিল — 'ইউসুফের নামে সর্বস্ব'। ইশক ও মহব্বতের আতিশয্যে তিনি সবকিছু থেকে উদাসীন ও বিস্মৃত হয়ে যেদিকে তাকাতেন, সেদিকেই কেবল ইউসুফ আর ইউসুফই দেখতে পেতেন; এমনকি আসমানের তারকারাজিতেও তিনি ইউসুফের নাম লেখা দেখতেন। 


বর্ণিত আছে — এই যুলায়খা যখন ইসলামে দীক্ষা গ্রহণ করেন তথা ঈমানী নুর লাভে ধন্য হন, অতঃপর হযরত ইউসুফের (আঃ) সাথে প্রণয়সূত্রে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ তখন তিনি তার থেকে পৃথক হয়ে নিরব একাকীত্বে এমনভাবে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হয়ে যান যে, শুধুমাত্র এই ইবাদতের জন্য তিনি সর্বপ্রকার জাগতিক সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণরূপে নির্লিপ্ত হয়ে থাকেন। হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম যখন পেয়ার-সোহাগের জন্য দিনের বেলায় তাঁকে আহবান করতেন, তখন তিনি রাতের ওয়াদা করে মুলতবী করতেন। আবার যখন রাতে আমন্ত্রণ জানাতেন, তখন দিবসের কথা বলে নিস্কৃতি চাইতেন। একদা হযরত ইউসুফকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন : 'হে ইউসুফ ! আল্লাহর পরিচয় লাভ করার পূর্বে আমি তোমাকে ভালবাসতাম; এখন আমি আল্লাহর পরিচয় পেয়ে গেছি; তাই একমাত্র তার মহব্বত ও ভালবাসা ছাড়া আমার অন্তর থেকে সকল গায়রুল্লাহর মহব্বত দূর হয়ে গেছে এবং এজন্যে আমি কোন বিনিময়ও কামনা করি না।' 

হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম বললেন : “হে যুলায়খা ! আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে হুকুম করেছেন। এবং বলেছেন যে, তোমার গর্ভ থেকে দুটি পুত্রসন্তান জন্ম নিবে এবং তাদেরকে নুবুওয়াত প্রদান করা হবে। 

যুলায়খা বললেন : “যেহেতু আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে হুকুম করেছেন এবং এজন্যে আমাকে উপায় ও ওসীলা হিসাবে নির্ধারণ করেছেন, তাই এ হুকুম আমার জন্য শিরধার্য। অতঃপর তিনি মিলনে সম্মত হন।


