দুনিয়া ও আল্লাহর পথ পরষ্পর বিপরীতমুখি (রাহাতুল ক্বুলুব)


দুনিয়া ও আল্লাহর পথ পরষ্পর বিপরীতমুখি  


📚রাহাতুল ক্বুলুব ✍🏻নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.) 

খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) বলেন,
৬৫৫ হিজরী২রা রজববুধবার। আমি মুর্শিদের  কদমবুসির ঐশ্বর্য লাভ করলাম। শায়খ বোরহানউদ্দিন গজনবীশায়খ জামালউদ্দিন হাসবীমওলানা নাসেহউদ্দিন পেসরহাজী কাজী হামিদউদ্দিন নাগোরীমাওলানা শামসউদ্দিন বোরহান এবং অন্যান্য মাশায়েখীনে ইজাম রেদওয়ানাল্লাহ্তায়ালা আলাইহিম খেদমতে উপস্থিত ছিলেন। 
হুজুর (শেখ ফরিদ রহ.) এরশাদ করলেন যেহুজুর (সল্লাল্লহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছেন, – "দুনিয়া-প্রেম সমস্ত পাপের মূল।"
 অন্যত্র বলেন  - "যে ব্যক্তি দুনিয়া ত্যাগ করেছে সে ফেরেস্তা হয়ে গেছে এবং যে দুনিয়াকে আঁকড়িয়ে ধরেছে সে ধ্বংস হয়েছে।

হযরত সোহেল তসতরী হতে বর্ণিত আছে যে দুনিয়া এবং দুনিয়া-প্রেম হতে বড় কোন পর্দা (প্রতিবন্ধকতাআল্লাহ  তাঁর বান্দার মাঝে নেই। 

দুনিয়ার প্রতি যে যতটুকু আকৃষ্ট হবে সে ততটুকু আল্লাহ্ হতে দূরে থাকবে।  সম্বন্ধে একটা উপমা দিয়ে বললেন যেধর একটা লোক দাঁড়িয়ে আছেসে সম্মুখের সব কিছুই দেখতে পাচ্ছে কিন্তু সে যদি মুখ পিছনের দিকে ঘুরিয়ে নেয়তাহলে সে সামনের কিছুই দেখতে পাবে না। সুতরাং প্রত্যেকের উচিত দুনিয়ার প্রতি প্রেমাশক্ত না হওয়াযদি হয় তাহলে আল্লাহ্ হতে বিচ্ছিন্ন হবে।

এরপর এরশাদ করলেন যেআমি আমার পীর  মুর্শেদ হতে শুনেছি তিনি তাঁর উস্তাদের বরাত দিয়ে বলেছেনযখন মানুষ দুনিয়ার প্রেম হতে মুক্ত হওয়ার জন্য সংগ্রাম করে নিজের অন্তর-মনকে পবিত্র করে এবং আল্লাহ্ তায়ালার জেকেরে নিবদ্ধ হয় এবং সমস্ত কিছু হতে নিজেকে দূরে রাখে তখন আল্লাহ তায়ালার বন্ধুত্ব লাভ হয়। যদি এরূপ না করতে পারে তাহলে কস্মিনকালেও উদ্দেশ্য সফল হবে না। 

এরপর বললেনদেহের জন্য যেমন জীবন-মৃত্যু রয়েছে তেমনি হৃদয়ের জন্যও জীবন  মৃত্যু রয়েছে। দেহ হতে রূহ বেরিয়ে গেলে যেমন তাকে দাফন করতে হয়। কিন্তু অন্তরের মৃত্যু অন্য ধরনের।  সম্বন্ধে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, "দুনিয়ার প্রতি অত্যধিক আকৃষ্ট না হওয়া এবং আল্লাহতায়ালার জেকেরে নিমগ্ন থাকা।" 

এরপর এরশাদ করলেন, – যে মানুষের অন্তর কিন্তু এর বিপরীত। তারা সর্বদা উত্তম খাদ্যদ্রব্য ও পানীয়আনন্দ এবং কাম প্রবৃত্তিতে সমাবৃত হয়ে পড়ে। আলস্য তার উপর ভর করে এবং কামনা  বাসনার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েআল্লাহতায়ালার জেকের হতে নিবৃত হয়ে নানান কু-প্ররোচনায় পতিত হয় এবং  ভাবেই তাদের অন্তর অন্তঃসার শূন্য হয়ে পড়ে। অন্তরের এ অবস্থাকেই অন্তরের মৃত্যু বুঝায়। যেমন মাটিীতে ঝোপ-ঝাড়ের আধিক্যে আলো প্রবেশ দুর্ভেদ্য হয়সেখানে বীজ বপন করলে চারা গজায় না। অন্তরের অবস্থাও ঠিক এরূপই হয়ে থাকে। পূর্ব হতে সেখানে কু-প্রবৃত্তি প্রাধান্য বিস্তার করে আল্লাহতায়ালার খেয়াল হতে বিমুখ হয়ে পড়েছে। যে অন্তরে একমাত্র আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কিছু প্রাধান্য পায় না সে অন্তরই জীবিত এবং এমন অন্তরই উজ্জ্বল অন্তরের দৃষ্টান্ত। 

এরপর এরশাদ করলেন যে, “উমদাহ” কিতাবেব র্ণিত আছে যেহযরত জোনায়েদ বোগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন পথ হচ্ছে পবিত্র হৃদয়ের পথ। পবিত্র হৃদয় একজনের তখনই অর্জন হয় যখন সে দুনিয়ার সমস্ত কিছুকে বর্জন করে এবং সমস্ত লোভ লালসা আশা-আকাঙ্খাকে বিসর্জন দিয়ে পবিত্র হয়। দরবেশদের আমল  দরবেশী এরূপই হওয়া উচিত।  কথা বলতে বলতে হযরত শায়খুল ইসলামের চোখ অশ্রুতে ভরে উঠলো এবং তিনি বললেন যেযে দরবেশ দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তাঁরসত্বাকে দুনিয়ার নিকট বিলিয়ে দেয় সে কখনও দরবেশ হতে পারে না বরং সে দরবেশ-নামের কলঙ্ক এবং তরীকত পন্থীদের মধ্যে আগাছা স্বরূপ। কেননা তার মাঝে দুনিয়ার আবর্জনা প্রবেশ করেছে। 

এরপর এরশাদ করলেন যেবাগদাদে খা'জা আযল শিরাজী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মজলিসে শুনেছিলামতিনি হযরত সৈয়দ আত্তায়েফা রচিত “উমদাহ” কিতাবের বর্ণনা হতে বলেছিলেন যেদরবেশদেরকে দুনিয়া এবং দুনিয়াদারদের সাথে সংস্রব রাখা হারাম। এরপর এরশাদ করলেন যেএকবার ইরাকের বাদশাহ এমন কঠিন রোগেআক্রান্ত হলো যে একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লো এবং এভাবে তিন বছর অতিবাহিত হলো।বাদশাহ হযরত শোহেল তসতরী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর স্মরণাপন্ন হলো। খা'জা সোহেল তসতরী রহমতুল্লাহি আলাইহি বাদশাহের নিকট গমন করে নিজের হাত বাদশাহের শরীরে রাখতেই আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর হাতের সম্মানে তাকে রোগমুক্ত করলেন। 

হযরত আবদুল্লাহ্ শোহেল তসতরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর  কাজের কাফ্ফারা স্বরূপ সাত বছর পর্যন্ত দুনিয়াদারদের নিকট হতে দূরে সড়ে রইলেন।

 এরপর হযরত শায়খুল ইসলাম রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন যেবুজুর্গানে-দ্বীন  তরীকার পীরগণের নির্দেশ রয়েছে- "ধনীদের সঙ্গ ফকিরদের জন্য প্রাণনাশক যহর তুল্য।

অর্থাৎ ধনীদের সঙ্গ হতে  দুনিয়ার সংস্রব হতে যথাসম্ভব বেঁচে থাকো। যে ব্যক্তি দুনিয়ারসাথে প্রেম করে তার বন্ধুত্ব গ্রহণ করবে না। কেননাদুনিয়া-প্রেম তার অন্তরে অস্ত্র হয়ে বসে আছে। যে তার সাথে প্রেম করবে সেও আক্রান্ত হবে। 

সম্মানিত সুফিগণ বলেন যেযে দরবেশের অন্তরে দুনিয়ার প্রতি সামান্যতম প্রেমও দেখা যাবে যে "মরদুদে তরীকত” অর্থাৎ পথে সে বিশ্বাসঘাতক।

পরবর্তী পর্ব —
জেকের 

প্রকৃত দরবেশের গুনাবলী (রাহাতুল ক্বুলুব)



প্রকৃত দরবেশের গুনাবলী  

📚রাহাতুল ক্বুলুব ✍🏻নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.) 

