২৫- পঞ্চবিংশ মজলিস
চরিত্রের পরিবর্তন-
পহেলা রবিউস সানী, বুধবার। পবিত্র দরবার শরীফে সেই দিন চরিত্র পরিবর্তন সম্বন্ধে আলাপ-আলোচনা হইতেছিল। পীর ও মুরশিদ এরশাদ করেন, সূফীগণ গুণের পরিবর্তনকে বিবর্তন বলিয়া থাকেন। মুরীদের প্রথম কর্তব্য হইল খারাপ স্বভাবকে সৎস্বভাবে, ক্রোধকে সহনশীলতায়, কৃপণতাকে বদান্যতায় ও অহংকারকে বিনয়ে পরিণত করা, রূঢ় কথার পরিবর্তে মিষ্টি ভাষা প্রয়োগ করা, অন্যায় কিছু না করিয়া ন্যায়নিষ্ঠ হওয়া ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি মনোনিবেশ করা।
এই সমস্ত কাজ মুরীদের পক্ষে ওযু করার ন্যায়। যেমন ওযু ব্যতীত নামায হয় না। তেমনি ঐ সমস্ত বিষয়বস্তু আয়ত্তে আনিতে না পারিলে তাহার পক্ষে তরীকতের পথে চলা সম্ভবপর হয় না। সাধন-ভজনের মূলই হইল ঐ সমস্ত বিষয়ের অধিকারী হওয়া।
সূফী সম্প্রদায় বলেন, এই সমস্ত গুণ আয়ত্তাধীন হইলে পূর্ণ পবিত্রতা অর্জিত হয়। ইহার পর যেকোন এবাদত-বন্দেগীই করা হয় তাহা সার্বিক হয় এবং আল্লাহ কবুল করেন। পরকালে তাহা ফলপ্রসূ হইবে।
যেই দুর্ভাগা এই গুণাবলীর সামান্যতম কিছুও অর্জন করিতে না পারে সে যত নামায পড়ুক, রোযা রাখুক আর স্বার্থান্বেষী আলেমগণ ঐ সমস্ত এবাদত-বন্দেগী দুরস্ত হওয়ার যত ফতওয়াই দিক না কেন, এই দুর্ভাগা যেইসব কর্তব্য কাজ সমাধা করিয়াছে, পরকালে সেইসব তাহার কোন কাজেই আসিবে না। তাই সূফী সম্প্রদায় এই বিবর্তনকে ফরযে আইন বলিয়া থাকেন। এই সমস্ত গুণ অর্জিত হইলে নফস পরাভূত হইয়া যায়। আর যে নফস পরাভূত হয় না, অন্তর সেই কাফের নফসের কয়েদী। নফস যে আদেশ দেয় অন্তর কয়েদীর ন্যায় সেই আদেশই পালন করে।
এইভাবে বুঝিয়া লও যে, মুসলমানী কাফেরীর হাতে বন্দী। তাই কাফের নফস যাহা বলে, মুসলমান (অন্তর) তাহার আদেশ পালনে 'হাঁ' না বলিয়া তবে কি করিবে?