পরবর্তী পর্ব

প্রেমাস্পদের তরে আত্মলীন


কাবা ঘরে প্রথম গিলাব



ইয়েমেনের বাদশাহ প্রথম তুব্বা।

হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর পৃথিবীতে আবির্ভাবের এক হাজার বছর আগে ইয়েমনের বাদশাহ ছিলেন তুব্বে আউয়াল হােমাইরী। তিনি একবার স্বীয় রাজ্য পরিভ্রমণে বের হয়েছিলেন। তার সাথে ছিল বার হাজার আলেম ও হেকিম, এক লক্ষ বত্রিশ হাজার অশ্বারােহী এবং এক লক্ষ তের হাজার পদাতিক সিপাই।এমন শান শওকতে বের হয়ে ছিলেন যে যেখানেই গেছেন, এ দৃশ্য দেখার জন্য চারিদিক থেকে লােক এসে জমায়েত হয়ে যেত। ভ্রমন করতে করতে যখন মক্কা মুয়াজ্জামায়। পৌছলেন, তখন তাঁর এ বিশাল বাহিনীকে দেখার জন্য মক্কাবাসীর কেউ আসলেন না। বাদশাহ আশ্চর্য হয়ে গেলেন এবং উজীরে আযমকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। উজীর ওনাকে জানালেন, এ শহরে এমন একটি ঘর আছে যাকে বায়তুল্লাহ বলা হয়। এ ঘর ও এ ঘরের খাদেমগণ ও এখানকার বাসিন্দাগণকে পৃথিবীর সমস্ত লোকে সীমাহীন সম্মান করে। আপনার বাহিনী থেকে অনেক বেশী লােক নিকটবর্তী ও দূর-দূরান্ত থেকে এ ঘর জিয়ারত করতে আসে এবং এখানকার বাসিন্দাগণের সাধ্যমত খেদমত করে চলে যায়। তাই আপনার বাহিনীর প্রতি ওনাদের কোন আকর্ষণ নেই। এটা শুনে বাদশার রাগ আসলাে এবং কসম করে বললেন , আমি এ ঘরকে ধূলিস্যাৎ করবাে এবং এখানকার বাসিন্দাগণকে হত্যা করবাে। এটা বলার সাথে সাথে বাদশাহর নাক মুখ ও চোখ থেকে রক্ত ঝরতে লাগলাে এবং এমন দুর্গন্ধময় পুঁজ বের হতে লাগলাে যে ওর পাশে বসার কারাে সাধ্য রইলাে না। এ রােগের নানা চিকিৎসা করা হলাে কিন্তু কোন কাজ হলাে। সন্ধ্যায় বাদশাহর সফর সঙ্গী ওলামায়ে কিরামের একজন আলেমে রব্বানী নাড়ী দেখে বললেন, রােগ হচ্ছে আসমানী কিন্তু চিকিৎসা হচ্ছে দুনিয়াবী। হে বাদশাহ মহােদয়, আপনি যদি কোন খারাপ নিয়ত করে থাকেন, তাহলে অনতিবিলম্বে সেটা থেকে তওবা করুন। বাদশাহ মনে মনে বায়তুল্লাহ শরীফ ও এর খাদেমগণ সম্পর্কিত স্বীয় ধারণা থেকে তওবা করলেন এবং তওবার সাথে সাথে রক্ত ঝরা ও পুঁজ পড়া বন্ধ হয়ে গেল। আরােগ্যের খুশীতে বাদশাহ বায়তুল্লাহ শরীফে রেশমী গিলাফ চড়ালেন। এবং শহরের প্রত্যেক বাসিন্দাকে সাতটি সােনার মুদ্রা ও সাত জোড়া রেশমী কাপড় নজরানা দিলেন। অতঃপর এখান থেকে মদীনা মনােয়ারা গেলেন, সফর সঙ্গী ওলামায়ে কিরামের মধ্যে যারা আসমানী কিতাব সমূহ সম্পর্কে বিজ্ঞ ছিলেন, তাঁরা সেখানকার মাঠি শুকে ও পাথর পরীক্ষা করে দেখলেন যে শেষ নবীর হিজরতের স্থানের যেসব আলামত তারা পড়েছিলেন এ জায়গার সাথে এর মিল দেখলেন, তখন তারা সংকল্প করলেন , আমরা এখানে মৃত্যু বরণ করবো এবং এ জায়গা ত্যাগ করে কোথাও যাব না। আমাদের কিসমত যদি ভাল হয়, তাহলে কোন এক সময় শেষ নবী তশরীফ আনলে আমরাও সাক্ষাত করার সৌভাগ্য লাভ করব। অন্যথায় কোন এক সময় তাঁর পবিত্র জুতার ধূলি উড়ে আমাদের কবরের উপর নিশ্চয় পতিত হবে, যা আমাদের নাজাতের জন্য যথেষ্ট। এটা শুনে বাদশাহ ওসব আলেমগণের জন্য চারশ ঘর তৈরী করালেন এবং সেই বড় আলেমে রব্বানীর ঘরের কাছে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর উদ্দেশ্যে দোতলা বিশিষ্ট একটি উন্নত ঘর তৈরী করালেন এবং অছিয়ত করলেন যে যখন তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তশরীফ আনবেন, তখন এ ঘর যেন তাঁর আরামগাহ হয়। ঐ চার’শ আলেমগনকে যথেষ্ট আর্থিক সাহায্য করলেন এবং বললেন আপনারা এখানে স্থায়ীভাবে থাকুন। অতঃপর সেই বড় আলেমে রব্বানীকে একটি চিঠি লিখে দিলেন এবং বললেন, আমার এ চিঠি শেষনবীর খেদমতে পেশ করবেন। যদি আপনার জিন্দেগীতে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার আর্বিভাব না ঘটে, তাহলে আপনার বংশধরকে অছিয়ত করে যাবেন, যেন আমার এ চিঠিখানা বংশানুক্রমে হেফাজত করা হয়, যাতে শেষ পর্যন্ত শেষ নবীর খেদমতে পেশ করা যায়। এরপর বাদশাহ দেশে ফিরে গেলেন। এ চিঠি এক হাজার বছর পর নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার খেদমতে পেশ করা হয়েছিল। কিভারে পেশ করা হয়েছিল এবং চিঠিতে কি লিখা ছিল, তা শুনুন এবং হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার শান-মানের বাস্তব নির্দশন অবলােকন করুন। চিঠির বিষয়বস্তু ছিল : “ অধম বান্দা তুব্বে আউয়াল হােমাইরীর পক্ষ থেকে শফীয়ুল মুযনাবীন সৈয়্যদুল মুরসালীন মুহাম্মদ রসুলুল্লাহ ( সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম ) উনার প্রতি। হে আল্লাহর হাবীব, আমি আপনার উপর ঈমান আনতেছি এবং আপনার  প্রতি যে কিতাব নাযিল হবে, সেটার উপরও ঈমান আনতেছি। আমি আপনার ধর্মের উপর আস্থাশীল। অতএব যদি আমার আপনার সাথে সাক্ষাতের সুযােগ হয়, তাহলে খুবই ভাল ও সৌভাগ্যের বিষয় হবে। আর যদি আপনার সাক্ষাত নছিব না হয়, তাহলে আমার জন্য মেহেরবাণী করে শাফায়াত করবেন এবং কিয়ামত দিবসে আমাকে নিরাশ করবেন না। আমি আপনার প্রথম উম্মত এবং আপনার আর্বিভাবের আগেই আপনার বায়াত গ্রহন করছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ এক এবং আপনি তার সত্যিকার রসূল।” 