 খাজা নিজামুদ্দিন (রহ.) বলেন ৬৫৫ হিজরীর ১৬ই রজব, সোমবার। মুর্শিদের কদমবুসির ঐশ্বর্য লাভ করলাম। শায়খ বদরুদ্দিন গজনবী, শায়খ জামালউদ্দিন হাছবী, মাওলানা শরফউদ্দিন নিবিয়াই ও কাজী হামিউদ্দিন নাগোরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারাও খেদমতে হাজির ছিলেন। হুজুর (শেখ ফরিদ গঞ্জশেখর রহ.) এরশাদ করলেন, দরবেশদের নিকট ধনী-দরিদ্র যে কেউ আসুক তাঁর উচিত কাউকে নিরাশ না করা, যা কিছু উপস্থিত থাকে তা তাদেরকে প্রদান করা। 

এরপর বললেন যে, অনেকে আছে যারা আমার নিকট কিছু নজর নিয়ে আসে, কিন্তু যদি কোন ফকির শূন্য হাতে আসে তাহলে আমার জন্য ফরজ হয়ে যায় তাকে কিছু দান করা। 

এবার তাঁর চোখ অশ্রুশিক্ত হয়ে উঠলো। তিনি পুনরায় বলতে লাগলেন, হযরত রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট সাহাবাগণ আসতেন এবং যে সব উপদেশ, আদেশ, নিষেধ, নির্দেশ ও জ্ঞান অর্জন করতেন সে সব তাঁরা তাঁদের অনুপস্থিত ভাইদের নিকট বলতেন এবং সে সমস্ত পালনের জন্য উপদেশ দিতেন। 

এরপর বললেন শহীদুল মুহাব্বাত হযরত খাজা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) -এর নিয়ম ছিলো, যেদিন তাঁর লঙ্গরখানায় কোন প্রকার খাদ্য দ্রব্য মওজুত থাকতোনা সেদিন তিনি খানকার খাদিম শায়খ বদরুদ্দিন গজনবীকে বলতেন যদি পানি মওজুদ থেকে থাকে তাহলে পানিই পরিবেশন কর। কেননা এ দিনটিও যেন অনুগ্রহ ও দান হতে বাদ না পড়ে। 

এরপর এরশাদ করলেন, বাগদাদ এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় যখন আমি ভ্রমণ করেছি তখন খাজা আযল সিরাজী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিলো। আমি তাঁকে সালাম পেশ করলাম তিনি সালামের জবাব দিয়ে মুসাফাহ (ইসলামী কায়দায় করমর্দন) করলেন এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন–
"হে লঙ্গর বিশারদ পবিত্র তব আগমন”

আমি এ কথা শুনে বসে গেলাম। তিনি তাঁর কৃপা ও দয়া দ্বারা আমার সম্বন্ধে আরও অনেক কিছু বর্ণনা করলেন। তাঁর অভ্যাসের মধ্যে দেখলাম তিনি অভ্যাগতদেরকে শূন্য হস্তে বিদায় দেন না। বিশেষ করে আমি কখনও দেখলাম না যে কোন আগন্তুক তাঁর নিকট হতে খালি হাতে গেলো। 

যখন কিছুই থাকতোনা তখন তিনি নিজের শুকনো খোরমা হতে দান করতেন। আমার বিদায় সময়ে তিনি দোয়া করলেন,– “আল্লাহ্ তায়ালা তোমার রিজিক্ বৃদ্ধি করুন।” আমি ফেরার পথে শুনতে পেলাম তিনি 'বাক্সিদ্ধ মহাপুরুষ' যাকে যখন যা বলেন সাথে সাথে তাই হয়ে যায়। এমন কি এ দোয়া তার পরবর্তী বংশধরদের পর্যন্তও স্থায়ী থকে। 

ঐ অঞ্চলে আরও একজন খ্যাতনামা বুজুর্গ ছিলেন। তাঁর সাথেও আমার সাক্ষাৎ হয়েছিলো; সৌজন্য বাক্য বিনিময়ের পর তিনি আমাকে বসতে বললেন, আমি তার আদেশ পালন করলাম। তাঁর বাসস্থান ছিলো জনকোলাহল হতে বহু দূরে, নির্জনে; যেখানে পশু পাখির আনাগুনাও ছিলোনা। এ অবস্থা দেখে আমার মনে প্রশ্ন জাগলো, এ বুজুর্গ এ নির্জনস্থানে কেন বাস করছেন এবং এর উদ্দেশ্যই বা কি? 

এ প্রশ্ন আমার মন হতে অন্তর্ধান না হতেই তিনি আমার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, “হে ফরিদ, ৪০ বছর অতিবাহিত হলো আমি এ বিজন গুহায় বাস করছি। জঞ্জাল ও আবর্জনা প্রীতি এড়ানো ভিন্ন অন্য কোন উদ্দেশ্য এর পিছনে নেই।' 

আমি তাঁর সুতীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি (কাশফ) অবলোকন করে বিহ্বল হয়ে তাঁর কদম মোবারকে মাথা রাখলাম এবং কিছুদিন তাঁর খেদমতে কাটালাম। 

এরপর সেখান থেকে বোখারার দিকে রওয়ানা হলাম। বোখারায় শায়খ সায়ফউদ্দিন বাখিরজী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সাথে সাক্ষাৎ হলো, তিনি অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের বুজুর্গ ছিলেন। তাঁর মজলিসে প্রবেশ করে সালাম নিবেদন করলাম। তিনি বসার জন্য নির্দেশ দিলে বসে পড়লাম।

 তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এ ছেলে একদিন সাহেবে খাল্কা (দরবেশী আশ্রমের অধিশ্বর) হবে। একটু পরে তাঁর পবিত্র কাঁধে রক্ষিত কম্বলটি নামিয়ে আমাকে দান করলেন এবং বললেন, এ গলীম (পশমী কম্বল) গায়ে জড়িয়ে নাও। 

আমি তাঁর এ নির্দেশকে সৌভাগ্য মনে করে পালন করলাম এবং কিছু দিন তাঁর খেদমতে অতিবাহিত করলাম। এর মধ্যে এমন কোনদিন দেখলাম না যেদিন এক হাজার লোকের কম তাঁর দস্তরখানে আহার করে এবং আগন্তুকদের মধ্য হতে কেউ নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। 

এর পর আমি সেখান হতে রওয়ানা হয়ে এক মসজিদে রাত্রি যাপন করলাম। শুনতে পেলাম সেখানে ইবাদতখানায় এক বুজুর্গ বাস করেন। আমি শুনামাত্র তাঁর খেদমতে উপস্থিত হলাম এবং মহামান্যের দর্শনে ভাগ্যবান হলাম। 

তিনি তখন ধ্যানমগ্ন হয়ে ঐশী-অচৈতন্য-লোকে দণ্ডায়মান ছিলেন। চার দিন পর তিনি চেতনার জগতে ফিরে এলেন। আমি সালাম আরজ করলাম। তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেন, তুমি আমার জন্য অনেক কষ্ট ভোগ করেছো, এখন বসো। 