অন্তর এবং নফসের ইহাই পরিচয়। অন্তর কখনও এমন কথা বলে না যে. দোযখের দিকে যাইতে হইবে। অন্তরের সিংহাসনে নফস উপবিষ্ট হইয়া বলে, 'আমিই তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রভু'।
আর অন্তরের পরিচয় হইল, মোমেনের কলব আল্লাহর আরশস্বরূপ। মোমেনের অন্তকরণ আল্লাহর ঘর। মোমেনের অন্তকরণ তাহাতেই শান্তি পায়।-
কাফের নফস আমাদের অন্তরে বাসা বাঁধিয়াছে এবং অন্তরকে তাহার বন্দী দাসে পরিণত করিয়াছে।
অন্তরে দেবদেবী প্রকাশ্যে মোনাজাত। হে অন্তকরণ। এখন মুসলমান হও, পৈতা ছিঁড়িয়া ফেল। কাফেরী তোমার অন্তরে বাসা বাঁধিয়াছে। এই কারণেই আজ পৃথিবীতে মুসলমানের সংখ্যা কম।
স্বভাব পরিবর্তনে নফস যখন বাহির হইয়া যায় তখনই অন্তর বাদশাহ হইয়া নফসকে বন্দী করে। অন্তর বাদশাহ হওয়ার সাথে সাথেই ঈমানের সূর্যোদয় হয় এবং ইসলাম স্বীয় সৌন্দর্য প্রদর্শন করে। মারেফাতের দ্বার তাহার বক্ষস্থল উন্মুক্ত করিয়া দেয়।
তারপর হযরত পীর ও মুরশিদ বলিলেন- অসদগুণাবলী যখন পরিবর্তন হইয়া যায় তখন তোমার সমস্ত সমস্যারও সমাধান হইয়া যায়। তোমার অস্তিত্ব যখন বিলীন হইয়া ফানার অবস্থা প্রকাশ পায় তখন তোমার মধ্য হইতে আনাল হক (আমি সত্য) শব্দ উত্থিত হইতে পারে। ইহার অর্থ এই যে, তোমার পক্ষে যতটা সম্ভব তুমি যেন নফসের নির্দেশমত না চল, অন্যথায় ধ্বংস হইয়া যাইবে। সমস্ত বুযুর্গই নফসের এই অবস্থা সম্বন্ধে জ্ঞাত। তাঁহারা নফসের ধোঁকা হইতে কান্নার সাথে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করিয়া বলেন- "আহ! আমার মা যদি আমাকে প্রসবই না করিতেন তবে কাফের নফস আমাকে ধ্বংস করিতে পারিত না। আমার জন্মের পর জীবিত দেখিয়া যদি আমার নামই না রাখিত, তবে পার্থিব কাজকর্ম এবং আরাম-আয়েশের জন্য আমাকে প্রশ্নই করা হইত না"।
একদিন কোন বুযুর্গের ইচ্ছা হইল তিনি মুরগীর ডিম খাইবেন। তিনি নফসকে উদ্দেশ করিয়া বলিলেন, আমি যতদিন জীবিত আছি মুরগীর ডিম খাইব না। এই ওয়াদা স্মরণ রাখিয়াই তিনি বিদেশ ভ্রমণে বাহির হইলেন। এক যুগ অর্থাৎ বার বৎসর পর্যন্ত তিনি সফরে থাকেন। একদিন তিনি কোন এক শহরে উপস্থিত হইলেন। তথাকার এক বুযুর্গ আসিয়া বলিলেন, ওহে শায়খ ! আজ আপনি আমার গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করুন। বুযুর্গ দাওয়াত কবুল করিলেন এবং মেজবানের সাথে তাঁহার গৃহে উপস্থিত হইলেন। এই সময় মেজবানের গৃহে মুরগীর ডিম এবং রুটি ব্যতীত আর কিছুই ছিল না। তিনি তাহা আনিয়া মেহমানের সম্মুখে রাখিলেন। মেহমান খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হইলেন। এমন সময় তাঁহার নফস বলিয়া উঠিল, পরিশেষে এক যুগ পর আমার ইচ্ছা পূরণ করিতে যাইতেছি। বুযুর্গ উপলব্ধি করিতে পারিলেন, নফসের আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ হইতে যাইতেছে। তিনি বলিলেন, খোদার কসম। এখনও তোমার ইচ্ছা পূর্ণ হয় নাই। এই কথা বলিয়াই তিনি উঠিয়া দাঁড়াইলেন এবং আহার না করিয়াই চলিয়া গেলেন।
বুযুর্গগণ নফসকে এইভাবেই পরাস্ত করিতেন এবং এইভাবেই তাঁহাদের উদ্দেশ্য সাধন হইত। আর তোমাদের ধারণা, পিতা-মাতার অনুসরণ করত শুধু রোযা-নামায দ্বারাই বৈতরণী পার হইয়া যাইবে। কখনও নহে। এইভাবে লক্ষ্যস্থল পৌঁছা সম্ভবপর হইবে না। ইহার পূর্বের যত কিছু আশা-আকাঙ্ক্ষা আছে তাহা তো স্বভাবসিদ্ধ। তাহাকে ধর্ম বলা যাইতে পারে না।
------------

No comments:
Post a Comment