ইয়ামিনের বাদশাহর এ চিঠি বংশানুক্রমে সেই চারশ ওলামায়ে কিরামের পরিবারের মধ্যে প্রাণের চেয়ে অধিক যত্ন সহকারে রক্ষিত হয়ে আসছিল। এভাবে এক হাজার বছর অতিবাহিত হয়ে গেল। ওসব ওলামায়ে কিরামের সন্তান-সন্ততির সংখ্যা বেড়ে মদীনার অধিবাসী কয়েকগুন বৃদ্ধি পেল। এ চিঠি ও অছিয়ত নামাও সেই বড় আলেমে রব্বানীর বংশধরের মধ্যে হাত বদল হতে হতে হযরত আবু আয়ুব আনছারী ( রাদি আল্লাহ আনহু ) এর হাতে এসে পৌঁছে। তিনি এটা তাঁর বিশিষ্ট গােলাম আবু লাইলার হেফাজতে রাখেন। যখন হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মক্কা মুয়াজ্জামা থেকে হিজরত করে মদীনা মনােয়ারার প্রান্তসীমায় পর্দাপন করেন, সুনিয়াতের ঘাটিসমূহ থেকে তাঁর উষ্ট্ৰী দৃষ্টি গােচর হলাে, তখন মদীনার সৌভাগ্যবান লােকেরা মাহবুবে খােদার। অভ্যর্থনার জন্য নারায়ে রেসালতের শ্লোগান দিয়ে দলে দলে এগিয়ে গেলেন, অনেকে ঘরবাড়ী সাজানাে ও রাস্তা ঘাট পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করার কাজে নিয়ােজিত হলেন, অনেকে দাওয়াতের আয়ােজন করতে লাগলেন, সবাই এটাই অনুময় - বিনয় করছিলেন, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমার ঘরে তশরীফ রাখুক। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ফরমালেন, আমার উষ্ট্রীর লাগাম ছেড়ে দাও। যে ঘরের সামনে গিয়ে এটা দাঁড়াবে এবং বসে যাবে, সেটাই হবে আমার অবস্থানের জায়গা। উল্লেখ্য যে, ইয়ামনের বাদশাহ তুব্বা আউয়াল হােমারী হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর জন্য দোতলা বিশিষ্ট যে ঘর তৈরী করে ছিলেন, সেটা তখন হযরত আবু আয়ুব আনছারী (রঃ)-এর অধীনে ছিল। উষ্ট্ৰী সেই ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। লােকেরা আবু লাইলাকে গিয়ে বললেন , ইয়ামনের বাদশাহর সেই চিঠিখানা হুযুরকে দিয়ে এসাে। সে যখন হুযুরের সামনে হাজির হলাে, হুযুর ওকে দেখে ফরমালেন তুমি আবু লাইলা? এটা শুনে আবু লাইলা আশ্চর্য হয়ে গেল। পুনরায় ফরমালেন, আমি মুহাম্মদ রসুলুল্লাহ, ইয়ামানের বাদশার সেই চিঠিটা যেটা তােমার হেফাযতে আছে, সেটা আমাকে দাও। অতঃপর আবু লাইলা সেই চিঠি হুযুৱকে দিলেন। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) চিঠি পাঠ করে ফরমালেন, নেক বান্দা তুবে আউয়ালকে অশেষ মুবারকবাদ। ‘মিজানুল আদিয়ান’