আমি তাঁর নির্দেশ পালন করলাম। তিনি তাঁর নিজের কথা বলতে লাগলেন, "আমি হযরত শাদ্দিনের বংশধর। ত্রিশ বছর যাবৎ এখানে বাস করছি। হে ফরিদ, এ ৩০ বছরে ভয় ও ভীতি ছাড়া আর কিছুই অর্জন করতে পারিনি। আমার বিশ্বাস তুমি এর কারণ বুঝতে পেরেছো।” 

আমি বললাম, আপনার কথার তাৎপর্য বুঝতে পারিনি, দয়া করে জ্ঞান দান করলে বাধিত হব। তিনি বললেন, এটা একটা ব্যতিক্রমধর্মী পথ। যে ব্যক্তি এ পথে পা রেখেছে সে মঞ্জিলে মাকসুদে পৌঁছে গেছে। বন্ধুর মিলন সে লাভ করবে। যদি এ পথে বন্ধুর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ পা রাখে তাহলে সে জ্বলে যাবে। 

এরপর বললেন, যেদিন আমার ইলাহির বন্ধুত্ব হাসেল হলো সেদিন আমার ও আল্লাহ্ তায়ালার মাঝে ৭০ হাজার পর্দা ছিলো। আওয়াজ হলো সামনে এসো, তখন প্রথম পর্দা উঠে গেল। দেখলাম একটা দরবারে বন্ধুর সহচর নিজের দৃষ্টি ঊর্ধ্বে নিবদ্ধ রেখেছে এবং বলছে আমি তোমার দর্শন প্রার্থী। এর পর দ্বিতীয় পর্দা উঠে গেলো, সেখানেও একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। এমনিভাবে যখন খাস ও প্রকৃত পর্দার নিকট পৌঁছলাম তখন আওয়াজ হলো, হে অমুক, এ পর্দা সেই উন্মোচন করতে পারে যে দুনিয়াকে ত্যাগ করে নিজের অস্তিত্ব হতে ভিন্ন হয়ে আমার সাথে সম্বন্ধ স্থাপন করতে চায়। 
আমি আরজ করলাম, আমি সব কিছুকে বর্জন করেছি। আওয়াজ হলো, যদি তুমি সকল জিনিস ত্যাগ করে থাক তাহলে তুমি আমারও বন্ধু হলে! 
তারপর আমি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নিজেকে এ ইবাদতখানায় দেখতে পেলাম। হে ফরিদ, অবশ্যই বুঝতে পারছো যে, এ পথে সমস্ত কিছু ত্যাগ করেই আল্লাহ্ তায়ালার আপন ও বন্ধু হতে হয়। 

এরপর হযরত শায়খুল ইসলাম শায়খ ফরিদ উদ্দিন গঞ্জেশকর্ রহমতুল্লাহি আলাইহি এরশাদ করলেন যে, তাঁর সাথে এ সব কথাবার্তায় সন্ধ্যা নেমে এলো, আমি তাঁর সঙ্গে এক সাথে নামাজ পড়লাম। নামাজ শেষ হওয়ার পর দেখতে পেলাম অদৃশ্যলোক হতে চারটে রুটী ও দু' পেয়ালা ঝুল (সুরওয়া) নেমে এলো। তিনি আমাকে আহার করার জন্য নির্দেশ দিলেন। আমি এক সঙ্গে তাঁর সাথে ঐ খাবার খেলাম সে খাবারের স্বাদ অকল্পনীয় ও অভূতপূর্ব ছিলো, যা আজও আমি অন্য কোন খাবারের মাঝে পাইনি। আমি সে রাত সেখানেই কাটালাম। 

পরে সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে মুলতান পৌঁছলাম। শ্রদ্ধেয় মাওলানা বাহাউদ্দিন যাকারিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। তিনি আমার সাথে হাত মুসাফা করে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি স্বীয় কর্মে কতদূর অগ্রসর হয়েছো? 
আমি উত্তরে বললাম, আমার কর্মের পূর্ণতা এ পর্যন্ত পৌঁছেছে যে, যদি আমি এ চেয়ারটিকে, যেটায় আপনি উপবিষ্ট আছেন, উড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেই তাহলে সাথে সাথে সে হাওয়ার উপর ভর করে চলতে থাকবে। এ কথা আমার মুখ থেকে সম্পূর্ণ নির্গত হওয়ার পূর্বেই চেয়ারটি মাওলানাকে সহ হাওয়ায় ভাসতে লাগলো। 
হযরত বাহাউদ্দিন যাকারিয়া নিজের হাত চেয়ারের উপর মেরে নির্দেশ দিলেন নীচে নেমে যাও। কিন্তু চেয়ার তাঁর নির্দেশ মানলো না। পরে তিনি আমাকে বললেন। তুমি অত্যন্ত উচ্চ স্থানে পৌঁছেছ। 

আমি সেখান থেকে বিদায় নিয়ে দিল্লী গেলাম। দিল্লীতে আমি কয়েকদিন বিশ্রাম নিলাম। আমি হযরত খাজা শায়খ কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী আউশী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর গোলামী হাসিল করেছি এবং এ গোলামীর মাধ্যমে যে আজমত ও নিয়ামত লাভ করেছি তা এ সব সফরের কোন ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে লাভ করতে পারিনি। আমি তাঁর মুরীদ হলাম। 

তৃতীয় দিনে তিনি তাঁর দয়া ও করুণার দ্বার আমার জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন এবং বললেন, ফরিদ স্বীয় কর্মে পরিপূর্ণতা (কামালিয়াত) অর্জন করার পর আমার নিকট এসেছে। তিনি এ কথা বর্ণনা করার সময় এতো জোরে চিৎকার করে উঠলেন যে বেহুশ হয়ে গেলেন। 

তিন দিন পর যখন জ্ঞান ফিরে পেলেন তখন আমার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, আল্লাহ্ তায়ালার বীর পুরুষগণ বহু বুজুর্গের সঙ্গ ও নৈকট্যলাভের সৌভাগ্য অর্জন করার পরই এমন উচ্চাসনে স্থান পেয়েছে। এ সৌভাগ্যের পথ সমস্ত বনি আদমের জন্যই উন্মুক্ত রয়েছে এবং আল্লাহ্ তায়ালার আশীষও সকলের জন্যই খোলা আছে কিন্তু গ্রহণকারীকে বীরদীপ্ত হতে হয়, যাতে সে জীবনের সাথে সংগ্রাম করে উচ্চারোহণের সোপানগুলো অতিক্রম করতে পারে। 

এরপর এরশাদ করলেন, এ পথে ভ্রমণ করবে আন্তরিকতার সাথে, যে পদক্ষেপ হবে সিদ্দিকের মতো আর চর্মচক্ষু ব্যতীত অবলোকন করবে। তা না হলে কোন অবস্থাতেই নৈকট্যের স্তরে পৌঁছতে পারবে না। এরপর তিনি নিম্নোক্ত রূবাই পাঠ করলেন।

অনুবাদ-
"তুমি রাস্তায় চল নাই তাই তুমি দেখ নাই, 
দরজায় আঘাত না হানলে সেটা খুলবে না। 
বন্ধুর পথে প্রাণ দিতে ডাকলে প্রত্যাবর্তন করো না, 
যদি এমন হও তবেই তাঁকে পাবে।"

হযরত শায়খুল ইসলাম পুনঃপুনঃ এ রূবাই আবৃত্তি করতে লাগলেন এবং প্রতিবারই আবৃত্তি শেষ করে মাথা সেজদাবনত করে রাখতেন। পুনরায় মাথা উত্তোলন করে আবার সেটা পাঠ করতেন এবং আবার সেজদাবনত হতেন। এ রকম করতে করতে যোহরের নামাজের সময় হয়ে গেলো। মুয়াজ্জেন আজান দিলে তিনি উঠে যেয়ে নামাজে নিবিষ্ট হলেন। মজলিস শেষ হলো।
-আল্লহামদু লিল্লাহি আলা জালিক। 

পরবর্তী পর্ব —
দুনিয়া ও আল্লাহর পথ পরষ্পর বিপরীতমুখি  

অপব্যায় (রাহাতুল ক্বুলুব)




অপব্যায়—

📚রাহাতুল ক্বুলুব ✍🏻নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.) 