উক্ত ঘঠনা ‘কিতাবুল মুসততরফ’, ‘হুজ্জাতুল্লাহে আলাল আলামীন’ ও ‘তারিখে ইবনে আসাকের’এ  বর্ণিত আছে।

——————

#তুব্বা

#ইসলামের_বাস্তব_কাহিনী

#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

পরিণাম (মাজালিসে গাযযালী - ১৬)



📚মাজালিসে গাযযালী ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
১৬ ষষ্ঠদশ মজলিস

পরিণাম
একুশে রবিউল আউয়াল, রবিবার। আমি দরবার শরীফে আরয করিলাম, লোকের পরিণতি কি হইবে এই সম্বন্ধে কেহ কিছু অবগত আছে কি?

এরশাদ করিলেন, কাহার পরিণতি কি হইবে এই সম্বন্ধে কেহই কিছু অবগত নহে। কিন্তু যাহাদের সম্বন্ধে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) খোশখবর দিয়াছেন তাঁহারাই পরিণতি সম্বন্ধে অবগত। যেমন- সাহাবাদের মধ্যে দশ জনকে বেহেশতী হওয়ার সুসংবাদ দান করিয়াছেন। বেহেশতী হওয়ার সুসংবাদ পাওয়ার পরও তাঁহারা নির্ভয় ছিলেন না ; বরং তাঁহাদের আশা-নিরাশার কোন সীমা ছিল না।
বর্ণিত আছে, হযরত আবু বকর (রাঃ) বলিতেন, আমি এতটা ভয় আর আশান্বিত যে, যদি কেয়ামতের দিন ঘোষণা করা হয়, আজ একজন ব্যতীত আর কেহই দোযখে যাইবে না, তবে আমি মনে করি সেই দোযখী আমি ব্যতীত আর কেহই নহে। আবার যদি বলা হয় যে, আজ একজন ব্যতীত আর কেহই জান্নাতী হইবে না। তবে আমি আশা করি সেই জান্নাতী আমি ছাড়া আর কেহ নহে।
সুতরাং দেখা যাইতেছে, পরিণাম কি হইবে সেই সম্বন্ধে কেহই অবগত নহে। এই বিষয়ে কেহ অবগত হইলে শয়তানেরও তাহার পরিণতি সম্বন্ধে জ্ঞান থাকিত। কারণ, সে ফেরেশতাদের ওস্তাদ ছিল সাত হাজার বৎসরের এবাদতের পুঞ্জি তাহার ছিল। তাহার আমল আরশের পাখার উপর রাখা ছিল।
যখন আল্লাহর দরবারে তাহাকে মরদুদ করা হইল, তখন তাহার কপালে লানতের টিকা পরাইয়া দেওয়া হইল। আল্লাহ এরশাদ করিলেন-
"নিঃসন্দেহে আমার লানত কেয়ামত পর্যন্ত তোমার উপর বর্ষিত হইবে।" সেই মরদুদ মাথায় ধুলাবালি নিক্ষেপ করিতে করিতে বলিতেছিল-
দোজাহানের এমন কোন স্থান নাই যেখানে আমি সেজদা করি নাই। আমিই তো নিজের অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিলাম। ইবলীসের ভাগ্যের কথা শুনিয়া তাহাকে লানত করিতাম আর নিজের এবাদতের জন্য শুকরিয়া আদায় করিতাম। কিন্তু আজ আমি অপাদমস্তক পরিতাপে নিমজ্জিত; সমগ্র জগতের জন্য উদাহরণযোগ্য। হঠাৎ বিষাদ স্রোত আসিয়া পড়িল, মাথায় আমার লানতের আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল। আমি কি জানিতাম যে, আমার অভিশপ্ত জন আমি স্বয়ং। আমি ছাড়া সকলেই জ্ঞানী আর আমি উন্মাদ। এখন আমি জানিতে পারিলাম যে, হাজার হাজার বৎসর এবাদত-বন্দেগী করার পরও লানতের বেড়ি গলায় দেওয়া হইয়া থাকে।
ইহার পর মৃত্যু সম্বন্ধে বলিলেন, মৃত্যু এমন এক বস্তু যাহা সন্তানকে ইয়াতীম করে, পিতামাতাকে সন্তানহারা করে, ঘরবাড়ী উজাড় করে, রাজা-বাদশাহকে এক মুহূর্তে দিশাহারা করে।
হে মৃত্যু! তুমি সর্বদা জীবনের উপর ডাকাতি কর। সন্তান-সন্ততি এবং ঘরবাড়ী ধ্বংস কর, যে রাজ্য গঠন করিতে হাজার বৎসর অতিবাহিত হয় তোমার কবলে পড়িয়া এক মুহূর্তে তাহা তছনছ হইয়া যায়। ওহে! তুমি রাজ্যের মালিক, এই জন্য গর্বিত হইও না। যখন মৃত্যু আসিবে তখন তুমি তাহা ছাড়িয়া যাইবে। মৃত্যু এমন এক বস্তু, যে প্রতিদিন প্রতিটি মানুষকে নূতন চিন্তা-ভাবনায় নিপতিত করে। প্রত্যেকের অন্তরকে ক্ষত-বিক্ষত করে। ওহে ভাই! মালাকুল মওত যখন উপস্থিত হন তখন বলেন-
"হে আল্লাহ! তোমার এই বান্দার আত্মাকে নেক না বদ লোকের আত্মার ন্যায় কবয করিব?".
জানি না আল্লাহ তখন ইহার উত্তর কি দেন। জানি না আমার ভাগ্যে কি লেখা হইয়াছে। আর ইহাও জানি না যে, পরিণতি কি হইবে? আমার পুণ্যও ধ্বংস হইবে যদি তিনি তাহা গ্রহণ না করেন।
এক বুযুর্গ ছিলেন। কোন লোক তাঁহার নিকট গেলে তিনি বলিতেন, ওহে ভাই ! মৃত্যু ক্রয় করিতে যদি পাওয়া যায় তবে আমার জন্য লইয়া আসিবে। তাঁহার মৃত্যুক্ষণে লোকে জিজ্ঞাসা করিল, মৃত্যু আপনার কেমন মনে হইতেছে?