এ আলোচনার সময় মাওলানা বদরুদ্দিন ইসহাক রহমতুল্লাহি আলাইহি আরজ করলেন যে,

ইস্রাফ অর্থাৎ (ব্যয়বহুলতা, অপচয়, অপব্যয়) কি এবং এর মাত্রা ও সীমা কতদূর পর্যন্ত? উত্তরে তিনি বললেন, যে খরচ আল্লাহর ওয়াস্তে ধর্মের নিয়তে জনকল্যাণে নয় সেটাই 'ইস্রাফ' বা অপব্যয় এবং যদি সমস্ত জগতের ঐশ্বর্যও আল্লাহর ওয়াস্তে বা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করা হয় তবু সেটা অপব্যয় বা ইস্রাফ নয়। হযরত শায়খুল ইসলাম শায়খ ফরিদউদ্দিন গঞ্জেশকর্ রহমতুল্লাহি আলাইহি যখন এ অমিয়বাণী বর্ণনা করছিলেন তখন যোহরের নামাজের আজান ভেসে এলো। তিনি মজলিস বরখাস্ত করে নামাজে নিমগ্ন হলেন। অন্যান্যরাও তাঁকে অনুসরণ করলেন। -আল্হামদু লিল্লাহি আলা জালিক। 

পরবর্তী পর্ব —
প্রকৃত দরবেশের গুনাবলী 

দরবেশের শর্ত (রাহাতুল ক্বুলুব)



দরবেশের শর্ত 
📚রাহাতুল ক্বুলুব ✍🏻নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)

দরবেশের উচিত এ চারটি কথা স্মরণ রাখা। যদি এ চার জিনিস তার মাঝে না দেখা যায় তা হলে তাকে দরবেশ বলা চলবেনা।
(১) আল্লাহর বান্দাদের দোষ-ত্রুটি হতে নিজের চোখকে বন্ধ করে রাখা।
(২) অকথ্য কথা শ্রবণ করা হতে নিজের কানকে বধির করে রাখা।
(৩) আয়াশ আরামের আলোচনা হতে নিজের জিহ্বাকে বোবা করে রাখা।
(৪) নফসের খায়েসে যদি পা কোন নাজায়েজ বা কোন অপ্রয়োজনে কোথাও যেতে চায় তাহলে তাকে ল্যাংড়া করে রাখা।
যখন এ চার জিনিস তার হাসেল হবে তখন তাকে দরবেশ বলবে, তা না হলে সে মিথ্যা দরবেশীর দাবীদার। 

এরপর বললেন, শায়খ শিহাবউদ্দিন ওমর সোহ্রাওয়ার্দী রহমতুল্লাহি আলাইহি ৪০ বছর চোখে পর্দা (পট্টী) বেঁধে রেখেছিলেন। কোন একজন এর কারণ 'জিজ্ঞেস করায় তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, পট্টী এ জন্য বেধেছি যে মানুষের দোষ ত্রুটি যেন চোখে না পড়ে। তোমরা কেউ যদি এ রকম কিছু দেখো তা হলে উচিত হবে তা কারও কাছে প্রকাশ না করা। 

এরপর হযরত শায়খুল ইসলাম মোরাকাবায় বসলেন। অনেকক্ষণ পর্যন্ত মোরাকাবায় অতিবাহিত করার পর মাথা উত্তোলন করে আমার দিকে তাকালেন এবং বললেন, দরবেশদের এমন হওয়া উচিত নয় যে, যেভাবে তার ইচ্ছা হবে সেভাবেই চলবে। যখন শায়খুল ইসলাম আলোচনায় ব্যস্ত তখন মুহাম্মদ শাহ নামে তাঁর এক পীর ভাই খেদমতে উপস্থিত হলেন। তিনি তাকে বসার নির্দেশ দিলেন। নির্দেশানুযায়ী সে বসে পড়লো। কিন্তু তার চেহারায় একটা বিশাদের ছাপ লেগেছিলো। কারণ তার ভাই মৃত্যু পথের যাত্রী ছিলো। হযরত শায়খুল ইসলাম তাঁর আলোকিত অন্তর দ্বারা পীর ভাইয়ের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে জিজ্ঞেস করলেন, "এখন অবস্থা কেমন?" তার উত্তরের অপেক্ষা না করে তিনি বললেন, "ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যাও তোমার ভাই সুস্থ হয়ে গেছে।” 

মুহাম্মদ শাহ আদবের সঙ্গে উঠে আদব সহকারে বিদায় নিয়ে নিজের বাড়ীর দিকে রওনা হলো। যখন বাড়ীতে পৌঁছলো তখন দেখলো যে তার ভাইয়ের অসুস্থতা দূর হচ্ছে এবং অল্প সময়ের মধ্যে সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলো। তার শরীরে তখন আর অসুস্থতার কোন চিহ্নমাত্র অবশিষ্ট নেই। 

এরপর হযরত শায়খুল ইসলাম এরশাদ করলেন যে হযরত আলী কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু খুতবার মাঝে প্রায়ই পাঠ করতেন, 'আমি হযরত রাসুলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জীবনেও দেখিনি যে তাঁর নিকট কোন নজর হাদিয়া পৌঁছলে তা তিনি সকাল হতে সন্ধ্যার মধ্যে বিলিয়া না দিতেন। অর্থাৎ সন্ধ্যার সময় তাঁর নিকট কোন নজর হাদীয়ার জিনিস অবশিষ্ট থাকতো না।

পরবর্তী পর্ব —
অপব্যায় 

খিরকা (রাহাতুল ক্বুলুব)



খিরকা 
📚রাহাতুল ক্বুলুব ✍🏻নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)

আলোচনা খিরকা সম্বন্ধে শুরু হলো, হুজুর এরশাদ করলেন যে হযরত রাসুলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মি'রাজ হতে ফিরে আসার পর নিজের সাহাবা রাদিআল্লাহু আনহুমদেরকে ডেকে এরশাদ করলেন যে আমার প্রতি আল্লাহ্ তায়ালার নির্দেশ হয়েছে যে, আমার দরবেশী খিরকা ঐ ব্যক্তিকে প্রদান করবো যে আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারবে। আমি জানিনা, সঠিক উত্তর আমি কার নিকট হতে পাব? 

প্রথম আমিরুল মু'মেনীন হযরত সিদ্দীকে আকবর রাদি আল্লাহু আনহু-এর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, যদি আমি তোমাকেই এ দরবেশী খিরকা দান করি তাহলে তুমি এর হক কিভাবে আদায় করবে? 

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদি আল্লাহু আনহু জওয়াব দিলেন, বিশ্বস্ততা অবলম্বন করবো, মওলার বন্দেগীতে কছুর (ত্রুটি) করবো না এবং যে সব মাল আমার নিকট আছে এবং ভবিষ্যতে যা আসবে তার সমস্ত কিছুই আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিব। 

এরপর হযরত ওমর রাদি আল্লাহু আনহু-কে উদ্দেশ্য করে বললেন, হে ওমর ! এ খিরকা যদি তোমাকে দেয়া হয় তাহলে তুমি এর হক কিভাবে আদায় করবে? 

আমিরুল মো'মেনীন হযরত ওমর ফারুক রাদি আল্লাহু আনহু বললেন, আপিন যদি আমাকে এ দরবেশী খিরকা দান করেন তাহলে বিশ্বস্ততা অবলম্বন করবো; আল্লাহর বান্দাদের প্রতি ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবো এবং অত্যাচারীদের প্রতিশোধ নিব। 

তারপর হযরত ওসমান গণী রাদি আল্লাহু আনহু-কে লক্ষ্য করে বললেন, যদি তোমাকে এ দরবেশী খিরকা প্রদান করা হয় তাহলে তুমি এর হক কিভাবে আদায় করবে? 

উত্তরে তিনি বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এ খিরকা যদি আপনি আমাকে দান করেন তাহলে আমি উদারতা, বদান্যতা ও বিনয়াবনতা অবলম্বন করবো অর্থাৎ এ খিরকার যে হক আছে তা পরিপূর্ণরূপে আদায় করবো। 

সর্বশেষে আমিরুল মো'মেনীন হযরত আলী কারামাল্লাহু ওয়াজহু-এর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, যদি এ দরবেশি খিরকা তোমাকে দেয়া হয় তাহলে তুমি এর হক কিভাবে আদায় করবে? 

উত্তরে হযরত আলী রাদি আল্লাহু আনহু বললেন, ইয়া সরদারে দু' আলম, যদি আমাকে এ খিরকা দান করেন তাহলে আমি আল্লাহ তায়ালার প্রকৃত বান্দাদের ও এ খিরকার গোপনীয়তা রক্ষা করবো। 

হযরত রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এ জবাবই প্রকৃত জবাব যা হযরত আলী প্রদান করেছে। অতএব এ দরবেশী খিরকা তাকেই দেয়া হলো। বলতে বলতে হযরত শায়খুল ইসলাম শায়খ ফরিদউদ্দিন রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর চোখ অশ্রুতে ভরে উঠলো এবং হায় হায় করে কেঁদে উঠলেন ও জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। জ্ঞান ফিরে এলে পুনরায় বলতে লাগলেন, দরবেশী হলো গোপনীয়তা। 

পরবর্তী পর্ব —
দরবেশের শর্ত 

ধৈর্য ও অভাবই হচ্ছে দরবেশের সঙ্গী (



ধৈর্য ও অভাবই হচ্ছে দরবেশের সঙ্গী —
📚রাহাতুল ক্বুলুব ✍🏻নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)

এরপর এরশাদ করলেন যে- ধৈর্য ও অভাবই হচ্ছে দরবেশের সঙ্গী। যদি দরবেশের নিকট কোন প্রকার নজর নিয়াজ (ফুতুহ) নাও আসে তবু সে বলবে না যে আমি কিছু পাইনি।
'সুলুকে'র কিতাবে বর্ণিত আছে, মালেক বিন্ দীনার রহমতুল্লাহি আলাইহি একজন বুজুর্গের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। উভয়ে আলাপ আলোচনা করতে করতে আহারের সময় হয়ে গেলো। দরবেশের মেয়ে লবণ বিহীন দুটো গমের রুটী দুজনের জন্য সম্মুখে এনে রাখলো। দরবেশ মালেক বিন্ দীনার রহমতুল্লাহি আলাইহিকে আহারের জন্য অনুরোধ জানালো। মালেক বিন্ দীনার রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর অনুরোধে শরীক হলেন। কিন্তু রুটী কামড় দিয়ে দেখেন রুটীতে লবণ নেই। তিনি বললেন, রুটীতে নিমক নেই, একটু নিমক হলে ভালো হতো। দরবেশের মেয়ে যখন এ কথা শুনলেন তখন তিনি দৌড়ে মুদি দোকানে গেলেন এবং নিজের লোটাটি বন্ধক রেখে নিমক এনে আহারের জন্য পেশ করলেন। উভয়ে নিমক সহকারে আহার ক্রিয়া সম্পন্ন করলেন। 

আহারের পর মালেক বিন্ দীনার (রহমতুল্লাহি আলাইহি) আল্লাহ্ তায়ালার শুকুর গুজারী করে বললেন, 'ধৈর্য ধারণ করা ভালো'। 
দরবেশের মেয়ে মালেক বিন্ দীনার রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর এ উক্তি শুনে বললেন, "যদি আপনার নিজের ধৈর্য হাসিল হয়ে থাকতো তাহলে নিমকের জন্য আমার লোটা বন্ধক রাখতে হতোনা এবং দরবেশ বললেন, আজ ১৭ বছর হলো নিজের নফসকে নিমক হতে বঞ্চিত রেখেছি। আমি এখন এও জানিনা যে নিমকের রং কেমন! হে মালেক, তুমি কি আমাকে আহার সম্বন্ধে উপদেশ দিচ্ছ? মালেক, প্রকৃত দরবেশী অন্য জিনিস এবং পোষাকী দরবেশী অন্য জিনিস। তুমি কি জাননা দরবেশদের উপর কি ধরণের দুঃখ, কষ্ট, বালা, মসিবত, বাধা, বিপত্তি নিপতিত হয়? দরবেশের- কথায় তিনি সম্বিত ফিরে পেয়ে লজ্জিত হয়ে ক্ষমা চাইলেন।

পরবর্তী পর্ব —
খিরকা

তরিকতের যাকাত (রাহাতুল ক্বুলুব)



📚রাহাতুল ক্বুলুব ✍🏻নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)

তরিকতের যাকাত–
এরপর এরশাদ করলেন যে আসহাবে তরীকত (তরীকতের সঙ্গীগণ) ও মাশায়েখে কুবার (সম্মানিত আধ্যাত্মিক শিক্ষক, গুরু ও পীরগণকে বুঝায়) তাঁদের উপক্রমে বর্ণনা করেছেন যে যাকাত তিন প্রকারে বিভক্ত।
(১) যাকাতে শরীয়ত (শরীয়তের নিয়মানুযায়ী যাকাত)
যাকাতে শরীয়ত হল শরীয়তের বিধান অনুযায়ী যাকাত, যেমন শতকরা ২.৫% হিসেবে (অবশ্য যে পরিমাণ টাকা থাকলে তার উপর যাকাত বর্তায়)। অর্থাৎ দু'শ টাকার জন্য ৫ টাকা যাকাত প্রদান করা।

(২) যাকাতে তরীকত (তরীকতের নিয়মানুযায়ী যাকাত)
যাকাতে তরীকতের হিসাব হচ্ছে দু'শ টাকার মধ্যে। নিজের জন্য ৫ (পাঁচ) টাকা রেখে ১৯৫ (একশত পঁচানব্বই) টাকা যাকাত, হিসেবে প্রদান করা।

(৩) যাকাতে হকিকত (আল্লাহ্ প্রাপ্তদের নিয়মানুযায়ী যাকাত)।
হকিকত পন্থীদের যাকাতের নিয়ম হচ্ছে নিজের কাছে যা থাকে সব বিলিয়ে দেয়া। অর্থাৎ দু'শ টাকা থাকলে দু'শ টাকাই বিলিয়ে দেয়া, কেননা দরবেশী হচ্ছে আল্লাহতে বিলীন হওয়ার পথ। সুতরাং লয়প্রাপ্ত ব্যক্তির নিকট কোন কিছু থাকা অন্যায়।

এরপর হুজুর এরশাদ করলেন যে, আমি হযরত খাজা শায়খ শিহাবউদ্দিন সোহরাওয়ার্দী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর দর্শন পেয়েছি এবং তাঁর সান্নিধ্যে কয়েকদিন খেদমত করার সুযোগও লাভ করেছিলাম। তখন দেখেছি যে, এমন কোন দিন ছিলনা, যে দিন তাঁর খানকাহ্ শরীফে ১০/১২ হাজার ফুতুহ (নজর, নিয়াজ, হাদিয়া ইত্যাদি) না আসতো। কিন্তু সমস্ত জিনিস সেই দিনই তিনি আল্লাহ্ তায়ালার রাস্তায় বিলিয়ে দিতেন। এক পয়সাও সন্ধ্যা পর্যন্ত নিজের কাছে রাখতেন না। তিনি বলতেন যদি আমি যেদিনের জিনিস সেদিন বিলিয়ে না দিই তাহলে আমাকে দরবেশ বলা হবে না বরং ধনী বলা হবে। 

পরবর্তী পর্ব —
ধৈর্য ও অভাবই হচ্ছে দরবেশের সঙ্গী 

দরবেশী -(রাহাতুল ক্বুলুব)