তিনি বলিলেন, আমার মনে হইতেছে সপ্ত স্তর যমীন আমার নিচে এবং সপ্ত স্তর উপরে। আমাকে যেন উহার মধ্যে রাখিয়া পিষা হইতেছে।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে-
মৃত্যু যন্ত্রণার এক ফোঁটা যদি পাহাড়ের উপর রাখা হইত তবে পাহাড় বিগলিত হইয়া যাইত।
বর্ণিত আছে, কেয়ামতের দিন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়ার সাথে সাথে সমস্ত প্রাণী মৃত্যুবরণ করিবে। কিন্তু আযরাঈল (আঃ) জীবিত থাকিবেন। আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞাসা করিবেন, হে আযরাঈল! কোন প্রাণী জীবিত আছে কি?
আযরাঈল (আঃ) বলিবেন, আল্লাহ! তুমি সর্বজ্ঞ। আমি ব্যতীত আর কেহ জীবিত নাই। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করিবেন, এবার তোমার জান কবয কর। তখন তিনি মৃত্যু যন্ত্রণার ভয়ে এমনভাবে চিৎকার করিবেন যে, পৃথিবীর আদি হইতে শেষ পর্যন্ত যদি সমস্ত প্রাণী জীবিত থাকিত, তবে তাঁহার এই চিৎকারের যন্ত্রণায় সমস্ত প্রাণীর প্রাণ সংহার হইয়া যাইত। বর্ণিত আছে, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর যখন মৃত্যু যন্ত্রণা আরম্ভ হইল তখন তিনি এক পেয়ালা পানি আনাইয়া তাহাতে পবিত্র হাত ডুবাইয়া পবিত্র বুকে মালিশ করিতেছিলেন আর বলিতেছিলেন-
হে আল্লাহ! আমার ও আমার উম্মতের জন্য মৃত্যু যন্ত্রণা সহজ করিয়া দেন।
ওহে ভ্রাত! এখন বুঝিয়া দেখ, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মাসুম হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যু যন্ত্রণায় আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করিয়াছেন, মালাকুল মওতকে নরম হওয়ার জন্য অনুরোধ করিয়াছেন, তখন তোমার আমার অবস্থা কি?
আমি আরয করিলাম, নবী, ওলী এবং অন্যদের মৃত্যু একই সমতুল্য কিনা? এরশাদ করিলেন, মৃত্যুর বেলায় সকলেই সমান 
"সকল প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিতে হইবে"। কিন্তু যন্ত্রণার মধ্যে পার্থক্য আছে। প্রত্যেকেই কার্যানুযায়ী মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করিবে। কোন কোন শিশু দুই তিন দিন মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করে। ইহা তাহাদের মর্যাদার তারতম্যের জন্য হইয়া থাকে। কারণ, তাহারা দুনিয়ায় কোন প্রকার দুঃখের সম্মুখীন হয় নাই। আজ এখানে যাহারা কষ্ট ভোগ করিবে পরকালে তাহাদের উন্নততর মর্যাদা হইবে।
পিতা-মাতার যে ধর্ম শিশুদেরও সেই ধর্ম। যতদিন শিশু থাকিবে ততদিন মুসলমানের সন্তান হইলে মুসলমান এবং কাফেরের সন্তান হইলে কাফের বলিয়াই বিবেচিত হইবে। বালেগ হইলে ঈমান আনা তাহার পক্ষে ফরয। শিশু অবস্থায় সে হুকমী ঈমান রাখে, হাকীকী নহে। শরীয়তের আহকাম তাহার পক্ষে-ওয়াজিব নহে।
কোন মুসলিম শিশু শৈশবে মারা গেলে আমরা তাহাকে মুসলমান বলি। কারণ, তাহার পিতা-মাতার ঈমানই তাহার ঈমান। কাফেরের সন্তান তাহার পিতা-মাতার কুফরীর জন্য নিজেও কাফের হয়। কোন কাফের মুসলমান হইলে তাহার সন্তানদিগকেও আমরা মুসলমান বলি। কারণ, তাহার পিতা-মাতার ইসলামই তাহার ইসলাম।
মাতা-পিতার কুফরীর দরুন সন্তানও কাফের থাকে। পরকালের ব্যাপারে মতভেদ আছে। ইমাম আযম (রঃ) বলেন, শিশুকালে মৃত কাফেরদের শিশু সন্তানদের পরকাল সম্বন্ধে জানি না। ইমাম মুহাম্মদ এবং ইমাম আবু ইউসুফ (রঃ) বলেন, কাফেরদের শিশু সন্তানদিগকে আরাফ নামক স্থানে রাখা হইবে। আরাফ বেহেশত ও দোযখের মধ্যবর্তী একটি স্থান। তাহাদের মধ্যে কুফরী নাই যে দোযখে যাইবে; আর ইসলামও নাই যে বেহেশতবাসী হইবে। বরং দুইয়ের মধ্যবর্তী স্থান আরাফে থাকিবে।
আর এক মতে, তাহারা বেহেশতের গেলমান হইবে, বেহেশতাবাসীদের খাদেম হইবে।
তারপর বলিলেন, যাহার পরিণতি ভাল সে বিপদমুক্ত। দুনিয়ার যাবতীয় বিপদাপদ পরকালের বিপদাপদের তুলনায় একটি সরিষা সমতুল্যও নহে।

---------

ওলীদের কাশফ ও কারামত (মাজালিসে গাযযালী - ১৫)



📚মাজালিসে গাযযালী ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

15 পঞ্চদশ মজলিস


ওলীদের কাশফ ও কারামত

বিশে রবিউল আউয়াল, শনিবার। কাবা শরীফের ফযীলত সম্বন্ধে আলাপ-আলোচনা হইতেছিল।

হযরত পীর ও মুরশিদ বলিলেন, হযরত ইবরাহীম (আঃ) কাবা গৃহ নির্মাণ করার পর আল্লাহ তাআলা আদেশ করিলেন, হে বন্ধু! কাবা গৃহ যিয়ারত করার জন্য আমার বান্দাদিগকে আহ্বান করুন।

হযরত ইবরাহীম (আঃ) আরয করিলেন, হে আল্লাহ! আপনার বান্দাগণ আমার আহ্বান কি করিয়া শুনিবে?

আল্লাহ তাআলা এরশাদ করিলেন, আহ্বান করা আপনার কর্তব্য। কিভাবে আপনার আহ্বান তাহাদের কর্ণগোচর হইবে সে ব্যবস্থা আমি করিব।

হযরত ইবরাহীম (আঃ) কোবায়েস পাহাড়ে আরোহণ করিয়া বলিলেন-

হে মানবমণ্ডলী! আল্লাহ আমাকে কাবা নির্মাণ করার নির্দেশ দিয়াছেন। আমি তাহা নির্মাণ করিয়াছি। তারপর তোমাদিগকে আহ্বান করার নির্দেশ দিয়াছেন। তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দাও এবং কাবার যিয়ারত কর। আল্লাহ তোমাদিগকে ক্ষমা করিবেন।