দরবেশী 
📚রাহাতুল ক্বুলুব ✍🏻নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)
হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) বলেন, – হযরত শায়খুল  ইসলাম (শেখ ফরিদ) রহমতুল্লাহি আলাইহি 'দরবেশী' সম্বন্ধে বললেন যে, 'দরবেশীটা সম্পূর্ণ একটা গোপনীয় ব্যাপার এবং খিরকা (আজানু লম্বা জামা) পরা তারই সাজে যে মুসলমান ও অমুসলমান উভয় সম্প্রদায় লোকের সম্বন্ধে কাশফ (অন্তর্দৃষ্টি) দ্বারা বাক্যালাপ না করে এবং দুনিয়ার যে সব জিনিসপত্র তার নিকট আসে সে সবই আল্লাহ্ তায়ালার রাস্তায় বিলিয়ে দেয়, যার মধ্য হতে একটা কানাকড়িও যেন কোন কারণে জমা করে না রাখে। 

পরবর্তী পর্ব —
তরিকতের যাকাত 

পীরের প্রতিটি কথাই গুরুত্বপূর্ণ মনে করে মুরীদের স্মরণ রাখা উচিৎ



পীরের প্রতিটি কথাই গুরুত্বপূর্ণ মনে করে মুরীদের স্মরণ রাখা উচিৎ —
📚রাহাতুল ক্বুলুব ✍🏻নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)

হযরত সুলতানুল মাশায়েখ মাহবুবে এলাহি নিজামউদ্দীন আউলিয়া কুদ্দেসি সির রুহুল আজীজ তার রচনায় বর্ণনা করেছেন যে ৬৫৫ হিজরীর রজব মাসের ১০ তারিখে বুধবার আমি হযরত সায়্যেদুল আবেদীন সন্দুল আরেফীন খাজা শায়খ ফরিদউদ্দীন মাসউদ গঞ্জেশকর্ রহমতুল্লাহি আলাইহির কদমবুসি লাভের সৌভাগ্য অর্জন করলাম। তিনি তাঁর পবিত্র দয়া ও করুণা দ্বারা আমাকে শিষ্যত্বে স্থান দিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে কুল্লাহ চাহার তকী (চার টুকরা কাপড়ের তৈরী এক ধরনের টুপী) তাঁর খিরকার (আজানু লম্বা জামা) পকেট হতে বের করে আমাকে পরিয়ে দিলেন এবং সেই সঙ্গে তাঁর নিজের পবিত্র খিরকা ও এক জোড়া খড়মও দান করলেন এবং এরশাদ করলেন, "আমার ইচ্ছা ছিলো হিন্দুস্থানের বেলায়েত কোন অন্য ব্যক্তিকে প্রদান করবো কিন্তু তুমি রাস্তায় ছিলে তাই আমার প্রতি আল্লাহ্ তায়ালার ইলহাম হলো, "এ নেয়ামত নিজামউদ্দীনের প্রাপ্য, যখন সে আসবে, তাকে দান করবে।" 

এরপর আমার ইচ্ছা হলো প্রারম্ভিক প্রেমের নিদর্শন স্বরূপ আর একবার কদমবুসি করবো। কিন্তু তাঁকে দেখার পর এমন বিহ্বল ও ভীত হয়ে পড়লাম যে আমি আমার সমস্ত ইচ্ছা ও বাসনা ভুলে গেলাম। হুজুর তাঁর আলোকিত অন্তর দ্বারা আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বললেন, আমার প্রতি তোমার প্রেম উত্তপ্ত ও অত্যধিক ছিলো। তারপর বললেন, “লাকুল্লি দাখেলুন দাহাস্তা”
অর্থাত "প্রত্যেক নব্য প্রবেশকারীর মনেই এরূপ ভয় সঞ্চারিত হয়ে থাকে।"

এরপর বললেন, "আমার প্রতি খেয়াল করো আমি যা বলি তা অতি যত্নে মনে রাখো।” 
আমি ভুলে যাবো এ সন্দেহে তিনি পুনরায় বললেন, “সেই সব মুরীদই ভাগ্যবান যারা পীরের মুখ হতে নিঃসৃত বাণী অতি মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করে এবং লিখে রাখে । যারা এরূপ করে তারা প্রতিটি অক্ষরের জন্য হাজার বছর ইবাদতের ছওয়াব লাভ করবে এবং ইহলোক ত্যাগ করার পর শ্রেষ্ঠ বেহেস্তে স্থান পাবে।” 
তারপর তিনি নিম্নোক্ত কবিতার পংক্তি দু'টো আমাকে শোনালেন।

অনুবাদ : “হে বিচ্ছেদের অগ্নি করেছো কাবাব তার অন্তর, 
আকাঙ্ক্ষার বন্যায় বিধ্বস্ত হয়েছে যার প্রাণ”।

এরপর এরশাদ করলেন যে, লোকদের এমন থাকা উচিত যেন মুহাব্বাত তাদের প্রতি সর্বাবস্থায় বর্ষিত হয়, কেননা এমন কোন মুহূর্ত অতিবাহিত হয় না যখন অন্তরে এ আওয়াজ না আসে যে,
“জিন্দা দিল ওহ হ্যায় জিসমে মুহাব্বাতে খোদা হ্যায়”। অর্থাৎ "সেই অন্তরই জীবিত যার মাঝে খোদার মুহাব্বাত বিদ্যমান।"

পরবর্তী পর্ব —
দরবেশী

দরুদ পাঠের ফজিলত - খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া

 


দরুদ পাঠের ফজিলত —

(খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া)

 কদমবুসির ঐশ্বর্য লাভ করলাম । হযরত শায়খুল ইসলাম (খাজা গন্জেশেখর) রহমতুল্লাহি আলাইহি চাসত নামাজের পর দরবারে উপস্থিত হলেন । দরবারে অনেক বুজুর্গ ও মোসাফির উপস্থিত ছিলেন । এ অধম (নিজামুদ্দীন আউলিয়া) নূরের জামাল (সৌন্দর্য) দর্শন করে মাথা জমিনে রাখলো; নির্দেশ হলো মস্তক উত্তোলন কর । নির্দেশানুযায়ী মাথা তুললাম । তিনি (খাজা গন্জেশেখর রহ.) বললেন, তুমি এসেছো খুব ভাল হয়েছে । হযরত শায়খুল ইসলাম দরবারের সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমি খোদার নিকট প্রার্থনা করছি নিজামুদ্দিনের সকল আশা যেন পূর্ণ হয় । এরপর দরূদ-শরীফ পাঠ সম্বন্ধে আলোচনা শুরু হলো । তিনি বললেন ‘আছারে আউলিয়া’ কিতাবে লিখা আছে, যে ব্যক্তি রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)- এর উপর মুহাব্বতের সাথে একবার দরূদ শরীফ পাঠ করে সে গুনাহ হতে এমনভাবে পাক হয় যেন সদ্য মায়ের উদর হতে ভূমিষ্ট হলো । এ ছাড়াও তার কর্মফলে অসংখ্য নেকী লিখা হয় এবং আউলিয়াদের খাতায় তার নাম সন্নিবেশিত হয় ।


এরপর অজিফা সম্বন্ধে বললেন যে সাহাবা, তাবেঈন ও পীরগণ যে সব অজিফা নিজেরা পাঠ করার জন্য নির্বাচন করেন তা তাঁরা নির্দিষ্ট সময়েই আদায় করেন । যদি দিনের অজিফা দিনে পাঠ করা কোন কারণে সম্ভব না হয় তাহলে রাতে পাঠ করে নেন । কিন্তু রাতের কোন নামাজ বা অজিফা ক্বাজা হলে তাঁরা নিজেকে মৃত মনে করেন এবং ক্রন্দন করে বলতে থাকেন যে, যদি আমি জীবিত থাকতাম তাহলে খাজায়ে কায়েনাৎ হযরত নবী করিম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)- এর সালাত (নামাজ) আমার দ্বারা ক্বাজা হতোনা । 


এরপর বললেন, হযরত এহ্ইয়া মোয়া’জরাজী (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর অজিফা ছিলো প্রতি রাতে তিন হাজারবার দরূদ হযরত রাসূলে কায়েনাৎ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)- এর উপর পাঠ করা, কিন্তু এক রাতে এ অজিফা তাঁর ছুটে যায় । তখন তিনি রোদন করতে লাগলেন; তাঁর এ কান্নার কারণ জানার জন্য বহুলোক একত্রিত হয়ে গেলো এবং এ কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করতে লাগলো । উত্তরে উনি বললেন একটি বড় নেয়ামত আমার নিকট হতে দূরে চলে গেছে । যখন এহ্ইয়া তাঁর এ দুঃখের কথা বর্ণনা করছিলেন তখন গায়েবী আওয়াজ হলো, “হে এহ্ইয়া তোমাকে প্রতিদিন দরূদ পাঠ করার জন্য যে ছওয়াব প্রদান করে থাকি আজ তোমাকে তোমার অনুশোচনার কারণে তার চেয়ে একশতগুণ অধিক ছওয়াব প্রদান করলাম । এ ঘটনা বর্ণনা করতে করতে হযরত শায়খুল ইসলামের চোখে অশ্রুতে ভরে উঠলো এবং কেঁদে ফেললেন । 


এরপর (গন্জবক্স রহ.) বললেন, একবার হযরত সিনাই রহমতুল্লাহি আলাইহি স্বপ্নে হযরত রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে দেখলেন যে তিনি খাজা সিনাই (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছেন । হযরত সিনাই রহমতুল্লাহি আলাইহি তখন দৌড়ে যেয়ে হুজুরেপাক (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)- এর কদম মুবারকে পড়ে গেলেন এবং বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ ! আমার প্রাণ আপনার জন্য উৎসর্গীকৃত কিন্তু আপনি আমাকে দেখে আপনার পবিত্র মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছেন কেন ? তখন হুজুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন,  “হে সিনাই তুমি আমার প্রতি এতো অধিক দরূদ পাঠ করেছো যে তোমাকে দেখে আমার লজ্জা হয়, বিনিময়ে আমি তোমাকে কি দিব ?”  এ পর্যন্ত বলে হযরত শায়খুল ইসলাম রহমতুল্লাহি আলাইহি উচ্চস্বরে কাঁদতে লাগলেন, তারপর বললেন, তিনি কেমন ব্যক্তি ছিলেন যার দরূদ পাঠের আধিক্যতায় হুজুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্বয়ং পুরষ্কার নির্বাচনে লজ্জিত হয়েছিলেন । হাজার নে'য়ামত সেই বুজুর্গের প্রতি এনায়েত হোক । তিনি অতি উচ্চাসনে আরোহণ করার সম্মান অর্জিত করেছিলেন এবং তিনি একই আসনে অধিষ্ঠিত থেকে জিন্দেগী অতিবাহিত করেছেন । ইন্তেকাল পর্যন্ত তিনি একই অবস্থানে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং পুনরুত্থিত দিবসেও তিনি একই মর্যাদা নিয়ে উঠবেন ।


এরপর বললেন, একবার একদল ইহুদী এক স্থানে এসেছিলো । এক মুসলমান দরবেশ তাদের নিকট কিছু যাচ্‌না করলো । এমন সময় আমিরুল মু'মেনীন হযরত আলী (রাদি আল্লাহু আনহু) ঐ দিকেই যাচ্ছিলেন । ইহুদীগণ দূর থেকে তাঁকে দেখে তাচ্ছিলভাবে দরবেশকে বললো, যাও ঐতো শাহে মরদান আসছে, তাঁর কাছেই নিজের দরখাস্ত পেশ করো । দরবেশ তখন আমিরুল মু'মেনীনীকে দেখতে পায়নি, তাই সে জিজ্ঞেস করলো তিনি কোথায় ? তারা দিক নির্দেশ করে বললো ঐ আসছে । দরবেশ এগিয়ে গেলো । পিছনে পিছনে ইহুদীগণও তাকে অনুসরণ করলো । সে আমিরুল মু'মেনীন হযরত আলী রাদিআল্লাহু আনহুকে সালাম পেশ করে নিজের অভাব জানালো । কিন্তু তাঁর নিকট সে সময় দেয়ার মতো কিছুই ছিলোনা । তিনি চিন্তা করতে লাগলেন কি করা যায় । তাঁর নিকট কিছুই নেই অথচ কিছু না দিলেই নয় । এ ছাড়াও ইহুদীগণের উদ্দেশ্যটাও তিনি বুঝতে পারলেন । তিনি দরবেশকে বললেন, হাত উন্মুক্ত করো । দরবেশ হাত খুলে ধরলো । হযরত আমিরুল মু'মেনীন দশবার দরূদ-শরীফ পাঠ করে তার হাতে ফুঁ দিলেন এবং হাত বন্ধ করতে বললেন । সে হাত বন্ধ করলো । এরপর তিনি তাকে ইহুদীদের নিকট যেতে বললেন । সে হাত মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় ইহুদীদের নিকট গমন করলো । ইহুদীগণ বিদ্রূপ করে জিজ্ঞেস করলো, কি পেলে হে দরবেশ ? দরবেশ বললো, কোন টাকা পয়সা তিনি দেননি, তিনি দশবার দরূদ-শরীফ পাঠ করে আমার হাতে ফুঁ দিয়ে বললেন, মুষ্টিবদ্ধ করে চলে যাও ৷ ইহুদীগণ একথা শুনে আরও বিদ্রূপের সঙ্গে হাসতে লাগলো এবং একজন বললো হাতটা খুল দেখি । যখন সে মুঠ খুললো তখন দেখা গেলো হাতে দশটি আশরাফি (স্বর্ণমুদ্রা) । ইহুদীগণ এ দৃশ্য দেখে বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে পড়লো । হযরত আমিরুল মুমেনীনের এ কারামাত দেখে ইহুদীগণের সকলেই ইসলাম কবুল করলো এবং এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর একই সঙ্গে আরও কয়েক হাজার ইহুদী ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে গেলো । সুবহানাল্লাহ্ !


হযরত শায়খুল ইসলাম রহমতুল্লাহি আলাইহি এরপর বললেন  খলিফা হারুনুর রশীদ একবার অসুস্থ হয়ে ৬ মাস শয্যাগত ছিলেন । তিনি দিনদিন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, ধমনীর স্পন্দন ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর হচ্ছিলো । অবশেষে অবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌছলো যে প্রাণবায়ু নিঃশেষ হয়ে যায় যায় । সেদিন ঘটনাচক্রে হযরত শায়খ আবু বকর শিবলী রহমতুল্লাহি আলাইহি খলিফার সদর দরজার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন । এ সংবাদ হারুনুর রশীদ জানতে পেরে তার উজীরকে পাঠালেন তাঁকে ডেকে আনতে । উজীর খলিফার আদেশ পেয়ে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে এলেন । হযরত শিবলী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর জন্য কোনরূপ আদর আপ্যায়ন করতে নিষেধ করলেন । খলিফার এ করুণ অবস্থা দেখে তাঁর মনে দয়ার সঞ্চার হলো । তিনি কয়েকবার দরূদ-শরীফ পাঠ করে খলিফা হারুনুর রশীদের মুখে ফুঁ দিলেন এবং খলিফা ধীরে ধীরে সুস্থ হতে লাগলেন এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলেন ।


হযরত শায়খুল ইসলাম রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, প্রত্যেকের উচিত হযরত রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর উপর প্রত্যহ অধিক সংখ্যকবার দরূদ -শরীফ পাঠ করা । যদি একেবারেই সময় না হয় তাহলেও প্রত্যহ অন্ততঃ ৫ বার অবশ্যই পাঠ করবে । একথা মনে রাখতে হবে যে সমস্ত অজিফার মধ্যে দরূদ শরীফই শ্রেষ্ঠ । সমস্ত রাত ইবাদত বন্দেগীর চেয়ে কয়েকবার দরূদ শরীফ পাঠ করা উত্তম । অবশ্য দরূদ বিভিন্ন প্রকারের রয়েছে । এক এক দরূদ শরীফের ফজিলত এক এক রকম । উপরে প্রত্যহ ৫ বার যে দরূদ শরীফ পাঠ করার কথা বলা হয়েছে তা নিম্নরূপ । 