যাহারা বাপের ঔরসে ও মায়ের পেটে ছিল, আল্লাহ স্বীয় কুদরত দ্বারা এই আহ্বান তাহাদের কানে পৌছাইয়া দিলেন। ঐদিন যেব্যক্তি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর আহ্বান শুনিয়া একবার লাব্বায়েক বলিয়াছিল সে একবার হজ্জ আদায় করিয়াছে, যে দুই বা ততোধিকবার লাব্বায়েক বলিয়াছে সে দুই বা ততোধিকবারই হজ্জ করিয়াছে বা করিবে। আর যে লাব্বায়েক বলে নাই সে হজ্জ করিতে পারিবে না।

কাবা যিয়ারত করার পুণ্য যেকোন সময়ই ছিল এবং থাকিবে। যাহারা এই আহ্বানে সাড়া দিয়াছে তাহারাই হজ্জ করার ভাগ্যে ভাগ্যবান হইবে।

তাহার পর বলিলেন, হজ্জ ও অন্যান্য সময়কার তাওয়াফ শেষ করিয়া লোক যখন সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সায়ী করার জন্য যাইত, তখন সেখানে এক বৃদ্ধা খোঁড়া মহিলাকে দেখিতে পাইত। বৃদ্ধা মহিলার কাজ ছিল, যাহারা সায়ী করিত তাহাদের কাপড়-চোপড় নিজের দায়িত্বে রাখা।

একবার এক ভারতীয় হজ্জ করিতে গিয়। সেই বৃদ্ধা মহিলাকে দেখিয়া বলিল, তুমি তো অমুক স্থানে থাক: আমি তোমাকে চিনি।

মহিলা বলিল, আমি অন্য কোথাও থাকি না। সারা বৎসর এখানে থাকিয়া লোকদিগকে সায়ী করিতে সাহায্য করি।

ইহার পর মাখদুম জাঁহা বলিলেন-

যেব্যক্তি "আমি হাযির! হে আল্লাহ আমি হাযির। তোমার কোন শরীফ নাই। আমি হাযির। সমস্ত প্রশংসা এবং নেয়ামত তোমারই। তোমারই রাজত্ব। তোমার কোন অংশীদার নাই" বলে, ইহা সেই আহ্বানেরই জবাব।

যাহারা কাবার যিয়ারত করে তাহারা ঐ আহ্বান শুনিয়াছিল এবং কবুল করিয়াছিল।

তারপর বলিলেন, আরববাসী দুইটি বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। প্রথম- প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা, কোন মতেই ওয়াদার খেলাফ না করা। দ্বিতীয় মেহমানদারী করা। মেহমান' যাহার বাড়ীতে উপস্থিত হউক না কেন, কোন মতেই তাহাকে অন্যের মেহমান হইতে দেয় না।

তাহারা দাস-দাসীদিগকে নির্দেশ দিয়া রাখে, আমার অনুপস্থিতিতে কোন মেহমান আসিলে সে যেন ফিরিয়া না যায় এবং কোনমতেই যেন তাহার অনাদর করা না হয়।

বর্ণিত আছে, একবার হযরত খিযির (আঃ)-এর সাথে হযরত মূসা (আঃ)-এর সাক্ষাত হয়। উভয়ে এক সাথে কোন এক গ্রামে গিয়া উপস্থিত হন। উভয়ে ক্ষুধার্ত ছিলেন। খাওয়ার মত কোন বস্তু তাঁহাদের সাথে না থাকায় তাঁহারা গ্রামবাসীর নিকট খাবার চাহিলেন। কিন্তু কেহই তাঁহাদিগকে আহার্য দিতে রাযী হইল না।

এই কথা আরবময় প্রচার হইয়া গেল যে, অমুক গ্রামে আল্লাহর দুই জন নবী গিয়াছিলেন এবং ক্ষুধায় কাতর হইয়া গ্রামবাসীর নিকট খাদ্য চাহিয়াছিলেন। কিন্তু কেহই তাঁহাদের কথায় কান দেয় নাই। তাঁহারা ক্ষুধার্ত অবস্থায়ই রাত কাটান এবং পর দিন সেখান হইতে চলিয়া যান।

হতভাগার দল বিফল মনোরথ হইয়া তাহাদের ধন-সম্পদসহ চলিয়া গেল। কেয়ামত পর্যন্ত তাহাদের এই কলঙ্ক উজ্জ্বল হইয়া রহিয়া গেল।

তারপর বলিলেন, মক্কার কাফেরদের অত্যাচার-উৎপীড়ন যখন চরমে পৌঁছিল তখন আল্লাহ তাআলা মুসলমানদিগকে হিজরত করার নির্দেশ দিলেন। মুসলমানগণ যখন মক্কা ত্যাগ করিয়া মদীনায় যাওয়া আরম্ভ করিলেন তখন কাফেরগণ মক্কার চারিদিকে শূলের ব্যবস্থা করিয়া রাখিল। কোন মুসলমানকে মক্কা হইতে মদীনা যাইতে দেখিলেই ধরিয়া আনিয়া শূলে বিদ্ধ করিত। এই চরম অবস্থার মধ্যেও তাঁহারা হিজরত অব্যাহত রাখিলেন। সোবহানাল্লাহ! কেমন তাঁহাদের মন বা আর কেমন মুসলমান!


সাহাবাগণ মদীনায় আগমন করার পর আর্থিক ও শারীরিক কষ্ট-ক্লেশের মধ্যে দিনাতিপাত করিতে লাগিলেন। ইহা দেখিয়া হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) খুব চিন্তিত হইয়া পড়িলেন এবং কি করা যায় সেই বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করিতে লাগিলেন।


হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মদীনাবাসীদিগকে সমবেত করিয়া এরশাদ করিলেন, যদি তোমরা চিন্তা-ভাবনা এবং পরামর্শ করিয়া উত্তর দাও তবে আমি তোমাদের নিকট একটি কথা বলিব।


সকলে একবাক্যে আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার জন্য আমাদের পিতা-মাতা কোরবান হউক, এরশাদ করুন।

এরশাদ করিলেন, মক্কাবাসী মুসলমানদের জন্য আল্লাহ হিজরত ফরয করিয়াছেন। তাঁহারা আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থ বাড়ী-ঘর, ধন-সম্পদ ছাড়িয়া রিক্ত হস্তে এখানে আসিয়াছেন। এখন তাহাদের জীবিকানির্বাহের কোন পথ খুঁজিয়া বাহির করা দরকার।


মদীনাবাসী সভাস্থল ছাড়িয়া চলিয়া গেলেন এবং নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করিতে লাগিলেন। প্রথমে তাঁহারা বলিলেন, আমাদের যাহা কিছু আছে সবই আমাদের মুহাজির ভাইদিগকে দান করিয়া দিব। তারপর আবার বলিলেন, আমাদের জীবিকানির্বাহের জন্যও কিছু রাখা দরকার। অতঃপর সকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেন যে. আমাদের সম্পত্তির অর্ধেক তাঁহাদিগকে দিব।

এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পর তাঁহারা হাসি-খুশী মুখে দরবারে নববীতে উপস্থিত হইয়া আরয করিলেন, আমরা সকলে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছিয়াছি যে, আমাদের নিকট যাহা কিছু আছে উহার অর্ধেক আমাদের মুহাজির ভাইদিগকে দান করিব।

এই সিদ্ধান্তের পর আনসারগণ মুহাজিরদিগকে তাঁহাদের সম্পত্তির অর্ধেক দান করিলেন। সুতরাং স্মরণ রাখিও, তোমার অন্তর যদি অর্থ বুঝে তবে তুমি ইহার যথার্থতা বুঝিতে পারিবে যে, পৃথিবী ত্যাগ না করিলে কেহ পৃথিবীতে কৃতকার্য হইতে পারে না।

আল্লাহ তাআলা আনসারদের প্রশংসায় বলিয়াছেন: "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর সাহায্যকারী হও। যেমন মরিয়ম পুত্র ঈসা বলিয়াছেন, আল্লাহর কাজে কে আমার সাহায্যকারী হইবে? হাওয়ারীরা বলিল,

আমরা আল্লাহর কাজে সাহায্যকারী। বনী ইসরাঈলের একটি সম্প্রদায় ঈমান আনিল

এবং আর একটি দল কাস্ত্রে হইল। আমি ঈমানদারদিগকে তাহাদের শত্রুদের

উপর সাহায্য করিয়াছি। ফলে তাহারা জয়যুক্ত হইল। ঐ সময় যেব্যক্তি এক সের গম দিয়া মুহাজিরদিগকে সাহায্য করিয়াছেন, আজ অহুদ পরিমাণ স্বর্ণ দান করিলেও সেই পরিমাণ পুণ্য সঞ্চয় হইবে না। আনসারগণ মুহাজিরদের জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করিয়াছেন, তাহার তুলনা কোন দিন কোন মতেই হইতে পারে না। এই পুণ্যময় ত্যাগ তাঁহারা ব্যতীত আর কেহই স্বীকার করিতে পারে নাই। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন-

লোকেরা যদি এক পথ অনুসরণ করে এবং আনসারগণ অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে আমি আনসারদের পথই অনুসরণ করিব।


__