“আল্লাহুম্মা ছাল্লি আলা মুহাম্মাদিন বেয়াদাদে মান ছাল্লু আল্লাইহি ওয়া ছাল্লি আলা মুহাম্মাদিন বেয়াদাতে মাল্লাম ইউ ছাল্লু আলাইহি ওয়া ছাল্লি আ’লা মুহাম্মাদিন; কামাতু হিব্বু ওয়া তারদা আনতু ছাল্লি আলাইহি ওয়া ছাল্লি আলা মুহাম্মাদিন কামা ইয়াম বাগিয়াছ ছালাতু আলাইহি ওয়া ছাল্লি আলা মুহাম্মাদিন কামা আমারতানা বিছছালাতি আলাইহি”


এরপর হযরত শায়খুল ইসলাম রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, মওলানা ফকির আবুল হাসান জিন্দোসী রহমতুল্লাহি আলাইহি বিরচিত “রওজা” কিতাবে দরূদ-শরীফ সম্বন্ধে বিস্তারিত ফজিলত ও বরকত বর্ণনা করা হয়েছে । তার মধ্য হতে কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হলো -

প্রথম ফজিলত   হযরত ইমাম শাফেয়ী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) - এর ইন্তেকালের পর তাঁকে তাঁর এক ভক্ত স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আল্লাহ্তায়ালা আপনার সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছেন ? জবাবে তিনি বলেছিলেন, তিনি তাঁর করুণা ও দয়া দ্বারা আমায় ক্ষমা করেছেন এবং ক্ষমার প্রধান উপাদান ছিলো আমার প্রতিদিনের ৫ বার দরূদ শরীফ পাঠ ৷


“রওজা” কিতাবে দরূদ-শরীফ সম্বন্ধে দ্বিতীয় ফজিলত

একদিন হযরত রাসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) দরবারে উপস্থিত হলে প্রতিদিনের অভ্যাস মতো সাহাবাগণ তাঁকে বেষ্টনী করে বসে পড়লেন । হযরত আবু বকরের নির্দিষ্ট স্থান ছিল তাঁর সর্বডানে এবং তিনি সেখানেই বসেছেন । এমন সময় এক যুবক প্রবেশ করে ছালাম পেশ করে অপেক্ষা করলেন । হুজুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সেই যুবককে হযরত আবু বকর (রাদি আল্লাহু আনহু) - এর পাশে বসতে বললেন । যুবক তাঁর আদেশ পালন করলেন এবং কিছুক্ষণ পর চলে গেলেন । হযরত আবু বকর (রাদি আল্লাহু আনহু) একটু চিন্তিত হলেন এবং অন্যান্য সাহাবা ভাবলেন আগন্তুক যুবক হয়তো খিজির (আলাইহিস্ সালাম) হবেন । কেননা সাহাবাদের মধ্যে এমন কেউ ছিলেন না যিনি হযরত আবুবকর রাদিআল্লাহু আনহু এর পাশে বসতে পারেন । হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বললেন, এ যুবক আমার উপর এতো অধিক সংখ্যকবার দরূদ পাঠ করে যা ভাবনার ঊর্ধ্বে । হযরত সিদ্দিকে আকবর (রাদি আল্লাহু আনহু) জিজ্ঞেস করলেন, এ যুবক খাওয়া-দাওয়া ও অন্য কাজে মশগুল হয় কি না ? হুজুর করিম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উত্তরে বললেন এ যুবক খাওয়া-দাওয়া ও অন্যান্য কাজ যথারীতি করে থাকে এবং তার পরেও সে প্রত্যহ অসংখ্যবার দরূদ পাঠ করে; কোনদিনও বাদ দেয়না । উপরে উল্লেখিত দরূদই তিনি পাঠ করতেন । 


এ আলোচনা চলার সময় হযরত শায়খুল ইসলাম (রহমতুল্লাহি আলাইহি) এর দরবারে পাঁচজন দরবেশ প্রবেশ করে জমিনবুছি করে বসে পড়লো এবং আরজ করলো, “আমরা কাবা শরীফ অভিমুখে রওনা হয়েছি কিন্তু রাস্তা খরচ নেই” হযরত তাদের কথা শ্রবণ করার পর একটু ধ্যানস্ত হলেন । একটু পড়ে মস্তক উত্তোলন করে সামনে রক্ষিত একটা পাত্রের ভাঙা টুকরোগুলো হাতে নিয়ে ঐ দরবেশদেরকে দান করলেন । দরবেশগণ এতে মনক্ষুণ্ণ হয়ে নিজেদের মধ্যে বলতে লাগলো, এ ভাঙা পাত্রে আমাদের কি কাজে আসবে ? হুজুর তাদের কথা বুঝতে পেরে বললেন, ওগুলোর প্রতি ভালো করে তাকিয়ে দেখ, নিরাশ হওয়ার কোন কারণ নেই । তারা সেই ভাঙা টুকরোগুলো ভাল করে নিরিক্ষণ করার পর দেখতে পেল ভাঙা টুকরোগুলো সবই খাটী স্বর্ণমুদ্রায় রূপান্তরিত হয়েছে । এই কারামাত দেখে তারা সকলেই বিস্মিত হয়ে পড়লো । আমি পরে হযরত শায়খ বদরুদ্দীন ইসহাক (রহমতুল্লাহি আলাইহি) - এর নিকট হতে জেনেছিলাম হুজুর ঐ টুকরোগুলোর উপর দরূদ-শরীফ পাঠ করে ফুঁক দিয়েছিলেন ।


-----------------------

আয়াতুল কুরসি আরবি 

 اَللهُ لآ إِلهَ إِلاَّ هُوَ الْحَىُّ الْقَيُّوْمُ، لاَ تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَّلاَ نَوْمٌ، لَهُ مَا فِى السَّمَاوَاتِ وَمَا فِى الْأَرْضِ، مَنْ ذَا الَّذِىْ يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلاَّ بِإِذْنِهِ، يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيْهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلاَ يُحِيْطُوْنَ بِشَيْئٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلاَّ بِمَا شَآءَ، وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ، وَلاَ يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا وَ هُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيْمُ-

আয়াতুল কুরসির বাংলা উচ্চারণ —

আল্লাহু লা ইলা-হা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়ুম, লা তা’খুযুহু সিনাতুঁও ওয়ালা নাউম। লাহু মা-ফিসসামা-ওয়া-তি ওয়ামা ফিল আরদ্ব। মান জাল্লাজি ইয়াশফা’উ ইনদাহু ইল্লা বিইজনিহি। ইয়া’লামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়ামা খালফাহুম। ওয়ালা ইয়ুহিতুনা বিশাইইম মিন্ ইলমিহি ইল্লা বিমা- শাআ। ওয়াসি‘আ কুরসিয়্যুহুস সামা-ওয়াতি ওয়াল আরদ্ব। ওয়ালা ইয়াউদুহু হিফজুহুমা ওয়া হুয়াল আলিয়্যূল আজিম।

আয়াতুল কুরসির অর্থ : 
আল্লাহ, যিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। যিনি চিরঞ্জীব ও বিশ্বচরাচরের ধারক। তন্দ্রা বা নিদ্রা তাঁকে পাকড়াও করতে পারে না। আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবকিছু তারই মালিকানাধীন। তাঁর হুকুম ব্যতীত এমন কে আছে যে তাঁকে সুপারিশ করতে পারে? তাদের সম্মুখে ও পেছনে যা কিছু আছে সবকিছুই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসমুদ্র হতে তারা কিছুই আয়ত্ত করতে পারে না, কেবল যতটুকু তিনি দিতে ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত। তাঁর কুরসি সমগ্র আসমান ও জমিন পরিবেষ্টন করে আছে। আর সেগুলোর তত্ত্বাবধান তাঁকে মোটেই শ্রান্ত করে না। তিনি সর্বোচ্চ ও মহান।

__